করিমের গান, করিমের প্রার্থনা

আহমদ সায়েম



রূঢ় কথাগুলি সবসময় সত্য হয় — আর মিথ্যে বলতে আসলে কিছু নেইও, যা আমি সবসময় মনে করি। যা-কিছু আমরা মিথ্যে বলি সবই আমাদের বানানো। একটা পুতুল বা রোবট স্রেফ নিজেকে আনন্দ দেয়ার জন্যই বানাই; অন্য কিছু কাজও পুতুল আর রোবট দ্বারা হয়, কিন্তু তা নিয়ে এই গদ্যে আপাতত কথা বলছি না আমরা; আমাদের চারপাশে ঢের কীর্তিকলাপ আছে যা অন্য কাউকে আনন্দিত করে না, — শুধু আত্মসুখই সেসব কীর্তিকলাপে প্রাধান্য পায়। ঠিক তেমনি মিথ্যে দিয়ে নিজেকেই সেইফ পজিশনে ধরে রাখি, এর বাইরে অন্য কোনো ফরমুলায় এর প্রকাশভঙ্গি পাওয়া যায় না। এর রূপরেখা আমাদের ছদ্মবেশ বা ছায়া। সত্য উদ্ঘাটনের জন্য এই ছায়াকে ধরতে হবে। আর ছায়া ধরা খুব সহজ নয় মনে হয়। শতবর্ষ পরেও যারা ছায়া ধরতে নামে তারা চারপাশের সবার চেয়ে কিছু-না-কিছু ভিন্ন তো হয়ই, কখনো-কখনো নির্মমও।

মূলত বাউল আবদুল করিমের গান নিয়েই কিছু কথা বলব ভেবে কলম ধরেছি। তবে তাঁর সমগ্র গান নিয়ে কথা বলব না; করিমের যে-কোনো একটা গানের বই পড়তে পড়তে আপনার নিজেরও মনে হতে পারে করিম তার নিজের প্রতি কতটা নির্মম বা স্বার্থপর। তা না-হলে কেউ কি এভাবে বলতে পারে—

আসল কাজ ফাঁকি দিয়ে রে
মন তুই আর চলিবে কতদিন
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ

আমরা চর্মচোখে যা দেখি তার সবটা সত্য নয়, তার মানে তো মিথ্যে কিছু আছে তা-ই স্বীকার করে নিচ্ছি। না, তা-ও স্বীকার করব না। বলব, যা দেখি তা বুঝি না বলেই সত্য-মিথ্যা বলে সমাজে সামাজিকতা করি। বাউল করিমের সাথে দেখা হয়েছে কয়েকবার বা অনেক-অনেকবার। প্রকৃতির তাৎপর্য উদ্ধার করা যেমন খুব সহজ হয় না, করিমও তা-ই। তারে খুব সাদাসিধে মনে হলেও চিন্তার দিক দিয়ে তিনি অত্যন্ত দূরদর্শী, অজস্র বিষয় বা দৃশ্যকে তুলে আনেন মাত্র কয়েকটি শব্দের সাহায্যে।

আমরা নানান রকমের গান শুনি, শুনতে শুনতে কাজ সারি, ব্যস্ত থাকি জীবনকর্মে; কিন্তু করিমের গান শুনে কোনো কাজে হাত দেয়া যায় না, জীবন থেকে যেন বের করে দেয়, মহাজনের খোঁজে নামিয়ে আনে সকল চিন্তাসূত্রকে।

কিছু আধুনিক গানেও এমন চিন্তাসূত্র পাওয়া যায়, সেসব গানেও ভাবিয়ে তোলার শক্তি আছে। কিন্তু ভাটিবাংলার বাউলকবি শাহ আবদুল করিমের গান যখন শুনতে যাবেন — ভাটির জল, হাওয়া আর মাটির গন্ধে ভরে উঠবে আপনার চারপাশ। অজস্র দৃশ্যের মাঝে নিজেকে অদৃশ্য করে দেখার শক্তি রাখেন করিম। এই করিম ‘করিম’ হয়ে ওঠার গল্প অনেক বিচিত্র, অনেক বিশ্লেষণের দাবি রাখে তার জীবনদর্শন। আমরা এই গদ্যে এতকিছুতে যাব না। একটামাত্র গানে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেই আমরা আলাপটা চালাতে চেষ্টা করব।

মন রে, চিন্তা করে দেখতে হবে
কেউ তো রইল না ভবে রে
একা একদিন যাইতে হবে রে
মন তোর সঙ্গী নাই কেউ যাবার দিন
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ।।

