সুরদণ্ডী

হামিম কামাল



।এক।

পালিয়ে চলে গিয়েছিলাম বোটানিকাল গার্ডেনে, তবু শেষরক্ষা হয়নি। আমার বন্ধু তৈয়বকে বাবা কোনোভাবে পেয়ে গিয়েছিলেন। তাকে বললেন, ‘শিগগিরই ওকে খুঁজে বের র্ক। আর জানা, ওস্তাদ অপেক্ষা করছে। যেখানেই থাকুক যেন চলে আসে সটান। আসতে তাকে হবেই।’ তৈয়ব জানতো, আমি পালালে কোথায় কোথায় বড়জোর যেতে পারি। দুটি জায়গা ছিল। প্রথমটি এলাকার মসজিদের ছাদ। দ্বিতীয়টি বোটানিকাল গার্ডেন। মসজিদ ছিল একেবারে আমাদের বাসার সামনেই। প্রাণীজগতে অঢ়বরা সচরাচর চোখ বরাবর তাকায়। এর ওপরেও নয়, নীচেও নয়। বাসা থেকে বেরিয়ে যে মসজিদ দেখা যায় তার ছাদে কেউ গায়ে পাটের মাদুর মুড়িয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে তা ধারণা করা কঠিন। ওখানে আমি তখনই শুধু লুকোতাম যখন খুব রাগ হতো বাসার কারো ওপর, আর, কখনও না-ফেরার শর্তসাপেক্ষ প্রতীজ্ঞা আমাকে দরজার ছিটকিনি খুলিয়ে নিতো। কিন্তু যখন আমার পালানোর পেছনে শঙ্কা কাজ করতো, আমি চলে যেতাম বোটানিকাল গার্ডেন। তুরাগ নদের তীরে সে-ই ছিল আমার নিরাপদ আশ্রয়। এর সবুজ অন্ধকারে আমি শৈশব থেকে কৈশোরে বহুবার হারিয়ে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি। এসব জায়গার খোঁজ যে জানতো সে আমার প্রিয় বাল্যবন্ধুটি, তৈয়ব। যার কথা বলছিলাম এইমাত্র। তারও এমন অনেক জায়গার খোঁজ আমি জানতাম। শৈশবের ওইসব রহস্যেমাখা দিনের টুকরো ছিন্নাংশ এখন ডায়রির পাতায় শেষ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। ভাগ্যিস ডায়রি লিখতাম!
বলছিলাম আমার পালিয়ে যাওয়ার কথা। কেন পালিয়ে গিয়েছিলাম? কারণ আমি সুরের দণ্ড পেয়েছিলাম। সুরের দ- পাওয়া কিন্তু অসুরিক ব্যাপার। এই সুরকে ভালো তখনো বাসিনি। তবু আমার হারানো পূর্বপ্রজন্মের বীর্যধারীদের কৃতিত্বে ওটা ভালোই খেলত এ কণ্ঠে। আর ওতেই হয়েছিল বিপদ। আমার বাবা বলতেন, ‘কণ্ঠে সুর যখন আছে, তাগুতি পথে তা যেন কাজে না লাগে, খবরদার! এ গলায় উঠবে কেবল কোরান তেলাওয়াতে, হামদ আর নাত। কারণ সুরের যিনি দাতা, তিনি তো স্রষ্টা স্বয়ং। সুতরাং তাঁর বাণী- প্রশংসাবাণীতেই শোধ হতে হবে দায়। এপথে দায়মুক্তি না ঘটলে অপেক্ষায় দোজখের আগুন!’ হায়, কে বলবে আমার বাবা ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত! শামসুর রাহমানের কবিতার বই কে যেন তাঁকে কিনে দিয়েছিল, তা-ই নিয়ে খুশিতে আটখানা হয়ে একদিন ঘরে ফিরেছিলেন! এমনও দিন ছিল, কে বলবে আজ। কোরানে আমার আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল তার জোরে। আমার জন্যে একজন ক্বারি ঠিক করা হয়েছিল। তার কণ্ঠে সুরের কারুবর ছিল বটে, কিন্তু একটি শিশুর প্রতি আচরণে ছিল-না কোনো চারুতা। হতে পারে শিশুদের প্রতি বিরূপ এমন পরিবেশে তিনি নিজেও বড় হয়েছিলেন। তবে কালেভদ্রে আদর যে করতেন না তা নয়। তবে তার পরিমাণ কতটা কম হলে একটি কিশোর বনের কাছে আশ্রয় নেবে বলে পালিয়ে যেতে পারে?
