সুরাৎসার

তুষ্টি ভট্টাচার্য



সুরের কথা বলছেন স্যার? আজ্ঞে, এই সুরটুর আমি বুঝি না। সুরা বুঝি। সার বুঝি ওই টাই! সুরা সুর যদিও বা হতে পারে, সার কিন্তু সুর নৈব নৈব চ। যা বিচ্ছিরি গন্ধ ওই সারের! তবে সার পেলে ভাল গাছটাছ হয়, ফুলটুল হয়, ফসলটসলও হয়। তা ওই গাছটাছে, ফুলটুলে, ফসলটসলে সুর থাকলেও থাকতে পারে। আমার জানা নেই স্যার। আমার জানা সুর বলতে সেই প্রথম শেখা আলো আমার আলো ওগো... তাও বিশ্বাস করুন, স্বরলিপি-টিপি দেখে না, এই আপনার মতই এক স্যারের আঙুল ধরে ধরে হারমোনিয়ামের রিড টিপে টিপে ফটাফট তুলে নেওয়া একটুখানি। আর পরম নিশ্চিন্তে ঢেকুর তুলে ঘুমিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেওয়া। আর সেই যে আমার আলো, তাকে যতই ওগো, হ্যাঁগো করে ডাকি, ধরা সে যে আর দিলই না শেষতক, বুঝলেন?
আর ঠিক এই জন্যই সুরও ধরল না আমাকে। ধরা তো দূর, ছুঁলোই না। তা সে নিয়ে আমার খুব একটা আফসোস নেই। বরং নিশ্চিন্ত কিছুটা। ওই সুরজানের যা র‍্যালা, সে যা হাইফাই ... আমার খসখসে চামড়া ছুঁলে তাকে আবার ডেটল দিয়ে হাত ধুতে হত। আর আলোও যে পালালো সেদিন কার সঙ্গে যেন... চাদ্দিকে ছিছিক্কার...স্ক্যান্ডে লের একশেষ আর কী! কিন্তু ওই পর্যন্তই। ওদের টিকি পাওয়া যায় নি তারপর থেকে। আর সত্যি বলতে কী, টাক, টিকি, টিকটিকি আর হাঁচি থেকে দূরে থাকি সবসময়েই। তাই এককথায় ‘বেঁচে গেছি’ বেদম।
সুর প্রসঙ্গে মনে পড়ল, আমাদের কলেজের এক দিদিমণি ছিলেন। তাঁর পদবী ছিল শূর। তিনি আবার সেই সময়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর গিন্নী ছিলেন। ফলে আমাদের পুরো বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট তাঁকে সুর দিয়ে থুরি তেল দিয়ে চলত। তাঁর ক্লাস আমার একদম ভালো লাগত না। ফলে ঘনঘন হাই তুলতাম, শূর ম্যাডামের বটানির চেয়ে জানলা দিয়ে দারুণ, দুর্দান্ত গাছগুলো দেখতাম, গাছের আড়ালে কেউ প্রেমট্রেম করছে কিনা তাও দেখে নিতাম। এছাড়াও আমার এক খাপছাড়া ভাব আছে, যা কিনা অনেকেই সহ্য করতে পারে না, ফলে সেই দিদিমণিও আমাকে তেমন সহ্য করতে পারতেন না। তবে তিনি কিন্তু খুব সুরেই কথা বলতেন, তাঁর পোশাক, তাঁর কথা বলা, তাঁর সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা আভিজাত্য ঠিকরে পড়ত। আর তাঁর গায়ের শ্যানেল-এর গন্ধ আমাকে কিছুটা মোহগ্রস্থ করলেও, অহং-এর গন্ধতে সব সুর কেটে যেত। তবে একদিন আমি বুঝলাম, ক্ষমতার দর্প বা এই ধরণের সমস্ত কিছুর ওপরেও মানুষের একটা মন বুঝি কোথাও না কোথাও থেকে যায়। সেই সময়ে বয়সের গুনেই হোক বা ইচ্ছেয় হোক, প্রচন্ড ফ্যাশন সচেতন ছিলাম আমি। তা সেই সচেতনতাকে এক ভীষণ থাপ্পড় দিয়ে একদিন আমার এক ভয়ানক সরু স্ট্র্যাপ দেওয়া উঁচু গোড়ালির চটি ক্লাস শেষ করে বেরনোর সময়ে ফটাস্‌ করে ছিঁড়ে গেল। আর সেই সময়ে আমাকে রক্ষা করতে যেচে এগিয়ে এলেন সেই শূর ম্যাডাম। ম্যানেজিং ডেস্কের হেড হিসেবে তাই আমি এখনও সেফটিপিনকে কাজে বহাল রেখে দিয়েছি! সেদিন থেকে ম্যাডামকে আমি সুর ম্যাডাম বলেই ডাকতাম।
আর একটা কথা বলার আছে স্যার। এই সুরকে ইঁদুরের মত ধারালো দাঁতের নীচে টুকরো টুকরো হতে দেখেছেন? এই সব ইঁদুরকে বলে অ-সুর। এদের সরু লেজ দেখে ভ্রম হতে পারে, মনে হতে পারে এরা নেহাতই নিরীহ। চেহারা দেখেও ভয় না পেতেই পারেন আপনি, কিন্তু ওই খুদে খুদে দাঁতগুলোকে আন্ডারস্টিমেট করবেন না কিন্তু! কখন যে আপনার ঝোলা ফুটো করে দেবে কুটকুট করে, আর আপনার সঞ্চিত দু আনা-চার আনা সেই ফুটো দিয়ে নিঃসাড়ে বেরিয়ে যাবে, আপনি জানতেও পারবেন না। তাই পাখির চোখ না দেখে ওই দাঁতগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখুন স্যার। ওই সুন্দর সাদা ধবধবে দাঁতগুলো কী নিষ্পাপ লাগছে না! ঠিক যেন শিশুর দুধের দাঁত। দেখতে ভাল লাগলে দেখতে থাকুন, তাতে অসুবিধে নেই, কিন্তু কামড় হইতে সাবধান!! এই রকম অ-সুরেলা প্রাণী কিন্তু সংখ্যায় কম নেই। তাই বলি স্যার, চোখ, কান খোলা রাখুন সব সময়ে। সুরের খোঁজ পান আর নাই পান, অ-সুরের চিহ্ন পেয়ে যাবেনই।
