সুরের হিরন্ময় পানপাত্র

বিশ্বদীপ দে



খুব ছোটবেলায় আমাদের একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল।
মানে চোঙাওয়ালা গ্রামাফোনের যে ছবি দেখা যায়, সেরকম নয়। তার চেহারা সেই সময়ের নিরিখে বেশ আধুনিক। ছিল একগুচ্ছ রেকর্ড। ইয়াদো কি বারাত থেকে হেমন্ত-মান্নার আধুনিক। বিসমিল্লার সানাই। তাও ছিল। আরও কত কী! একদম ছোটবেলার স্মৃতির মজা হল, তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের নানা কথা, স্মৃতিচারণ মিশে গিয়ে এমন এক কোলাজ তৈরি করে, কোনটা সত্যি ঘটতে দেখেছিলাম আর কোনটা পরবর্তী সময়ে অবচেতনে কল্পনার পথ বেয়ে স্মৃতি হয়ে উঠেছে বলা মুশকিল। তবে মনে হয়, ওই রেকর্ডটা বাজছে আর আমি একমনে পাশবালিশে হেলান দিয়ে সেটা শুনছি, এটা যেন সত্যিই ঘটেছিল। আগে পরের সব স্মৃতি মুছে গেছে, কেবল ওই দৃশ্যটা ছাড়া। কী গান শুনছিলাম, সময়টা রাত নাকি দিন... কিস্যু মনে নেই। কেবল বালিশে হেলান দিয়ে আছি আর গান বাজছে... এইটুকুই মনের মধ্যে এখনও ভেসে আছে।
গান নিয়ে লিখতে বসে এই সামান্য স্মৃতিটার কথা প্রথমেই মনে এল। আসলে একদম সদ্য একটা ঘটনা সেই স্মৃতিটাকে আরও টাটকা করে তুলেছে। সেকথায় পরে আসছি। আপাতত একটু পিছনদিকে যাই। রেকর্ড প্লেয়ার আর তারপর প্যানাসনিকের টেপ রেকর্ডার। যেটা নিয়ে বারবার বাবা আমাদের সাদা-কালো টিভিটার কাছে চলে যেত রেকর্ড করতে। তখন কটা আর গান সারাদিনে শোনা যেত। কিন্তু যখনই ভালো কিছু হত বাবা রেকর্ড করে নিত। স্নানে গেলেও বাবা গান চালাত। অথচ বাথরুমটা বেশ দূরে। এঘরের গান সামনের লম্বা বারান্দা পেরিয়ে অতদূরে কতটুকু আর পোঁছোয়। মা রেগে যেত। লম্বা বারান্দার এককোণে আমাদের রান্নার জায়গা। সেখানে স্টোভে সোঁ সোঁ শব্দ। তার সঙ্গে গান। আর ছিল চয়ন। ভোর সাড়ে ছটায় হত। আমি তখন চিঁড়েসেদ্ধ খেতে খেতে স্কুলে যেতে রেডি হচ্ছি। আর রেডিয়োয় বাজছে পুতুল নেবে গো। কিংবা এক যে কন্যা কেমন পুতুল পুতুল গড়ন।
সবকিছু এক অখণ্ড ছবির মতো হয়ে আছে আজকাল। সুরের স্মৃতি, গন্ধের স্মৃতি দৃশ্যের স্মৃতির সঙ্গে মিশে ব্রেনের ভেতর এক আজব রসায়নে এক হয়ে গেছে।

