যে ডানা ছায়ার যে ডানা গানের

মেঘ অদিতি




Music expresses that which cannot be said and on which it is impossible to be silent.
Victor Hugo

ষড়জ

একটা জীবন তখনও গোটা জীবন হয়ে ওঠেনি। ক্যানভাসের সামান্য দেখা যায়- তাতেই রঙ সদ্য মেলছে সুর, ছোঁয়া লাগছে ভৈরবীর- ডগর চলত পগ বাজে পায়েলিয়া..

আপাতত ওই স্থায়ীটুকুই, গুন গুন গুন। গাইতে গাইতে পা পড়ছে সামনে, ঝমঝম বোল উঠছে। ডালিম দানার মত গালের গুলাবি ছুঁয়ে দলবাঁধা হাসির একটা সকাল সুর হয়ে হাওয়ায় উড়ছে। সই পাতা বিনুনির প্রান্তে লাল-নীল ফিতেদের এক্কাদোক্কা খেলা- সবই তখন সেলিব্রেশন অফ লাইফ। মন তো তখন যখনতখন। এই কড়ি হ্ম তো আবার তারার ঋা। সকাল গড়িয়ে লাল ডাকবাক্সের মত গনগনে দুপুর হলে তখন আবার ভেতর ভেতর রাঙা পলাশের রঙ। আবির ছুঁয়ে দিলে সোনালি সরগম। কেউ ডাক পাঠায়। আশ্চর্য! ডাক পাঠিয়েই চুপ! দূরে যে বেজে যায় বাঁশী, সে কি চৌরাসিয়া? এত আকুল হয়ে বাজে..

ঋষভ
একটা গান হয়ে ওঠা গ্রামোফোনের দিনগুলো তখন এভাবেই হঠাৎ খুশি হঠাৎ মন খারাপের মন্ত্রণা দিয়ে যায়। কখনও উড়ে যায় একলা ফানুস। কখন যে বৃষ্টি নামে। ঘোর ধরা হৃদয়, কাঠঠোকরার ঠুক ঠুক ঠুকে চলায় নিঃস্ব লাগে । চিলেঘর ভর্তি রোদ। দুপুর নিঝঝুম। জলের কল, মুখ চেপে বন্ধ নয়। ফোঁটা ফোঁটা সুর ঝরে তাতে। এসব সময় জলই ইন্সট্রুমেন্টাল। দেখতে দেখতে ঘর ভরে ওঠে সুরে। অপ্রাপ্তি নেই তবু যখনতখন ধ্বস নামে আর তখনই সুরগুলো জড়িয়ে ধরে এমনি করে। কখন দুপুর গড়ায় মার্বেলের গায়ে। বিকেল প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠতে শুরু করে। হাওয়া আসে। ঝুল বারান্দায় জেসমিন গন্ধের পাশে দাঁড়ালে দেখা যায় রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে যারা যায় তাদের আড় চাউনিতে শাটার পড়ে ক্লিক। হয়ত গানের খাতা খোলা পড়ে আছে অথচ হারমনিয়ামের রিডগুলো সাদা কালোয় থেমে থেমে সুর তুলছে। প্রথমে বি-ফ্ল্যাট। বাজতে বাজতে হঠাৎই সি-শার্প। চরাচর ভেসে যাওয়া সন্ধ্যার ভেতর, এক ঘর তোমার ভেতর সেই তুমিটা তখন কাকে খোঁজে? মৃদু থেকে জোড়ালো হয় ঝন ঝন ঝন..উহুঁ ঝমঝম তো নয় ও কীসের বাজনা। শেকলের?

না দেখার ভেতর, একটানা বেজে যায় ঝন.. ঝন.. ঝন...

গান্ধার

একটা খয়েরি ডানার চিল শূন্যে ভাসিয়ে রেখেছে তার অলস শেষ প্রহর... খয়েরি ডানার চিল প্রতিবিম্ব হয়ে দোলে বেপথু জলছবিতে। জলে দুলতে থাকে এক শূন্য নৌকো। তার যাত্রা এবার এক মিউজিকালিটি বোধের দিকে।

বেলাশেষে এইসব ছবি এসে আবার যখন ইরেজ হতে থাকে পরপর তখনই একটা পাহাড়ের ছবি ফুটে ওঠে। একটা পাহাড়ই ভাবা যাক তবে। কাঠিন্য আর মৌনতা ভরা সে পাহাড়ের চূড়োগুলো ধরা যাক ঢেকে আছে বরফ পশমিনায়। পাহাড় ঘুরে তোমার ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রীতে প্যান করতে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে ধর শান্ত সবুজ এক প্রান্তর। সাদা বরফের ঔজ্জ্বল্য পেরিয়ে জুম ইন হতে হতে দেখা দিচ্ছে পর্বত চূড়া থেকে সমতলের মধ্যবর্তী সে খোলা প্রান্তর। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া টলটলে জল, মৌন পাহাড়ের সারি আর সেই ঘন সবুজ গালিচায় ঢাকা প্রান্তর সব সুরের মূর্চ্ছনাতে ভরে আছে। আর ধর তুমি সেই প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে আছো এতটাই যে গাছের সবুজ, পাহাড়ের গাম্ভীর্য, দূর থেকে কাছে, কাছ থেকে দূরে সবটাই পরপর জুড়ে যাচ্ছে তখন তোমার কাছে সাইকেডেলিক আলো আর রঙের কমপোজিশনে, অন্তহীন মিউজিকে।

