সেতার ও অন্য বোতাম

ফারাহ সাঈদ



দুপুরেরও কান্না আছে। সুরের কলতান। মৃদু সুরে সে কাঁদে। কখনও বা কাঁদায়। আজ কিছু ছায়া ফেলে আমি চলে যাচ্ছি অন্য কোন ঘরে। অন্য বাড়ির দুপুরঘরে। মনে পড়ে এ বাড়ির দুপুরগুলো ছিলো আমার একার। অন্য কেউ থাকতো না তখন। পিয়া অফিসে। আমি কেবল আমি। আমি ও আমার মন বারান্দা। কে যে কার পিছু নিতো ! কী আমি ! কী দুপুর ! কে যে কার !

বসার ঘরটায় পর্দা টানা ছিল না। একপাশে সেতার অন্য পাশে তবলা। রাস্তার ধারেই বসবার ঘর। একদিন পিয়ার সঙ্গে আমি ওয়ারী গেলাম। আসলাম সাহেবের বাসায়। পিয়ার আসলাম স্যার। দরজাটা বন্ধ। কড়া নেড়ে দাড়িয়ে আছি। কেউ এসে খুলে দেবে এই অপেক্ষায়। আমি আর পিয়া। জানালার ফাঁকে সেতারটাকে দেখি আমি। বারকয়েক। আর ভাবি, আহা এমন একটা যদি আমাদের ঘরে থাকতো। পিয়া সেতার শেখে আজ বেশ কিছুদিন। আমি শুনি। বাজাতে পারি না। ওসব আমার হয় না। পিয়ার গানের গলাটাও বেশ। সেই ছোটবেলা থেকেই পিয়া আর রুশোর গানের তালিম ওদের পাড়ার এক ওস্তাদের কাছে। ওকে বলি 'পিয়া তোমার এমন একটা সেতার থাকলে কী যে ভাল হতো !' বলতেই সে কী হাসি পিয়ার ! ওর হাসির শব্দেই কিনা , কে যেনো দরজাটা খুলে দিলো !

তিনি এলেন মিনিট তিনেকের মধ্যেই। চা খেতে খেতে কথা বলি আমরা। পিয়া সেতার নিয়ে বসে। আসলাম সাহেব চোখ বন্ধ করে শোনেন। আমিও! পিয়া গাইছে। দুপুরের কান্না ছাপিয়ে। রোদগুলো ভেঙে যেতে যেতে পিয়ার শরীরে নেমে যাচ্ছে। কার্পেটে এসে বসি আমি, চেয়ারের ভার আর বইতে পারি না। আরো রোদ , আরো আলো এসে গড়িয়ে পড়ে আশে পাশে। পিয়া গাইছে। কখনো থেমে থেমে , কিন্তু সেতার চলছে। তারপর এভাবে কোন এক মধ্য দুপুরে চোখের চশমা নামিয়ে আসলাম সাহেব সোফা ছেড়ে পিয়ার কাছে এসে বসেন। পিয়াকে কিছু বলছেন তিনি। আমি শুনতে পাই নি। দেখি পিয়ার চোখের কোণে কিছু জমে হয়েছে। ওকে কখনো এভাবে দেখিনি । আমরা ছিলাম অনেকটা সময় ওখানেই। আসলাম সাহেবের বাসায়। কত কথা , কত যে কথা। ওদের গল্প আর শেষ হয় না। এ পাড়ারই মেয়ে পিয়া। ছোটবেলা থেকেই ওরা ওয়ারীতে। বেড়ে ওঠা। গানের স্কুল। খেলার মাঠ।

আমি একটা রিক্সা ডেকে দাড়িয়ে আছি। পিয়া আর বেরুচ্ছে না। কি এত কথা ওর! আমাকে আবার ভেতরে ডেকে নিলো। 'শোনো, এই সেতারটা এখন আমার ! এটা বাড়ি নিয়ে যাবো!' 'কি বলছো তুমি ?' 'হ্যাঁ , স্যার আমাকে দিয়ে দিয়েছেন ! এই জন্যেই আজ তিনি ডেকেছিলেন আমাদের।' আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না । সেতারটা তাহলে আমাদের বাড়ি যাচ্ছে !আসলাম সাহেবকে ভেতরে গিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে আসি।

'সজল , তুমি বরং আমার সেতারটা নিয়ে রিক্সায় বসো, আমি অন্য রিক্সা নিয়ে আসছি।" 'আমার কোটটা পিয়া ?' 'আমি নিয়ে যাচ্ছি ,সজল, এই গরমে তুমিতো ওটা গায়ে দেবে না , তাই না !' 'না না , পিয়া, আমি কোটটা হাতে নিয়েই সেতার ধরে বসতে পারবো রিক্সায় '। এভাবে সেদিন পেরিয়ে এসেছি ওয়ারী , তারপর এক এক করে অন্য সব পাড়া , ছোট বড় গলি, ছোট রাস্তা , বড় রাস্তা। শেষে বাড়ি ফিরে দেখি পিয়া আমার আগেই পৌঁছে গেছে। অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। আমি আর সেতার। ঘরে কোথায় যে জায়গা করি। আমাদের ঐটুকু ঘর , ছোট্ট সংসার।

