অচ্ছেদ্য বন্ধন

কৌশিক দত্ত



কি সাহস দেখুন, গান নিয়েও লিখছি! গান সম্বন্ধে জ্ঞানগম্মি এমনই, যে “গ অক্ষর গোমাংস” বলে টিটকিরি দিলেও আপত্তি করার উপায় নেই। সুবিধে হল এই যে মানুষ আর তার সমাজ ক্রমশ যতই জটিল হোক, সঙ্গীতের মধ্যে এক মৌলিক সারল্য আছে, যা মানুষকে স্থান দেয়। ভাষা-ধর্ম-দেশ-কালের বেড়া ভেঙে মানুষকে অন্দরমহলে ডাকে। নিতান্ত মূর্খকে সাহিত্য ফিরিয়ে দিলেও সঙ্গীত ফেরায় না। দ্বিতীয় সুবিধে হল, গাইতে তো বলছে না। সুরের জগতের অসুর হলেও ধরা পড়ে যাবার ভয় নেই। অতএব লিখি, যা মনে আসে মেঠো সুরের মতো হাওয়ায় ভেসে।
গান শোনা শুরু জন্মের ক’মাস আগে। আমি তখন থাকতাম মায়ের শরীরে, অন্ধকারে। মা ছিলেন বড়মামার বাড়িতে। আমার মামাতো দিদির গানের পরীক্ষা সামনে। তাকে গান শেখাতে গিয়ে আর স্কুল থেকে মাস তিনেকের ছুটি পেয়ে মা পরমানন্দে গানে ডুব দিয়েছিলেন গর্ভকালের শেষদিকে। অভিমন্যু যেমনভাবে চিনেছিল চক্রব্যূহ, তেমনি করে আমি চিনেছিলাম সঙ্গীত। ঢুকতে শিখেছি, বেরোতে শিখিনি। গানের গহীনে আমার নিয়তি, আমাদের মৃত্যু... আমরা যারা গানকে জানি না, ভালবাসি শুধু। সঙ্গীতের চোখে আমরা ময়াল মায়া দেখেছি। সে আমাদের টেনে নিয়েছে চক্রের কোটরে, ঘিরে ধরেছে সপ্তসুরে, সপ্তস্বরে, সপ্ততন্ত্রিকায়, সপ্তমায়ায়। সেই মায়াজাল ছিঁড়ে আর বেরোনো নেই।
ষড়রিপু জয় করার পর মুক্তির পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকে সপ্তম রিপু... সঙ্গীত।
“ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে শিয়রে” জনপ্রিয় করেছিলেন উৎপলা সেন। তাঁর গলায় গানটা শোনাই হয়নি বড় হয়ে যাবার আগে। আদৌ না শুনলেও ক্ষতি ছিল না। এই গান তো আমার কানের কাছে গুনগুন করত অন্য এক কন্ঠ। মা গলায় বেজে উঠত, “পারুলের চোখে তাও নেই ঘুম, নেই ঘুম”, আর আমার চোখ ছুঁয়ে দিত রূপোর কাঠি। তারপর সারারাত ধরে চলত “আকাশের কাননে তারাফুল ঝরানোর মরসুম”, পাহারায় জেগে থাকত সাত ভাই চম্পা।
আমার বাবা ছিলেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের একনিষ্ঠ সমর্থক। অবৈজ্ঞানিক কল্পনা আর কুসংস্কার থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি আমাকে ঠাকুমার ঝুলি পড়তে দেননি। তবু শেষরক্ষা হয়নি। গান ছিল আমার রূপকথার জানালা। “যা রে যা উড়ে রাজার কুমার পক্ষীরাজে...” ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর ডানায় গান, তেপান্তরের মাঠে অচিন হাওয়ায় বাঁশি বাজায় ভূপালি... গান আমাকে নষ্ট করেছে ভাষার অতীত কল্পনায়।
গান তো আমার পিসিমার সেই বুড়ো ট্রান্সিস্টর। পিসেমশাই অসময়ে পৃথিবীর মায়া কাটানোর পর পিসি বেশিরভাগ সময় আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। আমাদের দুই কামরার ঘরটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই দুই কামরার, এবং অনূর্ধ্ব সাড়ে তিনশ’ স্কোয়ার ফিট। বাইরের নয় বাই নয় ফুট ঘরটা ছিল একই সাথে বসার, শোবার, খাবার এবং পড়ার ঘর। সদর দরজার ঠিক বাঁপাশেই একটা আধভাঙা