লাগি লগন

ইন্দ্রনীল বিশ্বাস


চতুর্দোলায় করে সকাল এসে দরজায় টোকা দেওয়ার আগেই আজানের সুর কানে আসতো আমাদের নতুন কিশোর পাড়ায়। সিদ্দিক মিয়াঁর বাড়ি বললে ষ্টেশন থেকে লোক দিক নির্দেশ দিত রামকৃষ্ণ পাঠাগারের সামনে গিয়ে পশ্চিম দিকে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর ছোট বটতলা, সেখান থেকে আরও কিছুটা পশ্চিমে ঝিনুক বাড়ি, ঝিনুক বাড়ির থেকে আরও কিছুটা পশ্চিমে গেলে সিদ্দিক মিয়াঁর বাড়ি। বাড়ি কোথায়, মস্ত হাভেলি। পূর্ব পাকিস্থান থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষেরা বিভিন্ন ক্যাম্প উপক্যাম্প ঘুরে ঘুরে সস্তায় জমি কিনে টালির ঘর আর মূলী বাঁশের বেড়ায় ঢেকে নিজেদের মাথার চালকে স্বাধীন করতে শুরু করলে এই অঞ্চল কিছুটা কোলাহল মুখর হোল। যদিও নেড়িকুকুর আর বেড়ালের দখলদারিত্ব নিয়ে এ বাড়ির টুলির সঙ্গে ও বাড়ির সন্ধ্যা পিসির ঝগড়াকে কেউই তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি। আর সেই কারনেই পূর্ব পাকিস্থানের বিভিন্ন জেলা উপজেলা আমাদের মধ্যে এসব নেই কিংবা আমাদের রান্না বাপু অন্য রকম বলে দুবাড়ির মধ্যে কচার ডাল দিয়ে বেড়া তুলতে পারলো না।
সদ্য পরিচয়ে হয়ে ওঠা কাকু, জ্যেঠুদের মুখে শুনতে শুনতে মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তাঁদের জমিদারি। আসলে ভূস্বামী। সেই হাভেলির পাশেই মসজিদ। একজন মৌলবি আসতেন আজান দিতে। দেখিনি কোনও দিন, সে আজান দিয়ে চলে যেত আমাদের কলতলায় সকাল পৌঁছাবার অনেক আগেই। এক চিকন কণ্ঠে সকালের আহ্বান তখন এই অঞ্চলের অনেকের এলার্ম ক্লক ছিল। কাকিমা জ্যাঠিমা দরজার বাইরে এসে মাথায় কাপড় দিয়ে পূবদিকে প্রণাম করে হাল্কা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেন দিনের কাজে। কোনও কোনও দিন দেখেছি আজানহীন সকালের শুভেচ্ছা না পেয়ে বাবা ভুন্ডলদার বাবাকে জিজ্ঞাসা করছেন আসিকদা, আজ যেন আজান শুনলাম না। ভুন্ডলদার বাবা বলতেন ও আর পারছেনা, বড্ড অসুস্থ।
এই সিদ্দিক মিয়াঁর একটি ঘরে পেতলের বুকে সোনার উজ্জলতায় বংশ গৌরবের শেষ প্রতিনিধি হয়ে থেকে গেলেন গানের কল। তার লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল কাঠের বাক্সে নিয়মিত বারো ঘণ্টার সংসারিক সহবাসের। সকাল ছটা থেকে রাত বারোটার এই পর্বে যেমন সর্দিকাশির দাওয়াইয়ের সঙ্গে বাড়তি থাকত নব যৌবনার সৌন্দর্য রক্ষার সর্বশেষ স্নো ও পাউডারের বিজ্ঞাপন। সেই কলের পাশে রাখা বিশাল এক কাঠের বাক্সের মধ্যে দম দেওয়া কালো সুদর্শন চক্রে কখনও কখনও নিদ্রাহীন স্তব্ধতায় এক মোহময় জাদুকর হয়ে খেলা করতেন উস্তাদ আমির খান ও বেগম আখতার। কত কত গ্রীষ্ম ও শীতের রাত