সঙ্গীত: গাঢ় ঘন আঁধারে অলৌকিক আলোর ইশারা

জুনান নাশিত



শিশুটি কাঁদছে।যুদ্ধাহত শিশু। একটি পা নেই। ব্যান্ডেজ বাঁধা।শিশুটি কেঁদে যাচ্ছে, অনবরত। খাওয়া নেই, খেতে চাচ্ছে না।কয়েকজন মিলে চেষ্টা করে যাচ্ছে। লাভ হচ্ছে না। গলদঘর্ম হচ্ছেন তারা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে কাননবালা দেবীর আশ্রমে তখন ঢুকলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন শিল্পী। সে দলে ছিলেন বুলবুল মহলানবীশ। তিনি একাধারে সংগীতশিল্পী, শিক্ষক, লেখক এবং মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা বেতের কেন্দ্রের অন্যতম এই শিল্পী বলছিলেন সেদিনের সেই কথা।শিশুটির কথা। ওনারা শিশুটিকে কাঁদতে দেখে কাছে এগিয়ে গেলেন। কোলে তুলে নিলেন। শুরু করলেন কোরাস, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল রক্তলাল। কী যেন কি হয়ে গেল, শিশুটি একেবারে চুপ। খাওয়াও শুরু করলো। পুরো এক বোতল দুধ খেলো সে। বলা যায় প্রাণে রক্ষা পেল এই শিশু। এই হলো গান কিংবা সঙ্গীত। কথা, সুর, তাল ও ছন্দের সমন্বয়ে যার সৃষ্টি।কি থাকে এই সঙ্গীতে, গানে? যা জীবন নদীর প্রবাহকে সদূরলোকের কোন এক মায়াময় ঘোরে নিয়ে যায়,সেখানে কোন মোহময় স্তরে মনের দূরন্ত অবগাহন জীবনকে সিক্ত করে, উজ্জীবিত করে, আনন্দিত করে। এক বর্ণিল ইচ্ছার তীব্র তীর জীবনাসক্তিকে বিদ্ধ করে, এর ভাবাবেগকে তুমুল করে। সুরের গতিবেগে হোঁচট খাওয়া জীবন থমকে দাঁড়ায়, কান পাতে, হৃদয়তন্ত্রীতে আবেগের দোলাচলে সেও টের পায় ঘনঘোর রূপান্তরে সবকিছুই অন্যরকম, আগের মতো কিছু নেই।যেন পলিসিক্ত কোমল কোন ভৌগলিক চিত্রলেখা যার অবয়ব আমাদের খুব চেনা, কিন্তু ছুঁতে গেলেই হাপিশ হয়ে যায়।এই চিত্রলেখা যেন অধরার আচানক এক প্রশ্নবোধক ধাঁ ধাঁ।তবে এই বোধ, এই ভাবাবেগ যতই অধরার প্রশ্নবোধক ধাঁ ধাঁ হোক যতই হাপিশ হয়ে যাক তা কিন্তু মানব মনের উজ্জ্বল এক জীবন্ত উপলদ্ধি। সঙ্গীত এই জীবন্ত উপলদ্ধি কিংবা স্পিরিচুয়াল ভিশনের গূঢ়, গভীর উদ্বোধক, দ্যোতক। জীবনের নানা ভাঙচুর, নানা চড়াই উৎরাই, পাওয়া না পাওয়ার ক্ষোভ আর হতাশার উপশমকারী। সুর মানব মনের অনার্য আত্মীয়। সুরের গভীরতা, সুরের চঞ্চলতা, সুরের সঞ্চরণশীলতা মানব মনের যে অতিমানস স্তর তাকে সংক্রামিত করে এবং তাকে সৌন্দর্যের এমন ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় যেখানে সে সুখের তীব্রসীমা স্পর্শ করার আনন্দ পায়।
বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষকেরা বলে থাকেন, পৃথিবীতে প্রথমে জড়ের বিকাশ, পরে প্রাণের বিকাশ। তারপর এল মননশীল মানুষ যাকে মনোময় স্তরের বিকাশ হিসেবে ধরা হয়। এক্ষেত্রে শ্রী অরবিন্দের বক্তব্য, ‘আমরা যদি প্রগতিতে বিশ্বাস করি তাহলে আমরা এ কথা মানতে বাধ্য যে, জগতের বিকাশ এই স্তরে থেমে থাকতে পারে না, মনোময় স্তরের পরে উন্নততর একটি স্তরের বিকাশ হবেই। শ্রী অবরিবন্দ মনের চেয়ে উর্ধ্বতর এই নতুন স্তরের নাম দিয়েছেন অতিমানস(সুপারমাইন্ড) স্তর।
