সুদূর কোন নদীর পারে …

অ্যান্ড্রোমিডা: শৃঙ্খলিত রাজকন্যা




সঘন-গহন অনুভবে পর্যবেক্ষণ আর তার বিশ্লেষণে অব্যাহত বুদ্ধিদীপ্ত রসালো শ্লেষ-ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর কৌতুকবোধ গদ্য লেখক রবীন্দ্রনাথের গদ্যের প্রাণ ও পরাক্রম। অবাক করা ব্যাপার হলো তাঁর গানগুলোতে (আঙুলে গোণা দু’চারটি প্যারোডি ছাড়া) শ্লেষ বা ব্যাঙ্গের ছিঁটেফোঁটাও নেই। যা আছে ভারিক্কী ভাষায় তাকে বলা হয় ‘ভাব সম্পদ’ আর ঐশ্বর্য, অথবা আমরা যারা ভাবে-ভাবনায় তত ভারিক্কী নই, আমরা বলতে পারি আবেগ কিংবা আহ্লাদ, স্বপ্ন কিংবা মাধুরী অথবা - এই সবই। ঐ যে অধরা মাধুরী - রূপের কোলে দোলে যে অরূপ, তাকেই তিনি ধরেন ছন্দোবন্ধনে। বিশ্ব হতে হারিয়ে গেছে স্বপ্নলোকের যে চাবি - ঐটি খুঁজে আনবার অসম্ভব কাজটি তিনি স্বেচ্ছায় নিয়ে নেন এবং সফল হয়ে ওঠেন কী অবলীলায়। গদ্যের যুক্তির ঝিলিক, বুদ্ধির শানিত দেদীপ্য ভঙ্গির জায়গায় তাঁর গানে কেবল রসের স্রোতে রঙের খেলাখানি …
“গান লিখতে যেমন আমার নিবিড় আনন্দ হয় এমন আর কিছুতে হয় না। এমন নেশায় ধরে যে, তখন গুরুতর কাজের গুরুত্ব একেবারে চলে যায়, বড়ো বড়ো দায়িত্বের ভারাকর্ষণটা হঠাৎ লোপ পায়, কর্তব্যের দাবিগুলোকে মন এক-ধার থেকে নামঞ্জুর করে দেয়[1]।” বললেন রবীন্দ্রনাথ এবং তিনিই লিখলেন, “গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি / তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি। / তখন তারি আলোর ভাষায় আকাশ ভরে ভালোবাসায় … তখন দেখি আমার সাথে সবার কানাকানি ॥” যখন তারি আলোর ভাষায় আকাশ ভরে ভালোবাসায় তখন কর্তব্যের দাবিগুলোকে মন এক-ধার থেকে নামঞ্জুর করে দেয় …
তখন তারি আলোর ভাষায় আকাশ ভরে ভালোবাসায় আর তখনি আমি আর আমরা টের পাই ... হঠাৎ খবর পাই মনে … এ গান যেখানে সত্য, সেইখানে বয়ে চলে ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা অথবা যে কোন আবেগমাখানো নদী। পৃথিবীর যাবতীয় নদী সব হেজে-মজে নাই হয়ে যাক, তবু এই ধলেশ্বরীর আর কোন শেষ নেই, মৃত্যু নেই, ‘তব মনোভূমি অযোধ্যার চেয়ে সত্য’ … কত কী লিখেছ রবি নাথ ! ভাবোনি তোমার মন্ত্রোচ্চারণ কতজনকে পথ দেখাবে, কতজনকে পথ হারাবার পথ। পথহারার সেই পথ খুঁজে পাবার কত মন্ত্র দিয়ে ভরা তোমার গানের গুচ্ছ আর গল্পসারি।
রবি নাথ, সেই যে লিখেছিলে, যদি তারে নাই চিনি গো, সে কী আমায় নেবে চিনে? বড় ভুল লিখেছিলে। প্লিজ না, আমারে না হয় না জানো, সে বরং অনেক ভাল। সেই ভাল। যারে আমি চিনিনি, তারে ‘চিনিলে না আমারে’ বলার ন্যাকামো আর অসম্মান দিও না আমাদের … দ্বারে এলেও তার তরী যাক ফিরে; তার ফিরে যাওয়াই ভালো। তার চেয়ে আমি সত্য, তার চেয়ে আমিই বরং ঘাটে ঘাটে ঘুরবো না হয় ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী ! রবি নাথ এবার লেখো, মোর ভাগ্যতরী এটুকু বাধায় গেলো ‘ঘুরি’ … ওরে আমারে যে বাঁধবে ধরে সেই হবে যার সাধন, সে কী অমনি হবে ? অমনিই হবে রবি নাথ? আমার বলে যা পেয়েছি শুভক্ষণে যবে, তোমার করে দেব তখন কারা আমার হবে ? কেউ না, স্রেফ কেউ না । দেয়ার ইউ আর আ স্টুপিড, ডাম্ব ফুল এবং কেউই তোমার না। যে আমারে দেখিবারে পায়, অসীম ক্ষমায়, তাকে ছাড়া সমর্পনের প্রশ্নটিই ভুল, সেই কথাটি গেলাম ভুলে ? তবে ? তবে সন্ধ্যায় দেখ তপ্ত দিনের শেষে ফুলগুলি সব ঝরা !

