নীলচে হাহাকারের গান

শাফিনূর শাফিন

ছোটবেলার কথা মনে আছে। স্কুল থেকে ফিরেই কাঁধের ব্যাগ ছুঁড়ে দিয়ে, একহাতে জুতা খুলে পায়ের মোজা খুলতে খুলতে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে অপর হাতে ক্যাসেট প্লেয়ারে অঞ্জনের গান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতাম। দার্জিলিং এর হালকা কুয়াশাঘেরাটোপে পকেটের ভিতরে আধখাওয়া পাহাড়ি ফল রেখে নিকোটিনে হলদে হয়ে যাওয়া আঙুল কীভাবে পিয়ানোর উপর খেলে যাচ্ছে কিংবা মাসের প্রথম দিনে ধর্মতলার মোড়ে পকেটে পিস্তল খেলনা নিয়ে মদ খেয়ে টাকা ওড়ানোর নিম্ন মধ্যবিত্ত বিলাসিতা, কৈশোর পেরোনো প্রেমের চ্যাপ্টা গোলাপ বা ম্যারিয়েনের গল্প, মধ্যবিত্ত কাঠখোট্টা জীবনের কারণে প্রেমিকার ববি রায়ের কাছে চলে যাওয়া, মালার নানা ছদ্মবেশের ভিতরে নিজের ফেলে আসা জীবনকে লুকিয়ে ফেলার সমস্ত চেষ্টা, এমন নানারকম মধ্যবিত্ত জীবনের বাঁধাবৃত্ত নিয়ম নিষেধের ছবি গানের ভিতর দিয়ে এসে ধরা দিতো আমার কাছে। এভাবে কবিতা লেখার ইচ্ছেটা সুপ্ত জেগে উঠা। এভাবে অন্য একটা দেশ বা শহরের মানুষ,জীবন, পথঘাট আপন করে ভাবা। এইজন্যই হয়ত প্রথমবার কলকাতা গিয়েও আমার একেবারেই অচেনা লাগেনি শহরটা!
অঞ্জন বা সুমন যেটা করেছিলেন তা হলো গানের কথা ভালো না লাগলে, কথাগুলো নিজের সাথে রিলেট করতে না পারলে- সুর যতো ভালোই হোক গানটা তেমন ভালো লাগেনা কখনোই। আমি খুব একটা ক্লাসিক্যাল প্রিয় নই। আমার কণ্ঠে সুর তাল লয় কিছুই নেই। শীলা মোমেনের রক্তকরবীতে গান শিখতে গিয়েছিলাম কিছুদিন। গান শেখার চেয়ে শীলাদির মুখে গানের গল্পগুলো শুনতে বা অন্যরা উদাত্ত সুরে গাইছে এটা দেখতেই বেশি ভালো লাগতো। কিছুদিন ক্ল্যাসিক্যাল শেখার চেষ্টাও করেছিলাম। ওস্তাদ যখন দেখলেন কণ্ঠে কিছুতেই গান উঠছে না, বললেন, “তুমি একবার ভোরের দিকে রাগ ভৈরবী শুনে দেখো কিংবা মাঝরাতে কাফী ঠাট। দেখবে কেমন লাগে!” উনি হয়ত ভেবেছিলেন তাতে আন্দোলিত হয়ে সুর আপনা আপনি আমার কণ্ঠে ভর করবে। সেসব কিছুই হয়নি। রাগ ভৈরবী শুনতে শুনতে আমি শুধু দেখেছি কীভাবে ভোর সোনালী আলোয় ভরিয়ে দেয় চারদিক। সে এক ঐশ্বরিক দৃশ্য ছিল!
গান মূলত আমার কাছে দৃশ্য। যে গান বা সুর আমার চোখের সামনে কোন দৃশ্য সৃষ্টি করতে পারে না তা আমার আর শোনা হয় না। আর তাই হয়ত গানের কথা অনেক গুরুত্বপুর্ন। মনোসরণির গান অনেক বেশি উদাত্ত আর তীব্র মনে হয় আমার কাছে। যেমনঃ
“অসীম সেই মৃত্যুতে বুঝি শোধ হবে নির্বাসনের সময়”
মনোসরণির আরেকটি গানেই আছে-

