দূরবর্তী মেঘেদের জলপত্রে লিখে রাখি আমার গানের স্বরলিপি

পাপড়ি রহমান



গান বা সুর হলো পলায়নের আধার। ঢলকানো সবুজে আচ্ছাদিত নিভৃত নির্জন এক গুহা---যাতে ঢুকে পড়া মাত্রই তুমুল ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভাসিয়ে নিয়ে যায় তীব্র বেগে। সেই ভাসানে ঘনীভূত বেদনার তুষপাহাড় ভেঙে পড়ে। বেদনা-বীজ থেকে নিত্যপ্রহর বাকল খসে খসে যে ধূসররঙা স্তম্ভ তৈরি হয়, আমি তাকে বলি তুষের পাহাড়! চিরন্তন বেদনা দিয়ে গড়া ক্ষণিকের তুষপাহাড়।
অথবা গান হলো একেবারে নিখুঁত সবুজ দিয়ে বানানো এক অলৌকিক ভেলা। যাতে চড়ে বসা মাত্রই পাড়ি দেয়া যায় একযুগের তমসাচ্ছন্ন জীবন! মুছে ফেলা যায় দুইযুগ ধরে পুড়তে থাকা দগদগে ঘায়ের যন্ত্রণা।
যেসব প্রেমের গান, যেসব বিরহী-সুর মানুষকে জলে ভাসন্ত পদ্মপাতার মতো কম্পমান করে তোলে, সেসবই আমি দিবারাত্রি আগলে বসে রই। সেসবকে জড়ো করে নিজের মর্মমূলে প্রোথিত করে নিজেই হয়ে উঠতে চাই কোনো সুরবৃক্ষ। হয়ে উঠতে চাই গানের পাতায় ছাওয়া এক বিস্তৃত বাগিচা। কিন্তু হায়! কি করে আমি হবো সুরবৃক্ষ? হবো সকল গানের আধার?
দেবী সরস্বতী আমাকে সুরের মায়ায় ঘুম পাড়িয়ে দিলেও সে বর আমায় কিছুতেই দেননি। আমার সুরের বাগিচায় তাই অসুর এসে নিত্য ভর করে। সুরের বদলে বোবাকন্ঠ নিয়ে যাপন করি আমার অযাচিত মনুষ্য-জীবন। আহা! তার চাইতে আমি যদি হতাম গানের পাখি। হতাম সেই দেবী ফিলোমেলা---যে দশ সমুদ্দুর দুঃখ ভোগ করার পর হতে পেরেছিল গানের পাখি নাইটিংগেল। তারপর থেকে গাইতে শুরু করেছিল পৃথিবীর যত গান। পৃথিবীর সব সুর এসে জমা হয়েছিল তার কিন্নর কন্ঠে!
কিন্তু ওই নাইটিংগেল পাখিও একদিন নিজের বুকের রক্ত দিয়ে ফুটিয়েছিল প্রেমের লালগোলাপ। তার মানে সব প্রেমেই থাকে আত্মদহন, থাকে আত্মহনন আর আত্মবঞ্ছনা। সব প্রেমেই থাকে সুর আর বিসর্জন। থাকে আগুন আর বিরহ। প্রেমের আগুনেই সিদ্ধ হয় প্রেম। খাঁটি হয়। আর রচিত হয় গান। আসে সুর। প্রেম না থাকলে সুরদেবতা ধরা দেবে না কিছুতেই। আর আগুন না থাকলে প্রেমকে ধরাও মুশকিল। আগুন হল তাই, যা কাউকে বিশুদ্ধ প্রেমের দিকে ধাবিত করে। আগুন হলো বেদনার লেলিহান শিখা, যা দিবানিশি আশিক কে দগ্ধ করে। কিন্তু আশিক ছাড়া অন্য কেউ তা বুঝতেই পারে না।

খ.
তখন জানতাম না, প্রকৃত প্রেমের বাইরে যে প্রেম, তা কেবলই মিথ্যাচার। এখন যেমন হাড়ে হাড়ে জানি। জানতাম না, সুর মানেই নিদান। গান মানেই আশ্রয়। শুশ্রূষা। মনকে সারিয়ে তুলতে চাইলে গানের কাছে যেতে হবে। হবেই।
জেনেছিলাম যখন মিথ্যা ঘেরাটোপের এক জীবন আমার শ্বাসরুদ্ধ করে দিয়েছিল। নিরন্তর শঠতা আর প্রতারণার সাথে লড়াই করে করে মুমূর্ষু হয়ে উঠেছিলাম। ধেয়ে আসা বৈরী বসন্ত থেকে সরিয়ে রাখতে চাইছিলাম বিশীর্ণ পত্ররাজি, কিছু অমুকুলিত পুষ্পবাহার---তখন সঙ্গীত আমাকে দিয়েছিল নির্বাণ। পেয়েছিলাম প্রশান্তি আর বেঁচে থাকার আশ্চর্য রসদ।

হামেশা তুমকো চাহা... অর চাহা কুছ ভি নেহি...