তার চেয়ে অকূল-মাঝে ভাসিয়ে তরী যাবোই অজানায়, আমি শুধু একলা নেয়ে আমার শূন্য নায়। তাতে সেও হয়তো রক্ষে পাবে, আমিও তথৈবচ। ওরে, ওরে মন যখন জাগলো না রে, তখন তার ফিরে যাওয়াই ঠিক … বরং পরান খুলে ডাক ডাক, ফিরে ফিরে ডাক দেখি রে … যারে অমন করে বাইরে থেকে ডাকবো না, আনবো ডেকে অদেখাকে দক্ষিণ সমীরণে চম্পক-রঙ্গনে-কিংশুকে-ক াঞ্চনে, ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধ্যায় তারই গানে দাবী আমার যার অধিকার আমার গানে?
তারই গানে দাবী আমার যার অধিকার আমার গানে? তবে ? তবে, যার গানে আমার দাবীর স্বীকৃতি নেই, আমার গানে তার অধিকারও অস্বীকার করলাম। সেও তো নাথ, তোমারই শিক্ষা, নাথ হে। পূজা দিয়া পদে করি না ভিক্ষা, বসিয়া করিনা তব প্রতীক্ষা … তারেই যদি প্রয়োজন পড়ে, আনিব তাহারে বাঁধিয়া, তবু, রসের নিবেদন অরসিকে, ললাটে লিখো না হে।
বলো তো, যে আমারে চিনতে পারে সেই চেনাতে চিনি তারে … সে চেনে কিনা, তাও তো সেই আলোতেই দেখি … যে চিনে নিলো বলে ভেবে নেই, সে আসলেই চিনে নেয় কতোটা ? যখন নিজের ইচ্ছের রঙ ঢেলে দেখে, চেনে সেই রঙমাখা ছবিখানা ? যে আপন রঙেই শুধু ফুল রাঙায় এবং প্রাণ কিনে নেয় ! নবফাল্গুন দিনে তারে পরান বেচে দিয়ে সে বেঁচে থাকি কী করে ? অশুভ ! ফস্টাস বাঁচতে গিয়েই মরেছিল | তবু, জানি নে ?
জানি জানি সে এসেছে এ পথে মনের ভুলে … সে যাক, দ্বার দিলেম খুলে !
রবি নাথ, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম; আর সত্য যে আপেক্ষিক, সেই সত্য ভুলে থাকলাম ? যে রূপের কোলে দোলে ঐ অরূপ মাধুরী, তার ছাঁচ প্রত্যেকের জন্যেই আলাদা। পুরোপুরি। সে কেবল নিজের মনের মাধুরীতে তৈরী, ‘টেইলর-মেইড’। সেই অরূপ রতনটি যে চায়; সে কী অমনি হবে ? রবি নাথ জানো না কি, যখন ছিলেম অন্ধ, আমি পাই নি তো আনন্দ । জেনো, আমাকে যে কাঁদাবে তার ভাগ্যে আছে কাঁদন, আর সেও অমনি হবে। যদি তারে নাই চিনি গো, জেনো, সেও মোর পায় নাই পরিচয় ! সে অবোধ যারে জানে - সে যে কেহ নয় ! আমি ঐ সব অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে রোজ - আসি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায় !

