তবু অনন্ত জাগে

তমাল রায়



১। কুকুররা ফেথফুল।
২। মানুষ কুকুর নয়।
৩। তাই ফেথফুলও নয়।
৪। সে কেবল এপ্রিলফুলেই বিশ্বাস রাখে।

যেভাবে গল্প এগোয়, এখানে তেমন উপাদান কিছু নেই আছে চরহাকিমপুরের মত একটা জায়গা। আর কিছু, অনির্দিষ্ট উপাদানমালা, যাদের উপাদান না হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা। চিৎ হয়ে শুয়ে এক অসমাপ্ত ট্রেন লাইন। আগে ট্রেন যেত। এখন যায় না। অবহেলা তাচ্ছিল্যে সর্বাঙ্গে। একটু দূরে ছোট এক নদী বয়ে চলেছে। বাচ্চার হিসির থেকেও ক্ষীণ তার চলন। আগে এ নদীই ছিল এতদ তল্লাটের লাইফ লাইন। এখন... আশপাশে কিছু পুটুশ এঁটুলির ঝোপ। বুনো একটা গন্ধ নাকে এসে লাগে। আপাতত এ স্থির চরাচরে এক অদ্ভুত শূন্যতা পাক খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তে। এ দিগন্তে কর্কটক্রান্তি কি করে যেন বা বয়ে গেছে। কর্কট আক্রান্তর যা কিছু লক্ষণ সব পরিস্ফুট।
তিনি এখানেই, এই চরহাকিমপুরেই কেন এসেছিলেন আজ আর জানা যায় না। যখন এসেছিলেন উত্তুরে বাতাস বইত খুব, বাতাসে হিস হিস, ঘুম ছেড়ে গেছে কবেই। সেটা শেষ হেমন্ত হবেও বা। কাটা ঘুড়ির যেমন স্থল ছোঁয়ার তীব্রতা থাকে ততটাই কি’না তাও জানা যায় না, তবে ভেতরের বাজারে দোকানে ফুটপাথে কেবল তুচ্ছ হতেই থাকছিলেন। ধর চিঠিতে লেখা ভুল বানানের মত, ক্ষমা আর সহিষ্ণুতার স্পর্শে সবাই কাটিয়ে দেবে একটা সম্পূর্ণ জীবন তাও কি হয়! বলা আর লেখার ভাষার মধ্যে যা যতটা ফারাক, হয়ত সেটুকু পৃথকতা নিয়েই তিনি সরে এসেছিলেন। বুকে তখন সন্ধ্যারাগের আকাশ। বকুল আসে না। আর তিনি পথ চলতে শুরু করেছিলেন…

বলাবাহুল্য চর হাকিমপুরে তেমন কিছুই ছিল না কখনও। পরিত্যক্ত রেল কোম্পানির লাইন, ত্যক্ত নদী, আর কিছু কান্না! ভাটির দেশ আর কান্না থাকবে না তা হয়। সকাল হলেই পাখিদলের সভা বসত দালানে। জানলা খোলা, তাই পাখি এসে বসত গায়ে, মাথায়, ঘুম ভাঙলে এও তো ঈশ্বরের প্রসাদ বলেই তাঁর মুখে ফুটে উঠত প্রসন্নতার হাসি। কাগজ কলম হাতের কাছে কই! অগত্যা মাথায় টুকে রাখা কিসব হিজিবিজি শব্দমালা। কখনও কাজে লেগেই যাবে। যায় ও তো। বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে শুধুই শূন্যতা, মানুষজন তখনও টের পায়নি এ তল্লাটের কথা। আর যা হয়। ঘরে বসেই দিব্যি শোনা যায় কানা নদীর তির তিরে শব্দ। শরীর ভেজে না। পায়ের পাতাই সই, তবু তো বয়ে চলা, যেভাবে মালতীলতা বিছিয়ে রাখে শুকনো বাগান। তিনি লিখে রাখতেন হিজিবিজি এই সব নদী চলাচল। প্রায় মাইল পাঁচ পথ পেরুলে হাট, শনি আর মঙ্গলবার বসে। বারের পুজোও হয়। লোকজন যা অল্পবিস্তর তারা নিজেরাই ক্রেতা বা বিক্রেতা। সকাল পাকতে শুরু করার আগে তিনি পৌঁছে যেতেন হাটে। সেখানে কিছু আছে। সেখানে কিছু নেই। তা নিয়ে তার মাথা ব্যথাও ছিল না। তিনি কেবল জোট বাঁধা শব্দদের গড়ানো শুনতেন কান পেতে। বেশ কিছু দূর থেকে তিনি ফিতে ফেলে মেপে নিতেন শব্দদের। দূরত্ব; চিনতে শেখায়!

