“মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না...”

অর্পিতা বাগচী



মা দুর্গা চলে গেলে ঠাকুর দালান খালি পড়ে থাকে । মাঝে মাঝে চড়াই এসে মহা আনন্দে নেচে বেড়ায় । মনেও তার ছোঁয়া লাগে । রোজ সেই নিঃস্ব দালানের সামনে বসে চড়াইদের দেখি । ওপরের ঝাড় বাতিতে পায়েরা আবার তাদের বাসা বাঁধতে শুরু করেছে । পূজার আগে তাদের বাসা ফেলে দেওয়া হয় প্রতিবারই হয় । গলা ফুলিয়ে পায়চারি করতে করতে তারা তাদের ভাষায় প্রতিবাদ করলেও শেষ অব্দি ঝাঁট দিয়ে ফেলেই দেওয়া হয় । আজ উড়ে উড়ে খড় কুটো এনে আবার বাসা বাঁধছে । সামনের একটি বচ্ছরের জন্য। আজকাল আর দালানের সিঁড়িতে গিয়ে বসলে ওরা তাকায়ে না , খুব ব্যাস্ত থাকে । কয়েক দিনের মধ্যে ওরা আবার দালানের দখল নিলো । খুব বেশি কিছু ওদের চাহিদা নেই, তাই ওড়ে ও না বেশি দূর । তবে থাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে । বিকেলের দিকে সময়ে করে এসে বসি । ওরা আজ কাল আর কাছে গেলে ভয় পায় না । আজকাল ওদের সাথে আমি কথা কইতে পারি , ওরা শোনে আমার কথা । কাজের মাঝে মাঝে জানলার বাইরে দেখতে ও পাই । আমার আশেপাশে ওড়ে। জানলার একটা কাঁচ এমন ভাবে ভেঙে গেছে আর পায়রা গুলো ওর ই মধ্যে দিয়ে আসবে যাবে । আর তারপর ই এক দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে। নীচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি , দেখি ছোট হতে হতে ওরা মিলিয়ে যায় । বাড়িতে গম ঝাড়া হলে মুঠো ভর্তি ছড়িয়েদি দালানে , একটা দুটো তিনটে করে নেমে আসে নীচে ,তখন আর আমার দিকে তাকানোর সময় নেই । বকবকম শব্দে ঘাড় ফুলিয়ে গমের দানা খেতে ব্যাস্ত । তবে আজকাল যেন একটু বেশী বেশীই থাকে বাসা ঘিরে । ওই খাবার আনতে যাওয়ার সময়ে টুকু ছাড়া । ঝাড় বাতিতে ধুলো পড়তে শুরু করেছে । আস্তে আস্তে আরও ধুলো জমবে । ঠিক পূজোর আগে আবার নামিয়ে , খুলে, ধুয়ে , মুছে চকচকে করা হবে । এমনি প্রতি বচ্ছর হয় । আর এই দিন গুলোতে ঝাড় বাতির আলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে , মলিনতা হারিয়ে। এমন দিনে ঝাড় বাতির আলোর নীচে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে অনেক বার পায়রার বাসার কথা মনে পড়ে। দুর্গা মা এলে,আলোতে ঝলমলিয়ে উঠে ঠাকুর দালান। আর ওদের দেখা যায় না। তার আগে শুধু ঘাড় ফুলিয়ে একটু বেশি বকবকম । এসব ভাবতে ভাবতে কখন ভিড়ের ধাক্কাতে আলোর নীচ থেকে সরে এসেছি ।
কিন্তু আজকাল এত বাসা ঘিরে থাকে কেন ? আর ওইসব দিনে ওরা থাকে ই বা কোথায় ? একটা নদীর তিরতির বয়ে যাওয়া ,পাশে কাশফুল,সবুজের খেত, ওপারের রাঙা মাটির রাস্তা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলে এক গরুর গাড়ির দুলকি চালে চলে যাওয়ার দেশে ? হবেও বা । আজ আবার একমুঠো গম তুলে নিয়ে ঠাকুর দালানে ছড়িয়ে দেওয়া মাত্র নেমে এল না । একটু সময় নিল তারপর,আর বেশী ক্ষণ নীচে থাকলোও না । আর সে সময় টুকু থাকলো বকবকম শব্দে কি যেন বলতে চাইলো । আবার ঝাড় বাতির ভেতর গিয়ে বসেলো । এমনি দিন গেল রাত্রি এলো, বেশ কিছু দিন পার । আজকাল হাত থেকে গম খেয়ে যায় । কেমন যেন এক বেপরোয়া ভাব । আমারও দিন রাত্রি জুড়ে পায়রা ভাবনা বাড়তে শুরু করে, কাশ ফুলের দিন আগত ।নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে আসে । গ্রীষ্মের দাবদাহ আর অনুভবে আসে না । দালান জুড়ে আমি আর একা নই , আসে লোক, আসে জন,আসে কলরব । আমার অনুভূতি আমার মস্তিস্ক ছুঁয়ে যায় ।
ঝাড় বাতি নামিয়ে ,ধুয়ে ,মুছে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হল ।ফেলে দেওয়া বাসার সামনে আমি একা । ব্যাস এটুকুই । একা । বাকিদের দেখা নেই । আমার সেই অনুভূতি কি যেন , কি যেন বলে যায় । আমি শুনতে চেষ্টা করি । নিঃশব্দ অনেক কিছু বলে শব্দে আমি তাদের শুনতে পাই না ।আমি শব্দহীনা হই । সামনে খড়কুটো খুঁজে পাই । একটা পায়রার উপস্থিতি বাতাসের ভারসাম্য বদলে দেয় । খড়টুকু ঠোঁটে নিয়ে দালানের বাইরের কুলুঙ্গিতে নতুন বাসা বানায়...