সম্মোহিনী ভালোবাসা

নীতা বিশ্বাস



‘সুরের আলো ভূবন ফেলে ছেয়ে
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে...’

বিশ্বচরাচরে প্রতিনিয়ত যে সুর বেজে চলেছে—নদীর তরঙ্গ উচ্ছলে, পর্বতের মন্দ্রসপ্তক ব্যারিটোনে, অরণ্যের উদবেলিত মর্মরে, পাখির কলস্বনে, বাতাসকাটা তার ডানার উড়ানে,---কেমন বিস্ময়কর মহিমায় তা সংযত ও সংহত সা রে গা মা পা ধা নি সা’ য় সকলের অলক্ষ্যে মিশে যায়! স্বর এসে বসে সেই নিয়ত বয়ে চলা সুরাঞ্জলি তে, আর হয়ে ওঠে সংগীত। প্রকৃতির ও প্রাণের অলিন্দে সপ্তসুরের মহাবসতি। মানুষ তার ভালোবাসার মৃত্যুঞ্জয় থেকে মহাবিশ্বের জড় ও প্রাণের কাছ থেকে আহরণ করেছে এই স্বরধ্বণি। উপাদান সব ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র। খুঁজে নাও হে ভোলামন!
“ডো- এক মায়াবী চোখের হরিণীর নাম। রে-তার বন্ধু, এক সোনাটুপ রোদ। আর বাকিটা ছোটাছুটির গল্প” (অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়)। সপ্ত সুরের ধ্বণিমাধুর্য কন্ঠে অনায়াস খেলিয়ে হরিণীর ছন্দময় চরণবিহ্বলতা। বিশ্বভুবন জুড়ে এই সুর খেলা। সেখান থেকেই আহরিত এই সুরবন্দনার অসামান্য।
তখন, সেই প্রথমআদি তে অজানা সুরব্যাকরণ কেমন করে সংবদ্ধ হয়েছিলো এ বড় বিস্ময়ের! আদিম মানুষ তার খিদের মাংস, শীতের বল্কল আর মাথাগোঁজার গুহাছাদ এর চরম প্রাথমিক চাহিদা মিটিয়ে থেমে না থেকে কি আশ্চর্য ভাবে তাদের বেঁচেথাকার আর একটি উপকরনের কথা ভেবেছিল! ধ্বনিমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশের আর্তি কি ভাবে তার মনে জেগে উঠেছিল, এ বড় বিস্ময়কথা!
কিছু কিছু সংবেদনশীল আদিম মানুষ এই অনুভুতি প্রকাশের ভাষা খুঁজতে চাইছিল, যার থেকে সৃষ্টি হলো ‘স্বর’। সেই আর্চিক যুগে অনুভূতি প্রকাশের একটিমাত্র স্বর ছিল। আমরা অনেক বছর পর্যন্ত জানতে পারিনি কি সেই স্বর! এরপর ‘গথিক’ যুগ- অনুভূতি প্রকাশে নিয়ে এলো ২টি স্বর। তিনটি স্বর এলো সামিক যুগে। সামিক যুগের গান সামগান বা সামরব। সময় বা কালখন্ড যত এগিয়ে আসছে, বিবর্তন এভাবে ক্রমান্বয়ে সাতটি স্বর নিয়ে এসেছে। সামিক যুগের পর স্বরান্তরের যুগে চারটি স্বর, ঔড়ব যুগে এক থেকে পাঁচটি স্বর, ষাড়ব যুগে এক থেকে ছয়টি স্বর, সম্পূর্ণ যুগে এক থেকে সাতটি স্বর (নিষাদ)। এভাবে সপ্ত সুর বা সুরসপ্তক। এইসব সঙ্গীত-ব্যাকরণ পন্ডিতের বিষয়-আসয়। আদিম মানব যখন ধ্বনিশ-শব্দ সহযোগে মনের আনন্দ-বিষাদ-বিস্ময়ের অনুভূতি প্রকাশ করতো, সেখানে কোনো ব্যাকরণের কচকচি ছিলো না। ছিলো আত্ম অনুভূতি প্রকাশের তাগিদ ও চাপমুক্ত নিঃশ্বাস। সমস্ত রকম প্রতিক্রিয়ার যে ধ্বনি তারা কন্ঠে ব্যাক্ত করতো, সেই ধ্বনি কে প্রকৃতির থেকে পাওয়া ধ্বনির সাথে মিশিয়ে দিলো। সৃষ্টি হলো সুর। সুরমুর্ছনা। প্রতিটি মুর্ছনায় এসে বসলো মানুষের প্রতিটি রকমফের অনুভূতি। সুখানুভূতি, দুঃখানুভূতি, প্রেমানুভূতি, বিস্ময়ানুভূতি, স্নেহানুভূতি। পিছু পিছু