সুরের ভেলায়, বেলা অবেলায়

রুমা মোদক



আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে
তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু আনন্দ জাগে
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্রতারা
বসন্ত বিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে
নাহি ক্ষয় নাহি শেষ নাহি দৈন্য লেশ
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।
স্মৃতি সত্তা আচ্ছন্ন করে এক ভোর, লক্ষ কোটি চেনা ভোরের ভীড়ে ভেবেছিলাম বুঝি আমার অসহনীয় বেদনার ভারে অচেনা হয়ে উঠবে বড়! শিকড় বিচ্ছিন্ন হবার দুর্বিষহ দগ্ধতা নিয়ে নিস্তব্ধ শহরের বুক চিরে জাগছিল নির্ঘুম সে ভোর। বাইরে কুয়াশায় ধোয়া পাতাদের মিছিল। ভিতরে তোলপাড় করা হু হু শূণ্যতা। বহনে অক্ষম মাথা যন্ত্রনার দুর্বহ বোঝা নিয়ে বারবার হেলে পড়ছিলো কাঁচের শার্সিতে। চোখ রাখলাম বাইরে, কই আমার এই অসহ্য বেদনার কোনো ছায়াতো নেই কুয়াশার বুকে ছিটকে পড়া উদীয়মান সূর্যটার রক্তিমাভায়। নীড় ছেড়ে বেরিয়ে আসা পাখিদের দলবদ্ধ ডানায় নেই কোনো বিষন্নতার ঝাপটানি। পৃথিবীতো ঠিকঠাক বহমান তার আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির নিয়মে, যেমন বহমান ছিলো সহস্র বছর ধরে, কিংবা থাকবেও আগামী আরো অনেক সহস্র বছর..... কবিগুরুকে মনে পড়লো, পুত্র শমীর মৃত্যুও পরদিন তিনি লিখেছিলেন “জ্যোৎস্নায় (রাস পূর্নিমা) আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষন নেই। মন বললে কম পড়েনি-সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও আছি তার মধ্যে........... যা ঘটেচে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্র“টি না ঘটে।” গভীর বেদনাগ্রাসী এ কথামালা চঞ্চল অস্থির অশান্ত হৃদয়কে স্থিত করে অচঞ্চল স্থির শান্ত সান্ত্বনার ধ্যানী দর্শনে। সত্যি তো মহাকালের মহাসৃষ্টিযজ্ঞে এক ক্ষণস্থায়ী বুদবুদসম জীবনের এই শিকড় বিচ্ছিন্নতার বেদনা কী এমন মূল্যবান? এই জন্ম-মৃত্যু তো সৃষ্টির ধারাবাহিকতা মাত্র!
তবু এই ব্যক্তিগত বেদনার ভার কেন অসহনীয় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আগলে দাঁড়ায় নিয়ত চলমান জীবনের রথ? নির্মোহ আবিষ্কারে সনাক্ত হয় এক স্বার্থপর আমি। যে গেছে জীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি সকল বঞ্চনা বেদনা আনন্দ নিয়ে, আমাদের নিরর্থক অশ্র“ স্পর্শ করে না তার অনস্তিত্ব অজ্ঞাত জগৎকে। আমরা মূলত অশ্র“সিক্ত হই আমাদের জন্য। আমাদের বেঁচে থাকার সহস্র দিন অধিকার করে থাকা, সহস্র প্রয়োজন কিংবা স্মৃতির পাহাড় অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমার বেঁচে থাকার ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন করে। আমি মূলত কাঁদি আমার জন্য। স্মৃতির সেই দুর্বিষহ অচলতা অতিক্রম করে আপন নিয়মে বেঁচে থাকার বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার আকুলতায় কাঁদি আমি। এ বড় স্বার্থপরতা মনুষ্য জন্মের, কেবল আপন অস্তিত্বের জন্য সকল মায়াময় জগত