সুর, শৃঙ্খলাবোধের পাশে আমাদের দৃষ্টিজ্ঞান

সারাজাত সৌম



সকলেই সুর শুনে অভ্যস্থ, তবে কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা সুর দেখে আনন্দ পায় বা জ্ঞান লাভ করেন—এ জীবন তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ণ। যদি এভাবে দিনের আলোয় আমরা ঢুকে পড়ি তাহলে দেখবো চারপাশে কতো কিছুই না চোখের সামনে ভাসছে, কঠিন—তরল—বায়বীয়—নানা রঙ, আবার আকার—নিরাকার—গোল—চ্য াপ্টা—সরল এবং বাঁকা। বস্তু আর মানুষের এই পালাক্রম, যাবতীয় এইসব ঘটনাবলী! আসলে সে সুরই আমাদের টেনে নিচ্ছে তাদের সকলের কাছে। ঠিক রাতের বেলায়ও একই রকম! আমরা আরো বহুকিছুর ভেতর ঢুকে পড়ি হুটহুাট। তবে এখানে সুর কোথায়? এই যে প্রশ্ন আসলো মনে, তারও তো একটা বোধ আছে। সেখানে নিজের শরীর নিয়ে যদি ডুব দিয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো—পা থেকে মাথাঅব্দি কোনো কিছুই অযথা হয়নি। এমনকি তার যে ব্যবহার সমানতরাল বা আঁকাবাঁকা সেও এই সুর প্রধান হিসেবেই কাজ করে। যেমন—দেহের সকল কিছুই সকলের পরিপূরক। একে অন্যের ধারা প্রভাবক। তারা একটি অমোঘ ছন্দেই কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত! জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই যে ক্রিয়া—কৌশল, এটাই হলো দেখে যাওয়ার গান বা সুরও বলা যায়, আপত মনুষ্যদৃষ্টিতে। আর স্রষ্টাই হলো এই সুর (কুন—ফায়াকুন)—জগতের সব কিছুতেই মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার গান। কিন্তু কিভাবে আমরা দেখবো সে জ্ঞান বা গান? যখন একটি পেইন্টিং (ছবি) সাধারণ কারো চোখের সামনে আনা যায়, হয়তো সে এর কিছুই জানে না। এমনকি যিনি এঁকেছেন তাকেও দেখেননি সে কোনোদিন, কিন্তু ছবিটার প্রতি তার এক ধরণের মায়া বা ভালোলাগা জন্মে যায়। মানে সে এখানে, এই ছবির সকল বিষয়—বস্তুর প্রতি প্রেমে পড়েছেন। এমনকি সে তার মনের ভেতর একটা সুর তৈরি করে নিয়েছেন বা ছন্দ তৈরি করে নিয়েছেন তার দেখার দৃষ্টিতে, তার মতো করে। কিন্তু সত্য যেটা, তা হলো ছবিটি যিনি এঁকেছেন এবং তার ছবির সকল বিষয় বস্তুর ভেতরই তিনি একটা থেকে অন্যটার মাঝে সুর বা ছন্দ এমনকি অংক দিয়ে সাজিয়েছেন—নিখুঁত সেই ছবি। এমনকি বাসে চড়ে যে মেয়েটি দূরে কোথাও যাচ্ছেন। তার চুল বাতসে উড়ছে—চারদিকে নানা ধরণের শব্দ—অতঙ্ক এর ভেতরও দেখা যায় যে সুরেরই ইন্দন ছড়িয়ে আছে নানাভাবে! তাকে দেখে যে কোনো পথচারী তার ভালোলাগা অনুভব করতে পারেন আবার অজান্তে প্রেমেও পড়তে পারেন। এমনকি এই প্রেম—ভালোলাগা অন্য কিছুর উপরও পড়তে পারে অন্যভাবে—নানাভাবে। এটা নিছক খেয়াল মনে হতে পারে কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে, এখানে প্রেম তার সুর ছড়িয়ে দিয়েছেন জাগতিক মানব ও মানবীর ভেতর দিয়ে সমগ্র সৃষ্টির ভেতর! ঠিক যখন একটি গাছের উপর পাখিগুলো গান গাইতে থাকে (সবটাই তার গান নয়, কথাও বলে চলে তারা) তখন গাছের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় যেমন ঠিক তেমনি উভয়ের দিক থেকে দেখার সে সৌন্দর্য তা একটা সুরের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পরে আমাদের চারপাশে।

আমরা তখন গান বাঁধতেও পারি এমন—


উড়ালিয়া প্রেমের পঙ্খী
আমারে বাতাসে ভাসাও।
যতো দূরে তুমি
তোমার নৌকা বাও
বসন্ত বসনে মক্ষী
কার গান গাও।
উড়ালিয়া প্রেমের পঙ্খী
আমারে বাতাসে ভাসাও...

যেন কোথাও নিয়ে যাবে আমাদের এই গান বা এই সুর। আমরা জানি না ঠিক কিভাবে আমরা পৌঁছে যাবো সেই সুরের কাছে, গানের কাছে। তাই আমাদের দেখাট খুবই জরুরী। আসলে আমরা কি দেখছি? কি শুনছি? আর কি বলছি? যখন আমরা নিজেরাই এই সুরধারার সৃষ্ট এক মায়া প্রাণ। এমন না যে, আমরা অযথাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। দেখা যায় কখনো কখনো একটা ঝগড়ার মাঝেও কিছু লোক দাঁড়িয়ে থাকে—কি একটা ভাবনা নিয়ে! অথচ তার পাশেই যে লোকটি ঝগড়া করছে বা নানা ধরণের কূটউক্তি ব্যবহার করছে তারও তো একটা মাধ্যম আছে, আছে সেই সব শব্দগুলিকে ব্যবহার করবার ক্ষমতা, আছে সেই ভাষাগুলো ছড়িয়ে দেবার প্রয়াস! আসলে এগুলোও সুর ধারা প্রভাবিত—এক ছবি। হয়তো কেউ কেউ এটাকে ধারণ করে ছবি আঁকে। কবিতা লিখে। গান বানায় বা সিনেমা। সেও এই একেই ছন্দে বিভোর থাকে বা সৃষ্টির কথা মাথায় রেখে চলে দিনের পর দিন। তার মানে হলো যে, আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে—ছড়ানো ছিটানো সব কিছুতেই এই সুর বা ছন্দ দিয়ে ঘেরা। আমরা পৃথিবীর সকল মানুষই তার সুরেই চলি, কথা বলি, গান গাই আরো যা যা আছে আমাদের প্রকাশ্যে বা গোপনে।