আমার এ গান তোমার গানের থেকে...

কৌশিক চক্রবর্তী



“সংগীতচিন্তা” বইয়ে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখছেন “আমাদের দেশে সংগীত এমনি শাস্ত্রগত, ব্যাকরণগত, অনুষ্ঠানগত হইয়া পড়িয়াছে, স্বাভাবিকতা থেকে এত দূরে চলিয়া গিয়াছে যে, অনুভাবের সহিত সংগীতের বিচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে, কেবল কতকগুলা সুরসৃষ্টির কর্দম এবং রাগরাগিণীর ছাঁদ ও কাঠামো অবশিষ্ট রহিয়াছে। সংগীত একটি মৃত্তিকাময়ী প্রতিমা হইয়া পড়িয়াছে।.... ক্লাসিক্যাল আমাদের কাছে দাবী করে নিখুঁত পুনরাবৃত্তি। তানসেন কী গেয়েছেন, জানি না, কিন্তু আজ তাঁর গানে আর-কেউ যদি পুলকিত হন, তবে বলব তিনি এখন জন্মেছেন কেন? আমরা তো তানসেনের সময়ের লোক নই, আমরা কি জড়পদার্থ? আমাদের কি কিছুমাত্র নূতনত্ব থাকবে না?” এই কথাটা পড়বার পরেই আমার অবধারিত ভাবে রবীন্দ্রনাথের এই পংক্তির কথা মনে পড়ে ... “আমার এ ঘর বহু যতন করে/ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।” আসলে গান, বা আরেকটু বৃহত্ত্তর প্রেক্ষিতে বললে সংগীত, বা শিল্পসাহিত্যও বটে, ততদিনই বেঁচে থাকে, যতদিন সে নিজেকে ঘষে মেজে নতুন করে নিতে পারছে। প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে পালটে নিতে পারছে। গোলমাল তখনই বাধে, যখন, এই ঘষামাজার কর্তবে নতুন সৃষ্টির ‘আনন্দের’ চাইতে, সে সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ব্যাকরণ লঙ্ঘন হল কী না, সেই তর্কে প্রাজ্ঞ পিতামহ শ্বেত শ্মশ্রু দোলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইতিহাস সাক্ষী, যতবার শিল্পীর প্রতিভার খামতি দেখা দেয়, ততবারই ধ্বংসের ভয়ে ব্যাকরণ টিকিয়ে রাখার ব্রতে মগ্ন হয়ে পড়েন তাত্ত্বিক পণ্ডিত।
গান-ই তো আমার জানলা। আমায় আকাশ দেখায়। বৃষ্টিভেজা শহরের কালোকুলো দিনগুলোয় ছাতা ধরে। কান্নার রাত্রিবেলায় পথে আলো ধরে। তাই গানের তোড়ে সব যে এলোমেলো হয়ে যায় কতবার। আমার ঠিক মনে পড়ে না, কোথাও যেন সংগীত বিষয়ে মহাকবি হাইনরিশ হাইনের এক অমোঘ উক্তি পড়েছিলাম। “Nothing is more futile than theorizing about music. No doubt there are laws, mathematically strict laws. But these laws are not music; they are only its conditions... The essence of music is revelation.” এই অনুভবটিই গানের মূল। এই অনুভবের পরের ধাপ আনন্দ। রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে শচীশ তাই বলে “গান যে করে, সে আনন্দের দিক হইতে রাগরাগিণীর দিকে যায়; গান যে শোনে, সে রাগিনীর দিক হইতে আনন্দের দিকে যায়।”
এই আনন্দ কখনও বাঁধ ভাঙা কান্না নিয়ে আসতে পারে, কখনও তীব্র উথালপাথাল। মেঘ ও রৌদ্র ছবিতে মান্না দে মশাইয়ের গলায় “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়...” শুনে এরকমই এক উথালপাথাল জাগে। তা শুধুই কি গানটার কথার জন্যে, সুরের জন্যে? না, আসলে কীর্তনাঙ্গের এ গানে, “তারি লাগি যত ফেলেছি অশ্রুজল...” এই অংশটায় যখন মান্না দে মশাই তাঁর সর্বস্ব ঢেলে দেন, তখন আমিও তাঁর কান্না শুনতে পাই। তখন সে মায়া কাটানো যায় না। রবীন্দ্রনাথই একটি গানে লিখছেন “তোমার গন্ধ আমার কন্ঠে আমার হৃদয় টেনে আনে”। এই কন্ঠে হৃদয়কে টেনে আনাতেই গানের যথার্থতা। ঠিক এই জায়গায় এসেই তাই, হাইনের কথাটার মূল সুরটুকু স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাঝেমাঝে তো এরকম হয়। কোনো বিশেষ শ্রুতি এতটাই প্রিয় হয়ে ওঠে, তাকে তখন আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়, সে পুরো ভূতে ধরার মতন ঘাড়ে চেপে বসে।

* * *