শৈশবে গান গাইবার তালিম পেয়েছিলাম। তো ঠাকুর সঙ্গীত ঠিকঠাক শিখবার প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের ভাবনার পাঠ নিতে হতো। তাতে নির্দেশ ছিলো, গাইতে হবে চোখ বুঁজে। চোখ গোল গোল করে শ্রোতার দিকে, জগৎ সংসারের দিকে তাকিয়ে যে গাওয়া - তাতে গানে গোল বেঁধে যায়, তার প্রাণপাখিটা অক্কা পায় আর গান যায় গোল্লায়। তো নয়ন মুদেই দেখি ‘আমায় বাঁধন বেঁধেছে,’ শব্দের যমকে-ঝঙ্কারে-অনুপ্রাস আনন্দে ভেসে যাই … সুদূর কোন্‌ নদীর পারে, গহন কোন্‌ বনের ধারে, গভীর কোন্‌ অন্ধকারে - সে হতেছে পার ?
পরানসখা, বন্ধু হে আমার !
ও বন্ধু আমার,
না পেয়ে তোমার দেখা একা একা একা একা একা …
ঐ শব্দ-ঝঙ্কার পেরিয়ে গিয়ে যেই ছবিটা ভেসে ওঠে, সে আমার চিরকালের গান: আমার চোখের আল্টিমেট ছবি, সঘনতম অনুভব, চূড়ান্ত পাওয়া ! তার পথ কখনও ফুরায় না ! সুদূর নদীর পারের গহন বনের ধারে তার অন্তহীনপথগভীরঅন্ধকার েঢাকা … কূজনহীন কাননভূমি, দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে, একেলা কোন্‌ পথিক তুমি পথিকহীন পথের 'পরে ???
ওরে রবীন্দ্রনাথ: মল্লারে-ঝম্পকে চঞ্চল চরণে-চলনে কী পরম গহন স্থির এক চিরকালের গান বেঁধে গেলে ?
যে দিন আকাশ কাঁদে হতাশ-সম, নাই যে ঘুম নয়নে মম-- আমি বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই, তাহার পথ কোথায় ভাবি তাই … পথ চেয়ে থাকা মোর দৃষ্টিখানি, শুনিতে পাও কি তাহার বাণী ! যখন আলোক নাহি রে, আমি তবু দেখি ঝোড়ো সে নদীর তীর, চোখের আলোয় চির-অদেখা সুদূর কোন নদীর পারের অন্ধকার পার হয়ে সে আসে ... অন্তহীন তার পথচলা … আমি তারেই জানি, তারেই জানি আর দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার … তবু … মোরে বারবার ফিরালে ! আসো নাই তুমি ফাল্গুনে যবে ছিনু আমি ভরসায়, এসো এসো ভরা বরষায় … জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি, এসো গো … শ্রাবণসন্ধ্যায় সেইদিন আমার ভিখারি মন ঠিক ফিরবে রাজার মতো …
আর এভাবেই রবি নাথ ওহে নাথ, এভাবেই ঐ খোঁজ-বাতির-আলো ঢেলে পথহারার পথের দিশা দিয়ে কত ভাবেই না নবজীবনের শিখরে দাঁড় করাও আমারই মতন কতজনারে, কত অভাজনেরে … এভাবেই তুমি আমারে ও আমাদের অশেষ করেছো … ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছো জীবন নব নব, আর আমি অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে এসেছি ...

তুমি বাঁচিয়ে দাও বারেবারে । সুড়ঙ্গের মুখে যখন কোথাও আলো থাকে না, তখন মাটি ফুঁড়ে আমার সুপ্তদৃষ্টি উপস্থিত তোমার গভীর অন্তর্দৃষ্টির নির্ভুল নির্দেশনায় । ভুল কি করোনি ? করেছো, তবু বেলা অবেলায় সে ভুল ছাপিয়ে বারেবারেই উপচে পড়েছে তোমার নিগূঢ় আনন্দধ্বনির প্রগাঢ় ধারা, জীবনের জয়গান। কেবল বাইরের যুদ্ধে নয়, নিজের গভীরে অহর্নিশ জেগে থাকা গাঢ় সম্মানবোধটুকু সেই জয়গানের প্রাণ। তাই নিয়েই অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসি আমি ও আমরা প্রতিদিন নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায় …
