গানের কঙ্কাল কাঁদে

স্বরলিপি



নিজের কাছে জমিয়ে রাখা পুরোনো কাটিংপেপারগুলো একটা একটা করে দেখছি আর ভাবছি বাড়ির পাশের রেললাইনটার কথা। রেললাইনটা স্কুলের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ বেঁকে গেছে। স্টেশনের কাছে একটা শিমুল গাছ ছিল। স্মৃতির এইটুকু যখন মনে পড়ে একটা গান গেয়ে উঠি। গানের সুরে সুরে শিমুল গাছটা ছুঁই-আর ছুঁয়ে দেই নিজেকেও। যদিও নিজেকে ছোঁয়া কঠিন।
গানের কথাগুলো-শিমুল যদি হইতাম আমি ফাগুনেরও কালে/শোভা পাইতো রূপ আমার শিমুলেরও ডালে/বন্ধুরে কেনো রে.../নারী হইতে গেলাম?
আসলে নিজেকে ছোঁয়ার বদলে নি:স্ব করে দেই।
আজ শিমুলগাছটা হয়তো ধানক্ষেতের দিকে ডালপালা নুইয়ে দিয়েছে। তার ফুলগুলো হয়তো নক্ষত্রমুখি। হয়তো একটা সাপ নেমে যাচ্ছে ঝোপের দিকে। আর ঝোপের উপরে স্বর্ণলতা কাঁপছে। সময়ের ছোট-বড় ঢেউ। তার উপর বর্তমান-অতীতের শেওলা জমেছে। হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে ঠাণ্ডা পানির ছোঁয়া নেই। বৃষ্টি বন্দনা করি। আজকের রাতটা ঠিক সেই রকমম যেমন রাত কাগজের নৌকা বানানোর আবেদন নিয়ে আসতো।
নৌকা বানানোর সময় গেলো, বয়সের সাথে সাথে নিজেকে হারিয়ে ভিন্ন ভিন্ন করে পেতে থাকলাম। আর রাতগুলোও ভিন্ন ভিন্ন আবেদন ফেরি করতে আসতে লাগলো। অনেক গান, অনেক রকম সুর রাতের ঝাঁপি থেকে তুলে নিতাম। সেগুলোর ভেতর থেকে নিজের পছন্দ মতো একটা গান খুঁজে পেতে চাইতাম।
একটা গানের কথা মনে পরছে, রঙচটা জিন্সের প্যান্ট পরা/জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা/লাল শার্ট গায়ে তার বুক খোলা/সানগ্লাস কপালে আছে তোলা/কেনো ঢেকে রাখো না ওই দুটি চোখ/ হে যুবক....
এই গানটিকে আমার কবুতর মনে হত। মনে হতো শুধু আমি নই অসংখ্য তরুণী ঘুড়ি উড়িয়ে উড়িয়ে গানটি গাইছে। সস্তা কথার গান বলে নিজেই গানটাকে উড়িয়ে দিতাম, আবার ফিরিয়ে নিতাম।
ওর কথা বলছি। ও মানে চয়ন। যতবার ওর শার্টের দু'একটা বোতাম খোলা দেখেছি যখন দেখেছি ওর বুকের কিছু অংশ দেখা যায়, আমার ভালোলাগত। ওর চুল যখন কপালে এসে পড়ত মনে হয় নিটোল জলে শেওলা ভাসছে। হাত দিলে দ্বিকবিদ্বিক হয়ে যাবে। ওর সিগারেট ধরার ধরণটা এমন! মনে হত এক সারি লাল পিঁপড়ে আর আরেক সারি কালো পিঁপড়ে রেললাইনের মতো দুই ঠোঁটের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
আর তখন গিটারের মতো তার নড়ে ওঠতো কণ্ঠের ভেতর। হাতের আঙ্গুল টাস টাস করত। রক্তের চলাচল মনে হত একটি দ্রুতগতির ট্রেন।
সম্পর্কের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। সবাইকে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু বলা যায়। বলা যায় আবার ভিন্নভাবে। না বলারও অলংকার আছে। সে নড়ে ওঠে মনের কাছাকাছি। যদিও মনকে আমি অনুভূতি নামেই ডাকি। অনুভূতির প্রকাশ করতে কখনো কখনো গেয়ে উঠতে হয়, অথবা কেউ গেয়ে ওঠে তাই শুনতে হয়। ছোঁয়া না যাক, ওতে খানিকটা দুরুত্ব ঘুচে যায়। ভালোবাসাকে সব সময় একরকম করে দেখতে কে বলেছে?