অসুরের কথা নতুন করে কীই বা বলব আপনাকে! বিশ্বাস করুন, ছোটবেলায়
দুগ্‌গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে যেতে চাইতাম না, ভয়ে। স্রেফ ওই অসুরের চেহারা
দেখেই হৃৎকম্প হত। মায়ের মুখের পাশে আরও যে কটা সুন্দর মুখ রয়েছে, তাদের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারতাম না। শুধু গণেশকে দেখলে খুব আমোদ হত। ও যেন ঠিক আমাদের পাড়ার মোটা গণশা। গাল টিপে আদর করে দিতে চাইতাম। কিন্তু সবার মাঝে ওই অসুর ব্যাটা আমাকে বহুদিন পর্যন্ত ঠাকুর দেখার ইচ্ছেটাকে আটকে দিয়েছিল। বাস্তবের অসুররা যে সবাই প্যান্ডেলের অসুরের মত দেখতে, তা ভাববেন না কিন্তু। তারা আমার মত দেখতে হতে পারে, এমনকি আপনার মত নিপাট ভালমানুষের রূপেও থাকতে পারে। তাই এদের চেনাটাই সবথেকে মুশকিল। কখনও দেখলেন এরা হয়ত হাতে ধারালো ছুরি বা লোডেড পিস্তল নিয়ে আপনার দিকে তেরে এলো, আর আপনার বুকের বাঁদিকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলিটি গুঁজে দিল। আর আপনি সপাটে মরে গেলেন, মরে যাওয়ার আগের মুহূর্তে চিনে নিলেন অসুরকে। কিন্তু হয়ত দেখলেন কেউ আপনাকে এক বাক্স সন্দেশ আর ফুল দিয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করল। আপনাকে বসতে দিল ঠান্ডা ঘরে। যেই আপনি আরাম করে বসলেন, অমনি আপনার পিঠে ছুরি মেরে দিয়ে চলে গেল। আপনি দেখতেই পেলেন না আপনার আততায়ীকে। জানতেও পারলেন না কে ছিল সেই অসুর। এদের আমিই এখনও চিনতে পারি নি, তো আপনাকে কী চেনাবো আর!
আগেই বলেছি, সুর আমি চিনি না। সেও আমাকে চেনে না। আমাদের মধ্যে যোজন যোজন তফাৎ। আমি ডানে গেলে, সে বাঁয়ে যায়। ফলে বিপরীতমুখী যে হাওয়ার সংঘর্ষ হয়, তাদের ঝাপটায় আমি একেবারে কাবু হয়ে যাই। সুরের অনেক দম, সে দিব্যি থাকে। সুরে সুরে কথা বলে, খায়দায়, ঘুমোয়, ঘুম থেকে জেগে উঠে গান ধরে, ধ্রুপদ, ধামার। ডবল ধামারের সময়ও তার দম থাকে অটুট। আমি উল্টোদিকে গেলে কী হবে, আমার কান কিন্তু সজাগ। একটুও তাল কাটলে বা আধমাত্রা কম হলে ঠিক ক্যাঁক করে টুঁটি চেপে ধরব! তবে সে আর দরকার পড়ে নি, সুর সুরই। সুরা নয়। সে নিজেই নিজের তালে, লয়ে চলতে থাকে মজবুত পায়ে। আমাদের অ-সুর বা অসুরদের নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই, ছিল না কোনকালেই। আমি মাঝেমাঝে ভাবি, কী অসীম শক্তি, কী বিপুল ক্ষমতা এই সুরের। সাতটি মাত্র স্বর দিয়ে কত না যাদুজাল বুনেছে, বুনছে নিষ্ঠা ভরে। এই পৃথিবীর কাছে যার বেশিরভাগটাই রয়ে গেছে অধরা। আমরা তো অন্ধ, বধির, অবুঝ। আমাদের হাজারো সমস্যায় মশগুল হয়ে সুরকে ভুলে যাই, বারবার তাল কেটে ফেলি। ধরতাইতে যেতে গেলে আর সোম খুঁজে পাই না। স্থায়ী থেকে শুরু না করেই অস্থায়ীর কাছে যেতে চাই। এত তাড়া আমাদের, এত কিছু একসঙ্গে পাওয়ার লোভ যে, আমরা সব একসঙ্গে পেতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলি নিমেষে। আর তারপরে হাহুতাশ করি বটে কিছুদিন, কিন্তু আবার যে কে সেই! আমাদের মরে গেলেও শিক্ষা হয় না, বুঝলেন? সুরের শিক্ষা এক জটিল সাধনা। তার আর আমি বা আমরা কী বুঝি। আপনি জানেন নিশ্চই এর গূঢ়তত্ত্ব। আসলে যে জানে, সেই জানে সুরের মহিমা। আমরা তো নিতান্ত এলেবেলে ধুলোবালি, বিপরীত হাওয়ার তোড়ে উড়ে যেতে এসেছি। সুরের কাছে দণ্ডবৎ থাকি, ঋণী থাকি তাই সারাজীবন।