গানবেলা

রিমঝিম আহমেদ



এক

সকল ঋতু উড়ে যায় চোখের সামনে, ফুল ও সুভাস, পাহাড়বন্ধন শেষ হলে নদী ও পাখিবন দেখা যায়, পাশেই ফুলবান বসন্ত। শিরক দৃষ্টির ভেতর আনন্দের ঘরবাড়ি। ভেঙে পড়ে মটরশুঁটির ধ্যান।
এই বিমর্ষতার নদী সাঁতরে কখনওই ওপারে যাওয়া হয় না। প্রায়োন্ধকারে আবছা হয়ে যাচ্ছি নিজে...
ওপারে এত আলো! মৌন মিছিলে কথাসব দাঁড়িয়ে আছে। ব্যথাদের আন্দোলন থেমে গেলে জেব্রা ক্রসিং সচল হবে পায়ের সম্মেলনে। লাল-নীল-সবুজ বাতি, গাড়ির হর্ণ। তারপর টেনে আনি স্মৃতির মিহিসুতো, বান্ডেল থেকে একটা অংশ টানলেই হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে সব। তখন শুধু চোখ বুজে থাকা, আর অনুভবের ঝাঁপি খুলে বুঁদ হয়ে থাকা। জানালা ক্রস করে যায় বন, নদী, হাট বাজার। আমিও গাড়ি পেরিয়ে ঘুরে আসি শৈশব খানায় আমার লাল মাটির গ্রাম, ঝাঁঝাল দুপুর, বাঘমারা ফিল্ড, জাকির হোসেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। তারপর সেই অহংকারী সহপাঠিনীর মুখ; টিফিন ছুটি। সে ছুটিতে খালি -পেটে তুমুল খিদেকে উপেক্ষা করে হেঁটে যেতাম উপজেলার আবাসিক এলাকায়। গ্রিল আঁটা জানালায় প্রতিটি অহংকারী মুখে দেখতাম নিজের বিকৃত প্রতিবিম্ব । আর পিচ ঢালা পথে এলোমেলো হেঁটে যেতে যেতে সে কমন শব্দ ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ’ । তারপর বিচিত্রসব গান ,সেসব গানের অনুরোধের পাশে কত নাম ! নিজেকে তখন মনে হয় পৃথিবীর দীনতম শিশু। যেদিন জানালার শিক ডিঙিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের প্রবেশাধিকার পেয়েছি, তাদের মশলামাখা ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় ভেদ করে পেয়েছিল স্বর্গের চেরির স্বাদ। ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ’ শুনতে শুনতে সেঁটে গিয়েছিল মগজে বিচিত্রসব সুর। প্রতিরাতে বাবার দুস্থ মুখ দেখে একটা রেডিওর স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম, আমাদের নিকানো মাটির ঘরে- সারি সারি শুয়ে থাকা বোনদের ভেতর। আর- ঘুম ভাঙা রাতে টের পাই- অশরীরী কেউ বিড়বিড় করে আমার ভেতর সেই সুর ।

একদিন কিশোরীবেলায় আমাদের দুস্থ বাবা আচানক ধনী হয়ে গেলেন। রাজার ভঙিমায় হেঁটে এলেন বুনো রাস্তা দিয়ে, আর ঘরে ঢুকে আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বল্লেন-এটা তোর জন্য। সে জাদুর বাক্স থেকে আলাদিনের প্রদীপের মতো হঠাত উদয় হল একটা রেডিও। লাল কাভারে ঢাকা, যেভাবে আমার পুতুলের জামা পরা থাকে! ঠিক তেমন; আমরা বলতাম রেডিওর জামা। ‘প্যানাসনিক’ । আমার জামাঅলা
রেডিও। স্কুল ছুটির পর কানের পাশে ধরে, অথবা রাত্রিবেলা সবাই ঘুমিয়ে গেলে- শুনতাম ছায়াছবির গান।