পিয়া ওর পছন্দের একটা শাল পেতে দিলো মেঝেতে। হালকা সবুজ, ঠিক সবুজও নয় কলাপাতা বলা যায়। ওটা সেতার বসানোর জায়গা। সেই রাতে আমি ঘুমোতে পারি নি। পিয়া সন্ধ্যায় সেতার বাজালো। সে সুর গুন গুন গুন গুন। আমার কানে। আমার মগজে।
পাশের চেয়ারে আমার কোট রাখা। কালো। সব বোতামগুলো কালো হলেও একটার রঙ আলাদা । কালোর কাছাকাছি যদিও। শেষরাতে চোখ বন্ধ হয়ে এলো আমার। ঘুমের মাঝেও শুনছি সেতার।

সকালে ঘুম ভেঙে জানতে ইচ্ছে হলো ঐ অন্য রঙা বোতামের কাছে, শুনতে কি পেয়েছে কিছু ! কোন সুর। পিয়া খুব ভোরে গলা সাধে। আমি জানি। আমি জাগি না তখনো। একটু বেলা হলে ঘুম ভাঙে আমার।পিয়া অফিসে। কখন যে ফিরবে ! সেতার নিয়ে বসবে। ভাবছি , আজ থেকে কোটটা সেতারের পাশেই থাকবে। আমি যখন শুনতে পাবো না, কোটটা নিশ্চয়ই শুনতে পাবে। এতো কাছাকাছি থেকে না শুনে কি উপায় আছে !

একটা চিঠি এলো বাড়িওয়ালার। ছেড়ে দেবার নোটিশ। কেনো এই চিঠি। পিয়া শেষের লাইনটা পড়তে গিয়ে মন খারাপ করলো। ভেঙে ফেলা হবে , নতুন করে তৈরি হবে আবার এ বাড়িটা ! তিনতলা বাড়িতে এখন আমরা ছয়জন প্রতিবেশি। বেশি দেখা না হলেও সাত বছরে কিছুটা জানাশোনা হয়েছে। মায়া জন্মে গেছে বাড়িটার জন্যে। বারান্দাটারও। আমার একতলার বারান্দা। ওখানে সরুতারে কাপড় শুকোতে দেয় পিয়া। আমিও। ইজিচেয়ারে বসে কাটে আমার দুপুর। বিকেলে পিয়া আসার পর আমি ফিরে যাই ঘরে। প্রতিদিন।

পরের মাস থেকে সিড়িতে শব্দ। মানুষের পায়ের আওয়াজ। আসবাব নামছে। নামছে মানুষ। ছেলে মেয়ে। বিছানাপত্র। আমার ভালো লাগে না। পিয়া বারান্দায় আসে, 'সজল, আজ বিকেলেই বাড়ি খুঁজতে যাবো চলো। আর সময় বেশি নেই'। 'আমার কোটটা ভেজা, কাল যাবো'। 'সেকি, এখন কোন শীত নেই , এই কোটটা না হলে কী চলে না তোমার সজল ?' ' পিয়া , তুমি জানো এটা আমার শখের।' 'তাই বলে বাড়ি খুঁজতে গেলেও ?' টপ টপ করে পানি পরে বারান্দায়।কোট থেকে। দু এক ফোটা পায়ে আসে আমার। পিয়া ভালোমত পানি ঝরিয়ে দেয় নি। ঘরে তাকাই। আমি সেতারটার দিকেও তাকাই। আমার পছন্দের সেওতো !

পরের দিন বিকেলে বেরুলাম। তারপর আরো দুদিন। একটা বাড়ি পছন্দ হলো। আমার নয় পিয়ার। দোতলায় । বারান্দাও নেই। তাও কি হয়। আমি নেবো না এ ঘর। পিয়া বোঝালো আমায় , 'সজল , এমন পাওয়া যায় না আজকাল, তুমি জানো তো।
ঠিক হলো , আমরা মাস শেষে ওখানে উঠবো। আমি মন খারাপ করে বাড়ি ফিরি। পিয়ার মন ফুরফুরে। রেনকিন স্ট্রীট ওয়ারী , মন ভাল হবারই কথা। পিয়ার শৈশব। ওর আসলাম স্যারের বাড়িও ওখানটায় !