ঐ যে বর্ণাঢ্য চিত্রাঙ্গদা[2]- সেই রাজেন্দ্রনন্দিনীকে যা দাওনি, আশ্চর্য, দিয়েছিলে মৃণালকে[3]I দুর্গম পাড়াগাঁয়ের, দিনের বেলায় শেয়ালডাকা পাড়াগাঁয়ের মেয়ে মৃণালকে দিলে অমিততেজ আর নিবিড় অহম, পরিত্যাজ্যকে অবলীলায় ত্যাগ করার অতি দরকারী শক্তিটুকু। দিয়েছিলে আপাতঃকোমল লাবণ্যকেও। সমস্ত যুদ্ধশৈলী-শক্তি এবং রাজক্ষমতা নিয়েও চিত্রাঙ্গদা যেই মনোবাধা পেরুতে পারেনি, ‘সম্মতি দাও যদি’ বলে অনায়াসে নত যে রাজেন্দ্রনন্দিনী, তার বিপরীতে কী উজ্জ্বল সাধারণ পরিবারের অসাধারণ সম্মানবোধসম্পন্ন এই বলশালী নারীরা। ছেঁড়াছাতা আর রাজছত্রে ফারাক করলে না তোমার সৃষ্টিতে ! ব্যক্তির শক্তির মূল পরিচয়টাকেই, চরিত্রের নিজস্বতাকে আমলে নেবার এই যে মনোভঙ্গী, ঐখানে তুমি নমস্য হয়ে রইলে রবি নাথ। তোমার গানেও কি তার ঝিলিক পাইনি ? যদি থমকি থেমে যাও পথমাঝে, আমি চমকি চলে যাবো আনকাজে।
তোমার শক্তিসূত্র - আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া, তাদের ভিতর আপনি জেগেছিলো ! তাই তো, যে বিন্দুর পাশে দাঁড়াবার সাহস তার আপন মাসীর হয়নি, সেখানে মৃণাল শুধু দাঁড়িয়ে গেলো না, সেই অপরূপ কিশোরীর প্রতি তার মমতার নিক্তিতে নিজের অবস্থানকে মাপবার সহজ সাহসে এবং তার বিপরীতে সিদ্ধান্ত নেবার স্পর্ধাতেও অসামান্য হয়ে রইলো। কেবল মুখশ্রীর গুণে সন্ধান করে আনা এক বালিকা সংসারের যাবতীয় গ্রন্থির মধ্যে দিয়ে পরিণত হবার ধাপে ধাপে আপন অন্তরের শক্তিতে-বুদ্ধিতে, অনুভবে-অনুধাবনে-সংবেদ ে হয়ে উঠলো অনন্যা; বাইরের রূপটুকুকে স্বীকার করেও তার মনের প্রখর আভিজাত্যে আঁচ লাগানোর অপরাধে পরিত্যাগ করে এলো প্রাত্যহিক জাগতিক সমুদয় স্বাচ্ছন্দ্য এবং বাহ্যিক স্বাচ্ছন্দ্যদাতাদের !
এইসবের মধ্যে দিয়ে আমদের তুমি খুব স্পষ্ট করেই জানিয়ে দাও যে, সেইখানেই আসলে ব্যক্তির শুদ্ধ রূপ, আপন শক্তি। যে শক্তিময়ী পূর্ণ মমতায় বলে ওঠে “আমার ঘরকন্নার মধ্যে ঐ অনাদৃত মেয়েটার চিত্ত যেদিন আগা গোড়া এমন রঙিন হয়ে উঠল সেদিন আমি বুঝলুম হৃদয়ের জগতেও একটা বসন্তের হাওয়া আছে -- সে কোন্‌ স্বর্গ থেকে আসে, গলির মোড় থেকে আসে না।”[4] সেই বসন্ত-হাওয়াকে ভালবাসবার এবং তাঁর ভালোবাসার সম্মান চাইবার আত্মসম্মান বোধ তাঁর ছিল বলেই মৃণালের সংসার ত্যাগ। দেড় দশকে যে তাকে চেনেনি, তিন দশকেও সে আর চিনবে না, এই আপ্ত সত্য জেনে ও মেনে নিয়েই সে মেনে নেয়নি নিজের ওপরে তার প্রয়োগ। তার ঐ বর্জন, ঐ অবজ্ঞার ভেতরেই রবি নাথ, তোমার সেই গানের বাণীর উত্তর। সেকী আমায় নেবে চিনে? জানিনে ? খুব জানি। তোমার স্বীকারোক্তি তো জানাই যে গান বাঁধবার সময় তোমার “বড়ো বড়ো দায়িত্বের ভারাকর্ষণটা হঠাৎ লোপ পায়” ! তবু, তোমার গানেররঙ্গভূমিতে যখন হাতে গোনা অভিনেতারা আপন আপন অংশ অভিনয় করে, তখন