অনঙ্গ শৃঙ্গার

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য



রাত্রির চক্রে কোনো মন্ত্রধ্বনির দিকে অবাক তাকিয়ে থাকে পৃথিবী। আর তুমি চিরদিন গীতবিতান, একটি গানের ভিতর থেকে তাকিয়ে আছো ঘরজুড়ে, একটি সতর্কবার্তার মুখোমুখি যেনো বা একটি প্রার্থনার রূপ, অনুরূপ তুমি বুঝতে চাইলে নিজের বাইরে একটি বাতাস গাছ উপড়ে এলোমেলো করে ঘর। এবং আরো প্রলোভনসঙ্কুল দৃষ্টিতে অব্যাহত থাকে। আমিই সেই এলোমেলো বিবাগী ঘর।

তোমার চিত্রাঙ্গদাপর্বে আমি একটা জিরাফ এঁকে দিই। কালো রঙে। তুমি মধ্যে মধ্যে এমন কিছুর সন্ধান দাও যা আর কেউ পারে না। ওপরে ওঠতে ওঠতে, মেঘের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে, পাশে পাহাড়ের খাঁজে, মাথায়, বুকের ভাঁজে মেঘের শৃঙ্গার দেখতে দেখতে আমার প্রথমেই যে কথাটা মনে হলো, এমন সুন্দরকে তোমার সঙ্গে বসে না দেখলে কখনো পূর্ণতা পাবে না। আমার মনে হলো বৃদ্ধ বয়সে হলেও একবার তোমার সঙ্গে যাবো আবার সেইসব সুন্দরের পেটের ভিতর। পরদিন মনে হলো, আমার আর কারো কথা কেনো মনে হলো না? উত্তর পাইনি। নিজের কাছে আশ্চর্য লাগছে নিজেকে। আসলে তুমিই আমার নারীসত্তা।

তোমার কণ্ঠ নীল, একটি চিৎকার ছুঁয়ে তীব্র কালশিটে দাগ বেরিয়ে চিত্রাভ শরীর থেকে। জল থেকে অপহৃত বাতাস যেমন পাতলা ঘনত্বের মধ্যে তার নখ ও নখরে চিরে দেয় বনান্তরের অনুভূতিকে, ঠিক তেমনিভাবে তোমার শরীরের সঙ্গে বেজে ওঠে আনন্দগান। এই গানের মুক্তি এই জগতে, তার ঠান্ডা পায়ের নিচে আশ্রয় নেয়, যেখানে সঙ্কুচিত নীল মাথা ঢাকবার জন্য একটি জাল আছে। প্রতিটি নৌকা একই সঙ্গে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য। আমি তোমার পা ছুঁয়ে দিই আমার বরফহাতে।

তারপর মুখভঙ্গি খেলাচ্ছলে তুমি শোনালে বন্ধবাতাস এবং তার হৃদয়ের কম্পনের ইতিকথা। তার তীরে অদ্ভুত দূরবর্তী সুন্দর ভাঁজ খোলে, যেন এটা একটি প্রাচীন মানচিত্র, নিজেই নিজের মধ্যে অধিষ্ঠিত। তোমার নীল শিরা, নীল চোখ, চোখের পাপড়ি সকল অসুন্দরকে গ্রাস করে।

তোমার পূজাপর্ব থেকে বের হয়ে আসো, তুমি দুইচোখ বুজে আমার রক্তের ভিতর ঢুকে যাও। দেখো, কেমন করে তৈরি হয় গানের কথা। গানের কথাগুলি কাক হয়ে যায়। আমি তো কাকতাড়ুয়া নই। আমি নিজেই কাক। চলো, চিড়িয়াখানার জিরাফগুলোকে বের করে নিয়ে আসি। তারপর আসো তোমার সঙ্গে ঘুরি। আর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক। ঝড়ে ভেঙে পড়ুক শিরীষগাছের শুকনো ডাল। আর তুমি আমার হাত ধরে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামিয়ে নাও। আর নীরবে হেসে যায় তিনটি জিরাফ।

যে অজাত নোনা পৃথিবীর এত গভীর প্রণয়, আকাঙ্ক্ষা যেমন অনুভূত হবে তা থেকে অপহৃত রাস্তার আলো, মানে সোডিয়াম লাইটের অধীনে নীল ছায়া হাতাহাতি করে। মেঘ আর চাঁদ ভিড় করে।তুমি কার মুখ বহন করে দাঁড়িয়ে থাকো উত্তরের রাস্তায় প্রশ্নের আকরে? একটি মধ্যরাত্রির পুকুর, জবুথবু ফিরে আসে যে প্রথম বাড়ি ছেড়ে জলাশয়ে নেমে গিয়েছিলো রাত্রিপাওয়া সেইসব জিরাফের মতো।

তুমি জগতের সকল পুষ্পভার আমার হাতে দিয়ে হাসো। তোমার চোখের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে আমার রঙিন দীর্ঘশ্বাস। তোমাকে বুঝতে দিই না। বুঝতে না দেয়ার মধ্যে একধরনের আনন্দময় যন্ত্রণা আছে। সেটা সুন্দর। এবং তা থেকে সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি মনে মনে চেয়েছি। আমি মনে মনে চাইলে হয়, তুমি আমার হাত ধরো। এই আনন্দ আমি লুকিয়ে রাখি আমি আমার দীর্ঘশ্বাসের ভিতর।

তুমি কি দেখতে পাচ্ছ একটি শস্য অথবা একটি তৃণভূমিকে নদী ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে? ধানের মধ্যে বায়ুর মধ্যে তুমি তোমার হাত ঘষা পাতার মর্মরধ্বনি শুনতে নেচে বেড়াচ্ছো তোমার মতো। আমি সেইদিন সন্ধ্যায় ব্রিজের ধারে দাঁড়িয়ে তোমার জন্য একজোড়া ঘুঙুর কিনতে চেয়েছিলাম, জানো!

তোমার গুনগুন করা গান আমার বুকের ভিতর ঢুকে পড়ে। তোমার গানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকি তারপর। একটি বারান্দায় প্রাচীন এক কণ্টক দিয়ে গেঁথে রাখি উড়ুক্কু মৃত্যুসমগ্র। একটি নির্জন ফুল সেই মৃত্যুর পাশে বেড়ে ওঠে। আর রং বদল করে প্রতিদিন। প্রতিদিন বদলে যায় তার আলো ও অন্ধকার। প্রতিদিন বিভাবরী রাত আসে তোমার পায়ের পাশে নক্ষত্রের রূপ ধরে। সেইসব রাতের সৌম্য উপস্থিতি আমি ভালোবাসি। আমি দুঃখ ও আনন্দের ভিতর তোমার মুখ মনে করি।

আমি তোমার নারীসত্তা। আমি একটি ভাঙা হাসি ও হাজার স্মৃতির শিয়রে মধ্যরাত্রির হাওয়াকে আপন করে তোমাকে যাচনা করি। জলসংগীতে নৌকাবন্ধ ঘাট, পাখি ছেড়ে যায় সন্ধ্যার আকাশ। তারা একটি জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চেহারাহীন ওড়ে ওড়ে করে অর্থহীন ক্রন্দন। বিন্দু নেই, কাউকে স্মরণ করতে যে আকাঙ্ক্ষা লাগে তা তোমার ছোট রাত মনোমোহন কান্নার অখণ্ডতা থেকে উত্থিত। তুমি তো সেইই গীতবিতান যে আমার এই ভাঙাজগতের চিরবাহন, অনঙ্গ শৃঙ্গার।