অবাক জোছনা, অচিন সুর

মুস্তফা কামরুল আখতার



খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে একটা গান। গানের লাইনগুলো সাধারণই, জোছনা নিয়ে লেখা। এ ধরনের চন্দ্রাহত মানুষ, জোছনা, নদী ইত্যাদি নিয়ে লেখা অজস্র কবিতা আর গান আছে। এ-সবই বহুল-ব্যবহারে জীর্ণ। তবুও গানটা খোঁচাচ্ছে, দুই-তিন ধরে।

গানটা হলো, --
'আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা চালা ভাঙা বেড়ার ফাঁকে,
অবাক জোছনা ঢুইকা পড়ে হাত বাড়াইয়া ডাকে ।
হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলে না,
আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবা না।

তুমি আমায় ডাকলা না গো, তুমি রইলা দূরে,
তোমার হইয়া অবাক জোছনা, ডাকল অচিন সুরে।'

খুব যন্ত্রণা করছে, মাথার ভেতর। কেন এমন হয়, জানি না। রাত-গভীরে জেগেথাকা মানুষ, একটা অ্যাপ দিয়ে গানটার অংশবিশেষ রেকর্ড করে ফেলি। একটু ইকো মেশাই।

আমি গান করি না। এমন নয় যে আমি গাই, কিংবা গান আমার ধ্যান। তা নয়। ইদানীং খুব যে গান শুনি, তাও না। তবুও হাহাকারভরা এক আর্তি সুরটায়। কী আছে? গানটির পরের কথাগুলো এমন, 'ঘর খুলিয়া বাহির হইয়া জোছনা ধরতে যাই, হাতভর্তি চান্দের আলো, ধরতে গেলে নাই।' তো, কী হয় এতে? যেন ভেসে বেড়ায় অপার্থিব এক চন্দ্রালোক, এই আছে, এই নাই।

আগেও অনেকবার হয়েছিল এমন, বেশ কয়েকটা গানে। এই গানগুলো কী অদ্ভুতভাবে ঘিরে ফেলেছিল আমাকে, দুই দশক ধরে মাত্র চারপাঁচটা গান। মাঝে-মাঝে এক-একটি গান কয়েক বছর ধরে এক ঘূর্ণিপাক তৈরি করত, চেপে রাখত।

একবার কলেজের এক প্রোগ্রাম, তখন আমি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে, সহকারী অধ্যাপক। ছাত্রছাত্রীদের প্রোগ্রাম, মাস্টার্স সমাপনী উৎসব। একসময় আমাকে মঞ্চে ডাকা হলো। অনেক ঘেটেঘুঁটে একটা চিরকুট টানতে হবে। এটা একটা খেলা। নিয়ম হলো, একটা নির্দেশ লেখা থাকবে এতে, তা করে দেখাতে হবে। দেখি, আমার কাগজে লেখা, 'যে কথা কোনোদিনই বলা হয়নি, তা আজ বলে শোনান।'

কী বলি! একটু ভেবে মাইক্রোফোনে হাসিমুখে বলি, 'আসলে আমি প্রচুর কথা বলি, কারণে, অকারণে। আবার পেশায়ও কথা-বলিয়ে চিৎকারক। তাই বোধহয় আমার সব কথাই বহুবার পুনরাবৃত্তি হয়ে গেছে। বলিনি, এমন কোনো কথা নেই আর। আমাকে এবার মুক্তি দেয়া কি যায়?'

অডিটোরিয়ামভরা দর্শক ক্ষমাহীন, নির্মমভাবে সমস্বরে জানালো, 'না স্যার, মুক্তি সম্ভব না। বলতেই হবে।'

আমি কাঁধ ঝাকাই, মাইক্রোফোন হাতে এদিক-ওদিক তাকাই। অসহায়ভাবে বলি, 'একটা কথা আমার সবসময়ই বলি, বলা হয় প্রায়ই। কিন্তু সবসময়ই মনে হয়, এটা আগে কখনো বলিনি।' একটু থেমে বলি, 'কথাটা একটা গান দিয়ে দিয়েই বলি?'

আমার অনুগত কিন্তু আজকের প্রোগ্রামের জন্য ক্ষমতাধর ছাত্রছাত্রীরা। ওরা বোধহয় গানের কথাতে আনন্দিতই হলো। আমি আমার মতো করেই একটা গানের সুর ধরি, --

'আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি,
আমার চোখ দুটো মাটি খেয়ো না।
আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না,
তারে একজনমে ভালোবেসে ভরবে না মন ভরবে না...'