বলে নেওয়া যাক। এ ভাটির দেশে কখনও নৌকো আসত, মাল পরিবহন এর উপযুক্ততাটুকু নিয়েই এতদ তল্লাট কখনও মানচিত্রে ঠাঁই পেয়েছিলো। এখন নদী বিলীয়মান। তাই স্রেফ চর! কখনও বিখ্যাত কোনো হাকিম এখানেই না’কি বাসা বেঁধে ছিলেন, তাই চরহাকিমপুর। পুরনাগরিকের কোনো সুবিধে বা সৌজন্য উন্নত রাষ্ট্র এগিয়ে দেয়নি। তাই হয়ত বাঁচোয়া। দুপুরের বারান্দায় আপাতত তিনি একা। মানুষ মূলগত ও গুণগত ভাবে একাই। তিনি কান খাড়া করে আপাতত শুনছেন দুপুরের চলাফেরার শব্দ। লিখে রাখছেন কোথাও বা অলক্ষ্যে। খেতে কিছু হয়, তাই খান। পরতে কিছু হয় তাই পরেন। দুপুর যেখানে বিকেল স্পর্শ করছে আপাতত সেখানেই মনোযোগ দিয়ে শুনছেন দুপুর আর বিকেলের মৃদু ঠোকাঠুকি। কিছু পর সন্ধ্যে নামবে। অপেক্ষা।

সূর্য ডোবার ও শব্দ আছে। শুনে দেখ। নিজেকেই বলছেন তিনি। আহ্নিক চলনের যেমন আছে একটা মিহি গুঁড়ো গুঁড়ো শব্দ মালা। ঘাসে পা হাঁটলে যেমন শব্দ পাওয়া যায়,অনেকটা তেমন। রাত আসছে, নদীঘরে তখন বকুল শূন্যতার হাহাকার। এখানে বকুল ছিল, এই নদী থেকে কিছু দূর। এখন নেই। রাত ন’টা কি দশটার বকুল শূন্যতায় দাঁড়িয়ে তিনি শুনছেন জ্যোৎস্নার শব্দ। আর শূন্যতার কান্না। তেমন কিছুই নেই এখানে। তার দেখা সমগ্রতায় কেবলই কানের ভূমিকা পালন। শেয়াল ডাকবে কিছু পর, অন্ধকার হেঁটে বেড়াবে বিস্তীর্ণ ভাটি জুড়ে। আর জলজ শব্দের পূর্ণ অবগাহনে তিনি সাধনায় বসবেন, ভোর আসার আগে পর্যন্ত। শব্দ মূলত সাধনাই। তিনি তাই মানেন, জানেন। জানাগুলোর শরীরে ডানা গুঁজে দিলে, তারা উড়বে। আপাতত প্রতীক্ষা....

