অনেকদিনের আমার যে গান

প্রবুদ্ধ ঘোষ



“প্রেম বলেছে যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে/ মরণ বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই” এই গানটা দেবব্রত বিশ্বাস ছাড়া আর কারো গলায় শুনিনি কখনো। এই গানটা যতটা না রবীন্দ্রসঙ্গীত, আমার কাছে দেবব্রতসঙ্গীত অনেক বেশি। প্রেম যে সত্যিই এমন আশ্বাস দিতে পারে, এ আমাকে প্রত্যয় করিয়েছেন দেবব্রত। দেবব্রত আর রবীন্দ্রসঙ্গীত আর আমার ত্রিভুজে আরেকজন ঢুকে পড়েছিলেন বোধবেলা বাড়তেই। ঋত্বিক ঘটক। কারণ, ওই বহুচর্চিত অভূতপূর্ব শব্দপ্রয়োগ রবীন্দ্রগানে। ‘সকালবেলায় চেয়ে দেখি’ থেকে ক্লোজ্‌শটে নীতার গলাটা দেখা যাচ্ছে, বিসর্জনের সময় জলে ভেসে থাকা দেবীমুখ। তারপর, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ ফের গাইছে নীতা, লয় কমছে সপাং সপাং চাবুক আবহে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু আর সুখীসুখী অবসরবিলাস থাকছে না, জীবনের ভাঙ্গচুরে ঢুকে পড়ছে... দেবব্রত বিশ্বাস আমাকে প্রথম শুনিয়েছিলেন মা। প্রথম শোনা, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। ক্যাসেটটা ছিল আর ওই বড়ো পুরনো টেপরেকর্ডারটা। নীল রঙের কভার ক্যাসেটে, দেবব্রতর সাইড ফেস্‌ হাতে আঁকা। আর, বহুদিন অবধি আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, রবীন্দ্রসঙ্গীত দেবব্রত ছাড়া কেউ গাইতেই পারেন না। মায়ের থেকেই পাওয়া এই অব্‌সেশন দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়ে। এবং উচ্চারণ! বহুযুগের ওপার হতে আষা‘ড়’ নয়, আষা‘ঢ়’ এলো। এই ‘ঢ়’-টা কেবল উনিই উচ্চারণ করেন বলে এখনো বিশ্বাস আমার। যেমন, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ গানটা আমি চিন্ময় চ্যাটার্জ্জী ছাড়া কারোর শুনিইনি কখনো। চিন্ময়ের গলায় ‘তুমি তাই, তুমি তাই গো’ অদ্ভূত মাদক। নেশাতুর ক’রে রাখে।

‘অবুঝ দু’হাত শুধু হাতড়িয়ে ফেরে ফুল ওড়ে অকালবাসরে/ রাতপাখি বন্দর ছেড়ে যায়’... সেই যখন ভেঙ্গে যাচ্ছিলুম, চারপাশে সবসময়ই নিঃশব্দ ভাঙ্গার শব্দ শুনতুম। আঙুল গলে সময় পড়ে যাচ্ছিল। আলাপ জমে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল। সযত্ন মুহূর্তগুলো বীভৎস জ্বলে গিয়ে কবিতায় দলা পাকিয়ে যাচ্ছিল। কখনো ইমেজ আসে বাজ-ঝলসানো গাছ; কখনো মুখ থুবড়ে বালিতে, কাঁকড়ারা খেয়ে যাচ্ছে কুড়ে কুড়ে নোনাজল ধুয়ে দিচ্ছে খোবলানো চোখ। আহত ছায়ারা দুলে দুলে ধ্বংসের দিকে। অভিমান চুরমার করে আয়নার ছবি। ছাই ছাই কথকতা কথকের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে আলো ছেড়ে, ঘুম ছেড়ে। কতদিন? কতদিন এরকমই সংকট কলোনি গড়েছিল প্রাত্যহিকে? দখল হয়ে গেছিল মনোভূমি... তারপর, কথোপকথন কি ফের? সেই গন্ধ আর স্বাদ আগের উত্তাপে? সেই বরফ গলে গলে আলাপ ফিরে আসছিল বুঝি। ‘মরা গাছ কি ছোঁয়াচ পেয়ে ডাকছে, সোনামন সোনামন।’ বেপাড়ায় কতদিন বিকেলের বাসস্টপে আমিও দাঁড়িয়েছি। সেই যেবার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ওদের বারান্দার উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়েছিলুম, আর একবারও আসেনি ও। বৃষ্টিভিজে আমি ফিরছিলুম প্রায়-ফাঁকা রাস্তা দিয়ে, গলি দিয়ে। আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে টাকি স্কুলের পাশের রাস্তা দিয়ে, রাজাবাজার ছুঁয়ে খালধার ধরে বাড়ি ফিরছিলুম। সেবার ‘বাসস্টপে কেউ নেই কোথাও’ গানটা আমার গান ছিল কিন্তু চন্দ্রবিন্দু জেনে ফেলেছিল কী ক’রে? এসব কতদিন আগের কথা, স্মৃতি? একযুগ? কিশোরবেলার আল্‌গা ছোঁয়াচগুলোয় ‘চন্দ্রবিন্দু’ বড্ড জড়িয়ে ছিল।

