চাইকভস্কির মোৎসার্ট ও অন্যান্য

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য



প্যোত্র ইল্যীচ চীকোভস্কি, বা সর্বজনগ্রাহ্য চাইকভস্কির পরিচয় দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।

ভিয়েনা পরিবৃত্তের বাইরের প্রথম বিশ্বখ্যাত ধ্রুপদী সঙ্গীতকার চাইকভস্কির ছিল অটল মোৎসার্ট -ভক্তি। সেই ভক্তির স্বরূপ, আর সেই ভাবের আলোয় অন্য খ্যাতিমান সঙ্গীতকারদের দেখে নেওয়া – স্বল্প পরিসরে এই লেখার উদ্দেশ্য সেটাই। আর, লেখাও আমার ততটা নয়, যতটা তাঁর নিজের - মানে চাইকভস্কির।

মৃত্যুর চার বছর আগে, ১৮৮৯-তে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে চাইকভস্কি লিখছেন, যৌবনোদ্গমের সময়ে ইতালীয় বেল কান্তো অপেরা তাঁকে এতটাই আচ্ছন্ন করে, যে তিনি একসময় মোৎসার্টের বিশালত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। জার্মান ধ্রুপদী সঙ্গীতের সম্বন্ধে ষোলো-সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত তিনি প্রায় অজ্ঞাত ছিলেন। সে-অর্থে তাঁর জ্ঞানচক্ষু ফোটে ওইরকম বয়সে ঘটনাচক্রে দন জোভান্নির অভিনয় দেখবার পর। লিখছেন – “এই ঘটনাটা আমার মনের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরিয়ে দিল। দন জোভান্নি দেখবার পরের যে উল্লাস, উৎসাহ আর ঘোরের অভিজ্ঞতা আমার হল তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তারপর কত সপ্তাহ ধরে যে আমি কেবল ওই অপেরার পিসগুলো পিয়ানোয় বাজিয়েছি, ওই স্বর্গীয় সঙ্গীত ঘুমের মধ্যে ভেবেছি আর স্বপ্নেও দেখেছি তার হিসাব নেই।... ওই দিনের পর থেকেই পাশ্চাত্যের সমস্ত মহান সঙ্গীতকারদের মধ্যে মোৎসার্টই আমাকে সবথেকে বেশী আকৃষ্ট করেছেন, এবং আমি নিশ্চিত যে বাকী জীবনেও এই টান আমার বিন্দুমাত্র কমবে না”। মোৎসার্টের সঙ্গীতই চাইকভস্কিকে বাধ্য করেছে নিশ্চিত জীবনের মোহরূপ সরকারী চাকরী ত্যাগ করে সঙ্গীতের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে। এর কিছুদিন আগে, ১৮৭৮ সালে, তিনি নাদেঝদা ভন মেক-কে লিখছেন – “দন জোভান্নির সঙ্গীত শুনে আমি সেই শৈল্পিক সৌন্দর্যের দুনিয়ায় প্রবেশ করেছি, যেখানে সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা বাস করেন”।

মৃত্যুর এক বছর আগে, ১৮৯২-তে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন – “আজকাল শুনি তরুণেরা অনুপ্রেরণার অপেক্ষায় থাকেন। আমার মতে এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটা পথ। মোৎসার্টের কথা ভাবুন। অত অল্প বয়সে চলে গেলেন। কিন্তু যাবার আগে কত অসংখ্য মণিরত্ন আমাদের জন্য রেখে গেলেন। অনুপ্রেরণার জন্য বসে থাকলে কি তা সম্ভব হত?”

