পুনর্জন্ম

ঋতুপর্ণা সরকার



১। মেয়েটা রোজ সকালে একটা নদীকে গান শোণাতে যেত। ভোর হতে না হতেই চুপচাপ পায়ে বাড়ীর উঠোন পেড়িয়ে এক দৌড় । সামনের গলির রাস্তা ভোরবেলা শুনশান । আরেক দৌড়ে গলি পেড়িয়ে বড় রাস্তা। ভোরবেলা শুধু দুএকটা সাইকেল আর কয়লার গাড়ি দেখা যায় । রাস্তা পেড়িয়ে একটা মাঠ । মাঠের পরে রেল কলোনির কোয়াটার্সগুলো শীতের ভোরে নিঝুম ঘুমে । কেবল কোনও কোণও বাড়ীর পেছন দিয়ে কয়লার উনুনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে । ভেসে আসছে জলে ভেজানো চা পাতার গন্ধ । তার সাথে মিশে যায় শাল আর ইউক্যালিপটাসের খুশবু। ফুসফুস ভরে শ্বাস নিয়ে ওই রাস্তাটা পেরোলেই নদীর গন্ধ ! ক্লোরোফিলের মত তাজা সুবাস জড়িয়ে ধরে মস্তিস্কের প্রতিটি কোশকে !ঘন বালির চর পেরলেই কানে আসে নদীর ডাক। নদীর পাড়ে বসে কান পেতে শোণে মেয়েটা । নদী আজও ভোরে ভৈরব গাইছে না ।এই নিয়েই তো ঝগড়া তার নদীর সাথে । ‘ভোরের রাগই যদি রোজ গাইবে তবে আমি অন্য রাগ শুনব কখন মেয়ে ? ভীমপলশ্রী শোনাবে না? আহা !’ মেয়ে গাল ফুলিয়ে বলে ‘ ওটা গাওয়ার সময় দিবা তৃতীয় প্রহর।’
‘তখন তো তোমার ইশকুল থাকে গো ! আচ্ছা তবে পূরবী শোনাও।’
‘ওটা সন্ধ্যের রাগ নদী। দিনের অন্তিম প্রহর।’
‘তখন তুমি কি কর? হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়াশোনা কর? না তোমার অঙ্কের মাস্টারমশাই আসেন?’
‘হ্যাঁ’
‘তবে তুমি গাইবে না রাগ গুলো?’
‘গাই তো। মাস্টার মশাই যখন দেন তখন সকালে আর বিকেলে এসে রোজ গাই।’
‘তবে আমায় শোনাও না কেন মেয়ে?’
‘তুমিও তো গান গাও রোজ।’
‘হ্যাঁ গাই তো। কত যুগ ধরে এই পাথুরে জমি ভাঙতে ভাঙতে বয়ে চলেছি! তোমরা দেখছ আমার বুকে বালি। ওগুলো আমার যন্ত্রণার চিহ্ন। আর সেই যন্ত্রণা ভোলার জন্য গান গাই আমি। সবাই শুনতে পায়না সেই গান।’
‘কেন? আমি তো পাই ।কালই তো ভোরবেলা ইমন গাইলে বলে বকুনি দিলাম’।
‘যাদের সুর জাগ্রত হয় নাভি থেকে , যাদের সুরের ধ্যানে জাগ্রত হয় ইড়া পিঙ্গলা, শুধু তারাই শুনতে পায়। আর শুনতে পায় তোমার মত ছোটরা।’
‘ হ্যাঁ। মা বোলত সোনা ভোরবেলা উঠে আগে তানপুরাতে ওম কর অন্তত আধ ঘণ্টা । তারপর এক ঘণ্টা শুধু পালটা সাধ। সুর যেন নাভি থেকে ওঠে, গলা দিয়ে গান গেয়ো না।’
‘ মা তো ঠিকই বলতো। মা যে ছোটো থেকে তোমার দাদুর রেওয়াজ শুনে বড় হয়েছে । তোমার দাদুর হারমোনিয়াম আর তানপুরাই তো তুমি ব্যবহার করো।’
‘ কিন্তু মা নিজে তো গান শেখেনি! নাচ করত খুব ভালো।’
‘সে তো ছোটোবেলায় দুষ্টু ছিল বলে গান শেখার কথা বললেই গাছে উঠে বসে থাকতো তোমার মা। তোমার থেকেও ছোট্ট ছিল তখন।’
‘তুমি জানলে কি করে?’
