বাংলা গানের কালিকা প্রসাদ

সামতান রহমান



বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে গিয়ে, গত বিজয়া দশমীতে ত্রিপুরা ও ধর্মনগর, একাদশীতে করিমগঞ্জ ও বদরপুর, দ্বাদশীতে শিলচর ছিলাম। বরাক উপত্যকার এই অঞ্চলে যে এত মানুষ বাংলায় কথা বলে, শুনেছিলাম, বিশ্বাস করতে হল। এবং বিস্মিত হতে হল বাংলা গানের, বাংলাদেশের গানের, প্রবাস দেখে।
ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জ, সেখানকার এক প্রখ্যাত বাউল সাধক শাহ আলম সরকার'র গান, শিলচর থেকে আসার সময় ট্রেনে একজন ভিক্ষুককে গাইতে শুনলাম! একটি অসমিয়া গান শুনলাম, সুরে অবিকল রাধারমণের একটি গানের কপি, যে গানটি আগরতলা, করিমগঞ্জ এবং শিলচর, এই তিন শহরেই বাজতে শুনেছি! শিলচরে, ওখানকার এক টিভিতে দেখলাম, আমাদের রংপুর অঞ্চলের ভাওয়াইয়া গান হচ্ছে, তাও একাধিক! বাংলা গানের এই যে সীমান্তমুক্তি, তার পেছনে যারা কাঁটাতার সয়েছেন, কালিকা প্রসাদ তাদের মধ্যে বিশেষতম।
কোন নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে সাধারণত গুরুত্বধারীরা, বিশেষরা আগে আপ্যায়িত হয়ে থাকেন, সর্বশেষে 'সুযোগ' আসে মিসকিন, অর্ধনিমন্ত্রিতদের, অনিমন্ত্রিতদের। বাংলা গানের কোন অনুষ্ঠানে, সে রাষ্ট্রীয় হলেও, বাংলাদেশে, লোকজধারার শিল্পী বাউলরা যদি শেষ পর্যন্ত 'সুযোগ' পেয়েও থাকেন, অনুষ্ঠানে তার দশাও মিসকিনমান। সে নিয়ে এখন আর বিস্ময় অবশিষ্ট থাকার কথা নয়, আশ্চর্য হই, যখন দেখি, আয়োজকরা এমন একটা ভাব ধরে থাকেন, যে, তাদের উপর এই বাউল শিল্পী সাধকদের আজীবন কৃতজ্ঞ না থেকে উপায় নেই।
যে গান আমাদের, যে গান মাটি মন মানুষের গতির স্পন্দন নিয়ে সুরিত হয়েছে, এই অঞ্চলের ভৌগলিক চলচিত্র ধারণ করে আছে, যে গান একটি অসাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদবিরোধী ভূগোল নির্মাণের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যে গান বহুপথ বহুরথ একত্রিত করতে পেরেছে, সেই গানকে ব্যবসায়ীরা নিভৃতেই রেখে, তাদের নিজস্ব নৈরাজ্য আমাদের কানে তুলে দিয়েছেন। কালিকা প্রসাদ সেই নিভৃতির ভেতর থেকে, কর্তাব্যক্তিদের হাত থেকে, বাংলা গানকে বহুকর্ণী করলেন, দেখালেন এই লোকজগানের প্রাণপ্রকৃতি।
এজন্য কালিকা প্রসাদ বেড়িয়েছেন বাংলাদেশেরও নানা প্রান্তে। ছায়ানটের আশরাফগিরি, জেমস বাচ্চুদের শনপাপড়ি, হাবিব বাপ্পাদের নাক অতিক্রম করে, কালিকা প্রসাদ, শাহ আব্দুল করিম'র চরণে ধুলিত হয়েছেন। তিনি বাউল সাধক, শিল্পী, গান রচয়িতাদের সঙ্গ নিয়েছেন এবং বাংলা গানের শক্তিতে নিজেই আবির্ভূত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার নানা প্রান্তের গান নিয়ে কালিকার অভিজ্ঞান তো ছিলই, বিস্ময়ের অন্ত থাকে না যখন দেখি তিনি বাংলাদেশের সংগীত মহাজনদের সম্পর্কে বিশেষ ধারণা রাখেন। ক্ষেত্র বিশেষে, এ দেশের অনুসন্ধানী সংগীতজ্ঞরাও যা করতে পারেননি, কালিকা, কালিকা'র দোহার, ততদূর গিয়েছেন। দেখেছেন, একটি গানের গান থেকে অন্য অনেক কিছু হয়ে ওঠা, শুনেছেন তার জন্মপর্যায়।
