জেগে আছো গান

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ



দিদির বইগুলোর মধ্যে এনাটমি , রেপার্টরি মেডিসিনের বইগুলো বেশ কৌতূহল জাগাতো আমার হায়ার সেকেন্ডারি দিনগুলোতে। মানব শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, কাজ অকাজ, বিগড়ানো কাজকর্ম সম্পর্কে কিছু উপর উপর ধারণাও তৈরি হয়েছিলো তখন । আমার বাংলা ভাষা সাহিত্য প্রীতি ও অঙ্ক ভীতির কারণটা দিদি যেন ফুটোস্কোপ দিয়ে মগজ ঘেঁটে বার করতো ঐ এনাটমি অধীত বিদ্যার সাহায্যে । এহ বাহ্য আগে ছিল দিদির সঙ্গীত সাধনা । গান শেখাতে আসতেন রমলা দিদিমণি । তবলায় সঙ্গৎ তিনি নিজেই করতেন । আসনপিঁড়ি করে বসে ডানে বামে দুই পাশে তবলা বাঁয়া নিয়ে যেমন অভিনব কায়দায় বাজাতেন তাই দেখে দাদারাও আশ্চর্য হত । বড়দা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় পর্যন্ত তবলা বাজিয়েছে কিন্তু দিদি বা আমার গানের সঙ্গে কখনো সঙ্গৎ করেনি । দিদির গান অনুশীলন চলার সময় আমার চোখ সন্ধান করতো মগজের কোন অংশটা গান চিনতে পারে , কেন চিনতে পারে না , রেপার্টরিতে আছে কিনা এর কোনো সমাধানের ওষুধ । অনুসন্ধান শেষে আমার খাতার পাতায় উঠে এসেছিল ---

দিদির নাম নন্দিনী
এনাটমিতে বন্দিনী
গান গায় যেন কোকিলনী
মিথ্যে একটু বলছিনি
শুধু যখন সরগম সাধে
বাইরে ভূমিকম্প বাধে
রেপার্টরি খুঁজে যাই
কম্প থামার ওষুধ নাই

ফলাফল যা হয়েছিলো , বেশ কিছুদিন ছোট হিসেবে দিদির থেকে যে ইন্সেন্টিভগুলি পেতাম , মানে নিজের হাতেরটা শেষ করে ফেলার পরে দিদির পেয়ারা থেকে এক কামড় , ওর ভাগ থেকে দুধের সর দিয়ে মাখা আলুভর্তা , তেঁতুল, কদবেল কাঁচা আম ইত্যাদি সম্পদ থেকে আমাকে সাময়িক বয়কট করে দিয়েছিলো পুরস্কার স্বরূপ ।

এখন দিদি হোমিও দিদি । ঘরে বাইরে চিকিত্সা পরিষেবা দানে রত । আমি বর্ণমজুর । এই লেখাটার সূত্রে বহুকাল পরে আবার সেই শরীর গাঁওবুড়ো এনাটমির দ্বারস্থ । সঙ্গীত কেমন করে কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে রোগহর হয়ে ওঠে তার সুলুক সন্ধান পাবো এই আশায় ।
শরীর গাঁওবুড়ো নিউরো সায়েন্স এর ফাংশনাল ব্রেন ম্যাপিং এর বিভিন্ন ইমেজের সাহায্যে দেখালো পুরো ব্রেনটাই মিউজিক্যাল । পুরো ব্রেনটাই সমন্বিত ভাবে যুক্ত হয় সঙ্গীতে । গান শোনা কাজে শুধু অডিটরি এরিয়া অর্থাৎ শ্রবণ কাজটা করে থাকে কেবলমাত্র সেই অঞ্চলটুকু নয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স , অডিটরি কর্টেক্স , ভিসুয়াল কর্টেক্স , সেরিবেলাম , হিপ্পোকক্কাস , এমিগডালা , নিউক্লিয়াস অ্যাকিউমবেন্স , কর্পাস কলোসাম , অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম , ভেস্টিব্যুলার সিস্টেম এবং এনটারিক নার্ভাস সিস্টেম নামক বিভিন্ন অঞ্চল মিলেমিশে তৈরি হওয়া বিশাল একটা ন্যাচারাল নেটওয়ার্ক ।
মানব মস্তিষ্কের বিবর্তনে যে দুটি অংশ পুরাতন ও নতুনের সুরটিকে সমানভাবে গ্রহণ করে নন্দিত করে চলেছে তার নাম নিউক্লিয়াস অ্যাকিউমবেন্স ও এমিগডালা । যদি কোনো সুর তরঙ্গ আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করে প্রাণ ভরিয়ে দিশা হরিয়ে দিতে পারে তবে সেই ' ফিল গুড হরমোন ' ডোপামিন নিঃসৃত হয় যেটা বস্তুত মানবদেহের জন্য পুরস্কার স্বরূপ । ঐ একই ক্ষেত্রটি আবার টেস্টি খাবার, গ্রেট সেক্স , কোকেনের ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উপভোগের ক্ষেত্রও বটে .. If music be the food of love , play on -- Shakespeare...অবাক লাগে না ! কিভাবে সব পথ মিলেমিশে যায় এমন করে !

