বেঁচে থাকার অন্য নাম

আসমা অধরা



বুঝে ওঠার পর থেকে যতবার ঢলে পড়েছি ঘুমে, প্রতিটি ঘুমেই একবার করে লুকিয়ে ছিল আশঙ্কা, মৃত্যুর। তাই ঘুমকে মৃত্যুও বলা যায় আর মৃত্যু বলা গেলে, বন্ধ চোখকে অন্ধ নয় কেন! তেমনি অন্ধ চোখের ওপর এক ক্ষণজন্মা প্রজাপতি এসে বসে, আবার ইন্দ্রিয়ের অতীত এক শঙ্কা ভর করে আসে, প্রবল ঢেউয়ের মতন। চোখের ওপর যেন ছবি ভরপুর এক রঙ্গিন গ্যালারী, স্লাইড ভিউতে শুরু হচ্ছে ছেলেবেলা থেকে। ভেসে আসে মায়ের গলা, গুনগুন করে গাইছে, “সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই…”
যতকিছু ভুলে যাই সবকিছুই প্রকট হয় আবার সেই অন্ধের কালে। প্রচ্ছন্ন হাসির বইয়ের পাতা উলটে যায়, গ্রামোফোনের পিনিয়াম জুড়ে ঘুরতে থাকে মনভুলানো বেহাগ। এভাবেই একসময় সূর্য্য ডুবে যায়, চাঁদ পিছলে নেমে যেতে থাকে হরিণের পেটের মত মসৃণ মেঘে, চুরি হতে থাকে ব্যক্তিগত আকাশ, চেনা সুগন্ধ। এই অন্ধত্ব কেবল দেয় না, নেয়ও।
তখন, আবার সেই বারান্দার মেঝেতে কান পাতলেই শোনা যায়, কলকল করে গড়িয়ে যাচ্ছে জল আর ঝাপসা হয়ে আসা রেলিং এ জ্বলতে শুরু করে লাইমস্টোন।
কান্না গাইবার কি কোনো নির্দিষ্ট ঢঙ আছে! তবুও প্রায়ই মনে হয়, হাসিমুখে কান্না গাওয়া যায়, “মধুমালতি ডাকে আয়”, আর এই ঝরে পড়া মালতিদল হাতের মধ্যে নিয়ে স্থির তাকিয়ে থাকা চাঁদের সাথে মত্ত কেউ একজনবা নিজেও হতেই পারি। আজকাল যেন স্বপ্ন ধরা পড়ে সেই অন্ধ চোখেই- করপুটে জমা থাকা কথা, ব্যথা, মালা হয়ে জড়ায় বকুল গন্ধে। 'স্ব' আর 'স' কি মিলেও যায় কখনো বোঝাই যায়না। অথচ তার ঘঁষা কাঁচের চশমা ঘোলা হয়। এগিয়ে দিলেই ভারী কাঁচ সাধারন সুতোর শাড়ীতে মুছে বাড়িয়ে ধরা হাতেও বকুল খেলে যায়।
এমন অন্ধ দিনে বন্ধ চোখে ভেসে ওঠা সেই মন কেমন করা চাঁদে ক্ষীণদৃষ্টি পুরু কাঁচে ঢাকতে আছে বলো? জোছনায় কি জ্বলে যায় অমন দৃষ্টি! আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিলেও কলঙ্ক লেগে গেল? যদি বলো কোথায়, সে উত্তরে বলা যায়, “চাঁদের গায়”। বা হাত ধরে হাঁটলে ওইসব আলো আর দৃষ্টির মাঝে কাঁচের ব্যাবধান অসহ্য মনে হয় না? ফের কেউ গায়, "গোপনে বলে মালা আয়.."
আজকাল হরিদ্রা ফল পাকলে, বন্ধ আর অন্ধ চোখেই তাকিয়ে থাকি মাকালের দিকে। মনে পড়ে পুরনো দিনের কথা, সেই সমস্ত কথারা অজস্র বেয়োনেট, বিক্ষত অধর। যে পক্ষী পেটের ভেতর থেকে চঞ্চু উঁচু করে ঠুকরে খায় বুকের ভেতরে আগলে রাখা যক্ষের ধন, তারে বলি, বাকীটুকুও খেয়ে যা, আয়! সামান্যতে কি কখনো মেটে ব্যথার আশ? লাল যদি গভীর দাগ ছড়াতেই না পোড়ায়! এইসব অন্ধত্বের দিনে আমি চাই অঢেল, আটপৌরে যন্ত্রনা।
যে যন্ত্রণার কোন সহবৎ নেই, যে যন্ত্রণা শিল্প জানেনা- এমন যন্ত্রণার কথা ভাবতে গেলেই মনে মনে বাজতে শুরু করে, “I know what you did last summer” গানে বেজে ওঠা এক প্রেমিকার শঙ্কিত আর্তনাদ...
‘He knows
Dirty secrets that I keep
Does he know it's killing me?
He knows, he knows
does he know
Another's hands have touched my skin
I won't tell him where I've been’
তারপরই প্রেমিকের আকুল কন্ঠ
‘It's tearing me apart
She's slipping away (I'm slipping away)
Am I just hanging on to all the words she used to say?
The pictures on her phone
She's not coming home (I'm not coming home)
Coming home, coming home
I know what you did last summer
{Tell me where you've been}
এই যে মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন এর দ্বৈধ মনাকর্ষ বয়ান করে যায় প্রেমিক যুগলের মাঝের কথোপকথন। বোঝা যায় একজনের অপরাধবোধ ও ভুলের সাযুজ্য তার চোখে তাকালেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়, যদিও সেই চোখেই প্রেমিক নিজের জন্য ভালবাসা খুঁজে পেতো। তবে সে এটাও জানে প্রেমিকা অনুতপ্ত এবং প্রেমিককে সে প্রচণ্ড ভালবাসে। এই যে কাছে আসতে চাওইয়া বা দূরে সরে যেতে না পারাই জীবনের বর্ণনাতীত অধ্যায় যা কথায় বলা না গেলেও সুর ও সংগীতে উঠে আসার মাধ্যম।
তাই এসো উৎসব করি এইসব অন্ধ অন্ধ ছুৎমার্গের, খুঁচিয়ে বাঁচিয়ে রাখি দ্রাঘিমায় আঁতস ব্যথাসকল। কোল পেতে থাকি, সাবলীল সমস্ত দুঃখের অভয়ারণ্য আশ্রয় হয়ে, ক্লান্ত হলে ভেজা হাতে মুছে দিই তার কপোলের চূর্ণ অলক- ললাটরেখার স্বেদ ও ক্লান্তি। ক্ষমাহীন প্রেমে আরেকবার অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরি যারে, সেই তো নিয়তি।
আর নিয়তি ভাবতে গেলেও সেই সংগীতই বেজে ওঠে কর্ণকুহরে…
“She dropped the phone and burst into tears
The doctor just confirmed her fears
Her husband held it in and held her tight
Cancer don't discriminate or care if you're just 38
With three kids who need you in their lives
He said, "I know that you're afraid and I am, too
But you'll never be alone, I promise you"