এই সব মনে পড়ে। কিন্তু বিশদে লিখতে বাধে। আমার সামান্য সব স্মৃতির কথা শুনে কার কী লাভ হবে! কিন্তু এটাও সত্যি গান নিয়ে লিখতে বসে এই কথাগুলোই নিজের থেকে এসে বসল আমার মনের মধ্যে। তাই সামান্য হলেও ছুঁয়ে গেলাম সেই আবছা মলিন হয়ে আসা সাদা-কালো ছবির অ্যালবাম।
মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে। শিশু ভোলানাথের সেই চিরকালীন পঙ্‌ক্তি। কী এক গান গুনগুন করত মা। মৃত্যু এসে তাঁকে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেই গুনগুন করা গানের স্মৃতি তার সন্তানের মাথার মধ্যে এক জলছাপ হয়ে রয়ে গেছে।
গান আমাদের কাছে অমোঘ মাইলফলক। সময় তার বিভিন্ন বাঁকে এভাবেই ‘গানটি গেছে ফেলে’। সেই গান কুড়িয়ে কুড়িয়েই আমাদের পথ চলা। যে নেই, সে আপনজন হোক কিংবা সময়ের খণ্ড তাদের চলে যাওয়ার পথটুকু আজও আলোময় হয়ে আছে ফেলে যাওয়া গানের ভেতর।

সেই দম্পতি আজ কোথায়? যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল পাড়ার ক্যাসেটের দোকানে। তখন খুব টিউশনি করি আর সেই টাকায় গুচ্ছ গুচ্ছ বই আর ক্যাসেট কিনি। পকেটে কিছু টাকা থাকলেই ঢুঁ মারি পাড়ার দোকানে। নতুন কী এল। নতুন কী কেনা যায়। দোকানটায় অনেকক্ষণ থাকতাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম ক্যাসেট। যেহেতু রেগুলার কাস্টমার, তাই দোকানদার বাবুদা আমার অত্যাচার সহ্য করত।
ওই দোকানেই একদিন এসেছিলেন সেই দম্পতি। দুজনেই দৃষ্টিহীন। জন্মান্ধ। এই পৃথিবীর রূপ-বর্ণ-আলো থেকে দূরে তাঁরা এক অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে কেবল সুরের রাজত্ব। খুব বেশি আয় করেন না, সেটা পোশাক-আশাক দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু বাবুদার কাছে জানলাম, এঁরাও আমার মতো নিয়মিত ক্যাসেট কিনে নিয়ে যান। সেই অন্ধ মানুষটি নানা শিল্পীর নাম ধরে ধরে ক্যাসেট খুঁজছিলেন। আর তাঁর স্ত্রী গান গেয়ে গেয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন সেই গানটি আছে কিনা।
এভাবেই লতা-আশা-কিশোর-মান্না নানা গানের কলি দিয়ে মনে মনে দোকানটা তন্নতন্ন করে খুঁজছিলেন তিনি। খুঁজতে খুঁজতে উত্তেজিত, সারা মুখের রেখায় রেখায় এক তিরতির কাঁপন যেন লক্ষ করছিলাম। মাঝে মাঝে গান ভুলে গেলে বা ভুল গাইলে স্বামী গেয়ে ধরিয়ে দিচ্ছিলেন সেই অংশটা। মনে হচ্ছিল এটা যে একটা দোকান, সেখানে অন্যরাও আছেন, সেসব যেন হুঁশই নেই। দুজনে বুঁদ হয়ে গানের ভিতর ডুব দিয়েছেন। বাবুদাও তাঁদের কথামতো ক্যাসেট বের করে দিচ্ছিলেন। খানিক পরে বেশ কয়েকটি ক্যাসেট কিনে যখন তাঁরা চলে গেলেন, বাবুদা হেসে বলল, ‘জানো তো, আমার এক চেনা লোক থাকে ওরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকে তার পাশে। শুনেছি কত্তা-গিন্নি যতক্ষণ বাড়িতে থাকে গান চলে। গানের সঙ্গে সঙ্গে দুজনেও গায়। গান ছাড়া এদের মুখে কোনও কথা নেই।’
সেই দম্পতি আর আমাদের পাড়ায় থাকেন না। কিন্তু আমি জানি, যেখানেই থাকুন আজও সেই বাড়িটা জুড়ে গান বেজে ওঠে সময়ে-অসময়ে। মনে পড়ে সেই জন্মান্ধ নারীর মুখ। গানের আলোয় আলোয় যাঁর সারা মুখে এক আশ্চর্য রঙের খেলা।
তাঁদের কথা ভাবতে ভাবতে এটা মনে হয়, আমি কি কখনও গানকে ওভাবে আঁকড়ে ধরতে পেরেছি? আমি তো বই পড়ি, সিনেমা দেখি আরও কত কী করি। গানের ভেতর দিয়ে অত গভীরে কি কখনও নামতে পারব! তবে একথা সত্যি, আমরা সবাই-ই জীবনে কোনও না কোনও সময়ে সঙ্গীতের কাছে ওরকমই আত্মসমর্পণ করেছি। সেই মুহূর্তে যেন আমাদের অন্য সব ইন্দ্রিয়কে মুছে দিয়ে কেবল আমাদের শোনার ক্ষমতাই সবটুকু অধিকার করে নিয়েছে। হয়তো সেটা খুব সামান্য সময়, কিন্তু তবু... ওইটুকু সময়ের খণ্ডের ভেতরে আমরাও মাঝে মাঝে মগ্ন হয়েছি সুরের ভেতর, গানের গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে পথ হারিয়েছি। যেন আমাদের নিজের কোনও দৃষ্টি নেই, ওই গান, ওই কণ্ঠস্বরের ভেতরই সবটা লুকিয়ে আছে।