সুর ও সাহিত্য সেই অতিমানস স্তরের ক্রিয়াশীল রূপ।এই রূপে জীবনের আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনের অপরূপ সেতুবন্ধন তৈরি হয়। ব্যবহারিক জীবনের অংশগ্রহণ না থাকলে কেবল আধ্যাত্মিকতা দিয়ে শিল্পের পরিপূর্ণ রূপের উপলদ্ধি পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, The spiritual vision must never be intellectual, philosophical or abstract, it must always give the sense of something vivid, living and concrete, a thing of vibrant beauty or a thing of power’
সুরে নিমজ্জমান সত্তা আধ্যাত্নিক চেতনায় যতই গভীর ও পরিশীলিত হয়ে উঠুক তাকে শিল্পিত হয়ে ওঠার জন্যে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করেই চলতে হয়। কারণ মূলত: বাস্তবই এর ভিত্তি। বস্তুকে কেন্দ্র করেই বাস্তবের অতিরেক এক ভাবনার জগত বিকশিত ও বিস্তারিত হয়। মানব জীবন সামাজিক সত্য। তাই সমাজ ও বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে কোন আনন্দই নিরালম্বভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। সুর ও সাহিত্যের নির্মিতি সাংসারিক, সামাজিক ও ব্যবহারিক ভিত্তিকে কেন্দ্র করেই, অর্থাৎ কোন সৃষ্টিই কেবল অলীক আকাশচারী না। বাস্তব এর ভিত্তিভূমি। না হলে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বাস্তবের অভাবটা সাহিত্যে একটা বড়ো ফাঁকি বলে মনে হয়।যাকে তিনি মাকাল ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাহিত্য ও সুরে যে সত্য প্রকাশ পায় তা কেবল সুরের সত্য নয় আনন্দময় চেতনার রূপান্তরিত সত্য।
জীবন, সুর কিংবা সাহিত্য একটি অন্যটির সঙ্গে দারুণভাবে সম্পৃক্ত। একেবারে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। সুর কিংবা সাহিত্য ভাবেরই প্রকাশ। অর্থাৎ ব্যক্তিক হিসেবে দেখলে তা আপন অন্ত:স্থিত বোধের একান্ত প্রকাশ। এ প্রকাশ আবার দু’ধরণের। একটি বাইরের, অন্যটি ভেতরের। বাইরের প্রকাশ জ্ঞানের আর ভেতরেরটি ভাবের। জ্ঞানে বিষয়কে জানি আর ভাবে বিষয়ীকে। ভাবে বিষয়কে ছাড়িয়ে বিষয়ী মূখ্য হয়ে ওঠে। আর সুরের মধ্যদিয়ে বিষয়ী তার কল্পনার বিস্তার ঘটায়।স্তর থেকে স্তরে নিজেকে উন্নীত করে।চূড়ান্ত কল্পনার এক মায়াময় লোকে তার অধিষ্ঠান ঘটে।আমির আমিত্ব তখন অনন্তময়তার এক প্রজ্ঞাময় স্বরে পরিণত হয়।আর প্রজ্ঞাময় প্রতিভাই রূপময় ও মায়াময় আনন্দের আধার হয়ে ওঠে।
সাহিত্য কিংবা সুরসৃষ্ট আনন্দ কিংবা মায়ালোককে অনন্তরূপ বলা হয়। কারণ এর কোন কোন সমাপ্তি নেই। সুরের রেশ কোনদিন শেষ হয়না। তার নিভৃত গুঞ্জন ভেতরে ভেতরে থামে না। এ যেন এক অন্তহীন প্রবাহ।