এই আনন্দের অনুসন্ধান একই সঙ্গে সুন্দর ও রহস্যময়। অনেকটা নতুন এক ভূখণ্ড আবিষ্কার করার মতন। আবার অজানা পথে পা বাড়ানোর জটিলতায় সে সম্পূর্ণ কুহকী। এমনই এক অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন গণিতজ্ঞ অ্যাণ্ড্রু ওয়াইল্‌স। ফার্মা থিওরেমের সমাধানের খোঁজে সাত সাতটা বছর দিন রাত একাকার করে ফেলে একদিন লক্ষ্যে পৌঁছবার পর, তিনি বলছেন, “Perhaps I could best describe my experience of doing mathematics in terms of entering a dark mansion. You go into the first room and it’s dark, completely dark. You stumble around, bumping into the furniture. Gradually, you learn where each piece of furniture is. And finally, after six months or so, you find the light switch and turn it on. Suddenly, it’s all illuminated and you can see exactly where you were. Then, you enter the next dark room...” একজন শিল্পী এভাবেই অনুসন্ধান করেন, আত্মখনন করেন। প্রতিদিন তাঁর নতুন জার্নি। প্রতিদিন সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটা।
আর ঠিক সেই কারণেই, অন্তত শিল্পে কোনও ফেলাছড়ার জীবনযাপন তাঁর পক্ষে বিলাসিতা। একজন শিল্পী যখন শেকল ভাঙেন, তখন সেই ভাঙাটুকুতেও শিল্পের পরিমিতি মিশে থাকে। এই পরিমিতিবোধ না থাকলে শিল্প তার মর্যাদা পায় না। সে কেবল সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে কেবল। এক সাক্ষাৎকারে কবীর সুমন বলেছিলেন, “বাংলা গানের সুর কোন বড়লোকের বখাটে ছেলে নয়, যে তাকে যেখানে সেখানে যেমন তেমন ভাবে লাগামছাড়া ঘুরে বেড়াতে দেওয়া যাবে।” কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে জুড়ে রয়েছে ব্যালেন্সের প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথেরই দুটি গানের উদাহরণে এই step by step balancing-এর ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে।
“আকাশভরা সূর্য তারা”। পাঠক, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, একবার চোখ বন্ধ করে গানটা মনে মনে গাইতে শুরু করুন। সা-র ওপর একটানা দাঁড়িয়ে আকাশভরা সূর্যতারা। এই একটানা দাঁড়ানো আসলে এই মহাবিশ্বের ঐন্দ্রজালিক স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। যেই বিশ্বভরা প্রাণটুকু জেগে উঠল, ওমনি সুরের চলনও একটু মাথাচাড়া দিল... আর বিস্ময়ে তাই যেই আমার গান বেরিয়ে এল... তখন তা পেরিয়ে গেল চার চারটি স্বর... খেয়াল করুন পাঠক, এই গা-আ-আ-ন –এর শেষ আ-ন লাফটা প্রথম অংশের চাইতে আরও বড়। মানে, চলা যখন শুরু হয়েছে, তখন আরেকটু বড় পা ফেলা যাক। পাঠক, এবার অন্তরা অংশ খেয়াল করুন। অসীমকালের... মোটামুটি এক পর্দায় স্থির; যে হিল্লোলে... চলার স্বাধীনতা পেয়েছি তো, তাই সুর আরেকটু উঠল; জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে... আরেকটু, দোলে অংশে সুর কিছুটা দোলাও দিয়ে নিল নিজেকে। এ গানের অন্তরায় ‘অসীমকালের’ অংশটা সুরের যে পর্দায় শুরু হয়, ‘জোয়ার ভাঁটায়’ গিয়ে সে যেন স্রোতের এই যাওয়া আসার কারনেই কিছু বা টলোমলো। কিন্তু ‘নাড়িতে মোর রক্তধারাতে’ যেই সে সুর পৌঁছে গেল, সে যেন আচমকা লাফ দিয়ে উঠল আকাশে। এতক্ষণ, যে ছিল নিতান্ত মাটিতে, ঘাসে ঘাসে, সে এবার যেন হৈ হৈ করে উড়ে গেল মহাশূণ্যে, জীবনকে সেলিব্রেট করতে চাইল। এতক্ষণ যে ছুটে পেরোচ্ছিল পাকদণ্ডি, সাঁই সাঁই করে পিছনের দিকে সরে যাচ্ছিল পথঘাট, এখন সে পাহাড়ের চুড়ো থেকে যেন লাফ দিয়ে ভেসে ঊঠল আর তার সামনে বিরাট নীল, কী হাল্কা লাগতে শুরু করল তার নিজেকে।
ধরা যাক, ‘গোধূলিগগনে মেঘে ঢেকে ছিল তারা’ গানটার সঞ্চারী। বাংলা গানে সার্থক সঞ্চারী প্রয়োগ বোধহয় একমাত্র রবীন্দ্রনাথই করেছেন। পাঠক, আরও একবার চোখ বুজুন... মনে মনে গান... চেয়েছিনু যবে মুখে, তোল নাই আঁখি... খেয়াল করলেন? একজন আরেকজনের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে, স্বাভাবিকভাবেই সে অচঞ্চল... খেয়াল করুন, গানের বাণীতেও এই অংশটুকু এক ও এক পর্দায় দাঁড়িয়ে। কোথায় সে নড়ল, না যখন আমি বললাম, আঁখি, কারণ এবার আমি আমার দৃষ্টি একটু সরিয়ে তোমার আঁখির দিকে নিয়ে গিয়েছি, আমার মন চঞ্চল, তুমি কি চেয়ে দেখলে আমাকে? সুরও সে কারণে সামান্য চঞ্চল। এর ঠিক পরের লাইনেই, আমি আঁধারে নীরব ব্যথায় বিবশ হয়ে গেলাম। পাঠক, ‘নীরব ব্যথা’ অংশের সুর খেয়াল করুন... উথালপাথাল টের পেলেন ?