তখন বোটানিকাল গার্ডেনের ভাঙা দেয়াল টপকে সবে লাল মাটির ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে একটু জিরোচ্ছি, এমন সময় দূর থেকে তৈয়বের অবয়ব দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তৈয়বও দেখেছে আমাকে। অস্কার ওয়াইল্ডের সেই স্বার্থপর দৈত্যের গল্পটা মনে আছে তো? দৈত্যের সেই যে এক অপরূপ বাগান, ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে শিশুরা ঢুকে পড়তো? বোটানিকাল গার্ডেনের দু’মানুষ উঁচু সাদা রঙ করা সীমানাদেয়ালেও একটা ফোকর ছিল ঠিক এমন। ওই ফোকরটাই ছিল আমাদের প্রবেশপথ। তো, তৈয়ব সেই ফাঁক গলে শরীরের অর্ধেকটা ঢুকিয়ে দিয়ে লাল মাটির টিলায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘চল বন্ধু, তুই কোথায় তা যে আমি জানি- কাকা সেটা জানে। না গেলে দুজনেরই ক্ষতি। আজকের মতো চল?’
সুরদণ্ডী আমাকে যেতে হয়েছিল। হাতে-পিঠে বেত চলতো না। আমার প্রতি দয়া নয়, বরং বাবার প্রতি এটুকু সম্ভ্রম ছিল। তবে চড় চাপড় আর চোখ রাঙানি সে অভাব পুষিয়ে নিতো সুদে আসলে। প্রেমিক মনের দণ্ড নিয়ে জন্ম নেওয়া কারো বুক হালকা করা মুক্তিটা মেলে নিজেকে ব্যক্ত করার পর। ব্যক্ত করতে প্রথমে চাই প্রস্তুতি এরপর দীর্ঘ যাপন। সেই প্রস্তুতি আর যাপনের যুগল আচারনিষ্ঠার অর্ধযুগ কাটতে চলেছে। একরাতে সাধুসঙ্গের পর মুক্তির সেই আভাসটুকুও মিলছে বলে মনে হলো।



।দুই।

আঠার বছর আগের সেই দুপুরের পর এক রাতে মহানগরের কালো গলিতে ধ্যানী এক সাহিত্যিক অগ্রজের বাড়ির দরজায় আঙুল ঠুকছিলাম। আড্ডাই ছিল মুখ্য। লাজনম্র স্বরে বলছি, সুরাপানের বিষয়টি ছিল অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যযোগ। তো যাহোক। সুর ছাড়া সুরার আনন্দ যে অর্ধেক, এ বিষয়ে আমাদের দ্বিমত হলো না। আর অগ্রজের রুচিও ছিল সূক্ষ্ম। ঘরটি তাপানুকূল আলো-আঁধারে সাজানো হলো। এরপর প্লেয়ারে চড়লো চাপা সুরেলা কান্না। সেই সুরে কোনো কথা বসানো ছিল না। নিরেট সুরের ওঠানামা ছিল। গাছের কোটরে ফিসফাসময় সুরের দীর্ঘ সময়কাল আদিম পৃথিবী অতিক্রম করেছে। সে সুরে তখনও ভাব চড়েছিল মাত্র, ভাবের বাহন ভাষা নয়। তেমন এক সুর। ‘তেমন’ বটে। ‘ঠিক তাই’ কিন্তু নয়। অর্থাৎ ভাবটা আদিম ভাষাহীন পৃথিবীর হলেও উৎসটা গাছের কোটর ছিল না। ছিল সুচারু আধুনিক সুরযন্ত্র।