প্রত্যেক অনুভূতিতে লাগলো স্বর এর পর অক্ষর (বর্ণ), শব্দাক্ষর, কথা, বাক্য। সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশে এবার সংগীত। ভালোবাসার সিম্ফনি। গান কে ভালোবেসে গান গাইলো মানুষ। প্রকৃতির মধ্যে চিরজাগ্রত যে গীতিময়, নিয়ত চর্চায় ও সাধনায় তা পরিশীলিত হয়ে উঠলো। ক্রমশঃ পরিশীলনই তো জীবনচর্যার অমোঘ। যন্ত্রসংগীতও মনুষ্যমেধায় আরো সংযোজনের হাত ধরে উঠে আসতে লাগলো নতুনতরতে। একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠলো। যা কিছু শ্রুতিনন্দন, আদিম মানুষও তাকে ভালোবেসেছে। আজও সেই পরম্পরা...। আসলে সাম= song=সংগীত(এভাবেও কি ভাবতে পারা যায়না!), নন্দনতত্বের এই রীপুটি মানুষের রক্তেই আছে। তাই নান্দনিক যাকিছু তাকে (বেশীরভাগ) মানুষ গ্রহন করে, আত্মস্থ করে। আদি থেকে বছরের পর বছর মানুষ পরম সাধনায় এই সংগীতশিল্প কে অর্জন করে চলেছে। এ ধারা চিরন্তন। এ ধারা চলমান। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে কেন? কেন এ কৃচ্ছসাধনা, যখন গ্রাসাচ্ছনের মত মানুষের জীবনে এর ততোটা প্রাথমিকতা নেই??? এখানেই মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর পার্থক্য ধরা পড়ে। আসলে বিশ্ব জোড়া এই সুরের ফাঁদে পড়েছে মানুষ। আদিম মানুষও এই ফাঁদ অস্বীকার করতে পারেনি। গানের ওপারে বিরাজ করে এক অসীম প্রসন্নতা। তাই মনে হয় সুর এবং সংগীতও মানুষের বাঁচার এক প্রাথমিক শর্ত ও পরম্পরা।
গান এর অন্তর্নিহিত কত যে অন্তঃসলীলা রাগ-রাগিনী, কত ছন্দের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য সৌকর্ষ সৌমেধিকতা, কত শিল্প, কত রঙ, গন্ধ, কত শক্তি, কত প্রতিরোধ, কত ব্যথার নিষ্ক্রমণ, কত অবরুদ্ধ দ্বার খোলানোর যাদুম্যাজিক, কত নিরাময়! মানুষ জেনেছে তার করিশ্মা।
কোনো অনুভূতিকে মনের মধ্যে চেপে রাখার যে চাপ, প্রকাশ করতে না পারার যে অবর্ণনীয় কষ্ট,—সংগীত সেই কষ্টের নিরাময়। স্বরবিণ্যাসের বিভিন্নতায় তারা মূর্ত হয়ে ওঠে। স্পষ্টতই বোঝা যায় মানুষের জীবন কি গভীর ভাবে সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তা যদি না হয়, তবে আদিম সেই নিরক্ষর মানুষের মধ্যে এই গীততাড়না আসতো কি? কেন তারা অবসর বিনোদনের জন্য বিচিত্র স্বরসংযোগে, কোন জড় বস্তুকে আঘাত করে শব্দধ্বনি নিস্কাশিত করে, নানা অঙ্গভঙ্গী সহকারে চিত্ত বিনোদনের পন্থা বার করবার urge অনুভব করলো! আমরা আধুনিক সঙ্গীত ব্যাকরণের মাধ্যমে জেনেছি, নৃত্য-গীত-বাদ্য—এই তিনটি কলার সমাবেশ ও সঙ্গমে সংগীত সম্পূর্ণ সার্থকতা পায়। যে ‘নাদ’ বা শব্দতরঙ্গ থেকে ‘গীত’ এর জন্ম(‘গীতং নাদাত্মকম্‌’), নৃত্য বাদ্য এগুলির উৎপত্তিও সেই ‘নাদ’ থেকে (‘বাদ্যাংনাদাব্যক্তা প্রশস্যতে, তদ্দয়ানুগতং নৃত্যং নাদাধীননতস্ত্রয়ম’)। এই ‘নাদ’কে ‘আহত’ ও’অনাহত’ এই দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে পরবর্তীকালে। আর আশ্চর্যে দেখি সংগীতের জন্ম ‘আহত’ শব্দ থেকে। কেন? ‘আহত’ নাদ থেকে কেন! এইজন্য যে, শব্দ স্থূল রূপে ও শ্রাব্য রূপে বাইরে আসার আগে সুক্ষ্ম রূপে প্রথমে নাভিতে আসে। নাভিমূল থেকে হৃদয়ে, কন্ঠে, এবং জিহ্বামূলে এসে স্থুল রূপ পায়। আমরা তো জানি বায়ু বা বাতাসই শব্দের মূল কারন। তো নাভি থেকে শব্দবায়ু জিহ্বায় আসার আগে নাসা, কন্ঠ, উরু, তালু, জিহ্বা ও দাঁত এই ছয়টি স্থানে আহত হয়ে একটি শব্দ সৃষ্টি করে। তাই ‘আহত’ শব্দই সঙ্গীতের জন্ম দেয়। আমরা জানি প্রতিটি জন্মের সঙ্গেই মিশে থাকে আনন্দ ও যন্ত্রণা। সঙ্গীতও আহত যন্ত্রণা থেকে আনন্দজন্মতে... আর আশ্চর্য সেই বিখ্যাত শ্লোক---
‘মা নিষাদপ্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধী ঃ কামমোহিতম্‌।’
এক যন্ত্রণা থেকেই তো জন্ম নিয়েছিলো এই শ্লোক এক দস্যুর জিহ্বা থেকে! আর সেই মূহুর্ত থেকেই দস্যুসর্দার রত্নাকরের জীবন আমূল বদলে গেল। গান এবং গানের মধ্যেকার যে অর্থচেতনা, সুরের মোহ, তা একটি ব্যক্তিজীবন কে, সমষ্ঠিগত মানুষজীবনকে আমূল পালটে দেবার ক্ষমতা রাখে। তার মনে কর্মে চেতনায় আনতে পারে এক মানবিক পরিবর্তণ।
#
সেই সুদূর অতীতে যেসব গীতিকবিতা রচনা হয়েছিলো মানুষের মুখে মুখে (শ্রুতিতে), সেখানে দেখেছি গান কেমন ভাবে ঈশ্বরের জয়গান হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে মানুষের সব কাজের প্রেরণা। ফসল বোনা, ফসল কাটা, ভার বহন করার বাড়তি শক্তি—এ তো গানের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে জড়িয়ে রয়েছে। ব্রতকথার গান গুলোয় সামাজিক জীবনে মেয়েদের চাওয়া-পাওয়ার কথা বিধৃত হয়েছে। বঞ্চণার দুঃখও গানের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। গান এভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। এসব সুরের আলো-হাওয়ায় ভুবন ছেয়ে আছে।
আর মিউজিক থেরাপি! যন্ত্রণাকাতর মানুষ সুরের আশ্চর্য মহিমায় শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে। সঙ্গীত মানুষের কাছে শুশ্রূষা ও নিরাময়ের অপর নাম। সংগীত আনতে পারে জনজাগরণ, হয়ে উঠতে পারে অত্যাচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে এক মস্ত হাতিয়ার। একলা জীবনের নির্জনতায় যেমন, ঠিক তেমনই সমবেত জীবনের পূর্ণতায় গান তার স্থান করে নিয়েছে অনায়াসে। সঙ্গীতই সেই আধার যা মানুষের সমস্ত অনুভূতির ব্যাক্ত রূপ।
#
সাউন্ড অফ মিউজিকঃ
সঙ্গীত কি যে অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা রাখে, আসি সেই কাহিনি তে। এ কাহিনি অনেকেরই জানা। ১৯৬৫ সালের সেই অসামান্য হলিউডি সিনেমা, যার নাম ‘সাউন্ড অফ মিউজিক।’ অদম্য প্রাণশক্তি, গানের ও সুরের সেই জোয়ার যা সব বন্ধন-শৃঙ্খল চোখরাঙানো অনুশাসন ভেঙে জীবনের জয়গান হয়ে উঠতে পেরেছে। দেখিয়ে দিয়েছে Gun এর সফল মোকাবিলা করতে পারে গান। সঙ্গীত। মিউজিক।