অতএব বোঝা গেল, গানের সুরটি তো আর এমনি এমনি বসে না, তার ওভাবে বসার পেছনে অনেক অংক থাকে। অনেক ওজন বুঝে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। একজন শিল্পীই জানেন এই পরিমিতির ব্যবহার, অনেক সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সংযম ও সংবরণের ব্যবহার। মহাভারতে দ্রোণাচার্যের শিষ্যত্বের কারণে, অর্জুন ও অশ্বত্থামা একই অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেছিলেন। তবু অর্জুন যেখানে মহারথী বীর, অশ্বত্থামা সেখানে নিছক এক প্রতাপশালী যোদ্ধা। এর কারণ, অর্জুন অস্ত্রসংবরণ করতে জানতেন। কিন্তু অশ্বত্থামা ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে তা ফিরিয়ে নিতে পারেন নি। ছোটবেলায় ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসে, ধারাভাষ্যকারের গলায় ‘Batsman left the ball well’ শুনে হাসি পেলেও, এখন মাঝেমাঝে বুঝি, well played-এর চাইতেও well left আরও কঠিন।
মিলান কুন্দেরার “Life is Elsewhere” উপন্যাসে নায়ক জেরোমিল একদিন তাঁর বান্ধবীর সংগে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ মেয়েটি মাথা রাখলো জেরোমিলের কাঁধে। ঠিক সেই মুহূর্তে জেরোমিলের যেন এক নতুন জন্ম হলো। তো কুন্দেরা লিখছেন, “A girl’s head meant more to him than a girl’s body”। কুন্দেরা এখানে দুটো মহৎ কাজ করলেন। এক, তিনি পার্কের এই মুহূর্তটিতে এনে দিলেন অনুভবের আনন্দ। আর এই আনন্দ সম্ভব হল, কারণ, কখনও কখনও কাঁধে মাথা রাখাটুকু লিখে যে সংবরণ কুন্দেরা দেখালেন, তা উপন্যাসটিকেও নতুন জন্ম দিল। রবীন্দ্রনাথের গানও তেমন। আজ চাইলেই হয়ত এই গানগুলোয় সুরের বন্যা বইয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু দুটো গানেই, এক সুরের পর্দায় এক পংক্তির একাধিক শব্দ, কখনও বা পুরো পংক্তিকেই দাঁড় করিয়ে রাখায় যে একঘেয়েমির আপাত ঝুঁকি থাকতে পারতো, তা কী এক ম্যাজিকে উধাও হয়ে গেল। উদাহরন হিসেবে এই গানদুটো এই কারণেই সার্থক যে, তারাও এই সংবরণের শাস্ত্র জানে।

* * *
বাঙালিই বোধহয় একমাত্র উদাহরণ যে জন্মোৎসবে ও একই ভাবে স্বজন-বৈরাগ্যে গান গায়, যে রাজদ্বারে ও শ্মশানে গান গায়, যে বিক্ষোভে-বিপ্লবে-ভীষণ অসম্ভবে-শান্তি অশান্তিতে ও একইসঙ্গে এই বিভ্রান্তিতে গান গায়, যার বিয়ের গান আছে, নৌকো বাওয়ার গান আছে, ধান কাটার গান আছে আবার ছাদ পেটাইয়ের গানও আছে। যার মুর্শিদি গান ও দরবেশি গান, তরজা-হাফ আখড়াই ও ব্রহ্মসংগীত পাশাপাশি বসে আছে। বাঙালিই সেই একমাত্র উদাহরণ, যে তীব্রতম উচ্ছ্বাসে গান গায়, আবার প্রবল শোকে গানের মাধ্যমেই শান্তি খোঁজে। যে রাগ-ঘৃণা-বিরক্তি-হাসি- ান্না-অভিমান সব কিছুকেই গান দিয়ে প্রকাশ করতে পারে। তার যে কোন উৎসব – তা সে ধর্মীয় বা সামাজিক – যাই হোক না কেন, গান ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এই যেমন, দুর্গা পুজোর কথা বললেই মনে পড়বে ত্রিনয়নী দুর্গা গানটার কথা। আর দেখতে পাব, পুজোর দিন সকালে বাবা হারমোনিয়াম নিয়ে গাইছে। যেমন, মহালয়ার ভোরের সেই অলৌকিক সুরসৃষ্টির কথা মনে করলেই আমার মনে পড়বে--- এই চাকরিতে ঢুকে প্রথমবার সোনাকানিয়ার কথা ... সেখানে আবার আদ্দেক সময়ে রেডিও সিগনাল ধরে না। মহালয়ার আগের রাত্তিরে