‘আমি সব জানি। নদীরা সব জানে ।’
‘তবে বলো মা কেন এতো তাড়াতাড়ি আমাকে ছেড়ে মরে গেল ?’
নদী চুপ করে যায়। একঘেয়ে ভাবে বয়ে চলে। গান থেমে যায়। মেয়েটা চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। শীতকালে নদী বড় শীর্ণ। চতুর্দিকে বালির চর। নদীর বুকেও কত চর। কোনরকমে ধুঁকে ধুঁকে নদী বয়ে যায়। বর্ষায় এই নদীকে চেনাই যায় না ! ফুলে ফেঁপে দুকুল ভাসিয়ে বয়ে যায়। বড় ভয় করে মেয়ের। বর্ষাকালে ওর জন্ম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দূর থেকে নদীকে দেখে। কাছে যায়না কখনো! যদি ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়? তবে বাবার কি হবে? বাবাকে কে দেখবে? সেই ভয়ে শীতকালেও ও মালকোশ , মেঘমল্লার শোনায় না নদীকে। নদীর পাশে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে থাকে যদি নদী ওকে মালকোশ শোনাতে বলে। মনে মনে গায় আলাপ, বন্দিশ। মুখে বলে ‘জানিনা গো। শেখা হয়নি’। একদিন মালকোশের আলাপ ভুল করে গুনগুন করে ফেলেছিল। নদী যেন সঙ্গে সঙ্গে ফুলে উঠেছিল! শীর্নকায়া নদীতে হটাত্ জলের কোলাহল! পাথরে সেই জল ছিটকে বিন্দু বিন্দু হয়ে চোখে মুখে পড়তেই মেয়ে ভয় পেয়ে চুপ করে গেল। নদী হাহাকার করে বলল ‘চুপ কেন করলে? আরেকটু গাও মেয়ে... আরেকটু!’ হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁপছিল সে। বাবার কি হবে?
২।
মেয়েটা এখনও গান শোণায় নদীকে। তবে এ নদী অন্য নদী। পড়াশোনা করতে এসেছে বীরভূমের লাল মাটির দেশে। সেখানেও খুঁজে পেয়ে গেছে আরেক নদীকে । লালমাটির ভাঁজে ভাঁজ ফেলে বয়ে চলেছে সে। খাত এর দিক পরিবর্তন করে পেছনে ফেলে আসে সে খোয়াই। অন্ধকারে সেই খোয়াইয়ের পাড়ে বসে থাকে কত প্রেমিক প্রেমিকা। মেয়েটা তার সাইকেলটাকে গাছে ঠেস দিয়ে রেখে একা বসে থাকে। হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে কান পেতে শোনে ঝিঁঝিঁর ডাক।সন্ধ্যায় পাখিদের বাড়ি ফেরার ডানার শব্দ। মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে কোন পাখি। অবিকল কড়ি মা ! নদীর ঝিরঝিরে শব্দ, পাতার নিঃশ্বাস, শিশিরের ঘাসে পা ফেলা... তালযন্ত্রের দরকার কি? সবই তো মধ্যলয়ে বাঁধা। তালে তাল মিলিয়ে গুনগুন করে ওঠে ... নিভৃত প্রানের দেবতা। পুরবী রাগ আবার আসে তার কোমল রে, কোমল ধ নিয়ে! আশ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। গান শেষ হয়েও থামতে চায়না। কখন ঢুকে পড়েছে সে আলাপে, বন্দিশে ,বিস্তারে। সন্ধ্যা নামে ঘন হয়ে। নদীর জল চাঁদের আলোতে জ্বাল দিয়ে হয়ে ওঠে আরও গাঢ়। মেয়েটার মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার সেই নদীটির কথা।‘সময় মিলিয়ে গান বাছবে মেয়ে? তবে তো সব গান শোনা হবে না আমার’। শোনানো হয়নি সব গান এখনও সেই নদীকে। ঋণ রয়ে গেছে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে সে যায় এখনও। কিন্তু নদী এখন আরও নিস্তেজ। পাড়ে বসে চুপ করে থাকে সে। দূরে শ্মশান থেকে পোড়া গন্ধ ভেসে আসে। গন্ধটা নাকে এলেই মনে হয় মা কে তো এখানেই...। চিতাভষ্ম এই নদীতেই কি? কে জানে! ওকে তো শ্মশানে আসতে দেয়া হয়নি। কিছুতেই আর মালকোশ গাইতে পারল না ও। নদী যদি ভাসিয়ে নেয় সব কিছু? ওর বাবার কি হবে?