সব শেষে, ২০শে সেপ্টেম্বর (২রা অক্টোবর) ১৮৮৬ সালে লেখা তাঁর ডায়ারির পাতা থেকে একটা অংশ তুলে দিই -

“যীশু ছাড়া আর কোনো সত্যসিঞ্চক মনীষী সম্বন্ধেই প্রেম বা ভক্তিজ্ঞাপক কোনো আলোচনা তলস্তয় তেমন করেন নি। যেটুকু করেছেন, তাতে বরং তাচ্ছিল্য বা ঘৃণার ভাবটাই বেশী ছিল। সোক্রাতেস, শেকস্পীয়র, বা গোগোল সম্বন্ধে তাঁর ভাবনা কি ছিল তা আমরা জানি না। আমরা জানি না মিকেলাঞ্জেলো, রাফায়েল, তুর্গেনিয়েভ, জর্জ স্যান্ড, কিংবা ডিকেন্স বা ফ্লব্যের – এঁদের নিয়েই বা কি ভাবতেন তিনি। দর্শনের ক্ষেত্রে কোথায় তিনি সদয়, প্রশ্রয়ী আর কোথায়ই বা নির্দয়, খড়্গহস্ত তার হদিশ হয়তো তাঁর নিকটজন রাখেন, কিন্তু এই বাগ্মী স্রষ্টা সেইসব মহাপ্রাণদের নিয়ে – যাঁরা তাঁরই সমকক্ষ, সমতুল্য – প্রকাশ্যে এমন কিছুই বলেন নি যার থেকে এইসব মনীষীদের সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব আমরা জানতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলি, উনি আমাকে বলেছিলেন যে বীঠোফেনের কোনো প্রতিভা ছিল না (মোৎসার্টের তুলনায়), কিন্তু এ কথা ওঁর কোনো রচনাতেই উনি উল্লেখ করেন নি। এই মানুষটি হয়তো শুধুমাত্র ঈশ্বর বা মানবজাতির সামনেই নত হন। কোনো ব্যক্তির সামনে ঘাড় নোয়ানো হয়তো এঁর জন্য নয়। তলস্তয়ের চোখে সুইতাইয়েভ একজন ব্যক্তিমাত্র ছিলেন না, ছিলেন সমষ্টির প্রতিভূ, মানবিক প্রজ্ঞার মূর্ত রূপ। তবে, সাহিত্যজগতের এই মহীরুহের পছন্দ বা অপছন্দ কি ছিল, তা জানতে পারলে বেশ হত।
আমার মৃত্যুর পর হয়তো আমার অনুরাগ বা দুরাগ্রহ নিয়েও মাথা ঘামাবে লোকে, বিশেষতঃ, আমি যা বলে বা লিখে যাই নি সেইসব নিয়ে।