রিপ ভ্যানের সাথে বেরিয়ে পড়ার আগে তেমন কিছু নেননি তিনি। তিনি মানে শ্যামাপ্রসাদ বা কালিকাপ্রসাদ। নামে কি আসে যায়। বস্তুত শব্দ ছাড়া তার তেমন আগ্রহের বহুকাল কিছুই ছিল না। লরির মাথায় করে গাছ চলে গেলে শহর ছেড়ে, তিনি জানতেন বৃষ্টিদের হলিডে। বাতাসও ধর্মঘট ডেকেছে। আকাশের পুঞ্জ মেঘেরা নিরুদ্দেশে। আর সকলের মতই তার হয়ত একটা বৌ ছিল। ধর নাম সরলা। আদতে সরলরেখার তেমন বক্র হবার কথা নয়, হয়ত হয়নিও। কিন্তু সমান্তরালে সেও তো অবজ্ঞা ছুঁড়ে চলে যেতেই পারে কোলাহলে। কোলাহল ও শব্দ। যেমন বিষ আর অমৃতেই বা তেমন ফারাক কই। তবু অমৃত। হয়ত পুত্র বা কন্যাও ছিল তার। অপূর্নতার ঝোপ ঝাড়ে তারা কেউ লাল নীল বেলুন ওড়াতে ওড়াতেই কোলাহলে মিশে গেছিল। এরপর ফিরে আসে এক দীর্ঘকালীন নীরবতা। যাকে অসুখ বলেই চিনেছিলেন তিনি। আর অ-সুখ শেষ হলে ভ্রমণে যাওয়া জরুরী, স্বাস্থউদ্ধারের স্বার্থেই। তাই রিপ ভ্যান। তাই হারিয়ে যাওয়া। কত দিন এভাবেই…
আর, এখন দীর্ঘ ঘুম ভাঙার শেষে। তিনি কেমন করে যেন নিজেই চর হাকিমপুর। ওপারে কাঁটাতার, এপারেও। সীমান্তে কেবল ভাটির কান্না। আর চেনা অচেনা শব্দগুলোকে তিনি মালায় গেথে রাখছেন আপাত অন্ধকারে। তন্ত্র সাধনা মূলত রাতেই হয়। রাত মানে নারী। রাতের নাভিমূলে পদ্ম রেখে, তিনি রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন সঞ্চিত শব্দের শরীরে। এবার ডানা লাগানোর আগে, নদীতে আচমন করে, তিনি ভোরের উপাসনায়। শিশির পড়া শুরু হল। অথবা পড়ছিলোই। আর তিনি লিখে রাখছিলেন কালের প্রেক্ষিত জুড়ে শিশিরের শব্দমালা। আসলে শিশির নয় জৈব কোনো রক্তরসে নিষিক্ত করছিলেন শব্দদের। যার পর ডানা লাগলো, আর ভোরের আঙিনায় দাঁড়িয়ে তিনি উড়িয়ে দিলেন গান। তখন ভোর। ঈশ্বর না’কি স্বয়ং এসে উপস্থিত হন এই সব ব্রাহ্মমুহুর্তে। ফলে পাখি উড়ালে নদীকে স্পর্শ করে আকাশ ছুঁলো শব্দরা। সুর ভাসছে গোটা ভাটির দেশে। জোছনা না’কি ভোরের আলোয় নৌকোর তলায় তখন নদীর জল বাড়লো। আর রিপ ভ্যানের সাথে তিনিও বেরোলেন নিজের সৃষ্টিকে পরখ করতে। তখন অবশ্যম্ভাবী বর্ষাকাল। বৃষ্টি নেমেছে। তার মুখে পরিতৃপ্তির হাসি, হাসিরা, হাসিদল ছড়িয়ে পড়ল মেঘে মেঘে।

১। কুকুররা ফেথফুল।
২।মানুষ কুকুর নয়।
৩। তাই ফেথফুলও নয়।
৪। সে কেবল এপ্রিলফুলেই বিশ্বাস রাখে

তাঁকে কোথাও যেতে হয়নি রিপ ভ্যানের সাথে। সরলা তার পুত্র কন্যাসহ সরেজমিন পর্যবেক্ষণে আজ ভাটির দেশে। ভাটফুলের ঝোপ পেরিয়ে তারা চলেছে সৃষ্টির আঁতুড়ঘরের সন্ধানে। গন্তব্যে পৌঁছালে যেখানে সকালের আলোয় চিৎ হয়ে পড়ে আছে স্রষ্টা। অথবা নানান শব্দফুলের সুর সঙ্গম। পাখিরা পাহারা দিচ্ছে শরীর। সুগন্ধ বিদায় নেবার পূর্বে ইত্যাদি ক্রিয়াকর্ম সকল। সকাল ছড়িয়ে পড়লে আজও কেন ভাটি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকে কান্নার গান। বুঝে নিচ্ছে সরলার পুত্র কন্যা।