৩।
ছোট্ট মেয়েটা তার মায়ের হাত ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। ভোরবেলা উঠে দুজনে বেড়িয়ে পড়েছে। মেয়েটার গায়ে গোলাপি সোয়েটার। মাথায় গোলাপি টুপি। টুপির চারপাশ দিয়ে কোঁকড়ান চুলগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছে ফোলা ফোলা মুখের চারপাশে আর চোখের ওপর। যে চোখগুলো এখন অবাক হয়ে দেখছে চারপাশ। দাদুর বাড়ি আগেও এসেছে কিন্তু এত ভোরবেলা মা ওকে নিয়ে তো বেড়োয়নি কখনো। মায়ের হাত ধরে পেড়িয়ে গেল গলি, বড় রাস্তা, মাঠ, রেল কোয়ার্টারস, বালির চর। দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মা দেখছে নদীকে কতদিন পর। বয়ে চলেছে একইভাবে। শুধু বড্ড বেশি শীর্ণ। বড্ড বেশি বালির চর। বড্ড বেশি যন্ত্রণা। মেয়ে দেখছে বালির চরের মাঝে জলের রেখা। কান পেতে শুনছে।
‘মা, নদীটা গান গাইছে যে !’
‘তুই শুনতে পাচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ। তুমি সেদিন যে শেখালে ইমন। নদীটা গাইছে শোন। ইমন! এখন কেন গাইছে ইমন ? গুরুজি যে বলেন ইমন গাওয়ার সময় হল রাত্রি প্রথম প্রহর।’
‘গুরুজি ঠিকই বলেন পুপে। তবে দিন বা রাত তোমার মনে। তোমার মস্তিস্কে। তুমি ইচ্ছে মত সৃষ্টি কর সেখানে দিন বা রাত। দিবা দ্বিতীয় প্রহর বা শেষ প্রহর। গাও নিজের মনের গান প্রান খুলে। বাঁধা নেই তো কোনও। তবে তুমি এগুলো এখনও বুঝবেনা। বড় হতে হবে বোঝার জন্য। যেমন আমি বুঝেছি। এই নদী কত বুঝিয়েছে আমায় !’
‘মা, তুমি এই নদীকে চেন? কথা বল?’
‘হ্যাঁ। চিনি তো ! কত গান গেয়েছি আমরা একসাথে। আমার সখী তো।’
‘মা আমিও গাইব’
‘সে জন্যেই তো এনেছি তোমায় আজ। আমার একটা ঋণ আছে। তা শোধ করতে হবে।’
‘ঋণ?’
‘ও তুমি বুঝবেনা। পূপে তোমার মালকোশ মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ’
‘ এসো। আমরা আজ দুজনে মিলে মালকোশ গাইব’
‘এই ভোরে মালকোশ?’
‘হ্যাঁ। এই ভোরেই। আজই এখুনি। বস আমার পাশে।’
এরপর সেদিন সূর্য উঠেছিলো। কিন্তু দেরীতে। আকাশে মেঘ এসেছিলো হটাত্। মালকোষের সুর আঘাত করছিলো প্রতিটি মহাজাগতিক অণু পরমাণুকে। অনুরণন হচ্ছিলো চতুর্দিকে। না, বৃষ্টি আসেনি সেদিন। শুধু শীর্ণকায়া নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছিলো। তীর ভেঙে বয়ে যাচ্ছিলো প্রাণ ফিরে পেয়ে। মা মেয়ের হাত মুঠোয় ধরে নিশ্চিন্তে বসে । অকাল শ্রাবণ এলেও আর ভয় নেই। মা আছে তো এখন!