তৈরি করা আমাদের। সৃষ্টির মহাযজ্ঞে তাকিয়ে গভীর বিষাদময় মূহুর্তে গুনগুন করি- আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে, তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু আনন্দ জাগে.......। স্মৃতি সত্তা তোলপাড় করে এক সুর আমাকে স্থিত করে জাগতিক কর্মে। সুরের অপার্থিব ধারায় এই ইহলৌকিক কর্মযজ্ঞে, অর্পিত কর্তব্যকর্মে খুঁজে পাই সান্ত্বনা, যে সান্ত্বনাটুকু না পেলে জগতের আনন্দযজ্ঞে মানুষ টিকে থাকতে পারে না।

(২)
কাভি কাভি মেরে দিল মে, ইয়ে খেয়াল আতে হে, এ যেইসে তুমকো বানায়া গায়া হে মেরে লিয়ে..........। যৌবনের এক তুমুল প্রেমের সুরে আপাদমস্তক হাবুডুবু খাই কখনো। প্রেম নয়,মোহময় পতনের তীব্র আবেগে, প্রেমহীন অপ্রয়োজনীয় বেঁচে থাকার আবেগময় সুরে........., ব্যর্থতার হতাশার নয় সময়ের উষ্ণতায়। কোনো আক্ষেপে নয়, খরস্রোতা সময়ে হৃদয়ের সুক্ষ্ম অনুভূতি হারিয়ে ফেলার। ব্যবহারিক দিনযাপনের নিশ্চিদ্র দেয়াল বর্তমানের সময় ঘিরে, এ দেয়াল থেকে নিয়মের কিতকিত খেলতে খেলতে ধাক্কা খাই অপর দেয়ালে, তারপর দায়িত্বের কানামাছিতে ও দেয়াল থেকে আরেক দেয়ালে, কোথায় দু-পাট জানালা কিংবা নকশা করা ভেনটিলেটর, এক ফাঁকে দেখে নেই বাইরের মুক্ত আকাশখানা একটু কিংবা বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেই বুকে ভরে বেঁচে থাকবো বলে। ফুসরত নেই, ফুসরত নেই, আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো এক প্রয়োজনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ জীবন। তবু কোথাও কোন ফাঁকে এক ছিদ্র জন্ম নেয় বেহুলার বাসরের মতো। লৌহদেয়ালের অচিহ্নিত কোন কোনে কে জানে? দূর বহুদূর থেকে বাতাসে ভাসে এক সুরৃ.........কাভি কাভি.......। থেমে যায় প্রয়োজনের অনিবার্য অবিশ্রান্ত দৌড় ক্ষনিকের জন্য, সময় থমকে দাঁড়ায় মূহুর্ত মাত্র........সুরের ভেলা আমাকে নিয়ে চলে অতীতমুখী চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা নিষ্ঠুর সব বাস্তবতা বিচ্যুত করে।
আহা সে এক সময় তুমুল প্রেমময় সময়.......খোলা মাঠে বসে বসে সন্ধ্যা আর রাতের রহস্যময় সন্ধি দেখা সময় একটুখানি হাতে হাত রেখে অচেনা শিহরণে হারানোর সময়.......। অজ্ঞাত ভবিষ্যৎ কে অবহেলে বর্তমানের অপেক্ষা, অভিমানে আর বোধ বিবেচনাহীন জীবনে ঝাঁপিয়ে পরার সময়। গভীর রাতে ক্যাসেট প্লেয়ারে কাভি কাভি........সুরে বালিশ ভিজিয়ে নির্ঘুম রাতের অনির্দিষ্ট গন্তব্য সমুদ্র কাটানোর সময়.......। দুজনার মাঝে ধর্ম সমাজের এক পৃথিবী দূরত্ব, দূরত্ব সংস্কৃতির আর রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় মূর্ত অনিশ্চিত গন্তব্য। বুঝিবা, অন্য কোনো নারীর ঘোমটা খুলতেই খুলতেই চকিতে আমার ঠোঁট স্পর্শ করার উষ্ণতা ভারাক্রান্ত করবে তাঁকে কিংবা আমাকে..........। অপ্রতিরোধ্য শরীরের আহবানে সাড়া দিতে দিতে বুঝি তীব্র জেগে উঠার আবেশ অব্যক্ত হারিয়ে যাবে নতুন অভিজ্ঞতার কাছে।
