দল বদল

শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

কাদোবাড়ি চ্যালেঞ্জ ফুটবলে মন্ত্রী আসবেই। মহকুমা চ্যাম্পিয়ন দলের সাথে চুড়োঝোড়া চা বাগান ফুটবল দলের এই ম্যাচ পঞ্চাশ বছরের পুরোন। খেলা হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমার বিকেলে। এবার সে পূর্ণিমা পড়েছে আষাঢ়ে। বৃষ্টিতে একান্ত খেলা না গেলে কাদোবাড়ি চ্যালেঞ্জের খেলা পিছোয় না। পঞ্চাশ বছরে একবারই পিছিয়েছিল। পাশের বানভাসি এলাকায় ত্রাণ পৌছনোর জন্য মাঠে হেলিকপ্টার নামে। সেই হেলির হাওয়ায় মাঠ একটু বেশি শুকিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন চুড়োঝোড়ার কোচ পবন মল্লিক। পরের দিন সকলকে অবাক করে মাঠে নামিয়ে দেয় বাচ্চা লাকড়াকে। বাচ্চা লাকড়া ছিল শুকনো মাঠের খেলোয়াড়। আগের দিনই ঠিক হয়েছিল সে খেলবে না। বাগানের ম্যানেজারের অনূর্ধ্ব উপেক্ষা করে বাচ্চাকে নামিয়ে পবন মল্লিক জীবনের সেরা গালাগাল খেলেও বাচ্চা যখন টুক টাক কোমরের ঝাঁকুনিতে দু-তিনজনকে ছিটকে দিয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়তে শুরু করল, পরিস্থিতি বদলাতে লাগল। খেলার শেষে ত্রাণমন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন যে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত উত্তরে এমন প্রতিভাবান কোচ থাকতে পারে সেটা তিনি ভাবতেই পারেন নি।
সেই থেকে কাদোবাড়ি চ্যালেঞ্জের খেলায় কোচ একটা ব্যাপার। আর আষাঢ়ের তৃতীয় দিনে অবিশ্রান্ত ঝিরি ঝিরি বরিষণের মধ্যে দিয়ে কালো ছাতা মাথায় কমল বসুনিয়া সেই কোচের কথা ভাবতে ভাবতেই হাঁটছিলেন। পিচের সরু রাস্তা মাঝে মাঝে ভেঙে জল আটকে রেখেছে। পাশে বাগানের সীমানা নির্ণায়ক তারের বেড়া। তার ওপাড়ে চা গাছের সারি বিশাল সবুজ গালিচা হয়ে উঠে গেছে খানিকটা। শেড ট্রির ফাঁক দিয়ে অস্তিত্ববান বিষণ্ণ কালো আকাশ। এ বাগানের চা বিদেশে যায়।
রাস্তা মিশেছে বাস রাস্তায়। সেখানে দোকান পাট রেল স্টেশন ইত্যাদি। কাদোবাড়ি থেকে কমল বসুনিয়া এসেছিলেন মাঝি মণ্ডলের কাছে। গত বার পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে চুড়োঝোড়ার দলকে পনের দিন কোচ দিয়েছিল মাঝি মণ্ডল। বাগান জিতেছিল দুই শূন্যতে। মাঝি জেলা ফুটবল টিমে খেলেছে কয়েক বছর। তার বাবা বাগানে কাজ করে। কমল ওপরে পঞ্চায়েত প্রধানের নির্দেশ আছে যে করেই হোক এবার মাঝিকে কাদোবাড়ির কোচ করতে হবে। অবশ্য এই উদ্যোগের পেছনে কিঞ্চিৎ ভিন্ন সমীকরণ আছে। কাদোবাড়ি ফুটবল ক্লাবে এলাকার নামি ব্যবসায়ী খগেশ রায় প্রধানের দাপট বাড়ছে। সে বিধায়কের কাছের লোক। আগে সে প্রধানের দলেই ছিল, মাস হলো বিধায়কের দলে ভিড়েছে। মাজি মণ্ডলকে কোচ করে মহকুমা চ্যাম্পিয়ন কাদোবাড়ি ফুটবল দলকে চ্যালেঞ্জের খেলাটা জেতাতে পারলে খগেশকে চেপে দেওয়া যাবে। কমল বসুনিয়া এই সমীকরণ জানেন বলে উত্তেজনা আর আশা নিয়ে এসেছিলেন মাঝির সাথে দেখা করতে। আলোচনা ইতিবাচক হওয়ায় এখন তিনি সরু পিচের রাস্তা ছেড়ে উঠলেন বাস রাস্তায়। সামনের চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা চলছে। এমন বৃষ্টির দিনে পাহাড়ের প্রায় কোলে উঠের পড়া এই জনপদের বাজারে দোকানিরা চায়ের দোকানগুলিকে ঘিরে গুলতানি করে আর খরিদ্দার এলে গুটি গুটি পায়ে ফিরে আসে আপন আপণে।