তালপাখা আর চাঁদরের সঙ্গে এক নিতান্ত বালকও তার সাক্ষী থাকলো তার হদিশ নিয়ে এলাকাবাসী মুখরিত হননি কোনদিন। তবে খবরের কাগজ ছাপিয়ে যখন ফিসফিসগুলো এই মফঃস্বলের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে অতিদ্রুত স্বশব্দ মহামারী ঘোষণা করলো বোম আছড়ে পড়া দিয়ে, তখনও এলাকায় কোনও বিচলন দেখা গেলো না। তার একটাই কারন একই শব্দ দ্বিতীয়বার যেমন তীব্র হয়না, তেমনি আশ্রয়হীন হয়ে আসা মানুষের অভিসার অভিঘাত আর তীব্রতায় ঠিকানা ছুঁয়ে রাখে। ঠিক যেমন করে অন্য ঘরের রাজনৈতিক গোপন আখড়ায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে এসে নির্বিবাদে মাসের শেষ রবিবার হাতে নিয়ে বাবা নিজের সঙ্গে সাপলুডো খেলতে নেমে যেতেন গিরিজা দেবী বা কিশোরী আমনকর শুনতে শুনতে। কিংবা কুপার্স সহবাসি জ্যাঠতুত ভাইয়ের সঙ্গে ছেড়ে আসা পরিজনের সুলুক সন্ধানে মিশে যেত কোলকাতার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলন।
নাজুক উচ্ছ্বাসে মাখামাখি হয়ে একটা দশক রক্তাক্ত হয়ে উঠলে তার সুদূর প্রসারী আবেগ খানিকটা হলেও বিলম্বিত্ খেয়ালের তানে নব্বইয়ে এসে সায়েন্স কলেজের হস্টেলে গাঁজার তীব্রতায় এক অন্য ভাষার সন্ধান পেলো। কে বা কার ষড়যন্ত্রে সেদিন ঘরবন্দি নেশার আবহে টেপ রেকর্ডারে পণ্ডিত এ.টি. কানন চালিয়ে দিয়েছিল, আর সারা ঘরে ‘লাগি লগন’-এর ওঠা নামা দেখতে দেখতে এ দেয়াল থেকে অন্য দেয়াল ক্রমশ আরও বড় হয়ে যাচ্ছিলো। আজ ঋত্বিক দেখতে দেখতে ভাবতে বসি কেন এই হংসধ্বনি রাগ ব্যবহার করলেন যখন শঙ্কর ফিরে এসেছেন পুনরায়। আসলে ‘দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে/ ধবল রোমের নিচে তার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে’ লিখেই জীবনানন্দ যেন ঋত্বিকের হয়ে গেলেন, বেদনার উত্তরাধিকার দিয়ে গেলেন ‘লাগি লগন’-এর আপাত উচ্ছাসের মধ্যে। আর এই বেদনার অংশিদারিত্বে আক্রান্ত কোনও যুবকের পক্ষে পক্ষ নেওয়া ছাড়া আর কোনও দ্বিতীয় আশার বাণী থাকেনা যখন সত্তরের আছড়ে পড়া ঢেউ ভাড়াটে হয়ে ঢুকে পড়তে থাকে বিভিন্ন বাড়ির উদবৃত্ত করে নেওয়া অংশে। ষ্টেশনপাড় ভরে মাছির নষ্টামি ভাতের থালা নিয়ে হাজির হতে থাকে আত্মগ্লানি আর অভিসম্পাতের মেরুকরণে।
একজন বিপন্ন ও বিপন্য মানুষের কাছে সেই উৎসে নবির দেখা করিয়ে দেয় যে সঙ্গীত তাতে কোনও বোধক শব্দের হাহাকার নয় বরঞ্চ এক ভিন্ন শব্দের হারিকিরি দু দন্ড শান্তি দেয়। যে শব্দে সে নিজেই নিজের কথা বসিয়ে নিতে পারে, নিজের সঙ্গে নিজের দেখা করিয়ে দিতে পারে। সেখানে সীমান্ত নেই, কাঁটাতার নেই, টুলির ভুলুকে নিয়ে সন্ধ্যা পিসির আতঙ্ক নেই, আছে আজানের সুর, জেগে ওঠার আহ্বান।