মনখারাপ নিয়ে শুতে গেছি, ঘুম আসছে না, কষ্ট-টা গলার কাছে আটকে আছে। ঘুমোচ্ছি না, মনে মনে নিজেই নিজের কানে শুনতে চেষ্টা করছি সেই মহার্ঘ্য গান ও পাঠ। আচমকা তন্দ্রা কাটে। ভুল শুনছি? দৌড়ে ছাদে যাই। দেখি রাস্তার ওধারে একটা গাছের ধারে বিশেষ এক কোণে রাখলে যেখানে মাঝেমাঝে রেডিওর পুররুজ্জীবন ঘটে, সেখানেই আমাদের এক সহকর্মী তৃপ্তির হাসি মেখে দাঁড়িয়ে। ছুটে যাই, দুজনে খুব হাসতে থাকি, আনন্দে লাফাই, দুজনের চোখ এলোমেলো ভিজে যায় ... মাননীয়া শিপ্রা বসু গেয়ে ওঠেন "ওগো আমার আগমণী-আলো ..."
গানই তো পারে সমস্ত শেকল ভাঙতে। সমস্ত সামাজিক ও ধার্মিক বিভেদের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে একমাত্র গান-ই পারে এই পৃথিবীকে এক আকাশের নীচে নিয়ে আসতে। বাঙালি আজীবন শোকে দুঃখে আনন্দে উত্তেজনায় প্রতিবাদে গান বেঁধেছে। সৌভাগ্যের বিষয়, বাঙালি কোনদিন হত্যার গান লেখেনি।
মানছি, এ এক নষ্ট-দুষ্ট পাগল সময়। কিন্তু, পাঠক, ভরসা রাখুন এই কারণেই যে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্তিগীতি “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন” কাজী নজরুল ইসলামের লেখা। পাঠক, মনে করুন... স্বয়ং ঈশ্বরই যেন উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের শরীর ধারণ করে পাহাড়ি রাগে গাইছেন “হরি ওম তৎসৎ” অথবা সেই গানই যেন বা অন্য শরীরে নেমে আসছে পণ্ডিত যশরাজের গলায় মিঞা কি টোড়িতে “আল্লাহ্‌ জানে, মওলা জানে...”। বৈজু বাওরা ছায়াছবিতে “মন তড়পত হরি দরশন কো আজ” শুনতে শুনতে আমাদের গায়ে যখন কাঁটা দিয়ে উঠেছে, তখন কি মনে হয়নি- যে এ গান যদি কেউ বানাতে পারেন, তবে তা কেবলই শাকীল বাদায়ুনি-নওশাদ আলি-মহম্মদ রফি – এই তিন ঈশ্বর। আমরা হলাম গান পাগলা মানুষজন, গান আমাদের রক্তে... সে গানের কাণ্ডারীর ধর্মধ্বজা নিয়ে আমরা কে কবে এত ভেবেছি? যারা সে তর্কে মশগুল, তারা শান্তি পাক।
মানুষের অস্তিতের ইতিহাসে এভাবেই বারবার গান নানারকম সীমারেখা ভেঙেছে। আমরা কবিতার লোকজন এক খোলসবদ্ধ মিথ্যে অহংকারের অসুখে ভুগি – কবিতা আমাদের কাছে যেন বা গানের বাণীর চাইতে ঢের বেশি ওজনদার। রবীন্দ্রনাথের কথা না হয় এই মুহুর্তে বাদ দিলাম – আচ্ছা, যদি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র কথা মনে করি? সেই “রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ নেই শূণ্যতা/ আকাশে তখন থমকিয়ে আছে মেঘ/ বেদনাবিধুর রাডারের অলসতা/ কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেগ...” শূণ্যতার নানা বিশেষণ বর্ণনা আমরা আগে নানা লেখায় পেয়েছি... কিন্তু এই সামান্য কেউ নেই শূণ্যতা? এই একটা সংহত ব্যবহার যেন নির্জন রানওয়ের ছবিটাকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে এনে দিল। আবার যদি মনে করি কবীর সুমনের সামান্য দুটো লাইন – “শরৎ আসে যায় মেঘের ফাঁকে নীল/ এই শহরটাই অতিথি গাঙচিল”... তখন একটা শহরের নিজস্ব চলাচল আমাদের চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

* * *