কাঠের চেয়ার, দেওয়ালে ঠেস না দিয়ে যে দাঁড়াতেই পারত না। তার বাঁহাতে জানলা, সামনে টেবিল। সেই জানলার ওপর দুপুরবেলা এসে বসত সেই ব্যাটারিচালিত বেতার যন্ত্র। স্কুল থেকে ফিরে তখন আমার খাবার সময়। মা নিজের ইস্কুলে ছেলে পড়াচ্ছে। সেই রেডিও আমাকে গান শোনাত। অনুরোধের আসর, হারানো দিনের গান। “সেই শান্ত ছায়ায় ঘেরা কৃষ্ণকলির দিনগুলি যদি থাকত!” বিলাপ ঝরে পড়ত চন্দ্রানী মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে আর জানালার ওপাশে মেঘুকাকুর দোকান পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটে ইউক্যালিপটাস গাছের কোনো একটা থেকে অলস বেলায় ডেকে উঠত একটি অনুপস্থিত ডাহুক। গান ছিল আমার গল্প বলা মাসি-পিসি।
গান মানে বালক বয়সে রাত জেগে শোনা পরভিন সুলতানা, ভীমসেন জোশী। সন্ধ্যা মুখোপধ্যায়,রাধাকান্ত নন্দী যুগলবন্দী। অথবা লতা মঙ্গেশকর নাইটের টিকিট কিনতে না পেরে বাবার হতাশা। বাবা গান বুঝতেন না, কিন্তু এটা জানতেন যে লতা ছিলেন আমার মায়ের বাল্য-কৈশোরের দেবী। এমনই ছিল সেই ভালবাসা যে গীতশ্রী মুকুট সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মাথায় চলে যাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সেদিনের বাচ্চা মেয়েটি। একই সুরে লতা নাকি গেয়েছিলেন “আয়েগা আয়েগা”, আর সন্ধ্যা গেয়েছিলেন “শোনো গো, শোনো গো”। জিতেছিলেন বঙ্গতনয়া, যাঁকে ভালবাসতে মার আরো অনেক বছর লেগেছিল। এসব মায়ের মুখে শোনা কথা। মা কার মুখে শুনেছিল? মার তো নিজের রেডিও ছিল না অত ছোটবেলায়! জিজ্ঞেস করে জানা গেল, কার বাড়ির দাওয়ায় নাকি বসেছিল সেদিন, কেউ খেতে দিয়েছিল আধখানা রসগোল্লা। সেটা ততখানি মিষ্টি লাগেনি; বান্ধবী ফুরফুরি জানিয়েছিল দুঃসংবাদটা।
গানের কাছাকাছি পৌঁছানোর সৌভাগ্য হয়েছিল মায়ের। কান ছিল, গলা ছিল। কন্ঠ আর স্ববশে নেই, কিন্তু কান এখনো আছে। স্বর নয়, শ্রুতির বিচ্যুতিও সেই কানকে পীড়া দেয়। আধপেটা খেয়ে বড় হওয়া মেয়েটির গান শেখার ইতিহাস বড় বিচিত্র। প্রতিবেশী এবং বয়সে বড় এক তরুণী, যাকে সে মাসি বলত, তাকেই গান শেখাত ইস্কুলবেলায়। বিনিময়ে তার হারমোনিয়ামটা বাজাতে পারত। এই খুদে মাস্টারনিকে কে শিখিয়েছিল গান? তখন পর্যন্ত কেউ না। তবে আমার দাদু আর তাঁর কোনো কোনো বন্ধু বৈঠকি মেজাজে গান গাইতেন। মেয়েটি শুনত। “কাজটা কঠিন ছিল না, বুঝলি?” মা একদিন বলেছিল, “রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে চাইল। তা ‘আলো আমার আলো ওগো’ শেখালাম প্রথমে। শিখল। তারপর ‘নবকুন্দধবলদলসুশীতলা ’ শেখাতেই ‘আলো আমার আলো ওগো’ ভুলে গেল। আবার ‘আলো আমার আলো’ শেখালাম, ‘নবকুন্দধবলদল’ ভুলে গেল। দুটো গান সম্বল করে বেশ কয়েক মাস চলেছিল।“
সেই মাস্টারনি ক্রমশ অনুষ্ঠান করতে শুরু করল এদিক-সেদিক। তখনো স্কুল পেরোয়নি, এমন সময় একদিন স্থানীয় খবরের কাগজে এক অনুষ্ঠানের খবর বেরোলো। লেখা ছিল, “সঙ্গীত পরিবেশন করলেন সর্বশ্রী ছায়া দত্ত...”। কমা দিয়ে দিয়ে বেশ কয়েকজন শিল্পীর নাম। “সর্বশ্রী” উপাধি পেয়েছে মনে করে খুশিতে নেচে ওঠে বালিকা-হৃদয়। সেই আনন্দের খবর বড়দের জানাতে গিয়ে উপাধিটা তো গেল, কিন্তু বাঙলা শেখার সূচনা হল। সেই মেয়ে পরে এমএ-বিটি পাশ করে বিধিমতে বাঙলার দিদিমণি হয়েছিল। সেও তো গানেরই দৌলতে।