এমিগডালা নামে আরেকটি যে মস্তিষ্কের প্রাচীনতম অংশ যেটা আবেগজাত প্রতিক্রিয়াকে পুষ্টতা দেয় এবং মস্তিষ্কের অপেক্ষাকৃত নবীনতম অংশ মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের বিমূর্ত বিষয়গুলি অর্থাৎ বিভিন্ন শিল্পকলা- সঙ্গীত - প্রভৃতি
নান্দনিক রসবোধের সঙ্গে যুক্ত করে । যদি কোনো গান বিষাদের পেয়ালা উপচে দেয় অথবা শতবর্ণের শত উচ্ছ্বাসে ময়ূর নৃত্য করায় তার জন্য এই এমিগডালা হল দাগি আসামী । বিজয় মালিয়া একবার অকশন সেন্টার থেকে হিটলারের জাঙ্গিয়া কিনেছিলেন বেশ কয়েক লাখ টাকা খরচ করে । এরকম কিছু কর্মকাণ্ড আপনিও যদি করে থাকেন তবে নিন্দো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স রে ।
এই দুটো অঞ্চলে কাজের ভারসাম্য কোনোভাবে ব্যহত হলে মৃগী , অটিজমের মতো মস্তিষ্কের বিভিন্ন জন্মগত রোগ , অ্যালঝাইমার্স ইত্যাদি ব্যাধি শরীরকে পঙ্গু করে দিতে থাকে ।
মস্তিষ্কের এসব ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পেতে সঙ্গীতের জুড়ি মেলা ভার । ক্যানসারের মতো কঠিন অসুখে তীব্র যন্ত্রণায় উপশম এনে দেয় বিশেষ ধরনের মিউজিক। তাদের সামাজিক, মানসিক উৎকন্ঠা উদ্বেগ থেকে অব্যাহতি দিতে পারে সঙ্গীত । উচ্চ রক্তচাপ , খারাপ মেজাজ , মানসিক চাপ , ক্লান্তি, স্ট্রোক হওয়ার পর গভীর ডিপ্রেশান নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সঙ্গীত বিশেষভাবে কার্যকরী ভুমিকা নেয় । এমনকী গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য ও গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষাতেও সঙ্গীতের ব্যবহার অত্যন্ত সুফলদায়ী । সঙ্গীতের প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ চিকিত্সা করে চলেছেন এরকম মিউজিক থেরাপিস্টদের মতে বিভিন্ন রোগে বিশেষ বিশেষ ধরনের মিউজিক শোনানো হয়ে থাকে । আলাদা আলাদা মিউজিকের কম্পাঙ্কের বিশিষ্টতা বিভিন্ন ধরনের রোগ সারিয়ে তোলে। ক্ল্যাসিকাল মিউজিক মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া উৎসাহ উদ্যম নিয়মানুবর্তিতা ফিরিয়ে দিতে পারে । মর্নিংওয়াক , জগিঙের সময় শিব তাণ্ডব স্তোত্রপাঠ শুনলে সমস্ত শরীরের রক্ত সঞালন বেড়ে গিয়ে শরীর মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মিউজিক বিট শরীরের মোটর অ্যাকশনগুলিকে শান দেয় । আবার ধ্যান করার সময় বা ক্লান্তি দূর করতে শ্লো কোনো মিউজিক শরীর মনে প্রশান্তি এনে দিয়ে মন মেজাজ আনন্দে খুশিতে উৎফুল্ল করে তোলে।