যন্ত্রের এসমস্ত অযান্ত্রিক সুর আমাকে বরাবরই বিশেষ একটি সুবিধা দিয়ে থাকে। তা হলো, কথা বসানোর অবকাশ। আঠারো বছরে আমি এই সুবিধাটুকুই নিয়েছি বেশি। অর্থাৎ যন্ত্রসংগীতই বেশি শুনেছি। বিনয়ের সঙ্গে বলছি, এই ‘বেশি’ সংখ্যার হিসেবে। পরিধির হিসেবে নয়। তো- অভ্যেসমতো মনের কথা আমি ইচ্ছেমতো বসিয়ে নিচ্ছিলাম। এতে করে যা হলো, শিগগিরই আমার মন ভীষণ স্মৃতিকাতর হয়ে উঠল। মদিরাতাড়িত মগজ আনন্দশঙ্কর, তাবুন সূত্রধরের নাম করলো না। এঁদের আমি ভালোবাসি। এমন দুটি নাম তুলে আনলো যাদের কাছে আমার অনেক ঋণ। মনে হলো, যে যাই ভাবুক, ওই ঋণ কিছুটা হলেও লাঘবের ঘোষণা আমাকে আজই দিতে হবে।
আমি বললাম, ‘যদি কখনো ওই অতো উঁচু কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারি যেখান থেকে মানুষকে উদ্দেশ করে দুটো কথা বললে মানুষ একটি অন্তত শোনে, সেখানে দাঁড়িয়ে আমি দু’জনের সুখ্যাতি করব। আমি বুকের বাম পাশে হাত রেখে তাদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতার কথাটা জানাব।
অগ্রজ ভেজা ভারি গলায় বললেন, ‘কারা তারা?’
আমার উত্তর, ‘একজন গ্রিক সুরস্রষ্টা ইয়ানি। অপরজন আইরিশ সুরশ্রীধর শেরি। সুরের যে সুরা তাঁরা আমাকে পান করিয়েছেন, সেই সুরার মতো এই সুরাও নয়,’ আমি পাত্রটি তুলে দেখালাম। ‘ওই সুধা আমাকে ঐশ্বরিকতার অনুভূতি দিয়েছিল।’
অগ্রজ মৃদু হেসে আমুদে কণ্ঠে বললেন, ‘সেটি কী রকম?’
অন্ধকারে এক ফিতে হলুদ আলোর দিকে আমি মাথা আরামে কাত হতে দিয়ে বললাম, ‘ইয়ানির সুর যখন আমি শুনি, ভেতর থেকে কথা উথলে ওঠে আমার। আমার ভেতর যে ইগদ্রেজিল বৃক্ষ, তা পাতা ঝরাতো ঝরাতো আর ঝরাতো। হায়রে, কত হাজারে হাজারে পাতা যে সে ঝরাতো, আর সেইসব পাতায় কত মানুষের, কত অজানা অদেখা লোকের কত ইতিহাসই যে লেখা থাকত! আমি অবাক হয়ে অনুভব করতাম, কথায় আমার বুকটা ভরে উঠছে। আমার হৃৎকলম চলছে। হৃৎকলম এতো বেগে চলছে যে হাতের কলম তার অনুবর্তী হয়ে উঠতে পারছে না। ওই যে প্লেটো বলতেন, সৃষ্টজগত স্বর্গের ছায়া, এও যেন ঠিক তাই। আমার হৃৎকলমে ওই ভাবের আসল আকার রক্ষিত রেখে বলপয়েন্ট ওই ভাবের ছায়ামানচিত্র এঁকে যেত। কিন্তু আপনি যাই বলুন ভাই, ওই যে বলে না— শব্দের সীমা তো তার অর্থকে ছাড়িয়ে, ঠিক তাই। আমি ওটাই বিশ্বাস করি। সেক্ষেত্রে আমার বলপয়েন্টে লেখা ওই ভাবছায়া ঘুরপথে হৃৎকলমে লেখা মূলভাবকে যে ছুঁয়ে যায় না, এমনটা যদি কোনো সমালোচক বলেও থাকেন তো কী করার আছে?’