সেভাবেই সেদিন রাতে একটা গান ঢুকে পড়ল আমাদের ঘরের মধ্যে। বাড়িতে বাকিরা তখন ঘুমের ভেতর। কেবল আমি মোবাইলে গান চালিয়ে বালিশের সামান্য দূরে রেখে দিয়েছি। আর শুনছি। আচমকাই বেজে উঠল সেই গান। লগ যা গলে। কতবার শোনা অথচ মনে হল এমন করে গানটাকে আগে কোনওদিন শুনিনি।
পরম প্রিয় পুরুষকে উদ্দেশ করে গাইছে এক নারী। চরমতম মিলনের জন্যে আকুতি ছাড়াও এ গানের সুরের চলন যেন আরও অনেক দূর নিয়ে চলে যায় আমাদের। নর-নারীর প্রেমের মগ্নতাকে ছাপিয়ে তা আরও গভীরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ক্রমশ রাত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠল। আর আমি টের পেলাম এ গান শহরের রাস্তায় রাস্তায়, নীল আলো জ্বলা প্রত্যেকটা বেডরুম, ফুটপাথে ঘুমন্ত মানুষের নিশ্বাসের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। এক মহামারীর মতো গোটা শহরটাকে দখল করে নিচ্ছে গানটা।
আমি বালিশে হেলান দিয়ে শুনছি। গানের কথা তার শরীর ছাড়িয়ে আরও বেশি করে জ্যান্ত হয়ে উঠতে লাগল। পাস আইয়ে কে হাম নেহি আয়েঙ্গে বারবার...
এমন মুহূর্ত বারবার আসে না আমাদের জীবনে, যখন আমরা কেবল একটা গানের ভেতর বেঁচে থাকি। যেন সেই কথাই বলে যাচ্ছে এই গান। শুনতে শুনতে টের পাচ্ছিলাম আমার শরীর থেকে একটু একটু করে ঝরে পড়ছে বয়স। আশপাশের সব কিছু মুছে গিয়ে এক অলৌকিক মুহূর্তে গিয়ে আমি ফিরে পাচ্ছিলাম অবিকল সেই ছেলেবেলার মুহূর্তটা। বালিশে হেলান দিয়ে আছি, আর একটা গান বাজছে। আর কিচ্ছু নেই। বাকি সব এলোমেলো ব্রাশ চালিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে।
ছোটবেলার সেই স্মৃতি আর আজকের এই জাগরণ... মনে হল এর মাঝে বাকি এতবছরের যাপন আসলে এক ঘোরের ভেতর অলীক বেঁচে থাকা...
সুরের হিরন্ময় পানপাত্র গড়িয়ে যেতে থাকে সময়ের কিনার ঘেঁষে।