স্বরোজ

বেবী সাউ



স্বরোজ / বেবী সাউ

বারবার আমার শূন্যতা ভরাট হয়ে ওঠে। এই আশ্চর্য শূন্যতা নিয়ে চুপ করে বসে থাকি একা। সুর্বণরেখার জল নামে ধীরে। মেরিন ড্রাইভের রাস্তায় তখন সিংহীর আত্মনার্দ। সমস্ত একাকীত্বের উঠোনে জানলা বলে কিছু নেই , পাল্লার ঝাপট নেই। তাঁকে আমি দূর থেকে ভালোবাসি। চাকচিক্য হীন কোকিল নিয়ে এগিয়ে রাখি ভোর। উজ্জ্বলতা বিহীন আমার এই কেশ রাশি , ছিলাহীন ভ্রু সমস্ত মেঘের কাছে কেঁপে ওঠে। ঝুমঝুমি বাজিয়ে দলমা নেচে ওঠে। হলুদ আলোর শহরে ছড়িয়ে পড়ে তবলার গুঁড়ো। হাতের আঙুলে নখ , নখে লেগে হারমোনিয়াম। মাকে বলি , এবার জন্মদিনে আমাকে অন্তরা দিও । যদি হারিয়ে যাই ...ফিরে আসার একটা চান্স! একটা রিপিট। কিছুক্ষণ ঝালিয়ে নেওয়া। পুবঘরে তখন রোদ ওঠে, কুয়াশা কেটে তৈরী ভোরের ভৈঁরো। নির্মাণ আর নির্মল। নতুন থাকি এসব সরগম জীবনে। কোমল রেখাব নিয়ে "ওঁ জবাকুসুমং... "

সাঁতারে অপটু বলে নলতলা ছিল সম্বল। মগ ভর্তি জলে খেলে বেড়াত হাঁসের দল। এক মগ আকাশ নিয়ে আমি মাথায় ঢালতাম। সরসর করে ভিজে যাচ্ছে ঋষভ মধ্যম। কিন্তু আর সপ্তমে পৌঁছানো যাচ্ছে না। গান্ধারে লয় কেটে যাচ্ছে। হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছে পাঁচ জীবন। আকাশবাণী থেকে মায়ের রান্নাঘরের শব্দ আসছে।গানের পিঠ ধরে হেঁটে চলেছি সমান্তরাল। চোখ ভর্তি জল , ধৈবত। ধরা পড়ে যাবো! বোনের কাছে এবার নিশ্চয়ই আমি ডাহা ফেল। পূর্ণিমা এসে লেবুতলা খুঁজছে। বাঁশবাগানে শনশন হাওয়া ভর্তি। ভোরের কুয়াশা চুরি করেছে চাক্ষুষ যতটুকু। ইমিউনিটি লাল শাড়ির ভাঁজ চেনে। আঁচল খোঁজে। আর আপনি গেয়েই চলেছেন। গেয়েই যাচ্ছেন। পঞ্চমের সঙ্গে দেখা করা মনে হতেই ব্যাগে দু'টো গান ভরে বেরিয়ে পড়ি এবার।

কে গো মেঘ মল্লার ছড়াও সিলেবাসের বইয়ের তাকে! সুহাসিনী বর্ষায় নিভে যায় হ্যারিকেন। ভয় করে!দিভাই, দিভাই! ঘুম থেকে উঠে বসা গল্পেরা শীতল আঙুল ছোঁয়ায় আমার কন্ঠে। ধিন্ ধিন্ না / ধি না --- এক দুই তিন... বল্লমের খোঁচায় মরে যাচ্ছে গাছ। ওরা ছুটছে। গান পাঠানো ছেলেটি গাছ আঁকড়ে পড়ে আছে। অন্ধকার। চারিদিকে বিপুল অন্ধকার নিয়ে রাগে ফুঁসছি। কেউ ভাবল না , আমার এ সমস্ত ছেড়ে যাওয়া একমাত্র আমার ভাইয়ের জন্য। প্রবাসী জানলার ভৌতিক অবয়ব , আমার সমস্ত মেয়েজন্মের কাছে, নির্জন গোচারণ ভূমি ডিঙিয়ে , লতাপাতা ডিঙিয়ে এইসব মরে যাওয়া শুধুমাত্র কাজলা দিদি হয়ে উঠার জন্য।

