গটআপ

অর্পিতা বাগচী

দার্জিলিং। প্লেনটা একটুর জন্য ধাক্কা খেলোনা। সামনের বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা,ককপিটে ঠিক পাইলটের পিছনে দাঁড়িয়ে গায়ের আঁচলটা টেনে নিলো শ্রী। সামনে এই প্রথম এতো বড় পাহাড় ।
পড়েছে, দেখেছে, ছবি। কিন্তু এ যে, স্বচক্ষে! ভালোলাগা যেন থামতেই চায় না। কেমন শীত শীত করছে, প্লেনের ভিতর আলাদা করে কি ঠান্ডা লাগবে ! অথচ গায়ের আঁচলটা টেনেই যাচ্ছে তখন থেকে।পাইলট ভদ্রলোক বেশ ভাল। নাহলে কেউ ককপিটে ডেকে নেয়। আসলে নতুন বিয়ের একটা গন্ধ থাকে, তুমি পাও না পাও তোমার সামনের জন ঠিক পাবে।
জুঁইফুলের জন্য ।একমাত্র জুঁইফুলের জন্য শ্রী রাজি হয়েছিল ভরা গ্রীষ্মের বিয়েতে। সারা বাড়ি জুঁইফুল দিয়ে সাজানো, হাল্কা আলো আর মৃদু সানাই। শ্রী বাবার কাছে এটুকু চাওয়ার আগে ঘরের
সামনে বেশ কয়েক বার হাঁটাহাঁটি করে, পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মার্বেল পাথরের মেঝে ঘসতে ঘসতে
মাথা নিচু করে গিয়ে বলা মাত্র রাশভারী বাবা হ্যাঁ না হু বলেছিলেন।
জমিদার বাড়ির এক মাত্র মেয়ে, শ্রী। মেয়ের কোনও ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেননি। বাদ রাখেননি নিজের
ইচ্ছেদেরও।লাল না, মেরুন না গোলাপি রং এর বেনারসিতে সেজেছিল শ্রী। সোনা নয় হিরের গয়নাতে মেয়েকে সাজিয়েছিলেন। হাতের চুড়িতে হিরেই ছিল,একটু ছাড়া ছাড়া। এক কাকিমা শ্রী হাত ধরে বলেছিলেন, “জমিদারবাবু পারেননি, জামাইবাবু পারবেন”। শ্রী হেসেছিল আর আড় চোখে লক্ষ্য করেছিল পাশে বসা ভদ্রলোক ও মাথা নামিয়ে আলতো হাসছিলেন।
এই প্রথম অপরিচিত কোনও লোকের সাথে বাইরেআসা,কথাবলা, পাশেবসা । একদিন চায়ের আমন্ত্রণে টীপট থেকে চা আর বানাতে পারছিল না। সেদিন প্রথম সকলের সামনে হাতেহাত দিয়ে চা বানিয়েছিল শ্রীরা ।
দার্জিলিং থেকে ফিরে হাতেহাত রেখেই দিনরাত একাকার ।নিজের হাত আর আলাদা করে বুঝতে
পারেনি শ্রী কোনদিন। ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমিয়ে পড়ার মাঝের সময় শ্রী হাতের আলতো স্পর্শ
অনুভব করত জামাইবাবু । এতো শাশ্বত এতো শান্ত এতো শক্তিশালী এত শীতল কোন স্পর্শ
যে হতে পারে শ্রী জীবনে না এলে টেরই পেতন না ।প্রতি মুহূর্তে শ্রী উপস্থিতি জানান দিত স্বাভাবিকে।
জীবন নদীর মতোই বইছিল তিরতিরে, একুলে অকুলে। শ্রীর কোলে শ্রীর ছোট ছেলে।
শ্রীর শরীরে জল জমতে শুরু করল। জল বাড়ছে জল কমছে জল বাড়ছে জল বাড়ছে ... । হয়ত বা জলের স্পর্শেই শ্রীর স্পর্শ আরও আরও শীতল, টলটলে। জামাইবাবুর দিনরাত্তিরে শ্রী স্পর্শ অপরিহার্য ।
সময়ে জানাই ছিল, ৯০ মিনিট । খেলা শুরুর বাঁশি বাজলো, খেলতে নামলেন জামাইবাবু । কালো জার্সি । প্রতিপক্ষে ১১ জনই।অন্যদিকে তিনি একা। জিততে তাকে হবেই। অতএব গটআপ। ডাক্তারের সাথে, তাবিজের সাথে, ওষুধের সাথে, মন্ত্রের সাথে, জলের সাথে, ফুলের সাথে, মৃত্যুর সাথে...।
খেলা শেষে , যখন বুঝলেন ততক্ষণে হিন্দু সৎকার সমিতির লাল গোলাপে মোড়া গাড়ির সামনে তিনি বসে।
প্রতি ঘরে শ্রীর বড় বড় ছবি । শোক যে সাত সমুদ্রের থেকেও কত কত গভীর হতে এই প্রথম