সেদিন আমি নিজেও তো ছিলাম চরমতম বিষণ্ণ বিপন্ন । সেদিন মাঝরাতে হাসপাতালের মেঝেতে বসে ভাবছি উদ্ভ্রান্তের সাত পাঁচ । তার একটু আগে অবধি আই সি সি ইউ-র সামনেই ছিলাম । নার্স এসে ফাইনালি যখন জানালো, লাইফ সাপোর্ট ফেল করে গেছে । কিছু করার নেই । চোখ ঝাপসা হয়ে গেল । মাথাটাও টলে যাচ্ছে কেমন । শেষবার ওর বেডের সামনে । অনন্ত ঘুমে তলিয়ে গেছে জয় । আর জাগবে না । আমার চব্বিশে পা বয়স থেকে জয় আমার খেলাঘরের সাথী । শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, কর্মজীবনের হঠাৎ সমাপ্তি , প্রচণ্ড ডিপ্রেশানে বেপরোয়া নেশা করে নিজেকে জীবন থেকে সরিয়ে নিলো অবশেষে । আগের রাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পরের দিন মাঝরাত থেকে সে নেই। চোখের সামনে নাভিশ্বাস ফেলা জয় অবিশ্বাস্য , ঘুম থেকে আর জাগবে জয় অবিশ্বাস্য , মৃতদেহ জয় অবিশ্বাস্য...। মনে হচ্ছিল পরের ঘটনাগুলো অর্থাৎ শ্মশানযাত্রা নিয়মকানুন দাহকাজ দ্রুত শেষ হোক আবার ঠিক শুনতে পাবো ওর গলায় ওর কবিতা আবৃত্তি , নয়তো খিচমিচ আর নয়তো বলবে ' ও বউ এই বানানটা ঠিক করে দে দিকিনি ' এসব পাগলামি পাশের ঘর থেকে যেমন শুনতে পেতাম ।
সারাদিন আত্মীয় পরিজন বন্ধুদের সহমর্মিতা আছে ঠিকই । কিন্তু সব আলো নিভে গেলে ? যখন কেউ জেগে থাকে না কেবল আমি ? অদ্ভুত তীব্র অসহিষ্ণুতা সমস্ত শরীর মন জুড়ে । গলার কাছটায় দলা পাকানো ক্রমাগত ফ্ল্যাশব্যাক । প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে । পলাতক মনে হচ্ছে জয়কে । নিজের দাদা দিদি যারা আমাদের আগলে রেখেছে তাদের সঙ্গে এমনকী আমার ছেলেটার সঙ্গেও কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করছি । কোনো সান্ত্বনা প্রবোধ যেন আগুনে ঘী পড়ে শত গুণ পুড়িয়ে দিচ্ছে আরো। কীভাবে কাটবে নেই..নেই..নেই এই সময়টা । ছেলের সামনে হায়ার সেকেন্ডারি রিটেন । আমি নিজে যদি এই অস্থিরতা না কমাতে পারি পারবো কেমন করে বাকিটা ? যতবার জয়ের মৃত মুখ ভাসে চোখে রাগে ক্ষোভে ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়িয়েছি বিড়বিড় করতে করতে , এইভাবে বোকামি কেউ করে..তুমি জয় না তুমি রাম বোকা..বোকার হদ্দ...আমরা জলে পড়ে তো ছিলাম না । তবু কেন এভাবে....। দ্রুত পায়চারিতে হাঁপিয়ে উঠেছি এমন দেখলে ছেলেটা আমাকে ধরে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকুনি দিতো। আমি থেমে যেতাম ।দু তিনদিন আমার এরকম অবস্থা দেখে রাত্রিবেলা ঘুমনোর সময় আমাকে বললো , মা আজকে আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো । তুমি যেমন আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও তেমন করে ।

ক্লাস ফাইভ থেকে ছেলেকে নিজের বিছানায় ঘুমানো অভ্যাস করিয়েছি । কিন্তু ঘুম পাড়িয়ে দিতে হয় এখনো । এই আঠারোতেও । অশৌচ বলে এক কম্বলের উপরে মা ছেলে ঘুমোতে হয়েছে । আমাকে একলা থাকতে দেওয়া হচ্ছে না । অন্যদিন দূর থেকে ওর মাথায় বিলি কেটে দিই। ঘুমিয়ে পড়ে । সেদিন ছেলেটা দুটো হাতে আমার মাথাটা জড়িয়ে নিয়েছে বুকের ভিতরে । হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি ওর । স্পন্দে ছন্দে ছেলে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন বিকেলে জয়ের উড়োখুড়ো মুখটা দেখতে পাচ্ছি । যেন সে ই ছেলে প্রসব করেছে আমার হয়ে । চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ছেলেটা বললো , নিভৃত প্রাণের দেবতা জেগে আছে শুনতে পাচ্ছো ? মুহূর্তে বিষণ্ণতা কোথায় মিলিয়ে গেলো যেন । মনে হচ্ছিল ছেলেটা হাসছে মিটমিটিয়ে । ছোট্ট ধমক দিয়ে ওকে পাশ ফিরিয়ে আমি চোখ বন্ধ করলাম । অস্থিরতা কেটে গেছে । একটা প্রশান্তি চারিদিকে । ছেলেটা চেনে আমার প্রিয় কিছু গানের মধ্যে ' নিভৃত প্রাণের দেবতা ' একটা । বাজছে যেন কোথাও । শুনতে পাচ্ছিলাম । যে নেই..নেই..নেই টা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলো আমাকে । সেটা আছে..আছে..আছে হয়ে গেল ।জয়কে তার সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে পেরে যাচ্ছি । সে পলাতক নয় । আমার প্রতি অটুট ভরসা থেকেই সে এত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আর থাকতে চায়নি । জানতো যে আমি পারবো ঠিক ছেলেকে বড় করতে । জয়ের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে যদি আমি থাকতাম । নিশ্চিত এভাবেই নিজেকে দ্রুত সরিয়ে নিতাম । আর কোনো ক্ষোভ নেই । তীব্র বিষাদ নেই বরং ছলকে ওঠা সুখস্মৃতিরা ভালোলাগা ভালোবাসায় সিক্ত করে দেয় । তরতাজা জয়কেই ফিরিয়ে দেয়....।
Music, once admitted to the soul becomes a sort of spirit , and never dies. -- Edward Bulwar-Litton .