আমার অন্তরাত্মা কাঁপছিল, কাঁদছিল, অজানা এক টানে। কী টান? দুর্জ্ঞেয়, ব্যাখ্যাতীত, অজ্ঞাত সেই টান। কিন্তু আমি কাঁদিনি। গানটা পুরো গাইনি, শত-ছাত্রছাত্রীর অনুরোধেও না।

পরের বছর অন্য ব্যাচের সমাপনী উৎসব, আমি তখন 'ভীষণ জনারণ্যে একা'। এই ছেলেমেয়েগুলো চলে যাবে, আর দেখব না, হঠাৎ ভেঙে পড়ি, আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। আমি আমার সমাপনী বক্তৃতা দিই, নিশ্চুপ অডিটোরিয়াম, ঝরঝর কাঁদতে থাকি। সামনে-বসা মানুষগুলোও একযোগে কেঁদে ওঠে । অসংখ্য মানুষ একযোগে কাঁদছে, এ এক অদ্ভুত-অপার্থিবসুন্দ দৃশ্য।ওই প্রোগ্রামে প্রিয় অনুজ জুলজির জয়প্রকাশও গান করেছিল। ও জুলজির অধ্যাপক।

জয়প্রকাশ একবার ঢাকার ফুটপাথ থেকে পাউরুটি-চায়ের বিনিময়ে এক বাউল থেকে একটি গানের কথা ও সুর তুলে এনেছিল। অন্যরকম একটি বাউল মরমী গান। জয়, আমি ও আইয়ুবভাই গানটি প্রায়ই করতাম, --

'ভাইরে ভাই, আষ্টে আঙুল কোদাল রে ভাই ষোলো আঙুল ডাঁটি।
সেই কোদালে তুইলা ফেলায় রে, আমার আপনা ঘরের মাটি।।
ও মন জাইনে নেও, নেও রে, ও মন জাইনে নেও রে... '

পরবর্তীতে কোনো এক সময় আমি ভয়ংকর এক আঁধার-টানেল থেকে গাইতাম ওই গানটির একটি লাইন। লাইনটি এমন --

'ও আমার আল্লাহ কেমন জন, আপনা দেহের মাঝে প্রভু নিরঞ্জন,
ও মন জাইনে নেও রে।'

কার ওপর যেন অদ্ভুত এক অভিমান গাঢ় হয়ে চারপাশ ছাপিয়ে ঢেকে দিত। কার ওপর? জানি না। বিহ্বল হয়ে গাঢ় বিষণ্ণ নৈঃশব্দ্য নিয়ে খেলতাম। অভিমানও কি কোনো এক নিশ্ছিদ্র আশ্রয়?

তারপর দীর্ঘ কয়েক বছর কেটে যায়। আমার সুরেরা আর আগ্রাসী হতো না। চুপচাপ, আমার ঘরগেরস্থালি-সময় হাঁটতে থাকে শুনশান সড়ক ধরে।

আবার একটা একনায়কের মতো আধিপত্য নিয়ে দুকূল ছাপিয়ে আসে এক গান। ঘিরে ফেলে উঠোন। জলের ছলে সময়, ছলকে ওঠে। উড়তে থাকে অনেকগুলো পৃষ্ঠা! যেখানেই যাই, কানে বাজতে থাকে। আমি গাইতে থাকি --

'আমার একটা নদী ছিল, জানল না তো কেউ,
এইখানে এক নদী ছিল, জানল না তো কেউ।
নদীর জল ছিল না কূল ছিল না, ছিল শুধু ঢেউ।'

গানটা ভিড় করে হঠাৎ। আবার সর্বগ্রাসী এক টান! গাইতাম, অকারণ এক গভীর-জলছলছল। টের পেতাম, শুনশান এক অচিন কূল-নাই, কিনার-নাই সমুদ্র, বাদামের খোসার মতো এক ডিঙি।

ডানা-ঝাপটানো এক বাউণ্ডুলে উড়ু-উড়ু পাখি বলত, 'এক নদী ছিল? আমিই তোমার নদী? কিন্তু ছিল কেন? এখন কি নেই সে নদী?' আমি সলজ্জ হাসতাম। বুঝতে পারতাম না, নদীর কী টান, আমাকে ছেড়ে যাবার, উজানভাটির!

সেবারই সব মেডিক্যাল কলেজসমূহের মধ্যে বিতর্ক প্রতিযোগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ অডিটোরিয়াম। আমি বিচারক প্যানেলে। অন্য দুই বিচারক ডাক্তার, তখনো এসে পৌছাননি। উপচেপড়া দর্শক, একটু অধৈর্য, দেরি হচ্ছে দেখে। আয়োজকরা অনুরোধ করলেন, 'স্যার আপনি একটা কিছু করবেন, আবৃত্তিজাতীয় কিছু, স্যারেরা আসার আগে কিছুক্ষণ এই সময়ে?'