দেখলেন তিনি । দিন দিন ডুবে যাচ্ছেন, ভাসছেন, সাঁতরাচ্ছে্‌ কাতরাচ্ছেন তার চেয়ে অনেক চেয়ে অনেক বেশী।
একমাত্র মেয়ের বিয়ে ঠিক ছিল আগেই। লাল না মেরুন না গোলাপি বেনারসিতে মেয়ের বিয়ে দিন শ্রী কে দেখতে পেলেন আবার ।অবকল শ্রী। সেই হাসি, সেই তাকানো, সেই ওঠা বসা কথা বলা ।এই বিয়ে শ্রীর শোকের ওপর গোলাপি বেনারসী বিছিয়ে দিলো ।
কালো মেঘটা হাল্কা হাওয়াতে সরে গেল একদিন। শরতের আকাশে মেঘ ভেসে ছিল।প্রতিদিন মেয়েকে একবার দেখা চাই। মেয়েও ঠিক মায়ের মত আলতো স্পর্শে শান্তি দিত বুকে।
ঘর ভরেছিল, বুক জুড়চ্ছিল। প্রতি বছর দুর্গা পুজো আসছে দুর্গা পুজো যাচ্ছে। নীল আকাশে কাশ ফুলের ছায়া। মা দুর্গা আসেন প্রতি বচ্ছর। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক, গণেশ, সিংহ, অসুর নিয়ে। সেবার যখন গেলেন সাথে নিয়ে গেলেন শ্রীর মেয়েকেও । এবার আর গটআপ করার সময়েও পেলেন না।আবার চলে গেল শ্রী।
দিন দিন বয়স বাড়ছে, চুলে পাক ধরছে । সংসারকে শুধু দুহাত ভরে দিচ্ছেন । জীবন তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে তারচেয়ে বেশি। যত না বেশি মেনে নিচ্ছেন মানিয়ে নিচ্ছেন তার চেয়ে বেশি।
পুরনো খেলার ছকে তিনি আর খেলেন না। আজ আর খেলার প্রয়োজন ও নেই তার। নিতে শিখতে হয় জানতে হয়। জেনেছেন শিখেছেন তিনিও । পরিপূর্ণ হচ্ছেন সম্পূর্ণ হচ্ছেন দিন প্রতিদিন। নতুন খেলা শিখছেন আজকাল। যে খেলা কৃষ্ণ শিখিয়েছিলেন অর্জুনকে...।জীবন খেলছে মৃত্যু খেলছে, তিনি দেখছেন। তিনি দেখছেন রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে।
সময় ৯০ মিনিট। মনে মনে জানেন ৯০ মিনিটই। অতিরিক্ত সময়ে তার প্রয়োজন নেই। জানেন ডাক তার আসবে যে কোনও দিন। তিনি শান্ত তিনি নিশ্চিন্ত তিনি সংযত। খেলতে নামলে বাকি এগারোজনকে দাঁড় করিয়ে গোল করবেন, এবার তিনি জানেন মনে মনে।
ডাক এলো। রাত্তির দুটো তিরিশ ,আম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল ।নতুন খেলা খেলবেন, মাঠে নামলেন। এই প্রথম তিনি চেনা ছকে খেললেন না, এই প্রথন তিনি নতুন ছকে। I C U , অক্সিজেন মাস্ক
সামনের স্ক্রিনে বিব বিব... খেলা শুরু। এই প্রথম তিনি সবাই কে অবাক করে পায়ে বল নিয়ে, সামনে তিনকাঠি ।এই প্রথম তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। পরের দিন অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেওয়া হল।
এই প্রথম তিনি ধীর পায়ে বল নিয়ে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। এই প্রথম তিনি ম্যাচ ধরে রাখলেন ৯০ মিনিট । এই প্রথম তিনি চোখের ইশারাতে গোল রক্ষক কে সরতে বললেন। শরীরে কার্বনডাইঅক্সাইড বাড়ছে। সকাল ৬ টা ৫০ মিনিট।এই প্রথম তিনি বল ঢোকাচ্ছেন নিজের জালে। এই প্রথম হারতে নামলেন, জিতবেন বলে।
এই প্রথম তিনি শ্রী কে দেখলেন খেলার মাঠে। এই প্রথমবার শ্রী লাল বেনারসী। এই প্রথমবার একটা স্টেডিয়াম কাঞ্চনজঙ্ঘায় । এই প্রথমবার খেলা শেষ। এই প্রথমবার বরফ পড়ছে মাঠ জুড়ে। এই প্রথম বার তিনি ম্যাচ খেললেন,গটআপ করলেন,জীবনের সাথে...