যদিও বিষয়টি বলবার দরকার পড়ে না, এসে যায়, কালিকার সামষ্টিক জ্ঞান ও সংগীতে অভাবনীয় দখল। যে বা যারাই বাংলা গান নিয়ে সৃষ্টিশীল কাজ করেছেন, সে যত অগম্য দূরত্বেই থাকুন, কালিকা, তাকে তার জানার ব্যপ্তিতে নিয়ে এসেছেন। হাল বিবেচনায়, এজন্য কালিকা প্রসাদ অনন্য, সাহসী, সংগ্রামী এক সংগীত সাধক। বাংলা গান, সে দুই পাড়েই, যে প্রবাহে গতি নিয়েছে, কালিকা প্রসাদ সেই আবহে থেকে, তার অন্তর্মূলে দাঁড়িয়ে তারই পুনর্গান করলেন। আমরা মোহিত হলাম, আশান্বিত হলাম।
বাংলাদেশের গান, এই ভূগোলের কবিতা ও অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে সমউৎকর্ষতায় এগিয়েছে। কোথাও কখনও কবিতারও অধিক! কালিকা ছুটেছেন সেই মুগ্ধতার উৎসমূলে। যেমন, তিনি বলছেন, ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালায়, গানে গানে কমলা সুন্দরী ও নদের চাঁদের প্রেমালাপ, পৃথিবীর 'রোমান্টিকতম ডায়ালোগ'। কালিকা বারবার, আবার, পুনর্বার বিস্মিত হয়েছেন, আপ্লুত হয়েছেন, বাংলা গানে।
আব্বাস উদ্দিন (আব্বাস উদ্দিন কে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ শিল্পী মনে করা হয়) গীত বহুবিখ্যাত একটি গান "আল্লাহ মেঘ দে পানি দে..."। দোহার, কালিকার গানের দল, গানটির মৌলিকত্ব অটুট রেখে নতুনভাবে পরিবেশন করেছে এবং এটি আমার মনে হয় এই গানের পুনরুজ্জীবন, যেটি গাইতে গিয়ে কালিকা, এর ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন, সেই সন্ধানেই জানা গেল, আব্বাস উদ্দিনের আগেও এটি গীত হয়েছে। গানটি রচনা করা হয়েছিল প্রার্থনা সংগীত হিসেবে, অনাবৃষ্টিতে কৃষকরা মাঠে সমবেত হয়ে এই গান গেয়ে খরামুক্তির প্রার্থনা করত। এই গান এবং এমন আরও গানের প্রাসঙ্গিক গল্প, আমরা কালিকা প্রসাদ'র কাছ থেকে জেনেছি। তিনি জানতে চেয়েছেন, জেনেছেন, ধরতে চেয়েছেন বাংলা গানের ধমনী এবং সেই ধমনীতেই তিনি প্রবাহিত হয়েছেন।
তিনি, যে গানই করেছেন, দোহারে, বাইরে, তার অধিকাংশ আগে গীত হওয়া লোকজধারার গান। এসব গানে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েছেন, প্রতিটি গানে একটি উৎসব আবহ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। সেজন্য বোধকরি তার গান শ্রোতাকে সহজে সংযুক্ত করে এবং শ্রোতা তার সহযোগী হয়ে ওঠেন। লোকজধারার এই গানের প্রতি সামষ্টিক উপেক্ষা যে আমাদের দীনতা, কালিকা প্রসাদ তা তার নিজস্ব পরিক্রমায় দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি এই গান গেয়েই আপামর মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন, পেরেছেন কোটি মানুষের চোখে জল আনতে, যখন তিনি শোভিত কফিনে পৃথিবী ছাড়ছেন। রাষ্ট্র, সমাজ আর এই ভুখন্ডের ভিত, কালিকার না থাকাকে, সংকটে অনুভব করেছে, করছে।
বরাক উপত্যকার মানুষেরা 'সর্বাঙ্গে কালিকার না থাকার ছবি' নিয়ে শিলচরের পিচপথে আহাজারি করেছে। বৃক্ষমূলে ফুলেল টান অর্পণ করে তারা তাদের কালিকার জন্য সমবেত হয়ে কেঁদেছেন আর অশ্রুসজল কণ্ঠে তুলেছেন কালিকারই গান, যে গানের মধ্যে বাংলাদেশের গানও ছিল! এই যে শোক-উত্তপ্ত হৃদয়েও বাংলা গানের সীমান্তমুক্তির দৃষ্টান্ত, এ তো কালিকাদেরই কাজ। করিমের পদ ধরে আজ এবং সর্বদাই কালিকা প্রসাদ'কে বলি-- "ভক্তের অধীন হও চিরদিন, থাকো ভক্তের অন্তরে"...