সেই সময় টা মনে পড়ছে, (১৯৩৯ সাল) যখন শান্ত সুস্থ মুক্ত গনতান্ত্রিক পৃথিবীতে নেমে আসছে হিটলারি অত্যাচার। হিটলারের জার্মানি পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক। ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব।’ হিংসা ঝলসে উঠছে যুদ্ধবিমানের ডানায়, গোলা-বারুদের বিষাক্ত ধোঁয়ায়, মেশিনগানের গুলিতে, কোটি কোটি মানুষের রক্তবন্যায়...। মারিয়া ফন ট্র্যাম্প এর স্মৃতিগাথা থেকে নেওয়া সাউন্ড অফ মিউজিক এর এই সত্য। যে সময় (১৯৩৮) অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ এর শান্ত শহরের ডানায় আঁকা আছে জোখজুড়ানো শান্ত বরফমন্ডিত আল্পস পর্বতমালা। নদীর জলধারায় পূর্ণ শান্তির টলটলে জলধারা। আকাশে ঝকঝকে নীলোচ্ছ্বাস। রোদ্দুরের রঙ সোনা সোনা। এই ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ এর মাঝামাঝি সময়ের কথা--
মারিয়া, সেই গানপাগল চার্চবালিকা, যে নদী পাহাড় অরণ্য আকাশ পাখি মেঘের মধ্যে নিঃশব্দে উচ্চারিত গান শুনতে পায়। চার্চের প্রার্থনার সময় চলে যায়। সে কিছুতেই সেই গান ছেড়ে ফিরে আসতে পারেনা। নিয়মবাঁধা প্রার্থনায় তার মন বসেনা। প্রকৃতির গান সে তার নিজের কন্ঠে তুলে নেয়। নিয়ম নয়, নিয়মভাঙার গান সে গাইতে চায় প্রাণ ভরে। গানই তার বাঁচার রসদ! তার শ্বাসের অক্সিজেন! নিশ্চুপ পাহাড় তার বুকে সাত সুরের তরঙ্গ তোলে। এই প্রবলেম চাইল্ড কে কি বেতের বাড়ি মেরে ঈশ্বর-উপাসিকা সন্ন্যাসিনী নান বানানো যায়! সে নিজেই কি নান হতে চায়, গান যার কাছে সমস্ত নিয়ম ভাঙার উদ্‌যাপন! তাই মারিয়াকে পাঠানো হয় কঠোর নিয়ম-শাসনের শৃঙ্খলে বাঁধা এক মিলিটারি অফিসারের মাতৃহীন সাত সন্তানের গভর্নেস হিসেবে। শৃঙ্খলার শৃঙ্খলে বাঁধা, ধমক-জর্জরিত এই সাতটি শিশুর ধুসর জীবনে মারিয়ার গান নিয়ে এলো মুক্তির নতুন স্পর্শ। সুরের আলোর অলৌকিকে তাদের কুন্ঠিত জীবন আলোময় হয়ে উঠলো। প্রাণ খুলে বাঁচতে শেখালো ওদের মারিয়া। অসাধ্য সাধন করলো মারিয়া তার ভালোবাসার সুরের যাদুতে, এমন কি কঠিনতার দেওয়ালে এতদিন আবদ্ধ থাকা মিলিটারি অফিসারটিও নিজের ভেতরে সঙ্গোপনে লুকিয়ে থাকা এক সঙ্গীতপ্রিয় মানুষকে খুঁজে পেলেন। খুঁজে পেলেন খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার উজ্জ্বল মুক্তি। চোখ মেলে দেখলেন তাঁর সাতটি সন্তান সাতটি সুর হয়ে তাঁকে ঘিরে রয়েছে। পিয়ানোয় বসে সেই রাগী কঠোর ও ডিসিপ্লিনের জীবনে আস্টে পিস্টে বাঁধা ক্যাপ্টেন জর্জ ফন ট্র্যাপ গেয়ে উঠলেন,
“এডেলওয়াইজ এডেলওয়াইজ, এভরি মর্নিং ইউ গ্রিট মি, স্মল অ্যান্ড হোয়াইট, ক্লিন অ্যান্ড ব্রাইট্‌, ইউ লুক হ্যাপি টু মিট মি...” ক-ত ব-ছ-র ধরে জমে থাকা পাথরচাপা এই অবরূদ্ধ বিষাদকান্নার গমগমে ব্যারিটোন সব শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে পড়লো। গান’ই পারে মানুষের মনের নিষ্ঠুর কে গলিয়ে দিতে। হিটলারের নাৎসিবাহিনীর রক্তচক্ষু থেকে সেই সাতসুরের মত সাত সাতটি কচি প্রাণকে সীমান্ত পার করিয়ে বাঁচার আশ্বাস ভরে দিতে পেরেছিলো তাদের বুকে, মারিয়া নামের মেয়েটি, শুধুমাত্র গানের ভালোবাসায় প্রতিপালিত বলে। সকল দুঃসময়কে পেরিয়ে যেতে পারে যে, তার নাম গান। মানুষের সমস্ত নরম সুন্দর ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে যে তার নাম গান।