নিদারুণ মর্মবেদনা ভুলিবার তরে ওইগান আমার দুঃখনিশিকে প্রগাঢ় করে তুলতো। একই গান আর সুর শুনতে শুনতে যামিনী ভোর হয়ে যেত। মগজ খেয়ে চলা হাংগরের দাঁতের শব্দ ছাপিয়ে ওই গান আমাকে নির্বাণ দিত।

তুমহে দিল নে হ্যায় পূজা... অর পূজা কুছ ভি নেহি...

আহ! দেবদাস! চাকচিক্যময় দেবদাস! বর্ণাঢ্য দেবদাস! যে দেবদাস ছবির প্রতিটি গান আমার হৃদয় কেটে কেটে রক্ত নদী বইয়ে দিত!

চাকচিক্যময় দেবদাসের পাশে ছিল শান্ত, নির্জন, ধ্যানস্থ বাপ্পা মজুমদার ও সঞ্জীব চৌধুরী। তাদের গান শুনে শুনে আমি ভোরে প্রথম ডেকে ওঠা দোয়েল পাখিটিকে দেখতে পেতাম।

আমি তোমাকেই বলে দেব
কি যে একা দীর্ঘ রাত
আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে...
আমি তোমাকেই বলে দেব সেই ভুলে ভরা গল্প
কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়...

কিংবা
চোখটা এত পোড়ায় কেন
ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও
সমুদ্র কি তোমার ছেলে
আদর দিয়ে চোখে মাখাও...

আর ছিল কাজী নজরুল ইসলাম। সদা। সর্বদা। বিছালায়। ব্যলাকনিতে। টবের সতেজ গাছগুলিতে। ভ্যান্টিলেটরে বাসা বাধা চড়াই যুগলের ডানায়। এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমার শিমুল তুলার বালিশটিতেও।

গভীর দুঃখ নিশি মোর
হবেনা হবেনা ভোর
ভিড়িবে না কূলে মোর বিরহের ভেলা

কিংবা

হারানো হিয়ায় নিকুঞ্জ পথে
কুড়াই ঝরাফুল একেলা আমি
তুমি কেন হায়
আসিলে হেথায়
সুখের স্বরগ হইতে নামি...

গ.
গান হলো সম্মোহন বিস্তারকারী রামধনু। যাকে শুধু অনুভব করা যায়। দেহে-মনে আশ্রয় দেয়া যায়। কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। যাবে না কোনোদিন। যেমন প্রেম। সত্যিকার প্রেম চিরদিন থেকে যায় নাগালের বাইরে। থেকে যাবে চোখের আড়ালে।
সহস্রবার পাইবার পরও নিত্যই নতুন মনে হয়ে সেই অমূল্য রতন।

তোমার সুরের ইন্দ্রধনু
রচে আমার ক্ষণিক তনু
জড়িয়ে আছে সেই রঙে মোর
অনুরাগমিয়...

ক্ষণিকের জন্যই তো এত কারবার এই ধরায়। এত গান। এত সুর!

এত সুর আর এত গান
যদি কোনোদিন থেমে যায়
সেইদিন তুমিও তো ওগো
জানি ভুলে যাবে যে আমায়...
‘ঠাণ্ডা ভেজা নখ দিয়ে এভাবেই ফুটো হয়ে গেল সব সিনেমা, সব মেঘশ্মশান। অন্ধকারে নীল নেগেটিভগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মন বল্লো, ঐ আমাদের গিটার। ঐ আমাদের অফিস। ঐ আমাদের ভূতগ্রস্ত শিকারের রিল। দু-পাহাড়ের মাঝখানে আমরা কি আছি? মাকড়শার বাগানে আমরা কি আছি? মহাশূন্যের পাস করা ফেল করা ছাত্রলাইনে আমরা কি আছি? গ্রন্থের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে থেমে যাই। একটা ছবি। বাবা ও মা। মাখখানে ফুটফুটে একটা ভ্রূণ। ছবির পেছনের দিকটায় একজন সূর্যাস্ত। অমনি চারিদিকে ডানা ঝাপটের শব্দ। আর ছবিটা ডিগবাজি খেতে খেতে হঠাৎ পেয়ে গেল এ পৃথিবীর আশ্চর্য ধুলোপ্রিন্ট। ছবি আর ডানা, ছবি আর ডানা। স্বপ্নে আবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো মৃত্যুর দৃশ্য...বাবা সুর তুললো। মা সুর তুললো। ভ্রূণ সেও সুর তুললো...
(বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম, জহর সেনমজুমদার)

ঘ.
মা বলতেন আমার আড়াই বছর বয়সেই নাকি একটা গান বেঁধেছিলাম---

বাব্বেসারে টায়রা
বউকুলে বউকুলে...