বীঠোফেন দিয়ে শুরু করা যাক। তাঁর প্রতি আমার প্রশংসা অপ্রতিবদ্ধ, আর তাঁর সামনে আমি ঈশ্বরজ্ঞানে মাথা নত করি। কিন্তু, আমার কাছে কি বা কে এই বীঠোফেন? যদিচ তাঁর কিছু সৃষ্টির সামনে আমি নত হই তাদের বিপুল মহিমায়, তবু বীঠোফেনকে আমি ভালোবাসি না। তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক যেন আমার ছেলেবেলায় আমার সঙ্গে দেব যিহোভার সম্পর্কের মতন। আমার মনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আছে, তবু এক ধরণের ভয় মিশে আছে সেই শ্রদ্ধায়। স্বর্গ ও পৃথিবীর সৃজক দেব যিহোভা – তাঁর পায়ে আমি নত হই ঠিকই, তবু তিনি আমার ভালোবাসার জন নন। অথচ, যীশু-সন্দর্শনে মনে যে ভাবটি প্রথমেই জেগে ওঠে তা ভালোবাসার। তিনি ঈশ্বর, তবু তিনি মানুষ। আমাদের মতন তাঁর জীবনেও পীড়ন এসেছে। তাঁর কষ্টে আমরা করুণা অনুভব করি, তাঁর প্রতি প্রেম অনুভব করি, সে সবেরই কারণ যীশু মনুষ্যচরিত্রের বিশুদ্ধতম রূপের প্রকাশ। আমার হৃদয়ে দেব যিহোভার আসনে যদি অধিষ্ঠান করেন বীঠোফেন, মোৎসার্ট তবে আমার সঙ্গীতের যীশু। এ তুলনা ধর্মের অবমাননা নয়। দেবদূতের মতন পবিত্র মোৎসার্ট, আর দিব্যসুন্দর তাঁর সঙ্গীত।
… আমার মতে, সঙ্গীতের সামগ্রিক সুন্দরের শীর্ষে মোৎসার্টের অবস্থান। তিনি একাই পারেন আমায় কাঁদাতে, প্রবল আনন্দে কাঁপিয়ে দিতে যখন দেখি সেই গন্তব্যের দিকে তাঁর সঙ্গীতের পূর্ণচেতন যাত্রা যাকে আমরা আদর্শ বলতে পারি। বীঠোফেনও আমায় বিচলিত করেন, তবে সেই অনুভবে মিশে থাকে ভয় – একটা তীব্র উৎকণ্ঠার ভাব। আমি জানি না কি করে বিশ্লেষণ করতে হয় সঙ্গীতের। খুব গভীরেও যেতে পারি না হয়তো। তবু দু’টি কথা এখানে বলে রাখা দরকার। বীঠোফেনের মাঝবেলার, কখনও প্রথম দিকেরও সঙ্গীত আমার পছন্দের। কিন্তু শেষদিকের সৃষ্টি, বিশেষ করে শেষতম কোআর্টেটগুলি, আমি রীতিমতো অপছন্দ করি। এসবে শুধুই কারুকাজ আর ওস্তাদি, আর কিছু নেই। বাকী সব এলোমেলো বিশৃঙ্খল, যাতে ভেসে বেড়ায় আমার সাঙ্গীতিক যিহোভার কুয়াশায় ঢাকা আত্মা।
মোৎসার্টের সবকিছুই আমার ভালো লাগে, কারণ আমরা তাঁর সবটুকু পছন্দ করি যাঁর প্রতি আমরা অনুরক্ত। তবে সব কিছুর ওপরে – ডন হুআন। কারণ এর থেকেই সঙ্গীত কি তা আমি জানতে শিখেছি। ততদিন (আমার সতেরো বৎসর বয়স পর্যন্ত) ইতালীয়ানদের কিছু আমোদদায়ক ‘প্রায়-সঙ্গীত’ ছাড়া কিছুই আমার জানা ছিল না। যদিও আমি মোৎসার্টের ভক্ত, তবু আমি একথা বলব না যে তাঁর সৃষ্ট সমস্ত সঙ্গীতই শ্রেষ্ট শিল্প হিসাবে ভাবা উচিৎ। এ কথা আমি ভালো করে জানি যে তাঁর কোনো সোনাটাকেই মহান সৃষ্টি বলা চলে না। তবু আমি এর সবকটিকেই ভালোবাসি, কারণ এই প্রতিটি সৃষ্টি তাঁর পুণ্য নিঃশ্বাসের স্পর্শ পেয়েছে।
এই দুই শিল্পীর আগে আমি বাখ বাজানো পছন্দ করি, কারণ একটা ভালো ফ্যুগ শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু বাখ-কে আমি কখনই এক মহান প্রতিভা বলব না। হ্যান্ডেল আমাকে একেবারেই আকর্ষণ করেন না, এবং আমি মনে করি তাঁর সঙ্গীত একেবারেই চতুর্থ শ্রেণীর। সৃজনশীলতার দারিদ্র্য স্বত্বেও গ্লুক্ বরং আমার অনেক কাছের। হেইডনের কিছু কাজ আমার ভালো লাগে। এই চার মহারথীকে ছাপিয়ে গিয়েছেন মোৎসার্ট। এঁরা সকলেই আলোকরশ্মির মতো, মোৎসার্টসূর্যের আলোয় যা হারিয়ে যায়। “