গান এভাবেই যেমন ধর্ম বর্ণ দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে মানুসের মাথায় ছাতা ধরে, তেমনি সে কখন যেন ব্যক্তি থেকে সমষ্টির, কখনও সমষ্টি থেকে ব্যক্তিগত – কখনও বা এক সমষ্টি থেকে অন্যের হয়ে ওঠে। তার সুর কাঠামো এক সংস্কৃতি থেকে ভেসে আসে আরেক ঘাটে। তার সুরের যে গোপন কৌটোয় ভ্রমর রাখা, তা কী যেন এক সম্মোহনে হয়ে ওঠে অন্য কোন দেশের আরেক রূপকথার গল্প। তাই কোন সে অজানা পদকর্তার “মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না”-র সংগে রজনীকান্ত সেন-এর “কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব, তোমার রসাল নন্দনে” এক হয়ে যায়। এক হয়ে যায় হংসধ্বনির বন্দিশ “লাগি লগন পতি সখি সন, পরম সুখ অতি আনন্দন”-এর সঙ্গে শংকরদাস কেসরীলাল ‘শৈলেন্দ্র’-র “পিয়া তো সে নয়না লাগে রে” আর রবীন্দ্রনাথের “হারানো সে আলো আসন বিছালো শুধু দুজনের আঁখিতে”... এক হয়ে যায় রিক্‌শাওয়ালা ছায়াছবিতে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে “অব মচল উঠা হ্যায় দরিয়া, সর পর গিরি বদরিয়া” আর হ্যারি বেলাফন্টের গলায় “বানানা বোট সং”।
যেমন করে সীমানা ভেঙে ফিলাডেল্‌ফিয়ার এক ধর্মযাজক রেভারেণ্ড চার্ল্‌স টিণ্ডলে-র লেখা প্রার্থনাসংগীত “I will overcome some day” ও আফ্রো-আমেরিকান প্রার্থনাগীতি “I’ll be like Him some day” মিলেমিশে হয়ে ওঠে লক্ষকোটি খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিবাদের ও আশাভরসার গান “We shall overcome some day”। ফিলাডেল্‌ফিয়া শহরে এক চার্চের প্রধান রেভারেণ্ড টিণ্ডলে সারাজীবনে অসংখ্য প্রার্থনাগীতি লিখেছেন। টিণ্ডলের এমন ছোট ছোট গানগুলো ক্রমে গসপেল সংস্‌ নামে প্রচলিত হয়ে যায়। I’ll overcome some day/ This world is one great battle field with forces all array/ If in my heart I do not yield, I’ll overcome some day...” - এই গানটি লেখা হয়েছিল ১৯০৩ সালে, পরে ১৯২১ সালে প্রকাশিত তাঁর Gospel Pearls বইয়ে সংকলিত হয়। অন্যদিকে আফ্রো-আমেরিকান গানটার কথা হল – I’ll be like Him some day/ Deep in my heart I do believe...”। ধর্মচর্চার ভাষা থেকে সর্বজনীন আশাভরসা ও প্রতিবাদ আন্দোলনের ভাষা হয়ে ওঠার এই ঘটনাপ্রবাহটি চমকপ্রদ। ১৯৪৬ সালে আমেরিকার চার্লস্‌টন শহরে আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির শ্রমিকেরা হরতাল করেন। এই শ্রমিকেরা ছিলেন মূলত আফ্রো-আমেরিকান মহিলা। এদের মধ্যে একজন লুসিলে সিমন্স্‌ বন্ধ কারখানার গেটের সামনে জমায়েতে টিণ্ডলের লেখা গানটায় ‘I’ বদলে ‘We’ করে গাইতে শুরু করেন... অর্থাৎ মুহূর্তের মধ্যে গানটা ‘We will overcome’-এ বদলে গিয়ে হয়ে যায় এক থেকে অনেকের গান। ক্রমে গানটা আর কালো মানুষের গান হয়ে আটকে থাকে না। জিলফিয়া হর্টন নামের এক শ্বেতাঙ্গ মহিলা শ্রমিকের হাত ধরে এই গান পৌঁছে যায় অন্যান্য কারখানার গেটে। ক্রমে এক এক জায়গায় সেই কারখানার অবস্থার নিজস্ব প্রয়োজনে এ গানে জুড়ে যেতে থাকে আলাদা আলাদা পংক্তি, স্তবক... কিছু বাদও যেতে থাকে। হার্ভাডের এক স্কুলশিক্ষিকা সেপ্‌টিমা ক্লার্ক গানের will বদলে আরও প্রত্যয়ী shall করে দেন। অবশেষে ১৯৬০ সালে এ গানের একটি আপাত স্থিতিশীল লিখিত রূপ প্রকাশিত হয় Peoples Song সংকলনে। মুদ্রিত অবস্থায় এ গানের নাম হয় “We shall overcome some day”। এ গানের পরিচিতিতে ছাপা হয় “Musical & Lyrical adaptation by Zilphia Horton, Frank Hamilton, Guy Carawan & Pete Seeger. Inspired by Rev. Charles Tindley, African-American Gospel singing, members of the Food & Tobacco Workers Union, Charleston SC and the Southern Civil Rights Movement”। আপাত স্থিতিশীল লিখিত রূপ বললাম কারণ এ গান তার পরেও বহুবার পাল্টেছে।