When you're weak, I'll be strong
When you let go, I'll hold on
When you need to cry, I swear that I'll be there to dry your eyes
When you feel lost and scared to death,
Like you can't take one more step
Just take my hand, together we can do it
I'm gonna love you through it.

এওতো জীবনই, জীবনের চরম পরিহাস নিয়তির। কখন নিয়তি মুখ ঘুরিয়ে নেয় তা কে জানতে পারে! হাসিখুশি মুখর জীবনসংসারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায় কর্কট বৃশ্চিক, এসময় হাত শক্ত করে ধরে রাখা সখাই জীবন, জীবনের অপর নাম। রোগে তাপে অথবা পর্বত ভেঙ্গে পড়া ক্ষণে যে মানুষ তার কোলে শুইয়ে রাখে তাপিতের শরীর, ভাগ নেয় যন্ত্রনার, পাশে থাকে বজ্রআটুনিতে মুঠোর ভেতর করতল আটকে ধরে তার বহিঃপ্রকাশ এভাবেই ফুটে ওঠে গানের মধ্যে। এ এক চরম আশ্রয়। ভালোবাসা, দুঃখ, কষ্ট, বিরহ, সহমর্মিতার উঠকৃষ্ট অধ্যায় যা জুড়ে থাকে জন্ম থেকে মৃত্যাবধী।
এতোক্ষনে মনের ভেতরে যা কিছুই তালগোল পাকালো সেখান থেকেই শুরু হয় আবার জীবনের জয়গান," আমি নিঝুম রাত, তুমি কোজাগরী আকাশ"। এমন কন্ঠ উন্মাদ করে তোলে শ্রুতিগহ্বর, তাও তো মিলিয়ে যায় কালের অন্ধকারে। আর তাই এইখানটায়, এই জোড়া অন্ধ চোখ ভিজে যায় গাঢ় কুয়াশায়।
এই আঙুলে ধরে হেঁটে যাও স্বমহিমা ও 'শ' সমাচার। অন্ধদিনের এসমস্ত কবিতা মনে রাখার কথা নির্দ্বিধায় ভুলে গেলেও ক্ষতি নেই। স্বজাতীয় নখর ও বিষদাঁত জন্মের পরক্ষনেই শাপগ্রস্ত হয়েছিল বলে, বিষ বহনের অক্ষমতায়, কেবল বিষাদ সঙ্গী একাল সেকালে। তবু যখন ক্লান্তি দুহাত ধরে টেনে নিয়ে চলে, ভেঙ্গে আসে শরীর, সাড়া দেয় না মন, তখন স্বেচ্ছায় বরণ করে নিই অমন অন্ধকাল। ছবি দেখি, কবিতা ভেসে আসে, আসে গান। এইতো জীবন! জীবন মানেই মা, মা মানেই আপাদমস্তক এক কবিতাঘর, আর সেইসব কবিতাই আসলে গান, মিউজিক, ডেথ মেটাল অথবা বেঁচে থাকার অন্য নাম।