আনাড়ির সঙ্গীত-ভাবনা

অর্ক চট্টোপাধ্যায়



গানের পাহাড় উজাড় করে কান্না এলো। মানুষের কান্না, যা কান পেতে শুনতে হয়, তাও কি নয় এক ধরণের সঙ্গীত? গায়ক জানেন কান্না মানুষের আদিমতম সঙ্গীত। সে সঙ্গীত আমাদের নির্জনতম আত্মপ্রকাশ। একাকিত্বের কলতান। সুমন তার গানে লেখেন:

'গানে গানে কেঁদে মরা
ব্যর্থ হয়েছে অভিসার'

অভিসার ব্যর্থ হয় বটে কিন্তু কান্না সন্ধিবিচ্ছেদের 'কাঁদ না'র মতো আলতো আবদার করে। অনুনয় করে যায় কানের কাছে। আমাদের শ্রুতিযন্ত্রের মায়ায় মোথিত হয়ে থাকে কান্না। কান যা শোনে তাই তো কান্না আর তাই তো সঙ্গীত। আমরা জন্ম থেকেই কাঁদি। কথা বলা বা বোঝার আগে একা শিশুর সঙ্গী হয় তার কান্না। সঙ্গীতও তো তাই। সঙ্গীহীন মানুষের সুরেলা সঙ্গ। শ্রমের সঙ্গ, নীরবতার সঙ্গ। কান্নাই শিশুকে তার বাইরের অজানা পৃথিবীর অপরিচিতির কথা প্রথম বলে যায়। নিমেষে বলে, হয়তো নির্মমভাবেও বলে। তার প্রথম কান্না গান হয়ে তাকে বলে: 'তুমি হবে আরো একা, আকাশেই আঁখিপাত।'

পাঠক ভাবতে পারেন কেন, হাসি কি দোষ করলো? বাচ্চারা যেমন অকারণে কাঁদে, তেমনি অকারণে হেসেও তো থাকে। ভাষা তার ঘাঁটি গাড়ার আগে হাসি-কান্না দুজনেই তো একইরকমভাবে ঘিরে থাকে নবজাতককে। হাসির কি সুরের অভাব আছে নাকি? কান্না নানা সুরে, নানা তালে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে জানে, হাসিও তো জানে নানা ছন্দে খিলখিল করতে। ঠিক কথা। আমি আসলে হাসিকে কান্নার অন্তর্ভুক্ত করে দেখতে চাইছি। হাসি কান্নার ভেতর থাকে। পাঠক আবার বলতে পারেন, সে তো কান্নাও হাসির ভেতর থাকে, এমনটা বলা যেতে পারে। নিশ্চই পারে, কিন্তু সদ্যজাত শিশুর শ্বাস প্রশ্বাস ঠিক করার জন্য ডাক্তার যখন তাকে চাঁটি মারেন, হাসির আগে তার মুখ থেকে কান্নাই বেরিয়ে আসে। হাসি অনুসরণ করে সেই কান্নাকে। কান্নার গভীর থেকেই উঠে আসে। না কাঁদলে হাসি থাকে না। আর সব কান্নার আদিতে থাকে সদ্যজাত'র ঐ 'vagitus.'

কবিও অনুভব করতে পারেন কান্নার সাঙ্গীতিকতা। শহীদ কাদরি তার কবিতায় লেখেন:


সব রাঙা ঘাস স্মৃতির বাইরে পড়ে থাকে
বৃষ্টি ফিরিয়ে আনে তার
প্রথম সহজ রঙ হেলায়-ফেলায়

কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না,
কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না।

এই ক্রন্দন কি সঙ্গীত নয়? সঙ্গীত কি নিজেই এক ধরণের ক্রন্দন নয়? কবিতায় শব্দ যখন গুমরে কেঁদে ওঠে, অনুভূতিপ্রবণ হয়ে পড়ে, শব্দের সেই অভিমানই কান্না। শব্দের সেই অনুরাগই সঙ্গীত।

গহীন এক অভিজ্ঞান এই সঙ্গীত। কোথায় এর শুরু, কোথায় এর শেষ নশ্বর মানুষ তার কিছুই জানে না। তার চারপাশের প্রকৃতি, জীব-জন্তু, বস্তু-পৃথিবী যে বিচিত্র ধ্বনির কার্নিভাল রচনা করতে থাকে তাকে স্বাক্ষী রেখে, সেই উদযাপনের সঙ্গীত মানুষ কেবলই শুনতে পারে। শব্দ যখন ধ্বনিময়তায় সঙ্গীত হয়ে যায় তখনি সে ভালোবাসতে শেখে। সংগীত না থাকলে মানুষ তো কোন ছাড়, সমগ্র ব্রহ্মান্ডেই হয়তো কোন ভালোবাসা থাকতো না। সুধীন দত্ত লিখেছিলেন:

অন্তরের অন্ধকারে অনঙ্গের লঘু পদধ্বনি

তিন 'অ' এর অনুপ্রাসকে যদি এখানে কবিতার একমাত্র সঙ্গীতময়তা ধরা হয় তাহলে হয়তো একটু ভুলই হয়ে যাবে। বরং স্বরধ্বনিত্রয়কে যেভাবে ভেঙে দিয়েছে ব্যঞ্জনধ্বনির 'পদধ্বনি', সেই ভাঙ্গনেই হয়তো রয়েছে এই পঙতির সাঙ্গীতিক মায়া।

একেকদিন আমাদের একেকটা গান পেয়ে বসে। মাথায় আটকে থাকে ফেভিকল জোড়ে। কেন ঐ গানটাই? কেন অন্য গান নয়? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর হয়না। গান আমাদের মনের অবচেতনে বাস করে। এতটাই করে যে আমাদের অবচেতন মনকে এক সুবিশাল মিউজিক আর্কাইভ বললেও অত্যুক্তি হয়না। সেখানে কত গান একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। যেমন আমি যখনই আপনমনে এই লাইনগুলি গাই:

সমুখে রয়েছে পথ
চলে যাও চলে যাও
পিছনে যা কিছু টানে
ফেলে যাও ফেলে যাও

ঠিক এই চারটি লাইনের পরে আমার মনে পড়ে:

ক্ষতি নেই আজ কিছু আর
ভুলেছি যত কিছু তার
এ জীবনে সবই যে হারায়
জানি ভুলে যাবে যে আমায়।

প্রথম গানটি 'বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও।' আর দ্বিতীয়টি হল 'এতো সুর আর এতো গান।' আমি জানা স্বত্ত্বেও কিছুতেই মানতে পারি না যে এই দুটি গান এক নয়। মানতে পারি না ঐ চার লাইনের পর এই চার লাইন আসে না। মানতে পারি না কারণ কোনো গানই তো আর একেবারে আলাদা নয়। মন যেখানে সচেতন থাকে না আর, সেখানে সঙ্গীতের যে অনন্ত স্রোত বইছে তাতে সব গানই যে অবগাহন করে রয়েছে। মানুষের সব কান্না যেভাবে একই বর্ণ, গন্ধ, স্পর্শ স্বাদের অশ্রু হয়ে বয়ে যায় চোখ থেকে। সাশ্রু নয়ন তখন নিজেই আরেক সঙ্গীত হয়ে গেছে। নীরবতার সঙ্গীত। কথা যা বলতে পারে না, সুর যেন ইনিয়ে বিনিয়ে কানের ঘনিষ্ঠ হয়ে তাই বলে যায়, গেয়ে যায়। সঙ্গীত কথার অব্যক্ততা যা আবারো তাকে কান্নার কাছাকাছি নিয়ে আসে। ছোট্ট মেয়েটা কথা বলেনা যখন তার বাবাকে গরু খাওয়ার জন্য পিটিয়ে মারা হয়। সে শুধু কাঁদে। কথা বলতে পারে না।

মনে পড়ছে সঙ্গীতের কথারহিত হয়ে পড়ার কথা। মখমলবফের 'সেক্স এন্ড ফিলোজফি' দেখে নিউ এম্পায়ারের খাঁচা থেকে সবে নেমেছি। মাথায় অবুঝ শয়তানের মতো গুনগুন করছে একটা সুর যেটা বারবার ফিরে আসে ছবিটা জুড়ে:

লা লা লা লা লা
লা লা লি লা লি
লা লা লা লা লা
লা লা লি লা লি

লিপি জানে না এই সুরের বয়ান। তাও এই সুর থেকে যায় চলচ্ছবির অমোঘতা নিয়ে। সিনেমাটির একটি দৃশ্যও যখন মনে থাকবে না, তখনো মনে ভিড় করে আসবে এই সঙ্গীত। আগামীতে হয়তো এমন দিন আসবে, এমন রাত নামবে, যখন সশব্দে হাসবে না মানুষ, সশব্দে কাঁদবে না। কানে সারাদিন হেডফোন গোঁজা থাকার দরুন সে আর পরিপার্শ্বের মুখর সঙ্গীত শুনতে পাবে না। তখন হাসি মানে কেবল এক ধরণের মুখাবয়ব আর কান্না মানে একরকম মুখব্যদ্যান। সেই আগামীতে হয়তো সকল সঙ্গীত নীরবতাপ্রাপ্ত হবে ব্যক্তির চরম নাস্তিতে। আমি তাও আশাবাদী সেই নীরবতা থেকে আবার সঙ্গীতের জন্ম হবে। কবীর সুমন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন তার মগজে প্রথম সুরের আনাগোনা অনুভব করেছিলেন তিনি, যখন ছোটবেলায় দেওয়ালে টাঙানো মিকি মাউসের এক মুখ হাসি দেখেন। দৃশ্যের হাস্যময়তা অচিরেই আবার সঙ্গীতের ক্রন্দন সৃষ্টি করবে আর আমার বৃদ্ধা ঠাকুমার বলা প্রতিশব্দেই কান্নার ঢেউ খেলবে। এ কান্না বেলাশেষের সঙ্গীত ছাড়া আর কিছুই নয়।

তখন সর্বত্র এক ক্রন্দন তৈরী হবে।
সর্বত্রই এক ক্রন্দন তৈরী হবে।।