'বৈশাখের পর না হয় ও বাড়ি যাবো , কি বলো পিয়া! ' 'সজল, প্রায় সবাই চলে গেছে, তুমি বুঝতে পারছো , আমাদের ছেড়ে দিতে হবে, মাসের মাঝখানে কি করে যাবো বলো ?' পিয়া ওর ছোট ভাইকে নিয়ে গোছগাছ শুরু করে। রুশো যদিও বিরক্ত আমাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে। একবার এসে বল্লো , সজলদা , আপনি কি বাড়িটা ভাঙা পর্যন্ত এখানেই থাকবেন ? ' আমি বলি ' হতে পারে তাই'। পিয়া কিছু বলেনি। আসলে ও কখনও কিছু বলে না আমাকে।

আজ বিকেলে রুশোকে বল্লাম , সন্ধ্যেটা থাক আমাদের সাথে, পিয়ার সেতার শুনে যা।' রুশো চলে যাচ্ছিলো আবার কী ভেবে যেনো ফিরে এলো। আমি আর রুশো মেঝেতে বসি। পিয়া আমার কোটটা সরাতে গিয়ে বলে,'সজল , এই সেতারের ওপর তোমার কোট রেখেছে, কি করেছো বলোতো ! ' আসলেও কী যে করি আমি ! কখন যে ভুলে রেখে দিয়েছি! থাক সে সব কথা! এ বাড়িতে আর কদিনই বা আছি। সেতার, আমি , তুমি, আমাদের বারান্দা ! রুশো যাবার বেলায় বলে গেলো, 'সজলদা , আপনার কি হয়েছে বলুনতো, আর দুদিন পর বাড়ি ছাড়বেন , আপনার কোন প্রিপারেশন নেই। আর এই গরমে আপনার এই কোট ? শরীর ভালতো ?' 'সব ঠিক আছে, আমিতো ছুটিতে আছি তুমি জানো রুশো, দীর্ঘছুটিতে একটু আরাম করবো , আর এইসব ভাল লাগছে না, এই বাড়িটার মায়াতো আছেই! '

দুজন লোক এলো। জিনিস গুলো একটা ট্রাকে তুলে দিতে। আমি বইপত্র বাক্সে ভরে নিলাম। আর সব পিয়াই করেছে। বৈশাখের আর কত দেরি ! আর মাত্র কয়েকটা দিন। থাকতাম না হয় কটা দিন এখানেই । কাউকে কিছু নয় শুধু মনে মনে বলি। পিয়া হঠাৎ বলে 'এবার চলো , সেতারটা তুমি নিয়ে এসো।' আমি বারান্দায় যাই। আমার কোটটা তারে ঝুলে আছে। এই ভেজা কোট আমি নেবো কি করে ! পিয়াকে বলি ' আমি পরে আসবো রিক্সায় তোমার সেতার নিয়ে। তুমি যাও রুশোদের সঙ্গে।' সেই সকালেই পিয়া চলে গেলো। রইলাম আমি ও আমার দুপুর। বাড়িটাতে আর কেউ নেই।

বারান্দায় যাই আমি। রোদ থেকে কোটটা সরিয়ে রাখি , যদিও ভেজা এখনও। বোতামটায় হাত রাখি। আমার খুব মনে হয় এই কোটটা সেতার শোনে। মধ্য রাতে, খুব ভোরে, কোন কোন দুপুরে। আমি যখন শুনতে পাই না তখনো। অন্য রঙের এই বোতামটা দিয়ে ও শুনতে পায় সেতারের গান। ওদের সখ্যতা বুঝি সেদিনের সেই রিক্সাতেই ! আমি প্রথম যেদিন ওদের একসঙ্গে করে এ বাড়িতে নিয়ে এলাম !

আমি ও আমার মন বারান্দা। কিছুতেই ইচ্ছে হলো না আর ঘরে যেতে। বিকেলে পিয়া এসেছিলো। ডেকে নিতে , আমি যাই নি। কি করে যাই বলো , আমার কোটটা শুকায় নি। কখন সন্ধ্যে, তারপর রাত হলো , জানি না। আমিতো সেতার শুনছিলাম। পিয়া সকালে জানালা থেকে ডেকে যাচ্ছে আমায়। ডেকেই যাচ্ছে! 'সজল , আমার সেতারটা ! তুমি আমার সেতারটা নিয়ে এসো কিন্তু ও বাড়িতে!' চোখ খুলেছি। লাল দুটো চোখ। ঘুমের ঘোরে বলি 'ঘরে আসো পিয়া, এসো ! ' আমি ডাকছি। কয়েকবার। ও আসে নি। 'পিয়া শোনো, আমি আসবো, রিক্সায় , তোমার সেতার নিয়ে, কিন্তু আমার কোট শুকোচ্ছে বারান্দায়।ওটা ফেলে যাই কী করে বলো !'