স্বর্গের কান্না

দ্বৈপায়ন মজুমদার


মানুষটা বেশ জনপ্রিয়, তবে শুধুমাত্র জনপ্রিয় বললে কমই বলা হয় । জীবনে একের পর এক সাফল্যের পাহাড় টপকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে । অ্যালবাম বেরোলেই হাজার হাজার কপি নিমিষে উধাও । ‘বিল বোর্ডে’ ওর গানের সাফল্য, ওর ম্যাজিকাল গিটার আর পাহাড় প্রমান জনপ্রিয়তা ওকে প্রায় ভগবানের পর্যায়ে নিয়ে গেছে । আর সেই ভগবানের চোখে জল, ভগবান কাঁদছেন ।
মার্চ ২০, ১৯৯১, নিউইয়র্ক, তিপান্ন তলা অট্টালিকার খোলা জানলা থেকে শূন্যে দোল খেতে থাকল চার বছরের বাচ্চাটা । যে সময়ে বাবার হাত ধরে পার্কে ঘুরবে, রঙিন খেলনাগুলো আদর করবে, মায়ের কাছে আবদার করবে, সেই সময় ছোট্ট শরীরটা হাওয়াতে দোল খেতে খেতে ছিটকে পড়ল পাশের বাড়িতে । ওর গায়ক বাবা জানতেও পারল না । যখন জানল, তখন ওই দূর আকাশে একটা তারা হয়ে গেছে ছোট্ট কনর (Conor) ।
কি করবে গায়ক, সব কিছু যে থেমে গেল হঠাৎ । প্রেম ভেঙে গেলে মানুষ কাঁদে, সেই কান্না আসে গানে, কবিতায় । আবার সেই ভাঙা প্রেমের গান শুনেও তো কত মানুষ নতুন করে প্রেমে পড়ে । এমন প্রেমের গান, ভাঙা প্রেমের গান তো কতই হয়েছে । সে নিজেও তো কত বছর সেই সাতের দশকে গেয়েছে বুক ভরা প্রেমের গান, ‘ওয়ান্ডারফুল টুনাইট’ (Wonderful Tonight) । আর ‘ওয়ান্ডারফুল টুনাইটে’র মত ভালোবাসার গানে প্রেমে পড়েছে অসংখ্য মানুষ । কিন্তু আজ কি করবে, গায়ক যে বড় একা হয়ে গেল । কি পাপ করেছে সে, গানই তো গাইত, থাকার মধ্যে ছিল গিটার আর ‘শূন্যতার ছোটবেলা’ । বাবা কেমন, তা বোঝার সুযোগ গায়কের ভাগ্যে ছিল না । সব কষ্টকে দুরে রাখতে সেই কোন ছোটবেলায় সম্বল করেছিল গিটারকে, আর তার পর বছরের পর বছর অসংখ্য গানে ভাসিয়ে দিয়েছে গান পাগলদের । আর জীবনের এতগুলো বছর টপকে এই চার বছরেরে ছেলেটাকে যে খুব ভালোবেসে ফেলেছে, বড্ড মায়ার টান । তার ভালোবাসার জিনিসগুলো নিয়তি কেড়ে নেয়, কেড়ে নিয়েছে, বার বার । আগের বছরই ১৯৯০, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা কেড়ে নিল ওর সহ সঙ্গীত শিল্পী, ওর ম্যনেজার সহ বেশ কয়েকজনকে । সেই কষ্ট সামলে ওঠার আগেই ওর চার বছরের সন্তান ভ্যানিশ । ছোটবেলাতে বাবা তাকে ফেলে চলে গেল অতি অবলেহায়, তবু জানত বাবা কোথাও একটা তো আছে, অন্তত বেঁচে আছে । আর আজ ওর চার বছরের কনর চলে গেল অনেক অনেক দুরে, চিরকালের জন্য । কোন পাপে ছেলেটা আর অক্সিজেন নেবে না এই পৃথিবীতে, অক্সিজেনের কি এতই অভাব ।
সেই কম বয়সে একবার নেশার টানে গান ছেড়েছিল, পরে বেরিয়েও আসে । তাহলে কি আবার ফিরে যাবে ফেলে আসা সেই অন্ধকার সমুদ্রে । কিন্তু না, ওর হাতে আছে একটা গিটার, যার তারে খেলা করে স্বর্গীয় জাদু, আছে কিছু সুর, আর আছে ওর ‘ভোকাল কর্ড’, গানের গলা । ওই সময় রাশ (rush) নামের এক সিনেমার সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিল মানুষটা । লিখতে বসল, সব কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল কলমে । উইল জেনিংসকে এই আবগের সঙ্গী করে নিল । দু’জনের কলমে উঠে এল স্বর্গের কান্না, ‘টিয়ারস ইন হেভেন’ । তার পর বুকের সব ভালোবাসা আর জমে থাকা কান্না বেরিয়ে এল শিল্পীর গলায় ।
চার বছরের বাচ্চাটা কি স্বর্গে ওর নাম মনে রাখবে ? সে কি একই রকম থকবে ? বাবার হাতের ছোঁয়া নিশ্চয় সে কি পেতে চাইবে.........এর থেকে বেশি চোখের জল স্বর্গেও থাকতে পারে না ।
‘would you know my name
If I saw you in heaven ?
Would it be the same
If I saw you in heaven ?
I must be strong and carry on
‘Cause I know I don’t belong here in heaven
Would you hold my hand
If I saw you in heaven ?
Would you help me stand
If I saw you in heaven ?
I’ll find my way through night and day
‘Cause I know I just can’t stay here in heaven
Time can bring you down, time can bend your knees
Time can break your heart, have you begging please, begging please
Beyond the door there’s peace I’m sure
And I know there’ll be no more tears in heaven
………………………………………..’
হ্যাঁ, এটাই এরিক ক্ল্যাপটন, আর তার সেই গান ‘টিয়ারস ইন হেভেন’ (Tears In Heaven) ।
(১৯৯৩ এ তিনটে গ্র্যামি সহ অসংখ্য পুরষ্কার দিয়ে ‘টিয়ারস ইন হেভেন’কে বর্ণনা করা যায় নি, যাবেও না । ২০০৪, এরিক ক্ল্যাপটন সিধান্ত নিলেন, আর এই গান গাইবেন না । কারণ অতি সহজ, এই গান তো বিক্রি অথবা পুরস্কারের জন্য তৈরি হয়নি, নিখাদ আবেগে এর জন্ম, এতোগুলো বছরে যদি সেই আবেগের যদি একটুও তারতম্য ঘটে তবে তা নিজের না গাওয়াই উচিত । অটোবায়োগ্রাফিতে ক্ল্যাপটন লিখছেন ‘originally, these songs were never meant for publication or public consumption ; they were just what I did to stop from going mad. I played them to myself, over and over, constantly changing or refining them, until they were part of my being’ , কিন্তু ২০১৩ তে আবার শোনা গেল ‘টিয়ারস ইন হেভেন’, আসলে স্বর্গের কান্না যে বড় খাঁটি, চাইলেও আটকানো যায় না )