আমি মাইক্রোফোন হাতে নিই, 'নদী ছিল, জল ছিল না কূল ছিল না' গাই খালিগলায়। অনেকটাই এলোমেলো অপ্রস্তুত আমি, কিন্তু আশ্চর্য, সবাই উদ্বেল-আনন্দ। কণ্ঠ মেলায় ওরাও।

কেটে যায় আরও দীর্ঘ কয়েকবছর। অবিনাশী গানগুলো বসবাস করে আমার ভেতর। ধিকিধিকি অঙ্গার। গানরঙের আগুন, শিখার ওপর আঙুল।

এই সুরের ভেতর নিভৃতে ঘুমাতো ধূসর ক্রন্দন। ফুলেওঠা বেলুনে জলের চাপ। আমি বিষণ্ণ হলেই এরা বিস্ফোরিত হতো। একবার গাঢ় লাভার আঁচ, পুড়তে পুড়তে ঢাকার পথে, বাসে। টিভিতে একটা নাটক চলছিল, দেখি, এস আই টুটুল অসম্ভব মায়াভরা গলায় গাইছেন --

'ও কারিগর, দয়ার সাগর ওগো দয়াময়,
চান্নিপশর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।

চান্নিপশর চান্নিপশর আহা রে আলো
চান্নিপশর রাইতে যেন বেসেছি ভালো।
কে দিয়েছে নিশি-রাইতে দুধের চাদর গায়
কে খেলেছে চন্দ্রখেলা ধবল ছায়ায়।'

আশ্চর্য, গভীর রাত, বাসযাত্রীরা সবাই ঘুম, ... আমি নোনাজলের প্লাবণ, ভেসে যাই। জোছনা আমাকে ছুঁতে পারে না, তা হলে কেন এমন হচ্ছে! আমি টের পাই, নিঝুম প্রকৃতি, রহস্যময় এক নীলাভ সাদা চাঁদের আলোভরা প্রান্তরে আমি। যেন আমার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তরল জোছনার ধারা। কী আবেশে আমি জলজ এক ঘোরে ডুবতে থাকি, ডুবতে থাকি। কালো এক পৃষ্ঠার বুক চিরে বাসটি ছুটতে থাকে, আমি ভেতরে জলমগ্ন। কেটে যায় আগুনদিন, ঘোর-ঘরে গানের দরজা খুলতে খুলতে, 'দুধের চাদর গায়,... কে খেলেছে চন্দ্রখেলা ধবলছায়ায়'।

বছরখানেক পর।
এবার চেপে আসে গাঢ়-কালিমাখা অন্ধকার, সঙ্গে নিবিড় শিউরেওঠা এক সুর। বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠের মর্মন্তুদ এক পাতাঝরানো গান, ঢুকে যায় সহস্র ফ্যাদম নিচে জলের অতল কাঁপে। একটা মেরুন রঙের ভেসপায় অ্যাক্সিলেটর মুঠো করে ছুটতে থাকি, চারদিকে গড়ায় গানটা --

'আমার গায়ে কতো দুঃখ সয়,
বন্ধুয়া রে,
করো তোমার মনে যাহা লয়...

নিঠুর বন্ধু রে,
বলেছিলে আমার হবে, মন দিয়েছি এই ভেবে,
সাক্ষী কেউ ছিল না সেই সময়।
সাক্ষী ছিল চন্দ্রতারা, একদিন তুমি পড়বে ধরা রে,
ত্রিভূবনে বিচার যেদিন হয়।'

মগজের কোষে-কোষে সুরটি সেঁধিয়ে যেত। কী এক তীব্র দহন, সুর ও কথার!

আইয়ুবভাই, অগ্রজ বন্ধু প্রফেসর আইয়ুব ভুইয়া, কয়েকদিন আগে একটি সাউন্ডক্লিপ পাঠালেন, মেসেঞ্জারে।

ফোনে জানতে চাইলেন, 'কামরুল, একটি গান, পেয়েছ?'

গানটি হলো, তাঁর কণ্ঠে ওই সুরটিই, 'ভাঙা ঘরে ভাঙা চালা... ', আমিও উদাস এক রোদের ঝাপটা টের পাই। তিনি বলে যান, 'আমার এইটুকু কাকে দেখাই, এমন কিছুতে আক্রান্ত হয়, তুমি ছাড়া তো আর কাউকে দেখছি না।'

আসলেই কি এ-সব ঐন্দ্রজালিক কিছু, সুর বা গান? মনে হয় না। কী যেন... কী যেন... কী এক অদ্ভুত ঘ্রাণভরা বাতাস, দোলে জীবন। কোথাও খুব গভীর এক শেকড়, শতবর্ষী প্রাচীন এক বৃক্ষ, সহস্র বছরের জমেওঠা মৃত্তিকা।