“আমায় অন্ধ করে
সব রঙ চুরি করে
আমাকেই চোর করা হলো”

কিংবা

“চোখ দুটো খোলা আছে
তোমায় দেখতে চাই
দেখিনি তোমায় কোনদিন”

সব রঙ চুরি করে সবাই হয়ত দেখবে অন্ধকার। আর আমি দেখছি সাদা সাদা আলোয় ভরে গেছে চারদিক। আমি দেখছি সাদার তোড়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামনে হয়ত আমারই মুখ দেখা যাচ্ছে- চোখ খোলা তবু নিজেকে দেখতে না পেয়ে আমি অন্ধ! এসব গানকে ঠিক গান না ভেবে কবিতা ভাবতেই ভালো লাগে। দিন আচ্ছন্ন করে। মনোসরণির গান শুনলে আমার এমনটা মনে হয়। যেমন মনে হতো অঞ্জন শুনলে।
তখন কাশ্মীরে ছিলাম। কাশ্মীরের ভীষণ ঠাণ্ডায় জমে যেতে যেতে যে গান শুনে নতুন কোন এক বোধ জেগে উঠেছিল,

“একটি দুটি তিনটি করে
ফুলগুলো সব যাচ্ছে ঝরে
ফলবতী গাছের বুকে
নীলচে হাহাকার”

সৈয়দ ফরহাদের গান প্রথম শোনা এভাবে। ঠিক তারপরেই একই গানে-

“গত হয়ে যাওয়া বন্ধুর মুখ
ফিরে ফিরে আসে কান্নার বেশে
স্মৃতির পটে জমে থাকা ক্ষত
পুরনো শোকের ফসিলেরা উঠে জেগে
আমরা জেনেছি ইতিহাস আসে ফিরে
ছকে বাঁধা যত প্রতিবাদ আহত”

প্রতিবাদের গান এমন শান্ত কোমল হতে আর কার শুনেছি মনে পড়ে না। প্রতিবাদী গান বলতেই তো আমরা ভুপেন, প্রতুল বা সুমন বুঝি। ফরহাদ অতো তীব্র ভাষায় না গিয়ে যেন মধ্যবিত্ত তরুণ মনটাকেই নাড়া দেয় অনেক। আবার ফরহাদই শোনায় সুন্দরবনের গান। ইরাবতি পশুর নদীর বাঁকে বাঁকে আর তারসাথে লালপেড়ে শাড়ি পরা অপূর্ব রূপের সুন্দরবনের কাছে রামপাল কয়লাবিদ্যুতকেন্দ্রের বিরুদ্ধে সমস্ত বাংলাদেশের প্রতিবাদ যেন বেজে উঠে তাঁর কণ্ঠে।
“আমার পতিত আঙুল পুড়ছে ক্রোধে
তবে কি রোদ পুড়ছে অনল বোধে”

এভাবে সুর কথাতে ধরা দেয় অনেক বেশি আমার কাছে। কথাগুলোই যেন মনে গেঁথে থাকে। সেই সুর বা গানের স্রষ্টা অঞ্জন, সুমন, প্রবর রিপন বা সৈয়দ ফরহাদ যেই হোক না কেন। কথায় সুরে ঘোর চাই। ঘোরে ডুবে যাওয়া। পিচের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যেন এক লহমায় মনে করিয়ে দিবে ফেলে আসা জীবন- সুর গান যেন এমন কিছুই। মনোসরনির হোমসিক গানের মতো যেন একফোঁটা জল না পেয়ে মনে হবে নদী আমার প্রিয়। গান কথা দিয়ে অমন তৃষ্ণার্ত করে তোলে।