বলা বাহুল্য, এ হল পৃথিবীর সেই বিরল গান যার একাধিক ভার্সান পাওয়া যায়... মুখে মুখে ঘেরা মানুষের এ গান সৃষ্টিসুখের উল্লাস ও সমবায়ী জঙ্গমতার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। মূল গানে ছিল দুটি মাত্র স্তবক। আমরা মোটের ওপর যার কন্ঠে এই গান শুনে বড় হয়েছি, সেই পিট সীগারের নিজের গাওয়া এই গানের একাধিক রেকর্ডিং খুঁজে এ গানের কমপক্ষে ১৫ টা স্তবক চিহ্নিত করা গেছে।
ভক্তি আন্দোলনে ‘হরিবোল’ ধ্বনির হাত ধরে চৈতন্যদেব বাংলার আপামর অন্ত্যজ শ্রেণীকে মিলিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারতভাগ্য বিধাতা’ যখন স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠে, তখন তাও এই সুবিশাল ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণকে মিলিয়ে দেয়। আবার ৯০র দশকে যখন মৃতপ্রায় বাংলা গান ‘তোমাকে চাই’ নামের এক জাদুতে জেগে ওঠে, তখন সদ্য কিশোর-সদ্য তরুণ-সদ্য যুবক বাঙালি প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে নতুন স্বাদের অভিজ্ঞতায় চমকে ওঠে। এ কি নিছকই আশ্চর্য এক সমাপতন যে, এক বৃহত্তর জনতাকে বিহ্বল করে চলা রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত আহ্বান এবং একই সঙ্গে সুমনের এই গানের আপাত ঝকঝকে পশ্চিমী ধাঁচের সুরকাঠামোতেও ‘জয় হে’ ও ‘তোমাকে চাই’-এর সুরে আসলে বাংলার সেই চিরকালীন ‘হরিবোল’ ধ্বনির ঐতিহ্যটিই খেলা করে, সুরের ইতিহাস এসে কানে হাত বুলোয় !
গান যে কী ম্যাজিক দেখাতে পারে, তার আরেক কিস্‌সা জড়িয়ে আছে সুরসাগর হিমাংশু দত্তের এক রচনার সূত্রে। ১৯৩৯ সালে শৈলেন রায়ের কথায় হিমাংশু দত্তর সুরে রেকর্ডবদ্ধ হয় ‘তোমারি পথপানে চাহি আমার পাখি গান গায়...’ [পরবর্তী সময়ে শ্যামল মিত্র এই গানটি পুনর্বার রেকর্ড করেন]। এ গানের অভূতপূর্ব সাফল্যে তার ঠিক তিন-চার মাস বাদে মনোজ ভট্টাচার্যের কথায় ঐ একই সুরে নতুন একটি গান রেকর্ড হয় – ‘তোমারি মুখপানে চাহি আমার আঁখি মূরছায়...’ এবং এই গানটিও সমান শ্রোতা দাক্ষিণ্য পায়। গল্প এখানেই শেষ নয়, এর কিছুদিন পরে একটি বাংলা ছায়াছবিতে আবার সেই এ-ক সুরে আরেকটি গান প্রকাশ পায়। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ‘বনের কুহুকেকা সনে মনের বেণুবীণা গায়...’। এবং এই গানটিও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এক বছরের মধ্যে এক সুরে আলাদা আলাদা কথায় তিন তিনটে গানের প্রকাশ – আর তিনটে গানই চলতি কথায় ‘হিট’ – এমন উদাহরণ বোধহয় খুব বেশি নেই।

* * *
গান বললেই আমার কাছে অনেকগুলো রবিবারের সকাল। আর আমার বাবা।