আমাদের জীবনধারণ কিংবা বেঁচে থাকার প্রেরণা আসে অন্নময় ও প্রাণময়তা থেকে। কিন্তু আমাদের আনন্দময় প্রকাশের সত্তা প্রাণময় কোষেরই একটা অবস্থান।বিদ্যাপতির কথায় বলতে হয়, যব গোধূলি সময় বেলি/ধ্বনি মন্দির বাহির ভেলি/নবজলধরে বিজুরি রেহা দ্বন্দ্বপসারি গেলি’ । কেবল তথ্য নয়, এর আনন্দময় প্রকাশ আমাদের মাঝে যে অনুরণন তৈরি করে তা মেঘের ভেলায় ভেসে সুরলহরীর দিগন্তভোলানো ডাকে ছুটে বেড়ানোর সঙ্গে তুলনীয়।যা অনির্বচনীয় আনন্দের, ভালোবাসার আর ভালোলাগার। সুরের লহরে শ্রোতা যে আনন্দময় সত্তায় ভেসে যায় তাই এক অসীম রাজ্য। সে অসীমতাই সুরের সার্থকতা তৈরি করে। তাই সুরে ও সাহিত্যে কি তথ্য প্রকাশ পেল তা বিবেচ্য নয়, বরং সেই তথ্য কিংবা সত্য কিভাবে আমাকে আনন্দের চেতনার স্তরে নিয়ে গেল সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।তথ্য এখানে গৌণ, আনন্দই মূখ্য।
এখন প্রশ্ন সাহিত্য, শিল্প, সুর কি কেবল আমাদের জীবনে আনন্দের জোয়ারই আনে? দু:খের করুণ রসে কি মন ভিজে উঠে না? কখনও কখনও তোলপাড় করা স্মৃতির লাটাইয়ে নিজেকে কি শুণ্য ঘুড়ি মনে হয় না? হয়। তুবও কি আমরা দু:খের করাঘাতে মন জর্জিরিত হবে জেনেও তা থেকে নিজেকে বিযুক্ত করি? করি না।কারণ এই দু:খময় অনুভূতিও শেষপর্যন্ত আনন্দময় ধারাই তৈরি করে। করুণরস থেকেও তৈরি হয় আনন্দময় ধারা। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যের ট্রাজেডির কথা উল্লেখ করা যায়। শিল্প সাহিত্যে যে ট্রাজেডি তাতে পাঠক শ্রোতা শেষপর্যন্ত আনন্দরসকেই নিংড়ে নেন।দু:খের কারণ থেকে যে সুখ এর মূলে রয়েছে সুর ও সাহিত্যের উৎপত্তিগত অবস্থান। কারণ তার উৎপত্তি অপরূপ এক মায়ার জগত থেকে। লৌকিকতার স্তর ছাড়িয়ে অলৌকিকতার অপূর্ব সৌন্দর্য থেকে।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দু:খের তীব্র উপলদ্ধিও আনন্দকর, কেননা সেটা নিবিড় অস্মিতাসূচক......গভীর দু:খ ভূমা, ট্রাজেডির মধ্যে সেই ভূমা আছে-ভূমৈব সুখম’।
প্রথমেই লেখাটি যে ঘটনা দিয়ে শুরু করেছি তার সূত্র ধরেই বলছি, সুরের নানা রকম ব্যবহারিক দিকও রয়েছে।এ কথা আমরা যেমন জানি তেমনি মানিও। বিশেষ করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে মিউজিক থেরাপি বলে একটা কথা আছে। সুরের সাহায্যে রোগীকে সারিয়ে তোলা।সুরের আবেশী আবেগ মানুষের শরীরজ ক্রিয়াকে যেমন প্রাণময়তা দেয় তেমনি মনোজগতের বিপুল বিশাল পরিবর্তন ঘটায়।শারিরীক কিংবা মানসিক যে কোন বিপত্তিতে সুরের ইন্দ্রজাল সঠিক পথ দেখায়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নানা ধরণের উপায় গ্রহণ করেন। কখনও গান শুনিয়ে, কিংবা কখনও গান লিখিয়ে অথবা গানের ব্যখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমেও থেরাপির কাজটি করেন।
কথিত আছে, সম্রাট আকবরের সভাসদ মিয়া তানসেনের সঙ্গীত লহরীতে নাকি বৃষ্টি নামতো, আগুন জ্বলতো। তার বাস্তব ভিত্তি কতোটুকু আমরা জানি না। হয়তো এটি শুধুই মিথ। কিন্তু আমাদের যাপিত জীবনের সবকটি পর্যায়ে সুর কিংবা সাহিত্যের প্রভাব যে কতোটা গভীর কতোটা প্রভাব বিস্তারী তা কি আর বলে শেষ করা যায়?