সংসাররঙ্গভূমিতে কত স্থানে কত অভিনয় চলে তার আর শেষ নাই। গানের ভিতর দিয়ে যে আদর্শ সুন্দরের পূজা করে গেছো রবি নাথ, তার অনুভব নয়ন মুদেই ভাল, তার উপভোগে চাই ‘অবিশ্বাসের স্বেচ্ছানিরোধ’। প্রতিদিনের জীবন-যুদ্ধে জিতবার জন্য চাই তোমার সোহিনী[5] কিংবা লাবণ্য[6] অথবা মৃণালকে। তোমার গানের গুচ্ছের পাশে গল্পসারিকে ঠাঁই দেওয়াও তাই খুব জরুরী। রবি নাথ, তোমার গানের লীলার সেই কিনারে যোগ দিবো যতটা ভালবেসে, জগৎকে ততটাই দেখবো তোমার গদ্যের মেজাজে - তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে, অবিচল বিশ্লেষণে, ঈর্ষাহীন সদা-সদর্থক জীবনবোধে। “গ্রামের মধ্যে আর সকলেই দলাদলি, চক্রান্ত, ইক্ষুর চাষ, মিথ্যা মকদ্দমা এবং পাটের কারবার লইয়া থাকিত, ভাবের আলোচনা এবং সাহিত্যচর্চা করিত কেবল শশিভূষণ এবং গিরিবালা[7]।” ইহলোকের বিচিত্র ও বহুবিধ কুশ্রী জঞ্জাল পেরুবার অভিজ্ঞতা নিয়েও তোমার শশি আর গিরি একদিন কীর্তনের আখরে লীন।
আমাদের কন্যাদের-পুত্রদের, কন্যাসম-পুত্রসমদের বলি - গান গেয়ে-শুনে যাও আপন আনন্দে। সে নয়ন মুদেই ভাল। কিন্তু পার্থিব পৃথিবীর পথে পথে চোখ দুটো খোলা রেখো ব্যাপ্ত বিশাল - তিনশো ষাট ডিগ্রীতে। কবির গান আর গদ্যের মেজাজের ফারাকের মতোই, তার প্রতি তোমাদের তাকাবার ভঙ্গীটি হোক আলাদা, আলাদা হোক আচরণ।

তবে, কার মিলন চাও বিরহী ?
নিবিড় ছায়া গহন মায়া, পল্লবঘন নির্জন বনে, শান্ত পবনে কুঞ্জভবনে যে জাগে একাকী … তার। বসন্তে বসন্তে সেই কবিরে দিই ডাক … যেই সুধারসপানে ত্রিভুবন মাতে তাও মোরে দাও … নূতন প্রাণ দাও … অন্তর যেন জড়াতে না যায় জালজঞ্জালগুলিতে … ভয় ভাঙা নায়ে যাই, আলোর ঐ ঝর্ণাধারায় আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুয়ে নিয়ে চলে যাই আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে উৎসাহে-সম্মানে, দাবীতে-অধিকারে, উচ্ছল-উচ্ছাসে।
অচেনাকে চিনে চিনেই উঠবে জীবন ভরে; তবে কিনা চিনতে হবে; অথবা ফিরাও তারে ব্যর্থ নমস্কারে। যদি বাঁধা পড়েও থাকো, ওরে অবোধ, বন্দী প্রাণমন হোক উধাও, শুকনো গাঙে আসুক জীবনের বন্যা, উদ্দাম কৌতুক, ভাঙনের জয়গান গাও নির্ভয় | পষ্টাপষ্টি ভেঙে দাও অটুট বলে জানা বাঁধন। প্রবচনের শূন্য গোশালা বরং অনেক ভাল । বল ওরে বেহুদা-বেঠিক, আমারে না হয় না জানো। সুদূর কোন্‌ নদীর পারে গভীর কোন্‌ অন্ধকার যে হতেছে পার, তার জন্য একজন্মের অপেক্ষাও মধুরতর, নষ্টসঙ্গে জীবন ব্যয় করার চেয়ে তো সহস্রগুণে …

________________________________________
[1] পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি হারুনা-মারু জাহাজ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯২৪
[2] নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা
[3] স্ত্রীর পত্র / গল্পগুচ্ছ
[4] স্ত্রীর পত্র / গল্পগুচ্ছ
[5] ল্যাবরেটরি / তিনসঙ্গী
[6] শেষের কবিতা
[7] মেঘ ও রৌদ্র