জলতরঙ্গ

অদ্বয় চৌধুরী




টিপ... টিপ... টিপ... টিপ...
ওই শব্দ বয়ে নিয়ে আসে অনেকটা সুর, অনেকটা আনন্দ।
কোমায় আচ্ছন্ন সুরমা যে বেডে শুয়ে আছে তার পাশেই বাথরুম। সেই বাথরুমের একটা কল থেকে সমানে জল পড়ে গত তিন মাস ধরে, কিম্বা তারও আগে থেকে, হয়তো বা অনন্তকাল ধরে, সারা দিন-রাত। টিপ... টিপ... টিপ। সরকারি হাসপাতাল, এখানে জল বা জীবন সবই তার নিজের খেয়ালে বয়ে চলে।
বিয়ের পরে শ্বশুরমশাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি গয়না নেবে, নাকি হারমোনিয়াম?” সুরমা হারমোনিয়াম নিয়েছিল। সুর ছিল তার গলায়, সুর ছিল তার নামে। ছকে বাঁধা রোজকার কাজকর্মের মধ্যেও সে সুর ধরে রেখেছিল। শিল-নোড়ার কর্কশ ঘর্ষণ অথবা কাপড় কাচার ধুপধাপ, সবকিছু ছাপিয়ে ভেসে উঠত সুরমার সুর। সেই সুর খুঁজে নিত সুখ। নিজে থেকেই।
চল্লিশ বছর বাদে সুরমার নামেই শুধু রয়ে গেছে সুর, কিন্তু গলায় নেই আর। সেখানে আছে নৈঃশব্দ। তবু সুরমা সুর খোঁজে অবশ যাপনে। ভিতরে পায়না, তাই বাইরে খোঁজে। সুর আসেও তার কাছে। শুধু আগের মতো সুখকে সঙ্গে নিয়ে আসেনা। তার অসাড় মন হয়তো বা এই সুর খোঁজার নাম রেখেছে যন্ত্রণা। হয়তো সে জানে যেদিন তার কাছে আর সুর আসবে না, সেদিন যন্ত্রণারও ছুটি হবে।
সেদিন ছেলেকে হাসপাতালে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। মন্ত্রী আসবেন হাসপাতাল দেখতে। চারিদিকে প্রচুর ছুটোছুটি। সবকিছু মেরামত করা হচ্ছে, সাজানো হচ্ছে। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। সুরমার অবশ চেতনা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে। সুরের জন্যে। কিন্তু সুর আর আসে না সেদিন। সেদিন বাথরুমের কলটা সারানো হয়েছে।
সুরমা আর সুরের অপেক্ষায় থাকে না। সুর তাকে ছেড়ে চলে গেছে বেখেয়ালে। এবার সুরমার সুরহীন দেহ অপেক্ষা করে থাকে সাইরেনের তীক্ষ্ণ সুরেলা শব্দের জন্যে।