মানে ‘বাকবাকুম পায়রা’ ছড়াটি নিজস্ব ঢংয়ে গেয়ে যাওয়া।
তার মানে ভ্রূণ অবস্থা থেকেই গান আমাকে আক্রান্ত করেছিল ভালোভাবেই। মনে মনে চাইতাম একদিন গায়ক হব। গানে গানে এ ভুবন ভরিয়ে দেব। তারুণ্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ভাবতাম, একজনকে সুর ঝরিয়ে বলে দেব---

গান শুনে ভালো লাগে যারে
এত দেখে চেননি কো তারে?
কমলালেবুর মতো পৃথিবী এ-ধার থেকে ও-ধারে গড়ায় আর আমিও তরুণী হই। আমার গান ভেসে বেড়ায় ইশকুলের পুকুরের টলটলে জল আর নমিতাদির হারমোনিয়ামের রিডে! আমি তখন
বনের তাপস কুমারী আমি গো
সখী মোর বনলতা।
নিরবে গোপনে দুইজনে কই
আপন মনের কথা...
বা
আমার বেলা যায় যে সুরে সুরে
তোমার সুরের সাথে সুর মেলাতে।

কিংবা
দূরদেশি এক রাখালছেলে
আমার গাছের বটের ছায়ায়
সারাবেলা গেল খেলে
আ আ আ আ

রবীবাবু তখন আমাকে বেশ তুমুল ভাবেই প্রেমে ফেলেছিলেন।
তিনি ছিলেন আমার সকল দুখের প্রদীপ।
ছিলেন বিরহের আকাশকুসুম। আর ছিলেন আমার একান্ত পার্থসারথী।
এভাবেই কিনা কত যে গানের নদী পাড়ি দিলাম।

আমি নদীর মতন কত পথ ধরে
তোমার জীবনে এসেছি
আমি সাগরের মতো গভীর হয়ে
তোমারে যে ভালোবাসেছি...

অফিস থেকে বাসায় ফিরেই আব্বা গলা ছেড়ে গান গাইতেন।
অনেক পরে বুঝতে পেরেছি আব্বার গলায় কী মধুর সুর ছিল। গানে দরদ ছিল। আর মনে যন্ত্রণা ছিল। অন্তরে হাহাকার ছিল। গানের পাখি হবার জন্য, দুটো ডানা পাবার জন্য ভিতরে ভিতরে আহাজারি ছিল।
কিন্তু হতে পারেন নাই গানের পাখি। কিংবা সুরের যাদুকর। ফলে একদিন পৃথিবীর সমস্ত সুর নিয়ে, গান নিয়ে ঘুমিয়ে গেলেন তিনি। ঘুমিয়ে গেল আমার গানের বুলবুলি। আর করুণ চোখে চেয়ে রইল সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।
এরপর তাঁর সমস্ত গান পাখিদের কন্ঠে ফের ফিরে এল। ফিরে এল আমার কাছে। এই পৃথিবীর কাছে।

ঙ.

জীবন নদীর পাড়ে গানের ভেলাগুলি তেমন করে ভিড়াতে পারলাম না। বা রয়ে গেল অনেক গান, অনেক সুর, অনেক প্রেম---না-বলা, না-গাওয়া, না-গুঞ্জরিত হওয়া। হতে পারা গেল না নাইটিংগেল পাখিটি।
কিন্তু মনে মনে যে গান আমি গাই, যে সুর তুলি সেগুলি মেঘ হয়ে ভেসে বেড়ায়। উড়ে চলে যায় এ দেশ থেকে ও দেশ। সে দেশ থেকে ভিন্ন দেশে।

পরদেশি মেঘ
যাও রে উড়ে
বলিও আমার পরদেশি রে

‘তুমিও চেয়েছিলে অধিক জীবন, যাবতীয় নীরব দংশনের পর
মেঘলা রাত্রির বুকে জেগে ওঠে অর্ধস্ফুট হরিণার এই চাঁদমালা
পায়ে পায়ে পদচিহ্ন, দু-পাহাড়ের মাঝখানে যেন এক শিবনৌকা
দুলে দুলে গৌরি খোঁজে, আমাদের সকলের মৃতদেহ ক্রমশ
ত্রিশূলের তিন ডানা ধরে উঠে যায় অজানিত শূন্যের ভিতর
এইখানে মৃত্যুভয় ভুলে কারা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন গায়?’
(মহাকাল সমারূঢ়, জহর সেনমজুমদার)