প্রেমে প্রেমে বাজে

সুমী সিকানদার



দগদগে হলুদ সরিষা ক্ষেতের মাঝখানে যে পথটা আনমনে হেঁটে যেতে থাকে তারই বিলম্ব ছায়া ধরে ধরে হাঁটে কিশোর।
সারাদিনমান বিজন সুর খেলে খেলে বেড়ায় তার কন্ঠে।হেঁটে হেঁটে একসময় ক্লান্ত পা তার দাঁড়িয়ে পড়ে আচমকা। কোত্থেকে যেন মাটিফুঁড়ে ডালপালা মেলে দেয়া গাছের ছায়ায় দু'দন্ড জিরিয়ে নেয়।
এই কোঁকড়া জীবন তার ভাল্লাগে না। কই কই পালিয়ে ছুটে যায় মন বেচাইন । মা'র গামছা শাড়িতে মুখ মোছা জীবনের কোন পূনর্জন্ম নেই। এক জনমেই যতটা পারে মায়ের আয়না হয়ে থাকে।
বাবা মিলিয়ে গেছে পুরোনো সোঁদা গন্ধের মত. ঝাপসা করে বাবার মুখটা মনে আসে। সে না দেখা মুখ আরো পরিষ্কার দেখার জন্য বেশি করে গান ধরে। গাইতে গাইতে গাল বেয়ে বেয়ে জলধারা গড়াগড়ি করে তাতে কিশোরের ভ্রুক্ষেপ নেই। ''এমন মানব জনম আর কি হবে মন যা কর ত্বরায় করো এই ভবে।' আহা সঙ্গীত কাঁদতে কাঁদতেও মন ভাল করে দেয় ।
বছর দুয়েক আগে শহরে পড়তে এসে বিরাট ধাক্কা খেয়েছিলো কিশোর। মানুষের রঙ ঢঙ্গের দিকে চেয়ে চেয়েই সময় গেছে।
এই খানে খোলা গলায় গান কই? সুর কই, স্বর কই। গান শোনার কান কই। হায়রে মানুষ , ''জাগাও পথিকে ও সে ঘুমে অচেতন।''
শহরে গান বলতে জরিবৌ সাজা রিকশার টুংটাং আওয়াজটাই তার মনে ধরেছে। শুনলে চমকে ওঠে ঘুম দুপুর। অবাধ্য ইচ্ছে করছে। টুং করে কে যেন ডাকে, নাকি জাগায়,নাকি আঁতিপাতি খুঁজে ফেরে কোন এক আলাদা ঈশ্বর যার ঘ্রাণ সারাবেলা চায়।
গ্রিল দেয়া বারান্দায় সমস্ত ঝুলন্ত কাপড়েরা ঈষৎ স্বাধীন ভঙ্গিতে ওড়ে , আসলে তো ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা মর্মর। উঠোনে মায়ের মেলা শাড়িটারও এই স্বভাব। সেও হাত ছড়িয়ে নাচের ঢঙ করে ওড়ে। হলুদ আর সবুজ কাঁথা ফোড় লুকিয়ে জলফড়িং নাচতে আসে।
মা'র শাড়িতে এত রঙ ফড়িং এলো কখন? বাবা কিনে দিয়েছিলো? রোদের কড়া ধমক খেতে খেতে আজ মায়ের শাড়ি রঙহীন। ম্লান নেহারি। কেন গো মা। আমিও কি নেই?
ঢাকায় ভাড়া বাড়িতে কিশোরেরা ক'জন একসাথে থাকে। লিস্ট করার মত সঙ্গে তেমন কিছু নেই । দরকারি কাপড়, হাড়িপাতিল, বই। খাটের নিচে ট্রাঙ্কেও আরও কিছু সরঞ্জাম। এসব তো সবার থাকে। কিশোর চুপচাপ এনেছে ছোট্ট ক্যাসেট প্লেয়ার । মামু কিনে দিয়েছিলো সেকেন্ড হ্যান্ড সেই টেপটা । খুব গান শোনার বাতিক। এই এক শখ, পুরোনো ক্যাসেটে পুরোনো দিনের গান কপি করে আর শোনে।
আগামীকাল বেশ কিছু বই লাইব্রেরিতে জমা দেবার কথা কিন্তু পড়ায় মন নেই। বই গুলো আধা পড়া রইলো। জানালা দিয়ে উড়ে গেছে সোমলতা সেই দ্বিধাগ্রস্থ হলুদের ধারে। সেখানে মা রইলো মা হয়ে, মা রইলো সরিষা হয়ে। চোখে তাবৎকালের এত কাচা সোনা লেগে আছে যে বইয়ের কালো আর দেখতে পাচ্ছেনা কিশোর।
জানালা লাগিয়ে দিয়ে ফের টেবিলে এসে বসলো। বইগুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখলো। চুপচাপ গাইছেন অজয় চক্রবর্তী । 'আমি সেদিন থেকে জেতা বাজি হেরেছি।'' কোন দিনের কোন বাজি যে কিশোর জিতেছে তা সেই জানে।
মুখের ওপর টুকরো হয়ে যাওয়া ম্লান হাসিটুকুর সাথে দপদপ জ্বলানেভা জোনা্কের কোথায় যেন মিল।সে ভীষন ভাবে নিজেকে ভুলে যেতে চায় ।ভুলে যায়।
