সঙ্গীত-ক্রোমোজোম

অনিন্দ্য রায়



রাহুল টুডু,বয়স সাড়ে পাঁচ বছর, মাঝেমধ্যে দেখাতে আসে। কখনো মায়ের কোলে, কখনো বাবার। আর অন্য কোলটিতে তার বোন, ইপিল। রাহুল এলেই সঙ্গীত বেজে ওঠে, মানে বাজানো হয়। আমাদের ফার্মাসিস্ট নীলকান্ত নিজের মোবাইলে গান বাজায় রাহুল এলেই। যেকোনো গান, ওয়েলকাম সং। রাহুলও
মুহূর্তে চঞ্চল হয়ে ওঠে। অদ্ভুত সব শব্দ বের করে মুখ থেকে, কোল থেকে নেমে আসে। তারপর নাচতে শুরু করে, তারপর ছুটে যায় গান যেদিক থেকে আসছে সেইদিকে, পড়ে যায়, উঠে ছোটে আবার। দুহাত বাড়িয়ে ধরতে চায় মৈবাইলটিকে, নাকি গানকেই!
হ্যাঁ, রাহুল, সে এলেই এক দমকা সঙ্গীত।
হ্যাঁ, রাহুল, তার ডাউন সিনড্রোম। সে কথা বলতে পারে না ঠিক করে, হাঁটতেও পারে না। মুখে লালা ঝরছে সবসময়, নাকে সর্দি । ওই যে, কী সব বলে না, জড়বুদ্ধি, হাবাগোবা, রাহুল তাই, তার হার্টে ফুটো, এদিকের রক্ত ওদিকের সাথে মিশে যায়, তার শরীর বাড়েনি বয়সের মাপে।হ্যাঁ, রাহুল, এমনই একজন, যার কোনো আলো নেই সঙ্গীত ছাড়া, আর কিছু নেই যেদিকে সে ছুটে যেতে চায়।
ডাউন সিনড্রোম, কী হয় তাতে? আমরা জানি যে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে আছে ক্রোমোজোম। মানুষের ক্রোমোজোম হছে তেইশ জোড়া, ছেচল্লিশটি। তার দুটি হচ্ছে সেক্স-ক্রোমোজোম। ছেলেদের হল 44xy আর মেয়েদের 44xx। চুয়াল্লিশটি শারীরিক বা সোমাটিক ক্রোমোজোম আর দুটি করে সেক্স-ক্রোমোজোম।
তো, এই ডাউন’স সিনড্রোমে হয় কী,২১ নম্বর ক্রোমোজোম জোড়ার সাথে থাকে আরেকটা, পুরোপুরি বা আংশিক, অতিরিক্ত, তৃতীয় কপি।একে বলে ট্রাইজোমি 21,এটি জন্মগত এবং সেরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। এরা বয়সের দিক দিয়ে সাবালকত্বে পৌঁছলেও মনের বয়স রয়ে যায় ১০-এর নীচেই। অনেকেই মারা যায় তাড়াতাড়ি, খুব কম জনই স্কুলে যায় , কেউ কেউ স্পেশাল স্কুলে। আনন্দ নেই, হর্ষ নেই, সঙ্গীত ছাড়া। আশ্চর্যজনকভাবে এদের আকর্ষণ থাকে সঙ্গীতের প্রতি।
এই হল ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন’স সিনড্রোম, ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাঙ্গডন ডাউওন ১৮৬২ সালে একে একটি পৃথক মানসিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই নাম। কেউ কেউ যদিও চোখমুখের গঠনের বিশিষ্টতার জন্য একে ‘মোঙ্গোলইজম’ও বলতেন, যদিও তা মঙ্গোলিয়বাসীদের অনুরোধে W.H.O. বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৬৫ সালে।
তো, এই হল রাহুল টুডু, মাঝেমধ্যে আসে আমাদের কাছে। সে কখনো স্কুলে যাবে না, মাঠে নেমে খেলতে পারবে না, এই পৃথিবীর উপযুক্ত চালাক হয়ে ঊঠবে না। আরো না, না, না, না, না দিয়ে তৈরি হবে তার জীবন। সমাজে সে এক ভিন্ন হয়ে রয়ে যাবে। কারণ, তার ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের একটা তৃতীয় কপি রয়েছে। তার শরীরের প্রতিটি কোষে এরকম। আমাদের নেই। আমরা তাই ‘স্বাভাবিক’। আর সে ‘আলাদা’।
তার বই নেই, খেলার সাথী নেই। সে গান শুনলে ছুটে যায়, থালা বাজিয়ে তাল তোলে, মুখ দিয়ে এমন সব শব্দ করে, আমাদের বোধ্যগম্য হয় না, তবু এক সুর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে তার কথা।
সঙ্গীতই তার বই, খেলার সাথী। ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের তৃতীয় কপিটি, যা তার অসুখ, তা-ই হয়তো সঙ্গীত। ওই ক্রোমোজোম জোড়মাত্র আছে আমাদের, আমাদের সঙ্গীত নেই।
হ্যাঁ, রাহুল টুডু, সাড়ে পাঁচ বছর,ডাউন সিনড্রোম, তার নিরাময় নেই। গান আছে,এ বাজনা আছে, আছে ক্রোমোজোমের তৃতীয় কপিটি।