তখন আমরা চটকলগুলোয় যেতুম। রাজনৈতিক পাঠ আদানপ্রদানের জন্য। কাঁকিনাড়া, নৈহাটি, হুকুমচাঁদ... বেশ কয়েকদিন ওখানেই থাকা, মজুরলাইনে। হিন্দি-উর্দুভাষী শ্রমিক অনেক। বাঙালি শ্রমিকও আছেন। কিন্তু, হিন্দিভাষী হোন বা বাঙালি, সমস্যাটা একই- অস্থায়ী কাজ, সপ্তাহান্তে বেতন অনিয়মিত, ছুটি কম, ছুতোনাতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত। আমরা যেতুম লিফলেট নিয়ে, হিন্দি আর বাংলা দু’ভাষাতেই। আর, খবরের কাগজে আলতা দিয়ে লেখা পোস্টার। শিফট্‌ বদলের সময়টা আমরা কারখানার গেট ঘিরে দাঁড়াতুম। প্রথমে একটু ভাষণ মতো। তারপর গান। ওঁদের থেকেই শোনা চুতিয়া মালিক আর দালাল ইউনিয়ন বনাম বহু ভাগে ভাগ হয়ে থাকা শ্রমিকশ্রেণি- এই নিয়েই তাৎক্ষণিক নাটক। সেখানেও গান হত, নাটকের মধ্যে। দেবযানী’দি আর সন্মিত প্রতিবার গাইত- ‘জিন্দা হ্যায় তু জিন্দেগি কি জিত পে ইয়াকিঁ কর্‌/ অগর্‌ কঁহি হ্যায় স্বর্গ তো, উতর্‌ লা জমিঁ পর।’ এখন প্রায়ই আলোচনায় আসে হিন্দি বনাম বাংলা, বাঙালি জাত্যাভিমান আর বিহারি শ্রমিক, ‘খোট্টা’ কাল্‌চারের বিরোধ। সেদিন দেখেছি ইন্টারনেটে, ওই নৈহাটিতেই হাজিনগরে উগ্র মিছিল। তলোয়ার হাতে। তিলক আর গেরুয়া ফেট্টি নির্দিষ্ট ধর্মের পরিচায়ক; ফেজটুপি বিপরীত ধর্মের। আমরা যখন কারখানার বাইরে মিটিং, গান, লিফলেট বিলি করতুম তখনো শ্রমিকের তিলক আর ফেজ দেখতুম। কিন্তু, তিলক আর ফেজ বিরোধী হয়ে গেল কখন, এতটা? আর, জানলুম একের পর এক চটকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিউ সেন্ট্রাল, টেক্সম্যাকো। ধুঁকছে হুকুমচাঁদ আরো অনেকগুলো। এগুলো খবর। টুকরো টুকরো। নিরুত্তাপ অক্ষরে অক্ষরে বাঁধা। তবু, কখনো তাপ লেগে যায় সেগুলোতে আর সে তাতে অনন্ত প্রত্যাশায় ঘুরে ঘুরে ঘুরে বেজে যেতে থাকে সেই গানটা- দেবযানী’দি শুরু করত, আমরা ধুয়ো দিতুম আর ভিড় জমে যেত আর কোনো কোনো শ্রমিক গেয়ে উঠতেন আর আমাদের চারপাশে বৃত্তটা বড়ো হতো আর সেই গানটা থামত না- “ঘিরে হ্যায় হাম সওয়াল সে, হামে জওয়াব চাহিয়ে/ জওয়াব দর্‌ সওয়াল হ্যায় কি ইনকিলাব চাহিয়েঁ”... গানটা এখনো ওই অঞ্চলে কতটা প্রভাব ফেলে?
আর, গানের কথাতেই মনে পড়ে যায় ‘ফিরাক্‌’ ছবিতে খাঁ সাহেবের ওই সংলাপ। অসুস্থ খাঁ-সাহেব একা একা সুরবাহারে অভ্যাস করে যাচ্ছেন; তাঁর বৈঠকে অনেকদিন আসে না কেউ। পরে, টিভিতে হঠাৎই দেখলেন গুজরাত গণহত্যার বীভৎসতা। বুঝলেন বিশ্বাস টলে গেছে, ভেঙ্গে গেছে সাঁকো। গান কি সেই ভাঙ্গাসাঁকো জুড়তে পারে? ‘সাত সুরোঁ মে ইত্‌নি কাবিলিয়ৎ কাঁহা কি অ্যাইসি নফরৎ কি সামনা কর সঁকে?’