মারিয়া বুঝিয়ে দিলো সংগীতই পারে ফ্যাকাসে জীবনে আলোর ঝলমল সাজিয়ে দিতে, জীবন থেকে সমস্ত ব্যারিকেড ঠেলে সরিয়ে দিতে, আহত প্রাণের শুশ্রূষা হতে। সংগীতের মধ্যে থাকে এক পারমানবিক শক্তিসম্পন্ন সুশীল হৃদয়।
#
উডস্টেক অভিযানঃ
আর দেখেছি সংগীতের মধ্যে দিয়ে সহনশীলতা শেখার সেই গত শতকের ১৯৬৯ সাল। আমেরিকার ধনতান্ত্রিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, ভিয়েৎনাম যুদ্ধের বর্ব্ররতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রশক্তির ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে খোলা প্রতিবাদ, শুধু গান গেয়ে শান্তিবারি বর্ষণের সেই ষষ্ঠদশক। এ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছেন তাঁর কবিতাগানের বই ‘হাউল’। ১৯৬৯ একদিকে চন্দ্রাভিযান, অন্যদিকে শুধুমাত্র গান কে হাতিয়ার করে হওয়া বিশাল সেই ‘উডস্টেক’ অভিযান। আশ্চর্য ভাবে একটা অভিযান পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার, দ্বিতীয়টি মানুষের নিজের গভীর গহনে, নিজের ভিতরে গমন করার অভিযান। সেই বিট প্রজন্ম। সেই হিপি প্রজন্ম। কেমন করে ভুলি তাদের অন্তরনিংড়ানো গান! তারা সমস্ত বিলাসিতা ছেড়ে নেমে এসেছে মাটিতে। গান নিয়ে তাদের অভিযাত্রা--, প্রতিবাদের গান। শান্তির গান।
রাষ্ট্রের আগ্রাসনী লোভকে বিদ্রুপ করে, জীবনের সকলরকম বিলাসিতা জলাঞ্জলি দিয়ে শুধুমাত্র সংগীতকে অবলম্বন করে সেই বিট কবি আর হিপি প্রজন্ম কন্ঠে তুলে নিয়েছিলো প্রতিবাদ ও নন-ভায়োলেন্সের গান। বিশ্বশান্তির বার্তা। প্রাচ্যের দেবদূত বুদ্ধদেবের শান্তির বাণী তাদেরকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিলো। নিউইইয়র্কের ‘বেথেল’ শহরের এক খামারবাড়িতে জিমি হেনড্রিক্স কে কেন্দ্র করে হয়ে উঠেছিলো সেই অসাধারণ উডস্টক অভিযান--, সাধারণ মানুষের পাশে বিট কবিদের ভাষ্য আর বিট্‌ল দের উত্তাল গান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো কিছু আভরণহীন নগ্ন দেবদূত, যারা পরোয়া করেনা শীতপোষাকের, মাথার ওপর ছাদের, আর ক্ষুধার অন্নের। শুধুমাত্র মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে শান্তির গান ভালোবেসে গেয়েছিলো এই বিটল্‌ আর হিপি প্রজন্ম।
আর ততদিনে আমরা জেনে গেছি সংগীতের সর্ব প্রথম স্বর টি হলো ‘ম’। একটি শিশুর, সকল শিশুর, পৃথিবীর তাবৎ শিশুর ‘মা’ ডাক যেন ধ্বণিত হয়েছে সংগীতের এই প্রথম স্বরের মধ্য দিয়ে। বিশ্বচরাচরে ‘মা’ স্বরটিই শিশুর প্রথম মুখের ও মনের ভাষা যা সংগীতের মধ্যে দিয়ে দেশ মাতৃকা ও পৃথিবী ‘মা’কেও ভালোবেসে সম্বোধন করা ছাড়া আর কি হতে পারে! ‌