মিশর সম্রাজ্ঞী আনখেসেন / অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ জয়া চৌধুরী



রমেশ্চন্দ্র মজুমদার, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়... ইতিহাস নির্ভর কাহিনীর সার্থক রচয়িতা বাঙালি লেখক কতজন আছেন? আমার জানার দৌড় খুব বেশি নয়। প্রিয় ঐতিহাসিক কাহিনীকার বলতে শরদিন্দুকেই দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলতে ইচ্ছে করে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় এই যে এঁদের মধ্যে কেউই মহিলা সাহিত্যিক নন। ভাবতে এ কারণেই অবাক লাগে যেহেতু বিষয় হিসাবে ইতিহাস বেশির ভাগ সময় মহিলারাই বেছে নেন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে পড়বার জন্য। যাই হোক সোপান পাবলিশং হাউস থেকে প্রকাশিত উপন্যাস মিশর সম্রাজ্ঞী আনখেসেন হাতে এল। নাম দেখেই কৌতূহল হয়েছিল। কেননা সাধারণ বাঙালি পাঠক হিসাবে মিশর মানে স্ফিংস, পিরামিড, ক্লিওপেট্রা ইত্যাদি নাম যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করলেও উপন্যাস পড়ি নি এর আগে তাদের নিয়ে। আগ্রহের বশে পড়তে শুরু করেই চমক তুতানখামেন এর রাজত্বকাল এর বিষয় জেনে। বারো বছরের বালক তুতানখামেনকে আমরা কে না চিনি স্কুলের ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে? কারণ ১৯২২ সালে হাওয়ার্ড কার্টার যখন তাঁর সমাধি আবিষ্কার করেন, প্রাচীন মিশরের সমৃদ্ধশালী ফারাওদের মধ্যে অষ্টাদশতম ফারাও যার সময়কালকে “নতুন সাম্রাজ্য সময়কাল” বলে বর্ণনা করা হয়- গোটা পৃথিবী তাঁকে চেনে। বালক অবস্থায় তিনি রাজ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু এ কাহিনী তাঁর চেয়েও বেশি তাঁর স্ত্রী আনখেসেনের। মিশরকে ধর্মীয় পুরোহিত তন্ত্রের থাবা থেকে আধুনিক যুগে রূপদান করার অগ্রপথিক ছিলেন তুতানখামেনের পিতা আনখআটেন ও তাঁর স্ত্রী ও বোন নেফারতিতি। এই পিরিয়ডকে কেন্দ্র করে এত অনবদ্য কাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে যা পড়লে অবাক হতেই হয়। মিশর মানেই রোমান শাসনের ঠিক আগেকার শেষ ফারাও ক্লিওপেট্রাকে চেনে পাঠক। কিন্তু অশ্রুত বীরাঙ্গনা আনখেসেন কে জানলে বারবার মনে পড়বে দিল্লীর শাসক রাজিয়া সুলতানা-র কথা। সেই পরাক্রম কিন্তু একই সঙ্গে লেখক হিত্তিতি যুবরাজ জান্নানজার সঙ্গে আনখেসেনের মধ্যে মধুর প্রেম কাহিনী বুনেছেন উপন্যাসটির পরতে পরতে। একটি সমরাঙ্গনে উপন্যাস শুরু। পাকা কলমচির মত অর্পিতা এগিয়ে নিয়ে যান আমাদের মিশরের রাজদরবারে। সত্যি বলতে কি খুব উপভোগ করেছি উপন্যাসটি। শহর আমাদের এমন গ্রাস করে নিয়েছে যে এখন আমরা গল্প উপন্যাসের প্রেক্ষাপট শুধু শহরকেই পড়ি, কিংবা গ্রাম হলেও তার সমস্যাও দিনের শেষে শহুরেই থাকে। নূতন কোন ভাবনার দিক প্রায় চোখেই পড়ছে না ইদানীং। এর চেয়ে অর্পিতা হাজার হাজার বছর আগেকার মিশরে যখন পাঠককে নিয়ে যান তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবুও একটা কথা না বলে পারছি না। নায়ক নায়িকার মধ্যখানের দৃশ্যগুলি আরো কিছু কল্পনা দাবী করে। জায়গাগুলি কিছুটা বর্ণনামূলক হওয়াতে যথেষ্ট রস উত্তীর্ণ হতে পারে নি। আশা করি ভবিষ্যতে লেখক এ বিষয়ে খেয়াল করবেন।
বইটির ছাপা, প্রচ্ছদ ও বাঁধাই অত্যন্ত সুন্দর , দামও সাধ্যের মধ্যেই , মাত্র ১৫০ টাকা। সত্যি বলতে কি হাতে নিয়ে ভেবেছিলাম আনন্দ পাবলিশার্স এর বই। পরে দেখি এটি সোপান পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশ পেয়েছে! তাঁদের খুব প্রশংসা প্রাপ্য এবং সেই সঙ্গে কঠোর নিন্দাও। কেননা প্রুফে অসংখ্য ভুল, যা এমন মানের লেখার সঙ্গে মানানসই নয়। এর পরের সংস্করণে যেন অবশ্যই সেসব শুধরে নেওয়া হয়। একটা কথা তো সবাই জানি “পহলে দর্শন ধারি পিছে গুণ বিচারী”। তাই ছাপা বাঁধাই এর সঙ্গে সঙ্গে বানান ঠিক থাকাটাও সমান জরুরী।
পরিশেষে উত্তরবঙ্গে রায়গঞ্জের মত ছোট শহরের এই সম্ভাবনাময়ী লেখককে আমার অকুণ্ঠ শুভেচ্ছা জানাই। তিনি আরো অনেক এ রকম ঐতিহাসিক কাহিনী রচনা করুন, আমরা পাঠকেরা একটু মন জুড়াই।