আর, গান বললেই মনে পড়ে ইস্কুলের শান্তনুকে। তখন তো আমাদের বেঞ্চ-বাজানো গানের বয়েস। দু’টো পিরিয়ডের মধ্যবর্তী নিজস্ব মুক্তিস্বাদ, যতক্ষণ না পরের টিচার ক্লাসে ঢোকেন! কৌস্তুভ গাইত, ‘জানে জিগর্‌ দুনিয়া মে তু সব্‌সে হাসিন হ্যায়’। রাতুল গাইত নচিকেতার গান। সৈকত প্রথম ‘জাতিস্মর’ শুনিয়েছিল আমায়। তখনই প্রথম তর্ক শুনেছিলুম রাজা আর রায়ের মধ্যে। রায় ছিল চন্দ্রবিন্দুর ভক্ত, রাজা ছিল ক্যাকটাসের। তখন ‘হলুদ পাখি’ গানটা আমাদের বৃত্তের অ্যান্থেম হয়ে গেছে; আর, ‘ভূমি’র ‘বারান্দায় রোদ্দুর’ পাড়ায় পাড়ায় অ্যান্থেম! চন্দ্রবিন্দুর আজকালকার মেয়েগুলো সব স্মার্ট আর, দুধ না খেলে হবে না ভালো ছেলে এই গানদু’টো মেয়েদের এবং ভালো ছেলেদের আওয়াজ দেওয়ার মোক্ষম গানাস্ত্র। আমাদের গলা হয়ে গেছিল হেঁড়ে, জোরজার বা অনুরোধ করলেও সুর কিছুতেই আসতে চাইত না। তবু, সেই যে ‘শিক্ষার্থী উৎসব’ হতো ইস্কুলে, তাতে শেষ বছরে আমরা সবাই কাঁপাকাঁপা গলা আর ভাসাভাসা চোখ নিয়ে গেয়েছিলুম, ‘বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায়...’। এখন হাসি পায় ওই দৃশ্যটার ছেলেমানুষি ভাবলে, স্টেজে প্রায় ১৫ জন আর দু’টোমাত্র মাইক। কেউ সা কেউ পা কেউ গা। চোখের জল যদিও একইরকম নোনা ছিল সবার!
ইস্কুলের শান্তনু ব্যান্ড তৈরি করেছিল। গজল কিছু কিছু ভাল গাইত আর ‘ইন্ডিয়ান আইডলে’র গানগুলো। গিটার কিনেছিল। তালিম হয়তো তেমন ছিল না কিন্তু দরদ ছিল খাঁটি। ও জলকে ভয় পেত খুব। মনে আছে, ২০১০-এ ওকে কাঁটাপুকুর থেকে আনতে গেছিলাম। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে পাতা, কপালে সেলাইয়ের দাগ। গলা অবধি ঢাকা। ওর গিটারটাও আনা হয়েছিল। কেওড়াতলায় চুল্লীতে ঢোকানোর আগে অবধি গিটারটা দেখেছিলুম। শান্তনু ইস্কুলের শিক্ষার্থী উৎসবে, ক্লাস টুয়েলভ্‌-এ, ‘হোঁঠো সে ছু লো তুম, মেরা গীত অমর কর্‌ দো’ গেয়েছিল।