মন চায়, মনে যে ঝড় ওঠে তার মেঘ-রোদ-বাতাস জড়ানো সুরের গান শুনতে। কিন্তু খুঁজতে গেলে, যে সব গান সামনে আসে সেগুলো অধিকাংশই শিঙওয়ালা জিয়ল মাছ। কেবল পুরুষ বন্দনা, কেবল পুরুষের কাছে নিজেকে সপে দেওয়ার গান।
কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম, আমার পোশাকে আগুন লেগে গেছে। আর আমি, ঘন্টা বাজিয়ে গার্লস স্কুলের মেয়েদের বাইরে চলে যেতে বলছি। ঢং-ঢং-ঢং করে বেজে চলেছিল ঘণ্টা, আমি ক্রমে নিথর হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার শরীরে ভেসে উঠছিল থোকা থোকা লাল দাগ। সেগুলো অন্য আকার ধারণ করছিল।
কিছু সময় পর নিজেকে মনে হচ্ছিল একটা শিমুল গাছ। আকাশ-মাটি, মানুষ- পোড়ামাটির মতো দেখাচ্ছিল। এমনকি কচি কলাপতাও। পত পত করে ছিঁড়ে যাচ্ছিল সেই পাতার শরীর। পাতার পোশাক বলতে তার গায়ে লেপ্টে থাকা সবুজ। তাও এফোঁড়-ওফোঁড় হযে গিয়েছিল।
দিনটি ছিলো চয়নের চলে যাবার দিন। চয়ন গত মাসে বিযে করে কানাডা চলে গেলো। ওর ছাত্র সংগঠনটি হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই মরে যাবে। ওই লাইব্রেরিতে বই বেড়েছে অনেক। সেগুলো কারা যেনো এসে দিয়ে গেছে, তার কিছু জানিনা। ওর সাথে কথাও বন্ধ ছিলো, না হলে হয়তো প্রশ্ন করতাম। আমি চয়নের কাছে একজোড়া সবুজ কবুতর চেয়েছিলাম। সেই জন্য ও আমাকে লোভী বলেছে।
এতেই নাকি ও বুঝে ফেলেছে, আমি ঘরমুখী নই। অথচ আমি ওকে কতবার, কতদিন বলেছি- 'তুমি যখন আমার কাছে এসে দাঁড়াও তোমার সাদা শার্টটা সবুজ মনে হয়। আমি বনজ ঘ্রাণ পাই। আমি আরও বলেছি, ছোট ছোট ঘরগুলো-দরজাগুলো এক একটি পৃথিবী-এক একটি প্রবেশ মুখ। আরও বলেছি, তোমার চোখে এতো বড় রাস্তা আছে যে, পৃথিবীর সব ডাক-হরকরা এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে এই সীমানাকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। বলেছিলাম, আমরা পৃথিবীকে সতেজ রাখতে অন্ধকার-আলো-কুয়াশা-বন- ল-সুর চাষাবাদ করবো।'
এই যে হাতের কাছে কাটিংপেপার এতে পরিবেশ দিবসগুলো নিয়ে পত্রিকায় বিস্তর সংবাদ। এক এক বছরের সংবাদ এক এক সমস্যাকে বড় করে দেখিয়েছে। এগুলোতেই একটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। রাত বাড়ছে।
এখন রাত আসে। আমার আর কাগজের নৌকা বানাতে ইচ্ছা করে না। শিমুল গাছ হবার ইচ্ছাও মরে গেছে। একপেশে গানের ভারে খানিকটা বেঁকে গেছে মনের ঘর-দোর এবং জানালা।
আমার স্কুলের মেয়েদের বলেছিলাম, মেয়েরা যদি পারো তোমরা সমান্তরাল গান লেখো-গাও।
আর একটু পর রাত বারোটা বাজবে। দরোজার ওপর থেকে একটা ছায়া নেমে যাচ্ছে তো আর একটা ছায়া পরছে। ওই বুঝি কেউ এলো দরজায় শব্দ হচ্ছে ঠক-ঠক ঠক।