গান গেয়ে কিছুদিন পেট চালিয়েছে মেয়েটা। গান ভালবেসেই গেয়েছে, যদিও খিদের সঙ্গে মঞ্চে ওঠার গভীর সম্পর্ক ছিল। তখনো মেটাতে পারেনি প্রথাগতভাবে গান শেখার ইচ্ছা। কোলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বড়মামার সৌজন্যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে নিবিড় পরিচয়। মামা ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সের এক জোড়া টিকিট পেতেন কোনো সূত্রে। যেদিন আধুনিক গান হত, সেদিন মামীকে নিয়ে যেতেন। বাকি দু’দিন ক্লাসিকাল। স্ত্রীকে বঞ্চিত করে বোনকে নিয়ে যেতেন সঙ্গে। শিল্পীর নাম, রাগ, ইত্যাদি ঘোষণা হলে মামা সংক্ষেপে মাকে বুঝিয়ে দিতেন রাগটির পরিচয়। গুনগুনিয়ে দু’লাইন শুনিয়ে দিতেন চলন, পকড়। তারপর গান শুরু হলে সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ভদ্রলোক খানিক মাথা নেড়ে “আহা, আহা” বলতে বলতে ঘুমের আশ্রয়ে চলে যেতেন। আর তাঁর বোন বুভুক্ষু ছাত্রীর মতো সুর গিলত। ডোভার লেন কনফারেন্স কোলকাতার সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালীর গর্ব। অনেক বিদগ্ধ মানুষ এই অনুষ্ঠানে জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত-মুহূর্ত যাপন করেছেন। হলে ঢোকার টিকিট না পেয়ে শীতের শিশির মাথায় করে সারারাত বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতেন যাঁরা, মা বলেন, মামা বলেন, তাঁরাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ শ্রোতা। আদালতের শব্দদূষণ-নিরোধী রায়ের অনেক ভালো দিকের পাশাপাশি একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল এই শ্রোতাদের অবলুপ্তি। হয়ত এঁদের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আরো কোনো মেয়ে বা পুরুষ, অনুষ্ঠানটি যাঁদের কাছে শুধু জলসা নয়, ইস্কুল। হয়ে ওঠার পাঠশালা। কলি যুগের কোলকাতায় এইসব একলব্যের আঙুল বা স্বরযন্ত্র কেটে নেননি কোনো সঙ্গীতগুরু।
আড়ংঘাটার মেয়েদের স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার পর, এতদিনে, গানের আসরে সেই মেয়ে ছাত্রী হতে পারল। যাতায়াতের পথে একদিন রাণাঘাট নেমে ভর্তি হল নগেন্দ্র সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে। দশ টাকা মাইনে দিতে হত মাসের শুরুতে। না, শিক্ষয়িত্রী হিসেবে স্কুল থেকে পাওয়া বেতন থেকে সেই দশ টাকা দেবার উপায় ছিল না। গানের টিউশনি করেই তা জোগাড় করতে হত। মাছের তেলে মাছ ভাজা। গানের চর্চা হত যাতায়াতের পথে চলন্ত ট্রেনে কর গুনে গুনে। এইসব করে তার জুটে গেল সোনার মেডেল এক। পরবর্তী কালেও দেখেছি, হাজার হল্লা করে, তবলায় বেতালা চাঁটি মেরে, কোনোভাবেই মার সুর-তাল-লয় ভঙ্গ করা যেত না। অনুষঙ্গনিরপেক্ষভাবে সঙ্গীতকে যে ধারণ করতে পেরেছে অন্তরে, সঙ্গীত তার নিত্যসাথী। “গান শিখতে হয় কান দিয়ে, চোখ দিয়ে নয়”, মার কথা বেদবাক্য। স্বরলিপি চেনাই হল না আমার। মধুক্ষরা জীবন রইল শুধু শ্রবণে।