অগ্রজ প্রশ্রয়ের হাসি হেসে শুধু বড় এক নিশ্বাস ফেললেন। বুঝি তার মনের কথাটি মনমাটিতে দিলেন চাপা। সেখান থেকে ভুঁইচাপা ফুটবে কোনোদিন, এই আশায়। আমি তো থামিনি তখনো। বললাম, ‘আর ওই সিক্রেট গার্ডেন। শেরি যে আমার সামনে কী এক গোপন বাগানকে উন্মুক্ত করল, কী বলব, ওই বাগানের সবুজ অন্ধকারে কী যে মায়া, আমি তো বেরোতেই পারলাম না আর। আইরিশ নর্ডিক বরফে ঢাকা রহস্যের বনে আমার বাঙাল মন কাঙাল হয়ে কোন অতীতের সাথীদের যে খুঁজে ফিরেছে রাতের পর রাত! পায়নি তাদের। শুধু ব্যথাটুকু নিয়ে ফিরেছিল। তাতেই বুক এমন ভার হয়ে থেকেছে দিনের পর দিন, ভার নামাতে নামাতে ভাঁড় ফুরিয়ে গেছে, তবু ভাঁড়ার খালি হয়নি।’
থামলাম বটে, কিন্তু আমার চোখজোড়ায় ভেতরের জমাটখোলা কথার বাষ্প এসে জমছিল। অগ্রজ লেখকেরও জহুরির চোখ, কেন তিনি তা বুঝবেন না? বললেন, ‘তারপর?’
‘তারপর— আর কিছু না। কিছু না বলতে, একটু অবশেষ।’
‘বলতে?’
‘আমি তো এই মাটির সন্তান। নই? আমার চোখ চুল নখ বলে পূর্বপুরুষেরা এই মাটিতে জন্মেছেন, মরেছেন, সাধনা করেছেন। এখানেই তাঁরা এঁকেছেন গেয়েছেন। পৃথিবী তো তখন আজকের বৈশ্বিক গ্রামটি ছিল না, তথ্যের প্রবাহ তকন অবাধ ছিল না। আমার বর্তমান বলে দেয়, আমার পূর্বপ্রজন্মের সেই সব প্রেমকাতর তরুণ-তরুণীদের দুর্ভাগ্যের ধারা বজায় রাখতে আমি আজ শিল্পের পথে জুয়া খেলতে এসেছি। সাধনার জায়গাটুকু বাণীর, আর প্রতিবেশ বৈশ্বিক গ্রাম। আমার প্রাচী মন বাণী ভরা সুর শুনবে বলে উৎকর্ণ হয়ে ছিল। কিন্তু ওই প্রতীচী ইয়ানি, শেরি, ওরা সুরের যে আদি ধর্মকথা আমাকে শোনালো, তাও তো আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না। বাণী তো শুধু মানুষের মুখে ভাষায় মূর্ত না। প্রাকৃত অব্যক্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যে নীরবতার ভাষা— তাতেও কিন্তু আশ্চর্য গভীরতায় সেই বাণী লীন হয়ে আছে। তাকে মেলে কখন?’
‘কখন মেলে?’
‘গভীর মগ্নতায়।’
‘ঘোরালো ঠেকছে।’
‘কল্পনার চোখে শুধু দেখুন, ওই মগ্নতার পৌঁছুব বলে আমি যখন বোঁচকাটা কাঁধে তুলে নিলাম। আর কোথাকার অচিন স্রোত এসে আমাকে শব্দের সাগর কেটে খাবি খাওয়াতে খাওয়াতে অচেনা জলনারীর রাজ্যে নিয়ে ফেলল। রূপসী সুরললিতা আমার হাত ধরে বলল, চলো, আর আমিও চললাম।’
সেই অগ্রজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবার সময় অনুভব করলাম বুকটা কেমন হালকা-হালকা লাগছে। বুঝি এতোদিনের জমাট ভাবের ভার শব্দে কারো কাছে মুক্ত করতে পেরে সুরদণ্ডী আমার দণ্ড থেকে— মুক্তি ঠিক নয়, বরং মুক্তির আভাস মিললো।