—সবাইরে যেতে হবে একদিন, সকল দৃশ্যের আড়ালে, নতুন কোনো দৃশ্য হয়ে..., কিন্তু মহাজন...!! এইসব নিয়ে আমাদের কোন ভাবনা নেই কিন্তু তাঁর মন এমন ভাবনায় নিমজ্জিত সারাক্ষণ। গানে গানে তাঁর সকল ইবাদত। ইবাদতের নানান রকম আছে, আসলে ‘আছে’ বললে ভুল হবে। কথা বলার বা হাঁটাচলার স্টাইল তো সবারই আলাদা, ঠিক তেমন করেই তৈরি করে নিতে হয় আপনার চাওয়ার ভঙ্গি; বা তা তৈরি করতেও হয় না, হয়ে যায়। করিম কোথাও কোনো ইশকুলে শিক্ষা নিয়ে ‘করিম’ হয়ে ওঠেননি, বরং তাঁর বলার ভঙ্গিই ছিল গান। করিম মহাজনের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন গান দিয়ে। গানই তাঁর প্রার্থনা, বা ইবাদত, বলা যায়।

আমার মনপাগলা বড় কঠিন, শোধ হলো না মহাজনের ঋণ, — মন তাঁর পাগলাই বটে, যে-জটিল প্রক্রিয়ায় আমাদের সূর্য দেখা হয় তার তাৎপর্য শুধু শুধু ব্যাকুলতা ছাড়া অন্যকিছুর অস্তিত্ব বিশেষ পাওয়া যায় না। আমরা প্রকৃতির তাৎপর্য বিশেষ না জেনেই সংগ্রাম করছি প্রকৃতিরই বিরুদ্ধে। আমরা আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতাও ছাড়িয়েছি, অথচ আমাদের হাত দিয়ে নষ্ট হয় আমারই সংলগ্নজনের সম্পদ, সম্মান এবং তার জীবনও। তাই আমাদের এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় প্রকৃতির কোনো সাহায্য থাকে না, দৃশ্যের পরে দৃশ্য জয় করি আর গৌরবান্বিত হই, অথচ নিজেকে শেষ করে যখন প্রকৃতির দিকে হাত বাড়াই বা মহাজনের ছায়া নিতে যাই তখনই টের পাই জলের গভীরতা।

নিজের জীবনযাপনই জীবনের পথ দেখায়। করিমও তো তা-ই। জীবননদীতে ভেসেছিলেন জীবনের সন্ধানে। অর্থকষ্ট ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য, মানসিক বিড়ম্বনাগুলো ছিল তার উপার্জন আর এই উপার্জনের ব্যাকুলতা ছিল তার চোখে-মুখে স্পষ্ট। কৈশোর আর যৌবন গেছে মোল্লা-মুন্সির দৌড়ানি খেয়ে, তবু উপার্জনের পথ দাবিয়ে রাখেননি, বরং আরো বেশি শক্তি পেয়েছে তার কর্ম বা গান। আজকের দিনে তাঁর সেই উপার্জন, কর্ম বা গান যা-ই বলি না কেন, সবার দৃষ্টিশক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। প্রতিটা শব্দে এত এত শক্তি যে তা একইসঙ্গে আমাদেরে একাধিক বা অনেক পথ দেখায়। করিমের ভিন্নতা ওখানেই। তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে কেউ তার নয়, “একা একদিন যাইতে হবে রে, মন তোর সঙ্গী নাই কেউ যাবার দিন”... আর বেশি কিছু না বলে এবার পুরো গানটা একবার দেখে নিতে পারি—

আসল কাজ ফাঁকি দিয়ে রে
মন তুই আর চলিবে কতদিন
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ।।
মন রে, ভবের বাজারে আইয়া
ছয় রিপুর সঙ্গ পাইয়া রে
কামিনী কাঞ্চন চাইয়া রে
মন তোর আপনজন বাসিলে ভিন্
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ।।
মন রে, চিন্তা করে দেখতে হবে
কেউ তো রইল না ভবে রে
একা একদিন যাইতে হবে রে
মন তোর সঙ্গী নাই কেউ যাবার দিন
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ।।
মন রে, বাউল আবদুল করিম ভাবে
কেন-বা আসিলাম ভবে রে
ভবের জনম বিফল যাবে রে
আমার মনপাগলা বড় কঠিন
শোধ হলো না মহাজনের ঋণ।।

রচনা : ০৯ এপ্রিল ২০১৭