গানের কথা বলতে গিয়ে মায়ের কথাই বলছি শুধু। অন্য উপায় কী? গানের তো সেটুকুই পেয়েছি, যেটুকু ছিল মায়ের আঁচলে বাঁধা। গান মানে তো সেই ভোরবেলা চিলেকোঠা থেকে কোমল ঋষভ ভেসে আসা। আমাদের সাড়ে তিনশ’ স্কোয়ারফুটের ঊষাকালে মায়ের গানের জায়গা হয়নি। ছাদের দরজা ঘেঁষে রাখা ছিল কয়লার বস্তা আর ঘুঁটের বাক্স। তার পাশে, তাদের ফাঁকে বসে মা রেওয়াজ করত। তানপুরা বাজত “পা – র্সা – র্সা – সা”, মায়ের গলা নেমে যেত ক্রমশ খাদের দিকে, আবার সেই পথ বেয়ে উঠে আসত... সা – নি – দা – পা – দা – নি – সা... মন্দ্র সপ্তক, কোমল ধৈবত, সন্ধিপ্রকাশ, ভোর... ভৈরব। ঘুম থেকে অল্প অল্প জেগে আমি শুনতে পেতাম সূর্য ওঠার শব্দ। সময়কে আসলে কান দিয়ে ছুঁতে হয়, চোখ দিয়ে নয়।
মায়ের আঁচল না ধরেও গান শুনেছি। এই শোনাকে বলে বড় হয়ে যাওয়া। পাশ্চাত্য সঙ্গীতে মার কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না, আগ্রহও না। শুনিনি তাই ছোটবেলায় কোনো ইংরিজি গান, প্রাইমারি স্কুলে শেখা দু-একটা বালখিল্য গীত ছাড়া। হস্টেলে আমার এক রুমমেট ছিল এরিক ক্ল্যাপটনের অন্ধ ভক্ত। তার ডায়েরি থেকে জামা, সর্বত্র লেখা ছিল “ক্ল্যাপটন ইজ গড”। তার কাছেই প্রথম শুনেছিলাম তার দেবতার গান। সুবিধের লাগেনি, আসলে ততদিনে তৈরি হয়ে যাওয়া অন্যতর রুচির সঙ্গে মেলেনি বলে। তবে সেই সূত্রে পশ্চিমের জানালাটা খুলে গেল। বিথোফেন থেকে মেটালিকা, একে একে একতারা বাজিয়ে হেঁটে গেল অনেক বাউল। আর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের গেরুয়া বাউল শুনিয়ে দিল, “আমায় মাস্টারমশাই মারবেন বলে বাবা আমায় ইস্কুলেতে পাঠায় নাই; আমার বাবার মতো ভাল মানুষ জগতে আর নাই।“
গান মানে তো কয়েকটি মুহূর্ত আসলে, যা সহসা ফিরে এসে কাঁপিয়ে দিতে পারে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা বুক। কী আশ্চর্য, আমার নিজস্ব সেই অসম্ভব মুহূর্তেরা অধিকাংশ রাত্রিকালীন! আর প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে ঘাতক যন্ত্রটি ছিল রেডিও। হাই ওয়ের ধারে টিমটিমে ধাবায় ভটকে হুয়ে একাকী যুবক পেঁয়াজ আর আলুর তরকারি দিয়ে রুটি খেতে খেতে শুনতে পেল পাশের খাটিয়ায় শুয়ে থাকা লোকটির বুকে জড়ানো রেডিও গাইছে, “জিন্দেগী, কৈসী হৈ পহেলি হায় ইয়ে!” স্বপ্ন ছাড়িয়ে স্বপ্নচারীর চলে যাওয়া এমনভাবে বুঝিয়ে দিল সেই মধ্যরাত, যা পারেনি “তাজমহল”, “সোনার তরী”-র রবীন্দ্রপাঠ। সেই রাত, সেই সুর-কথা, এতগুলো বছর পেরিয়ে এখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার অস্তিত্বের উপর দুর্নিবার।
তারও অনেকদিন আগে কলেজের ক্যান্টিনের কর্মচারী অশোক আমগাছের তলায় পাঁচিলের ওপর বসে রেডিও শুনছিল, “পাস নহী তো দূর হি হোতা, লেকিন কোই মেরা আপনা!” দুনিয়ায় আপন কি কেউ ছিল কারো?