আমার গানবেলা, পছন্দের পরিধি বেড়ে আকাশ ছুঁয়ে দেয় । রবিবাবুকে ভালোবেসে ফেলি-“আমার সকল নিয়ে বসে আছো সর্বনাশের আশায়”, “সখী ভাবনা কাহারে বলে” “আমার হিয়ার মাঝে” অথবা “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়”। নজরুলের- “কাবেরি নদীজলে কে গো বালিকা”, “ দেব খোঁপায় তারার ফুল” । তারপর কত সন্ধ্যা ভরে দিয়েছে আঞ্চলিক গানগুলো ! মগজ যেন ধোলাই করে গেছে, আমি সুর ছেড়ে বেরোতে পারি না।

প্রেমে পড়ার বয়সে- কোথাও ধানকল জেগে থাকে। গানের ভেতর আমি জেগে থাকি, আর লিরিকগুলো প্রিয় সবুজ ডায়েরিতে লিখে রাখি। তারপর চিঠির পরতে পরতে সাজানো হয়ে গেলে যথার্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে যাপন করি প্রতিক্ষা। বিরহে সুর, মধুরতায় সুর, বেমালুম ভুল হয়ে যাওয়ার দিনেও গাইতে থাকি- “চান্দের সাথে রাইতের পিরীতি হইলে জোছনা ছড়ায়...” ।

দুই

একদিন সন্ধ্যায় খুলে গিয়েছিল রিকশার হুঁড। আঁধারের ঝাঁপ ফেলে রাত মেলে দিয়েছিল অবিচ্ছিন্ন আড়াল। কারো করতলে মেখে দিয়েছি আয়ু, আমি জীবন আঁকি ইচ্ছের তুলিতে। ওই চাঁদ জানালায় ছড়িয়ে দিচ্ছে দিচ্ছে আহবান। আমাদের অভিমানগুলো কংক্রিটের ভাঁজে ভাঁজে মিশে যায় । তখনো মধ্যরাতে চুলখলা আঁধারে কেবল ছড়িয়ে থাকে সুর... আমরা ছিটকে পড়ি পরস্পর কৌণিক দূরত্বে। তারপর- “আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন...”
রামু বাইপাস ক্রস করলেই রাবারবন, সবাই তাই-ই বলে। এই গাছগুলোকে শেখা হয়নি এখনো । সবুজ লিকলিকে শরীর, মাথার উপরের একঝাঁক লাল লাল পাতা। আমি তাদের নাম রাখি মনেমনে 'আগুনপাতা'। এই নাম সবাইকে জানতে হবে তা নয়, আমি নাম রাখি শুধু নিজেকে জানানোর জন্য, আর সে নামে আমিই ডাকি। তেমন নাম অনেককিছুরই রাখা হয়, মানুষ, পাখি, গাছ, আরো আরো যতসব, যাদের নাম জানি না। নিজেকে নিজে স্বাধীনতা দিয়ে বসি নামকরণের।
সেই আগুন পাতার কাছাকাছি আসলে আমি বুঝি আমাকে কতদূর যেতে হবে আরো। আগুনপাতার কাছে আসলে বুঝে নিই ওইতো এসে গেছি, সামান্যই বাকি আছে পথ। আমি সতর্ক হই পাতার সংকেতে। অথচ তাকে পাঠ করা হয়নি যতটা রোদকে, বৃষ্টিকে, ততটা তাকে করেছি। এই পাতা সংকেত নিয়ে বেঁচে থাকে আমার জন্যে, তার জন্য এবং তাদের জন্য। সে; “সকল হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি যারে...” । আমি ও তুমি কি কখনো কোন গাছের জন্য বাঁচি!
আমার কাছে আসতে হলে আগুনপাতার সংকেত নিয়ে তোমাকে আসতে হবে। তাদের দেখে বুঝে নিতে হবে সামনেই ফটক, ব্যাগ গুছিয়ে নামা।
তোমার আর আমার দূরত্বের সমঝোতা এই আগুন পাতারাই না হয় মেলে রাখুক! “ আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরানসখা বন্ধু হে আমার...”