গানকথা

শিবলী মোকতাদির



‘গান গাই আমার মনরে বুঝাই মন থাকে পাগল পারা। আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া।’ বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সরল এই বয়ানই বলে দেয় বাঁচার জন্য শ্বাস যতটা গুরুত্বপূর্ণ গানও ঠিক ততোটাই।প্রতিটি প্রাণের পরতে পরতে গোপন গেরিলার মতো ঘাপটি মেরে বসে আছে সে। সুযোগ পেলেই সুরের হুল ঢুকিয়ে দিচ্ছে আমাদের মগজে ধমনির রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। পৃথিবী ঘোরার মতো এতটাই নিভৃতে যে বুঝতেই পারি না আমরা।সুর আর ছন্দ ছাড়া মূলত সবকিছুই বেহুদা, তথা বিরক্তিকর।সরলার্থে সুর এলেই গানের প্রসঙ্গে মেতে উঠি আমরা।সুরের সৃষ্টি আর মানব সৃষ্টি ধরতে গেলে একই সূত্রে গাথা। তবে গানের সৃজনপর্ব শুরু বিশেষ করে বাংলা গান সেই রামপ্রসাদ ও নিধুবাবুর হাত ধরে বলা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে।সংস্কৃতির বিবিধ কলার মধ্যে গান অতি অবশ্যই এক উচ্চমানের অমৃতশিল্পকলা। আবহমান বাংলার জল-মাটি-হাওয়া ঋতু বৈচিত্র্যের পেক্ষিতে তৈরি যে গান তার কথায়, সুরে প্রকৃত মানবচিত্ত আজও সঙ্গাহীন হয়ে পড়ে।যদিও পাশ্চাত্যের সুররীতির ঢেউ সুযোগ পেলেই দেলা দিচ্ছে , ঠাঁই করে নিতে চাইছে আমাদের বাংলা গানের আনাচে-কানাচে।ভালোমন দের বিচারে না গিয়েও বলা চলে এতে করে তৈরি হচ্ছে নতুন রূপবন্ধ।অচেনা তাল, এবং সর্বপরি নতুন কাব্যগীতিকা।
আমরা যা কিছুই লিখি, বিশেষ করে কবিতা সে তো এক অর্থে গানই।বিপরীতে গানই কবিতা।ব্যাখ্যায় এক রবীন্দ্রনাথকে টানলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। কাজ যত বিচিত্রই হোক না কেন অর্থ একটাই। যিনি তা করছেন লালিতও হচ্ছেন তিনি তার দ্বারা।কাজেই প্রবাহমান সমাজব্যবস্থায় সংগীতও যিনি রচনা করছেন সমাজ তুলে নিচ্ছে তার প্রয়োজনীয় জীবনরসটুকু সেই সুর-গংগীতের কাছ থেকে। জাতি হিসাবে আমরা—বাঙালিরা শিল্পকলার নানান ধারায় আজ যথেষ্ট পরিপক্ক। আমাদের কৃষ্টি দিয়ে সভ্যতার প্রকৃত সংজ্ঞায় আমরা সংজ্ঞায়িত। এখানে নাটকে, নৃত্যে, চিত্রে-চলচ্চিত্রে যেমন পারদর্শী ঠিক সংগীতেও আমি বলবো যথেষ্ট সমৃদ্ধশীল। এ এক অহংকার বটে।শহর থেকে বন্দরে। গ্রাম থেকে গঞ্জে প্রতিনিয়তই সৃষ্টি হচ্ছে অবারিত গানের গুলবাহার। আর তা সুর হয়ে ভেসে ভেসে গিয়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে আমাদের হৃদমাঝারে। মরি মরি করেও এর ধাক্কায় ফের চাঙ্গা হয়ে উঠছি আমরা। কাজেই গানই প্রাণ। আর এই প্রাণকে প্রফুল্ল রাখতে চাই কবিতার টান।
খুব পরিকল্পনা করে নয়, খানিকটা নিজের তাগিদে বাকিটা অন্যের অনুরোধে নিচের গানগুলো, ভিন্নার্থে কবিতাগুলো লিখেছিলাম। ব্যাকরণের মারপ্যাঁচে এ যে নিখাদ গানই—এ চ্যালেঞ্জ ছুড়ছি না আমি।সে সাহসও নেই আমার। তবু পাঠঅন্তে যদিবা গুনগুনিয়ে কেউ কোথাও কোনোদিন গেয়ে ওঠেন নিচের পংক্তিমালা তবে কি ধরে নেব হে রাখাল তুমিও গীতিকার! ঘটনাচক্রে হলে তা ভালো, না হলেও বিন্দুমাত্র চোট পাবো না এ দিল-এ।







শিবলী মোকতাদির

গানের কবিতা ০১

তোমার দেশে যাচ্ছি আমি বন্ধু বিরামহীন
বন্ধ দুয়ার খুলে তুমি
ডাক পাঠালে অগ্নি-ভূমি
ঘুরতে ঘুরতে স্বপ্নে, জেগে রাতের পরে দিন।

যাচ্ছি আমি তোমার দেশে বন্ধু বিরামহীন ॥

ঝড়ের পরে ঝরণা যথা
আগুন হয়ে আলোকলতা
পাহাড় বনো পথের পাশে অবাক করা দিন
যাচ্ছি আমি তোমার দেশে বন্ধু বিরামহীন।