অথবা কয়েক বছর পর এক নতুন হাসপাতালে প্রথম রাতের ডিউটিতে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে দশজন অজ্ঞান বা তন্দ্রাচ্ছন্ন রোগী আর পাঁচজন অচেনা নার্স, ভেন্টিলেটরের মৃদু ফোঁসফোঁস আর মনিটরের অপার্থিব অ্যালার্ম, এইসব শব্দে আরো ঘনিয়ে ওঠা নিস্তব্ধতার আবহে হঠাৎ, নিয়মের তোয়াক্কা না করে, যেন বকা খেতে চায় বলেই, মৃদুস্বরে এফএম স্টিরিও বাজিয়ে ফেলেছিল ওয়ার্ড বয়, “ইয়ে ভি কোই জিনা হৈ? ইয়ে ভি কোই মরনা?”
রাত মানে তো কান্নাপ্রহর, আর কান্না মানে তো দরবারী কানাড়া। সমাজ তো পুরুষকে কাঁদার অধিকার দেয় না, গানটুকু কেড়ে নেয় না ভাগ্যিস। তাই সে মধ্যরাতে গুমরে গুমরে গায় “কেন মেঘের ছায়া আজি চাঁদের চোখে?” বৈজু বাওরার মতো আঙুল তোলে ভগবানের দিকে, “টুট গয়ী মেরী প্যার কী নগরী, অব তো নীর বহা লে!” অথবা বাজায় তার লুকনো সরোদ, যার কথা জানতেন একমাত্র পূর্ণেন্দু পত্রী... “সরোদ বাজাতে জানলে বড় ভাল হত! পুরুষ কীভাবে কাঁদে, একমাত্র সেই জানে।“
সূর্য ডোবার রঙ তো পূর্বী, মাড়োয়া। সন্ধের বাতাস তো ইমন। দয়িতের জন্য প্রতীক্ষার আকুলতাই তো বেহাগের মীড়। ভিন্নতর মধ্যরাত তো মালকোষ... তান্ত্রিক মাতৃকা আরাধনার গহন রাত। মালকোষের আছে নিজস্ব মা। সে বিশেষ, সে ব্যক্তিগত, ঠিক যেমন আমাদের আছে নিজের নিজের মা, যে অন্য কারো নয়। “মালকোষের মা ঠিকমতো লাগাতে শেখা এক বিরাট ব্যাপার। কতরকমে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যে সে আসে! কিন্তু যখনই আসে, তখনই চিনিয়ে দেয়, হ্যাঁ, এ মালকোষ।“ সপ্তস্বর জানলেই গা-এর পর অবধারিত সারল্যে সে আসে না। তাকে ছুঁতে গেলে, তার সন্তানকে চিনতে হয়। তাকে চিনতে পারলেই তার সন্তানকে ছোঁয়া যায়।
সঙ্গীত তো মা আসলে। মালকোষের... আমার। সঙ্গীত তো গর্ভ। সেখানে জন্ম। সেখানেই বিলয়।