কিন্তু মানুষের অধিকাংশ ভাবে এক কতিপয় করে দেয় আরেক। প্রথমে শোনা যায় মুখ্যমন্ত্রী ছুটি কাটাতে এদিকে আসবেন তাই চ্যালেঞ্জের খেলা উদ্বোধন হবে তার হাতে। এলাকায় শিহরন ওঠে। এর পর রটতে থাকে মুখ্যমন্ত্রীর বদলে দমকল মন্ত্রীর কথা যা এলাকাকে হতাশ করে দেয়। আবার তারা উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে মন্ত্রীর সাথে ‘ফাঁসির চেয়ে দামি’ সিরিয়ালের নায়িকা ঝিংকুর আসার সম্ভাবনায়। কমল বসুনিয়া উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকে। তাঁর উত্তেজনার কারণ এই সব সংবাদ নয়। খেলার বাকি দশ দিন অথচ এখনো এলো না মাঝি মণ্ডল। সে বাগান দলের কোচিং দিচ্ছে, তা-ও নয়। কিন্তু প্রধানের স্থির চিত্ত দেখে কমলের মনে হচ্ছে কিছু একটা ভাবছেন তিনি। হয় তো বেঁকে বসেছিল মাঝি মণ্ডল। কাদোবাড়ির কোচ করাতে না পেরে অন্য কিছু চুক্তি হয় তো করিয়েছেন প্রধান। সে এবার কাউকেই কোচিং দেবে না। তাহলে দলের কোচ এবার কে? অনেকগুলো জিজ্ঞাসা নিয়ে জট পাকায় কমল বসুনিয়ার মন। জিজ্ঞাসার উত্তরের প্রধান মৃদু হাসেন আর বলেন, ‘অত ভাবছিস কেন?’
বৃষ্টি হারিয়ে দিনগুলি এখন সূর্যের তাপে হাঁসফাঁস। ঘামতে ঘামতে মানুষ হেজে যাচ্ছে। বিরাট এক অশ্বত্থ গাছের নিচে বিড়ি টানতে টানতে কমল বসুনিয়া ভাবে খগেশ রায় প্রধান যদি কাদোবাড়ি ফুটবল টিমের কেউকেটা হয়ে ওঠে তবে প্রধানের ইজ্জত নেমে যাবে কতটা! তবে সে শুধু ভাবেই।
খেলার এক সপ্তাহ আগে আবার আকাশ ঠেলে মেঘ এলো পাহাড় থেকে। সারা দিন ঘরে বসে জানলা দিয়ে জল পড়া দেখল কমল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে জানলার পাশ দিয়ে যাওয়া ফুটবল ক্লাবের ছোকরা সহ সম্পাদক চিৎকার করে জানিয়ে গেছে যে আজ থেকে দল নামছে প্র্যাকটিসে। দল কার কোচিং-এ নামছে সেটা জানার জন্য কমল বসুনিয়ার ফোন গিয়েছিল প্রধানের কাছে। সে ফোন বন্ধ ছিল। আর শেষ বিকেলেই যখন চারদিক প্রায় অন্ধকারে ঢেকেছে তখন সেই সহ সম্পাদক আবার এলো জানালায়। ধরে আসা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে বলল, ‘ক্লাবের আজ সুদিন কমল।’
‘কেন? কোচ কে এলো?’
‘কোচ?’ সহ সম্পাদক ভেজা দেশলাই দিয়ে বেশ কসরত করে সিগারেট ধরিয়ে ভেজা চোখে তাকায় কমলের দিকে। ‘কমল! তুই খবর জানিস না?’
‘খবর?’
‘তোর প্রধান সাহেব বিধায়কের দলে যোগ দিচ্ছে। চ্যালেঞ্জের খেলার দিন রাজ্য সভাপতি আসছে। সেদিন সকালেই বাজারের সভায় প্রধানের হাতে দলের পতাকা তুলে দেবে।’
তারপর স্থির হয়ে থাকা কমলের চোখের দিকে তাকিয়ে কুটিল হেসে সে বলে, ‘তুইও চলে আয় না। কী ফালতু আদর্শ মাড়াচ্ছিস!’