চন্দ্রাহত বালিকার দীর্ঘশ্বাস

সূর্য্যমুখী



“পাড় নাই কিনার নাই রে
ও আমার চক্ষু নাই”

পৃথিবীর দীর্ঘতম সাতরাত পার হলে ঘূর্ণির মতন যে ছায়া জেগে উঠে আকণ্ঠ ঠোঁটের ডগায়, সেই শীতকালীন প্রেমিকার দিব্যি- ভালোবাসা জেনো, প্রিয়তম। তোমাদের ধুসর উপেক্ষার চাদর বিছিয়ে উপচে পরা রোদের পসরা জানে নগরের শেষ বকুলের নীল নীল রুপকথা; যাকে লালন করেছে পরিযায়ী ডানা, কৈবর্তজীবন আর খলসের আলো; খানিকটা বিদঘুটে নদী অথবা একটি লুকানো ডালিম গাছের বিহ্বল তৈলচিত্র।
নিশ্চল ক্যনভাসের সামনে দাঁড়ালে জেনে যাই শেমিজের তীর ঘেঁষে কেনো ছুটে চলে তীব্র অন্ধকার আর নখের কিনার। অনুচ্চারিত বানান থেকে এভাবেই খসে পড়ে হসন্তের দল, জেঁকে বসে মৃত্যুর অবিচল মায়া। সময়ের বদলে ধেয়ে আসে নিশ্ছিদ্র চোখ। চোখের কিনারজুড়ে বালিকার দীর্ঘশ্বাস আর কুবের মাঝির নিত্য যাতায়াত। মাঝি চোখজুরে পাড়ি দেয় পৃথিবীর ওলান।
সর্পগন্ধা রমণী জানে ভাদ্রমাসের পূর্ণিমায় কেন জলে টান পড়ে, অযথা কেন প্রলাপ শিখে সিঁথির সিঁদুর? সফেদ কাফনের ভিড়ে কখন খেলা করে একটাই ময়ূর? ছায়াহীন শেমিজের ‘পর লিখা হয় দ্বিচারি সারসের গল্প; “চাঁদ নহি অভিশাপ বলে” ফিরে চলে অশোকের আত্মজা।
অবারিত ছায়ার কথা ভাবলেই মনে পড়ে বাবার কথা। আমি নিশ্চয়ই মারা যাবো বাবার মতন। মৃত্যুর বাহান্ন দিন পুর্বে পশ্চিমের শিরীষ গাছজুড়ে পাড়ি দিবো নৈশব্দের জারুল। ভালোবাসার নামে গিলে খাব ঘড়া ঘড়া কেউটের বিষ তবু বিষণ্ণ আত্মকথনের দ্বিতীয় অধ্যায়জুড়ে পড়ে থাকে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।
তোমাদের ম্রিয়মাণ পানশালায় সুলভে বিক্রি হয় স্মৃতিচারণ, রুহের মাগফেরাত আর ওমের ভ্রান্তিবিলাস যেভাবে শেষ হয় একটি প্রচ্ছদের মৃত্যু; ঝড়ের বদলে ধেয়ে আসা নিঃসঙ্গ অবয়ব- বিনিদ্র ক্ষরণে জেগে থাকা বালিহাঁস, নগরীর সজল উপাখ্যান...মৃতপ্রায় শব্দ, ভুলে যাওয়া শৈবাল অথবা হাঙরের হাহাকার! শুরু হয় নৈশভোজ- শুরু হয় সমুদ্রগামী বালিকার নিঃসঙ্গ ভ্রমণ। বনমালী, তুমি ফিরে এসো সুখি বাজার অর্থনীতির ঘ্রাণে, পরজন্মের শহুরে ট্রাম আর রেলের ভীরে। অন্ধকারের এগারোটি নামে; ফিরে এসো শালিকের জানালায়- নীল মুখ, চোখের গোপন গহ্বরে।
অমসৃণ শীতরাত তবু জেগে থাকে যূথচারী মৃত্যুর হাত ধরে; জেগে থাকে জলজ খোয়াবনামা। পলিদ্বীপ হাতড়ে খুঁজে ফেরে জোছনার বৈধব্য; বাসর বিছিয়ে কে আছে আর মৃত্যুর মতন ওঁত পেতে? অন্ধ অরণ্য? নৈশকালীন চন্দ্রাভিযান? প্রতিটি প্রচ্ছদের মৃত্যুর পর দেখা মেলে নিঃসঙ্গ অবয়ব- ওয়াইনে মুখ গুঁজে খুঁজে ফেরে প্রিয়তম নিঃশ্বাস; শুরু হয় তুমুল বর্ষণ। ধেয়ে আসে উত্তুরে কদম গাছটা; কদ্মতলায় বংশীবাদক। শালিকের অপরনাম। শালিকেরও জীবন আছে। জীবন চলে যায় দীঘির কাছে, দীঘি যায় চালতার বনে, বন যায় নীলকমলের বিলে। একে একে সন্ধ্যা নামে- অশ্বথের পাতাজুড়ে। শালিকের দল ভেজে, ভেজে নারী; একান্ত বর্ষা শেষে- খসে পড়ে অগণন আত্মাহুতি!

আমি দৃশ্য বুনে যাই। স্থির দৃশ্যের নামে হেঁটে বেড়াই আসমুদ্রহিমাচল। পরিচিত বামহাতজুড়ে খুঁজে ফিরি মৃত্যুর ঘ্রাণ, অযাচিত অবয়ব অথবা পরিচিত মুখোশ। উড়ে যায় নীল মুখ, পরিযায়ী ডানা অথচ একটা স্থির দৃশ্যের কথা ভাবছি যেখানে মৃত্যু আছে, আছে অন্ধ অরন্য। শাদা ইঁদুরের নখে লেগে আছে দানিউবের তীর ঘেঁসে ভুলে যাওয়া বালিকাগন্ধ। যেভাবে ভুলে যায় দয়িতা বৃক্ষের কথা!“লেট মি ডাই ইন ইউর আর্মস, লেট মি লে ডাউন বিসাইড ইউ...” বলতে বলতে সন্ধ্যা নামে। উরুজুরে। শুরু হয় আকণ্ঠ বিষপান। উটের গ্রীবায় লেগে থাকে বনিতা রাত, ভাসমান রমণীর বুকের মতন উদোম ভালোবাসা। ভুলে যাওয়া মেষপালকের নিমগ্ন আত্মকথন শেষে ফিরে যায় নগরের শেষ চুল্লি- অপেক্ষারত সফেদ বকুল।