গানের সঙ্গে এ আত্মীয়তা শৈশবেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। বাবাকে এভাবে কতবার দেখেছি, খাটের ওপর জানলার পাশে বসে হারমোনিয়াম কোলে নিয়ে রোববারের সারাটা সকাল একের পর এক গান গেয়ে যাচ্ছে। বাবার বাল্যবন্ধু শিবুকাকু তবলায়। দুই বন্ধুর মুখে আশ্চর্য এক আলো। “চাই না মা গো রাজা হতে, রাজা হওয়ার সাধ নাই মা গো, দু-বেলা যেন পাই মা খেতে…” গানের সুর গড়াতে গড়াতে একসময়ে সারাটা ঘর ভাসিয়ে দিত, বান ডাকত বুকে। নাওয়া খাওয়ার হুঁশ নেই কারও। সকাল কখন পেরিয়ে গিয়ে দুপুর। হয়ত লুকিয়ে লুকিয়ে শ্যামাই খাইয়ে দিতেন দুই গান-পাগলাকে। বয়সে, অসুস্থতায়, বাবা এখন আর হারমোনিয়াম কোলে তুলে নেয় না। শিবুকাকুও কবেই কোন সে বিপুল সুদূরে পাড়ি দিয়েছে। হয়ত সেখানে তার নিজস্ব কৃষিকাজে আবাদ করে সোনা ফলাচ্ছে শিবুকাকু। কিন্তু, রোববারের এই ছবি খোদাই হয়ে আছে বুকে।
আর এক রোববার - ঠাকুরপুকুরে মেজমাসির বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ফিরছি, বাসে মা ওদিকটায় বসে, একদম পেছনের সিটে জানলার ধারে বাবা আর আমি। বেশ খানিকটা রাস্তা, তার ওপর তখন বাসটাও অনেক ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আসত। বাবা তো চিরক্ষ্যাপা মানুষ, কে কী ভাবলো, বয়েই গেল তাঁর, তাঁর তো শ্যামাগান আছে। ব্যস, শুরু হয়ে গেল... দোষ কারও নয় গো মা/ আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা… বাসের লোকজন শুনছেন, মা কেবল মুচকি মুচকি হাসছে। বাবার স্বভাবতই ভ্রূক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ পর আমায় বললেন, শিখে নে। এরপর সারাটা বাসযাত্রা জুড়ে বাবার কাছে গান শিখতে শিখতে, গাইতে গাইতে আমার ও আমাদের বাড়ি ফেরা...
আমাদের বাড়িতে বারান্দা নেই, ছাদ নেই, থাকার মধ্যে ওই এক জানলা--- ওটি দিয়েই আমার সব সংযোগ। আমাদের এই জানলাটা দিয়ে এমনিতে আকাশ দেখা যায় না। আমাদের কোনো ছাদও নেই। শুধু নীল দেখবার জন্য অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা আছে। তেষ্টা আছে। কিন্তু এই কলকাতা শহর তাকে বারবার এড়িয়ে বেড়ায়। এতকাল বাবা-মা’র ঘরটার একটা জানলা দিয়ে একটুকরো আকাশ দেখা যেত। পিছনের দুটো বাড়ির ফাঁক দিয়ে। একটা খোলা জায়গা ছিল এতকাল। খোলা জায়গা? এই কলকাতায়? কী করে যে সে থাকতে পেরেছিল এতটাকাল, সেটাই তো আশ্চর্যের! মনে পড়ে, গত বছর, মোটের ওপর শরৎ আর হেমন্তকালের মাঝামাঝি এক সময়ে --- একদিন ওই ঘরে বসে আছি। বাবার ছোট্ট প্লেয়ারটায় বাজছে --- “আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী...” মেঘ আর রোদ্দুর এসে পিছনের পুরোনো খোলা জমিটার এক কোণে ঘাড় কাত করে দাঁড়ানো বোকাসোকা নিমগাছটার পাতায় খুনসুটি করছে। আর ঠিক সেই সময়টাতেই দেবব্রত বিশ্বাস আরও একবার কী কুক্ষণেই যে গেয়ে উঠলেন--- “রৌদ্র মাখানো অলস বেলায়, তরু মর্মরে ছায়ার খেলায়, কী মুরতি তব নীল আকাশে, নয়নে উঠে গো আভাসি... ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর...” আর আরও একবার, সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল আমার। এবার কয়েকদিন আগেই টের পেলাম, সেই ফাঁকা আল্‌সে জায়গাটায় একটা বিশ্রি চারতলা বাড়ি উঠে আকাশটাকে পুরোপুরি গিলে নিয়েছে। আর আবারও অনুভব করলাম, এই গানটা এবার থেকে স্মৃতিতে, দিনযাপনে আরও বেশি করে খোদাই হয়ে গেল।