মুক্তি তো চাইনি কখনও । বরং অসংখ্য জড়ানোর মাঝে আমার পথের কড়ি বিছিয়ে রেখেছি। তোর ভালোবাসাতে অন্ধ হয়ে পেতে দিয়েছি আমার নশ্বর অবিশ্বর। অন্ধ বাগানে ছলছল করে সমুদ্র খেলে। অসাধারণ শাঁখে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে গানের খাতা। সযত্নে গুছিয়ে রাখি এই বয়ঃসন্ধি। অর্ণব অর্ণবীর মিল হবে কী এবার! বৈশাখ এলেই কেমন যেন একাকীত্ব গ্রাস করে নির্জন দুপুর। উদাসী বাউল ভিক্ষা চায় দরজায়। গান বাজে। রান্নাঘর উছলে ওঠে। মা ভগবান জ্ঞানে সমস্ত পাওয়া না পাওয়ার আঙ্খাকাকে তুলে দেন তাঁর পায়ে। ঝোলা ভর্তি গান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শহর। আনাচে কানাচে কথা ভাসে-- কোন গানে কতটুকু ভুল পাওয়া গেছে , কোথাও ছিঁড়ে গেছে লয় তান। ফুঁপিয়ে উঠি। কথা নিয়ে ভাবল না কেউ! কথা কী তবে শুধু শূন্যের মোহে হারিয়ে যাওয়া! দিগন্তের খোঁজে বেরিয়ে পড়া মানেই একটা বিরাট নষ্ট জীবন? ঝিনুক খোঁজের সঙ্গেই আমার পরিচয় আজন্মের। ক্ষোভ না, ক্ষুধা না, সম্পর্ক মানেই একটা বৃত্তের সঙ্গে অন্য বৃত্তের শুধুমাত্র নো- ম্যান'স ল্যান্ডের ম্যাপ ধরিয়ে দেওয়া।

হাত চাই, একটা। আঙুলে ছুঁয়ে থাকা একটুখানি নিঘন স্পর্শ। কত জন্ম কেটে গেল এসব মোহনীয়তায়। আপনার গানে কথার সঙ্গে সবটা সুর মেলে না ঠিকই কিন্তু সঞ্চারী ছাড়া জমে না আসর। আলেয়ার খোঁজে দৌঁড়ে বেড়াই। মুক্তো নেই , নাকি মুক্তি। সোপান বেয়ে বেয়ে শুধু মার্বেলের পিচ্ছিল স্টেপ। কতকাল আর তাল মেলানো যায়, ভেঙে যাওয়া রীডে পেইন। মৃত্যুদিনময় সোপান পেরিয়ে জলের কাছে পায়ের পাতা ভেজাই। সুড়সুড়ি দেওয়া গলায় রেওয়াজ চুপ থাকে। প্যারাসিটামলে লেগে থাকে স্বরলিপি। চাঁদের দিকে হাত চলে। তখনই তোর ভেবে নিই পৃথিবীর নির্জনতম পুরুষ। আরেকবার আত্মহত্যা ঝুলিয়ে রাখি মানগো ব্রীজে। একেই কী "ইউথেনেশিয়া" বলে অনিন্দ্য!

সব শেষ হলে সাধনা আরম্ভ হয়। সময় থিতিয়ে পড়ে। দাবীহীন, শান্ত কোন যুবক চুপচাপ সন্ন্যাস বেজে নেয়। তখন আমি সুজাতা। ভেজা চুল বেয়ে নামছে কর্পূর। চোখে ভরে আছে খোয়াইয়ের মাঠ। বটের কোটর থেকে জন্ম ভেসে উঠছে। এলাচের গন্ধ ধরে আছে হাতের তালু। বিষধর শীত পেরিয়ে উনুনে গরম করি পায়েসের চাল। মরুসর্প পেরিয়ে বাঁশি বেজে ওঠে।

গান না,সুর না। ঋষভ গান্ধার পেরিয়ে প্রত্যহ সপ্তমে পৌঁছে যাওয়া। ধবল মেঘের খোঁজে প্রতি প্রত্যহ অপেক্ষা পুষে রাখা, এই ভিডিও ফুটেজ নিষাদ হে! অভোগ থেকে হত্যা করো আমায়।

আপনিই বলুন নির্মলা মিশ্র -- মেয়েরা চোখের জল ছাড়া আর কী দাবী করতে পারে!