মধ্যম

ডাক ভেসে আসছে। আবার.. আবার.. বারবার। চারপাশে যা কিছু ঘটে সবকিছুর সাথে সেই কবে থেকে এই ডাক ভেসে ভেসে আসে আর অনুরণিত হতে থাকে আকাশে বাতাসে। হাওয়া ফিসফিস করে, রাতআকাশ মাথার ভেতর ঢুকে পড়ে গুনগুন করতে থাকে, হয়ত তুমি সেই আকাশেই ডুবে। তারা গুনতে গুনতে গান আসছে তখন- তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে.. আর তোমায় অবাক করে দিয়ে আকাশ থেকে খসে পড়ছে তখন একটা দুটো তারা। আকাশটা যখন গান বা গানই আকাশ, তখন তোমাকে ওরাও আবার ডাক পাঠায়। ওরা মানে ওই যে স্কিট, হুল্লোড়, কোরাস, গ্রুপ, আড্ডা আর ফেস্ট। তুমি হয়ত অনন্তের কাছে নত হতে হতে তখন ভাবো- ভিড় থেকে নিজেকে লুকোতে হবে। একা একা হেঁটে যেতে হবে মাইল আফটার মাইলস..

তুমি কি জানো- কেউ সুর বাঁধে, কেউ ছেড়ে আসে এক ঘর গান?

পঞ্চম

বহু আগের নিশ্চিহ্ন তারার আলো তুমি আজও দেখো। পুরোনো ইতিহাসে গায়ে ঘুঙুরের ঘূর্ণি তুমি আজও শুনতে পাও। যা নেই তার জন্য হাহাকারগুলো তুমি লালন কর এমনি করে। আর তোমার অপেক্ষা, সেও তো জানলা খুলে রেখেছে সেই কৈশোর থেকে।

লং শটে থেকে থেকে যার দীর্ঘ ছায়া ভেসে ওঠে তাকে তুমি চেনো?

স্মিত হেসে পাশে এসে দাঁড়ায় এক আজনবি। চোখের তারায় প্রশ্ন, জীবন কেমন?

জীবন.. হা হৃদয় কথা বল আজ। বল সময়ের ঘোড়ায় ধেয়ে আসা দিনের মাঝে যে সুর বাজে তা কেন ধরতে পারি নে! নওল সবুজ পাতার আলোকসংশ্লেষন থেকে পাতাঝরার বেলা- আজও কেন সব বসন্তবাহার রাগে গায় আর আমি কার অপেক্ষার প্রহর গুনি। কারো তো আসার কথা নেই। তবু কেন অপেক্ষা!

টলটলে জলের গায়ে ছবির মত ঝুঁকে থাকে এই শহর
এবং
নিঃস্তব্ধতা

কথাদেরও কি বয়স হলো হৃদয়?

আজনবি মৃদু মৃদু হাসে। তার চোখ হাসির দ্যুতি বিচ্ছুরক। জীবন, বিমূঢ় চোখে তাকিয়ে তার চোখে। যাপন সহজ ছিল কবে? এক পা দু পা করে হার্ডল পেরোও, সেটাই জীবন। শ্রবণ শক্তি লোপ পায় যদি, একবুক সবুজের ভেতর, রঙের ভেতর মন ডুবিয়ে রেখো। একরৈখিক একাগ্রতায় , স্বচ্ছ দৃষ্টিকে মেলে রাখো টানটান। প্রকৃতির নিজস্ব স্বর শুনতে পাও? তোমার বধিরতা কাটাতে প্রকৃত শ্রবণ তো সেই স্বর, তাকেই বল সঙ্গীত। শোনো সেইসব সুর! তাদের নিয়ে এবার দেখাতে থাকো একের পর এক জাদু। একার ভুবন জুড়ে যে নৈঃশব্দ্যেরা জাল ছড়িয়ে বসেছিল এতকাল তারা এবার থমকে যাক সে অলৌকিক সুরের প্লাবণে!

যে শুনতে পায়, পৃথিবী তারই জন্য গায়।

তুমি কে?

তোমায় অবাক করে দিয়ে সে বলে, যে অসীমে নিজেকে সমর্পণ করেছো, তাকে চিনতে পার না!

ধৈবতে - নিষাদে

রাত। আপাত নিস্তব্ধতা এবং নির্মাণ। সমস্ত অপেক্ষার অবসানে অবিরাম ঝরে পড়ছে এখন সুর যাকে তুমি অশ্রু বল আর তোমার না বলা কথারা গান হয়ে উঠছে। তোমার সমস্ত আকুলতাকে দু’হাতে জড়িয়ে এবার সে ছুঁয়ে দিচ্ছে হাত, চোখ, চুল, অধর। চাঁদ গলে নামছে তোমার শরীরে। আলো পিছলে যাচ্ছে। পাহাড়ের মৌনতা ভেঙে, কাঠিন্য সরিয়ে পাহাড় তোমাকে জড়িয়ে নিচ্ছে। উদারার সা-কে তুমি এবার পৌঁছে দিয়েছ তারার সা- এর কাছে। প্রতীক্ষা শেষ। এবার মিলনের সুর। তুমি নও, তোমরা, মিউজিকাল নোটের A,B,C,D,E,F,G কে এবার দোঁহে যেই বেঁধে ফেলছো কর্ড রিলেশনশীপে- অমনি জল ডাকছে ণা সা জ্ঞা, পাহাড় গাইছে মা পা ণা র্সা আর তুমি গাইছো Do, re, mi, fa, so, la, ti, do! মিলেমিশে যাচ্ছে কর্ড আর স্কেল। মেজর-মাইনর।

এ পূর্ণতার কাল জেগে থাক আসমুদ্র প্রণয়ে, ইমন কল্যাণে।