তারপর পৃথিবী ঘুরেছে কত বিচিত্র নিয়মে, পরিবর্তনের গতিতে লেগেছে প্রতিনিয়ত নতুন চাকা, কতো তার নিত্যনতুন রং, সময় কেড়ে নিয়েছে যুবতীবেলার আবেগ চুলের রং, অপেক্ষার নির্ঘুম রাত। কঠোর বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে পথ আগলে তবু ছেলেমেয়েদের হাতের রিমোট টম এন্ড জেরি থেকে চ্যানেল ঘুরয়ে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের টি-২০ উত্তেজনায় যেতে যেতে কোন একটা চ্যানেল হঠাৎ ইথারে ছড়িয়ে যায় সুর-এই যেইসে তুমকো বানায়া গায়া হে মেরে লিয়ে........। হাতের খুন্তিটা হঠাৎ ভুলে যায় মাছটা উল্টে দিতে, দুধের হাড়িটার পেট ফুলে আছড়ে পড়ে জ্বলন্ত চুলায়, গন্ধে ভরে যায় বাতাস আর বহুদূরের কোন মুগ্ধ বিকাল, ক্লাস ফাঁকি দেয়া গোপন দুপুর, আড়াল খুঁজে ফেরা কোন বৃষ্টির বিকেল আমাকে অশ্র“সিক্ত করে বলতে থাকে কাভি.....কাভি........।
গভীরে যাও আরো গভীরে যাও......... এই বুঝি তল পেলে ফের হারালে....... গভীরে যেতে যেতে অতলে হারাই, থৈহীন অতল, শেষহীন অতল..........। খুব একটা কিশোরীবেলা মোহগ্রস্ত করে আমাকে, তীব্র আকুল হয়ে ডাকে কুচুরিপানা ভাসা পুকুর ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমীর অঞ্জলী, অষ্টমীর সন্ধিপূজো, দশমীর বিসর্জন সমবয়সী একঝাঁক ঝগড়া-ভাগাভাগি-ঈর্ষা- মিলমিশ, শহরের চারদেয়ালের বন্দীত্ব থেকে স্বপ্নের মতো একমুঠো মুক্তি। সারাটা কৈশোর জুড়ে যে আকাংক্ষা বাঁচিয়ে রেখেছে জীবনের বৈচিত্র্যময় রঙে।
আলোয় আলোয় ঐ আকাশে মুক্তি পাওয়ার অপার্থিব রঙীন সূর্যোটা হঠাৎ একদিন গ্রাস করে নিলো গ্রহণের কালো আঁধার। রাজনৈতিক দাবার চালজনিত অনিরাপত্তা অস্থিরতায় আমার স্বপ্নের জগতের মানুষগুলো দেশছাড়া হয়েছে, হাতছাড়া হয়েছে আমার একান্ত প্রিয় স্বপ্নময় মুক্তির ঠিকানা, এখনো গভীর ঘুমে বিষাদময় ঢাকের তালে আমি বিসর্জনের সুর শুনে বিষাদের অতলে তলাই- আমি ডাকি মা, মা, মাতো কেন, শুনে না.......।
দিনে দিনে এই মানব শাসিত গ্রহ একটা একটা সিঁড়ি টপকায় উর্দ্ধপাণে, গন্তব্য অজ্ঞাত রহস্যময়। তবু থেমে থাকেনা সভ্যতার অগ্রযাত্রা। উঁচু হয় টেকনোলোজির টাওয়ার। নদীপাড়ে শুয়ে থাকা আয়ালানের ছোট্ট চোখের দৃষ্টি পৌঁছায় না সভ্যতার সেই উঁচু টাওয়ারের গৌরবে। ধিক্কার খেলা করে দু হাতের মুঠোর ভিতরে। সভ্যতা অগ্রসরমান বিস্ময়কর সব আবিষ্কারে। কিন্তু থামেনা বিসর্জনের স্রোত।সায়ানাইড এর চেয়ে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী পয়জন নেমে আসে সিরিয়ার ঘুমন্ত মানুষের উপর। গুড়ো হয়ে যায় সভ্যতার স্মারক হাজার বছরের ঐতিহ্য ভাস্কর্য, যৌনদাসী নারীদের হাহাকার হারিয়ে যায় চোখ ঝলসানো বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায়। আমরা এগিয়ে যাই, কেবল উন্নয়নের সিঁড়ি টপকে টপকে এগিয়ে যাই, আসলে অন্ধ সময়ে যায় না আমাদের দূরদৃষ্টি, অজান্তেই খুঁড়ে চলেছি কি সভ্যতার কবর? দুনিয়াজুড়ে এই রক্তাক্ত হানাহানি ধর্মান্ধ উন্মত্ততা বেদনা বাড়ায় বৈ কমায় না। বিসর্জনের বেদনার সুরে ডুবেও বড় আশাবাদী রূপান্তরের অপেক্ষায় থাকি...অপেক্ষাতেই থাকি......।