গান এভাবেই বারবার করে ব্যক্তি আর সমষ্টির সীমানা ভেঙে দেয়, নতুন আলোয় সামনে এসে বাজে। এই যেমন, “আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে” মনে করলেই আমার আচমকা এক পড়ন্ত রোদের দুপুর-বিকেলবেলা একটা ফাঁকা বাসস্টপের কথা কেন যে মনে পড়ে যাবে! দেখব, দু বছর আগে ছেড়ে যাওয়া আমার প্রেমিকা একা দাঁড়িয়ে আছে সেই বাসস্টপে। এই গানটার সঞ্চারীতে “কোন দূরের মানুষ যেন এল আজ কাছে... তিমির আড়ালে নীরবে দাঁড়ায়ে আছে...” অংশটা যেন নতুন করে বাজতে থাকে আমার কাছে, ওই একটা শেষ দুপুরবেলায়।
এই কয়েকদিন আগেই তো, মেয়েকে পাশে বসিয়ে ঘরে গান শুনছি... জনতার হাতে হাতে ঘোরো তুমি নিশানের মত... এ গানটা সুমনের কোনো অ্যালবামে নেই। অথচ, অনেক অনেক অনুষ্ঠানে শুনেছি, খুব ভালোলাগা জড়িয়ে আছে। মনে আছে, অনেক দিন আগে, কোনো এক টেলিভিশন চ্যানেলে এক নববর্ষের অনুষ্ঠানে সুমন এই গানটা পিয়ানো বাজিয়ে গেয়েছিলেন। ওই একটু আগে বলেছিলাম না, কোনো কোনো গান ভূতের মতন ঘাড়ে সেই যে চাপে, আর তাকে নামানো যায় না। এ গানটাও তাই। তো সে যাই হোক, ইন্টারনেটের দৌলতে সে গান জোগাড় করা গেছে, কোনো এক অনুষ্ঠানেরই লাইভ রেকর্ডিং। বাপ-মেয়েতে মিলে শুনছি। মেয়ে কি আর অতশত বোঝে, সে শুধু গোলগোল চোখ করে বাবার মাথা নাড়া দেখছে। চলতে চলতে গানটা এবার সেই মোক্ষম জায়গাটায় এসেছে, যেখানে রয়েছে --- “থেমো না কখনও তুমি তৃপ্তির মুমূর্ষু টানে/ স্থবির সময় ভেদ করে তুমি যেও গান গেয়ে/ এ গান ফুরোলে তুমি চলে যেও আগামীর গানে/ স্থানু স্বরলিপি দেখে চিরকাল হেসো তুমি মেয়ে…” আর ওমনি আমার সারা গায়ে নতুন করে কাঁটা দিয়ে উঠল। আবিষ্কার করলাম, এই গানটা হয়ত এতকাল প্রেমের গান ছিল, হয়ত রাজনীতির গান ছিল, কিন্তু আজ থেকে এই গানটা আমার কাছে কেবলমাত্র আমার মেয়ের গান। এই কথাগুলোই তো আমি প্রতিমুহূর্তে আমার মেয়েকেই বলতে চাইছি। এই তৃপ্তির মুমূর্ষু টানে না থামার কথা, এই স্থবির সময় ভেদ করে চলে যাওয়ার কথা, এই স্থানু স্বরলিপি দেখে হেসে আগামীর গানে চলে যাওয়ার কথা… সুমন শুধু আমার হয়ে এই কথাগুলো বলে দিলেন। আর এভাবেই প্রিয় একটা প্রেমের গান নতুন শরীর নিয়ে আমার কাছে এক পিতার স্বপ্ন আর ইচ্ছের কাহিনি হয়ে গেল। এক প্রিয় একটা দুপুরবেলায় প্রিয়তর হয়ে উঠল।

* * *
আমাদের বড় হয়ে ওঠার দিনগুলোয় মোবাইল ফোন জন্মায়নি, ইন্টারনেটের গল্প শুনেছি মাত্র, রাগী-স্বপ্নদেখা আমরা যুবকেরা তখন চিঠি লিখতে জানতুম। মাঝেমাঝে বিকেলবেলা লেটারবক্স ভরে উঠত মনকেমন পোস্টকার্ড-খাম-ইনল্যা ্ডে ভরা আমাদের সমস্ত স্বপ্নদেখার লিপিতে। এই রূঢ় সময় আমাদের কারোর কারোর স্বপ্নকে কঠিন বাস্তব করে দিয়েছে, কারোর কারোর স্বপ্ন এখনো শীতঘুমে। কিন্তু আমরা দিনান্তে সেই স্বপ্নদেখার কাছেই নতজানু হয়েছি বারবার। ভেবেছি, আসলে তো জিতেছি যতটা হেরেছিও ততটাই, ভেবেছি অনেক কিছু নেওয়ার পর, এখন অনেকতর কিছু দেওয়া বাকি … ।
আজকাল পরম পরিতৃপ্তির বেঁচে থাকা, দামি গাড়ি চড়া, দশতলা অফিসে বসে নিচে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া অতি সাধারণ মানুষদের পোকামাকড়ের মতন মনে হওয়া আর ঠাণ্ডা ঘরে থেকে থেকে ক্রমে আরও ঠাণ্ডা রক্তের সরীসৃপ হয়ে ওঠার অসুখে আমাদের অনেক পরিচিতরাই আক্রান্ত।
শুধু আমি ও আমরা গুটিকয়েকজন নিশ্চিত জানি, মনখারাপের আশ্রয়, গান নামে সেই প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে বারবার দেখা হয়ে যাওয়াটাই এই জ্বালাপোড়া কলকাতায় বৃষ্টিবিকেল।