কিশোরের বর্ণনা দিয়ে লাভ নেই।তার গাত্র বর্ণ দিনে ময়লা আবার জোৎস্নায় ধবল। তার নাক নকশা যেন আঁকা। কন্ঠ খুব টানে ধক লাগে।
দরকারী কিছু কিছু জিনিস তার আছে কিছু কিছু নেই। এতসব নেই এর ফাঁকে তার কেবল কোমলপনা সুর আছে। এ সুরের উৎস তার বাবা । তিনি গাইতেন।জমিখালে পা ডুবিয়ে কৃষি কাজ করতেন দলেবলে। দুপুরে বাড়ি থেকে আনা শাকভাত খেয়েই চুরুট ধরিয়ে আয়েশে গাইতেন আব্বাস উদ্দিন। সুরও ছিলো।
''যদি বন্ধু যাবার চাও ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে।''
চরদখলের রাতেই তার বাবার মৃত্যু ঘটেছিলো। লাঠিয়ালদের সাথে কৃষক পেরে উঠবে কেন।বিহানের ওয়াক্তে জমির চাচাই দেখেছিল বাবার আধা ডোবা শরীর। পরে সবাই ধরাধরি করে কাদায় রক্তে মাখামাখি দেহ উদ্ধার করলেও, তার জীবন আর উদ্ধার করা যায়নি টলটলে জল থেকে।
কে জন্ম নেবে জানার আগেই এক মাটির ঘর থেকে আরেক মাটির ঘরে রওনা দেয় কিশোরের বাবা। তাই বুঝি জলে কি চরে কোথাও মন লাগে না মন বাউলার। সে গানের টানে নানা মানুষের মুখের রেখা দেখে দেখে মায়া খুঁজে বেড়ায় সুর খুঁজে বেড়ায়।কানের মধ্যে হুহু করে বাতাস হয়ে ঢুকে পরা সুর তাকে অন্ধ করে রাখে কাঙ্গাল করে রাখে। সে বাবার আদল মুখে নিয়ে ঠোঁটে বাঁশি বাজায়।
পদ্মাসনে বসে আছে কিশোর। সন্ধ্যা কাল চিঠি গুঁজে দিয়েছে তা পকেটেই রয়ে গেছে। খুলে পড়্রা কথা মনেই নেই। হঠাৎ মনে পড়েতেই সে চিঠি খুলে বসে। পাশের বেডে রুমমেট চন্দন ঘুমায়। টেবিল ল্যম্পের গোল উজ্জ্বল নুয়ে থাকা আলোয় সে চিঠিটা পড়তে শুরু করে।
কিশোর কিশোর...... দুইবার তার নাম লেখা। সন্ধ্যা সব সময় এভাবেই লেখে , প্রিয় প্রিয় । 'কেন এক কথা দুইবার লেখো? '
'ভাললাগে গো ,তুমি কি বোঝো' ।
সারা চিঠি জুড়ে তার সন্ধ্যার প্রেম, অনেক দিন দেখা নেই। তার অনেক রাগ, এলোমেলো মন তীব্র আকুতি। শরীর যদি একবার তৃপ্তি পেয়ে যায় তো সে নদী ভুলে সাগর সাঁতরায়। শরীরের শুরুটা সন্ধ্যা জানে,সে বাধ্য করতে জানে। সন্ধ্যাকে অক্ষরে পড়া শেষে আলগোছে বইয়ের ভাঁজে রেখে দেয় কিশোর। তাকে তো সম্পর্কে বাঁধতে নেই। সে তো সম্পর্ক চায় না।
কিশোরের এত কিছু ভাবনা নেই, থাকেনা । জলফোঁটার মত তার মন টলটল করে ,পিছলায়। পেলে পেলো, না পেলে না পেলো। এত ধান্ধা নেই বাঞ্জারান। দেহ পেলেই যদি অনন্ত সুখ মিলবে তবে বার বার কেন মানুষের এক মন শতেক মনে ছুটে যায়। 'এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না।''
অপরাহ্ণের মোমস্বচ্ছ আলোয় কিশোরের চোখের লেগে থাকা স্ফটিক চিক চিক করে ওঠে। সে তানপুরায় রেওয়াজ শুরু করে। জাগতিক সব ভুলতে এর চেয়ে অব্যার্থ ওষুধ আর নেই।
দোসর ফিরে গেছে অপেক্ষায় থেকে থেকে। কিশোর ফিরে যাচ্ছে কাঁধে শান্তিনিকেতনী পাটের ঝোলা ফেলে। যেভাবে তার সাধক গুরু সারাজীবন মাঠে ঘাঠে প্রান্তরে অচেনা সুরের মাত্রা গুনে বেড়িয়েছেন সেরকম। এই সব পুরুষ সব সময়ই কারো না কারো জন্য যোগী। কার জন্য? ''সাজিয়াছো যোগী বল কার লাগি ।'' তানপুরায় সুর লাগছেনা , রঞ্জন দিয়ে এক মনে তার ঘষে চলেছে কিশোর, সুর লাগা চাই কানে।
ক'টা দিন মায়ের কাছে ঘুরে আসবে , ব্যাগ গুছিয়েছে তাড়াহুড়ায়। সে সুযোগে সন্ধ্যার বিয়েটা নির্বিঘ্নে ঘটে যাক। সন্ধ্যার মা' কে কিশোর কথা দিয়েছে ।