স্বপ্নে ঘোরা তোমার প্রেমে রাতের পরে দিন ॥

ফিরতি পথে অন্ধকারে
দেখছি ফিরে বারেবারে
আলোয় দেখা তোমার সে মুখ তিলেই উদ্ভাসিত
রঙের মাঝে অবাক করা অল্প অভিনীত।

অভিমানের আঁচল ঢাকা
মনহীনা রও মানুষ ফাঁকা
আঁকা-বাঁকা আকার দিয়ে দৃশ্যে আচ্ছাদিত
আলোয় ভরা তোমার সে মুখ নিত্য ধরা দিতো।

রঙের মাঝে অবাক করা অল্প অভিনীত ॥

অবশেষে তোমার দেহে বাজতে থাকা বীণ
টানছে আমায় শ্যাওলা পড়া খাতার মতো ঋণ

স্বপ্ন দেখে ঘুরতে ঘুরতে রাতের পরে দিন
যাচ্ছি আমি তোমার দেশে বন্ধু বিরামহীন ॥

শিবলী মোকতাদির

গানের কবিতা ০২

আমরাই ধরি আমরাই করি করণীয় সব প্রেমের খেলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥

দৃশ্যান্তরে নির্মিত হই
নদীতে নৌকা উপরে ছই
ছইয়ের মধ্যে অনুগ্রহ, গ্রহণের দায়ে বইছে বেলা
আমরাই পারি পারের কর্তা ফুটে তুলি রূপ, রসের মেলা

বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥

বিনির্মাণের প্রশ্ন ধরে
ধাঁধার ধর্মে ধারণ করে
আমাকে লুকাও, লোকায়িত সব দূর দিয়ে সুর চঞ্চলা
এতটাই তুমি সরল-সোজা পথের প্রশ্নে পথভোলা

বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥

কানায় কানায় পূর্ণ করো
দেহের মধ্যে গোপন গাঢ়
মধুতে মত্ত ভ্রমর যথা পুষ্পের পরে হানে ফলা
তোমার তপ্তে আল্গা আমি গলে গলে করি পথচলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥








শিবলী মোকতাদির

গানের কবিতা ০৩

গোপনীয় সব বিবিধ সুরের স্বরলিপি যায় ভেসে
তোমারই পানে চাহিয়া শুধু দূর হতে দূর দেশে

যেন সে গানের এলোমেলো রূপ
কণ্ঠে জাগায় জটিলতা খুব
কিছু কিছু তার তাল-বেতালা
বাকিটা বধির অন্ধ-কালা

সেই ভয়ে হই উজানমুখী উদ্ভান্ত অবশেষে
তোমারই পানে চাহিয়া শুধু দূর হতে দূর দেশে ॥

যায় বেলা হায় ঋতুটি শীতের
বন্ধুকে তার চিনে নিতে ফের
আমারই গদ্যে তোমাকে যখন
রেখেছি পদ্যে গীতিটি তেমন

বর্ষায় ভিজে শীতল করা শরতেই ফিরে এসে
তোমারই রূপে মুগ্ধ যত দূর হতে দূর দেশে ॥

জলে ডুবে যায় দুএকটি তার
নানান প্রান্তে অচেনা প্রকার
সুরের সত্যে শিল্পী সাধক
আমারই কণ্ঠে পরিচিত হোক

ভিন্ন ভাষার হিজিবিজি সুরে গান হয়ে অবকাশে
তোমারই মধ্যে জেগে থাকি দিন রাত্রিকে ভালোবেসে ॥
দূর হতে দূর দেশে...
তোমারই অঙ্গে ফুটে থাকে সুর স্বরলিপি একপাশে
আকারে-প্রকারে দুইদিকে যাই অজানা নিরুদ্দেশে ॥
দূর হতে দূর দেশে...


শিবলী মোকতাদির

গানের কবিতা ০৪

খবর যিনি রাখতে পারেন
তার দেখা আজ ক্যামনে পাই
গুরুবিনা গুরুত্বহীন
সংবাদে মোর আস্থা নাই।
ওগো, গোপন কথার একটি রঙিন ডাক পাঠালাম শুভেচ্ছায় ॥

রীতিনীতির প্রশ্ন তুলে
বৃথায় আমার সময় যায়
অনুরাগের ভাবটি ধরে
শ্যাওলা জমে ঋতুর গায়।
ওগো, ইচ্ছে করে প্রেমের চিঠি পাঠাই তোমার আস্তানায় ॥

খেলছো সেথা আমায় নিয়ে
গোপন তোমার কারখানায়
গড়ছো ছলে ব্যর্থ প্রেমিক
লাবন্যহীন মুখখানায়।
ওগো, জটিল তোমার দেহে বৃথায় অঙ্গ আমার জড়িয়ে যায় ॥

জানতাম যদি জাদুর কলা
একটি নামের বর্ণনায়
প্রকাশ্যে বুক দিতাম চিরে
হৃদয়খানি তোমার পায়।
ওগো, স্বপ্নে দিবা-রাত্রি শুধু ঘুরছো সরল বৃত্তটায় ॥

অক্ষরে আজ ঘুমের ঘোরে
আগুনলাগা কল্পনায়
গুরু আমার বিরলে রয়
বিদেশি ভুল ঠিকানায়।
ওগো, আমার স্নিগ্ধ, সরল ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নটায় ॥

কী নাম তোমার উদাসীনি? বন্ধুরা সব জানতে চায়
ওগো, আমার স্নিগ্ধ, সরল ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নটায় ॥