লালন

আনিফ রুবেদ



দেখনারে ভাব-নগরে ভাবের কীর্তি :
লালন। এক মহামানবের নাম। একজন মানুষ কেন মহামানব? আমার মতই হাত-পাওয়ালা মানুষ, তাকে কেন আমি মহামানব বলছি? বলি তাঁর চিন্তার জন্য, তাঁর কর্মের জন্য। আমিওতো চিন্তা করি, কর্ম করি। হ্যাঁ, আমি চিন্তা করি আমার জন্যই, আমি কর্মও করি আমার জন্যেই। আমি আমার ‘আমি’র মধ্যেই বদ্ধ থাকি। একজন মহামানবও একজন ‘আমি’ এবং এই ‘আমি’র ভেতর বদ্ধ থাকেন। এর বাইরে বেরুনো কারো পক্ষে সম্ভব নয় এবং এর প্রয়োজনও নাই। যা বলতে চাচ্ছিলাম, একজন মহামানবও ‘আমি’ এবং ‘আমি’র ভেতর বদ্ধ থাকেন। কিন্তু পার্থক্য আছে। মহামানব হলেন বিশাল এক ‘আমি’। এই ‘আমি’ পৃথিবীর সমান, মহাবিশ্বের সমান। এই ‘আমি’ সকল জীব অজীবের সাথে সম্পর্কিত করে ফেলেন নিজেকে। মহামানবের কাছে অন্য একজন মানুষ তারই অংশ, একজন কুকুর, শুকর, পাখি তারই আত্মীয়। সমস্ত কিছুর উপর তার দয়া আর কর্ম প্রয়োগ সমান। তিনি সকলের ব্যথায় ব্যথিত হন। একজন মহামানব শুধু সংবাদ পরিবেশন করেন না, তিনি সংবাদ পরিবর্তন করেন।

আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে/ দিব্য জ্ঞানি সেই হয়েছে/ কুবৃক্ষে সুফল পেয়েছে :
লালন। আমি যখন এই নামটি উচ্চারণ করি, তখন আসলে উচ্চারণ করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির নাম। তাঁর চাইতে বড় কেউ নাই। আমার কেন এমন মনে হয়? আমি কি ধর্মীয় কোনো গোঁড়া অনুসারির মত চেতনা বহণ করে চলেছি? যদি উত্তর করি - না। তবে আরো একটি প্রশ্ন আসে - তবে কেন? পৃথিবীতে খুব বেশি কথা বলার, খুব বেশি বিষয় বোঝার আছে বলে আমার মনে হয় না। পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য খুব সামান্য বিষয় আমাদের বোঝার আছে। যাঁরাকে আমরা মহামানব, মহামানুষ বা বিরাট মানুষ বলি তাঁরা সকলেই প্রায় একই ধরণের বিষয় নিয়ে একই রকম কথা বলে গেছেন। বলেছেন একই কিন্তু তাঁদের প্রকাশটা আলাদা। প্রকাশের ধরণটা আলাদা। সবধরণের প্রকাশ, শব্দের, বাক্যের ব্যবহার সবারটা ভাললাগবে বা বোধগম্য হবে বা হৃদয়ে গিয়ে বাজবে সকলের এমনটা হয় না। একেক মহামানবের চিন্তা, কর্ম এবং বাণী প্রচারের রকম ভিন্ন হয়। এবং আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি তাদের গ্রহণ ক্ষমতাও এক নয় এবং গ্রহণের ধরণও এক নয়। সুতরাং যে মহামানবের প্রকাশের ধরণটা যার হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারে, যোগ দিতে পারে সেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় সে মহামানবের চিন্তাধারা। উদাহরণত, একই বিষয়ের উপর দুটি সঙ্গীত যদি বাজানো হয় দেখা যাবে দুজন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীতটিকে গ্রহণ করতে পারছে। যেকোনো একটিকে পছন্দ করছে। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই। লালন তার কথাটি এমনভাবে বলেছেন যা আমার ভেতরের কথাকে জাগিয়ে দিয়েছে। আমি আসলে অন্যের সেই কথাটিকেই পছন্দ করি যে কথাটি আমারও কথা। সেই কথাটি বা চিন্তাটি আমার ভেতর ছিলই শুধু প্রকাশ করতে পারছিলাম না, নিজে নিজেকে বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমার চিন্তাটিকে আমি নিজে চিনে নিতে পারছিলাম না। মহামানবগণ আমার নিজের ভেতরের কথাটিকে জাগিয়ে দেন, চিনিয়ে দেন। আমার কথা আর চিন্তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন, চিনিয়ে দেন লালন। জানিয়ে দেন তার চিন্তা দ্বারা, প্রকাশনা দ্বারা।

আল্লা কে বোঝে তোমার অপার লীলে :
লালন। অদ্ভূত এক যাদুকর। অদ্ভুত এক চিন্তাবীর। অদ্ভুত এক সাধক। অদ্ভুত এক বিরাট। তাঁর ভাবনা, বেদনা মানুষের জন্য, মানুষের দিকে দারুণ আকুল হয়ে প্রকাশ করেছেন। তাঁর সমস্ত কিছু প্রকাশ করেছেন শুধু মাত্র সঙ্গীতের মাধ্যমে। অন্যকোনোভাবে বাক্যব্যয় করার প্রয়োজন হয়নি তাঁর। তাঁর সুরমাখা বাণী কান দিয়ে একেবারে মরমে পশে যাই। লালনের গান শোনার জন্য বিরাট কোনো কণ্ঠশিল্পীর কাছে যাবার দরকার পড়ে না। আমার বন্ধুটি যদি গায়, পাড়ার রাখালটি যদি গায়, হাটুরে পথিক যদি গাইতে গাইতে যায়, সেটাই মধু হয়ে, মধুর হয়ে ঢুকে বুকের মাঝখানে।

আল্লা হরি ভজন পূজন/ এ সকল মানুষের সৃজন/ অনামক অচিনায় বচন/ বাগেন্দ্রিয় না সম্ভবে :
লালন। তিনি তাঁর গানের মধ্যে একেবারে জীবিত। আমি দেখতে পাই তাঁকে। তাঁর পরশ অনুভব করি। গানগুলো আক্ষরিক অর্থেই তাঁর শরীর আর মনের খণ্ড। কিন্তু পূর্ণ। আমি দেখেছি, কোনো স্থানে হয়তো বসে আছি আর কোনো কুচিন্তা করছি মনের ভেতর আর সেখানে যদি হঠাৎ করে কেউ গেয়ে উঠেছে লালনের গান সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি। বুকের ভেতর ঢুকে যেন সঙ্গীতটি আমাকে চড় মেরে দিয়েছে। আমি একা একা বহুদিন এমন চড় খেয়েছি। একেকটা গান একেকটা লালন হয়ে ধরা দেয় আমার কাছে। নিজেই যখন লালনকালাম গাই, মনে হয়, আমার কণ্ঠের বড়ই সৌভাগ্য গানটি গাইতে পেল। রাতে যখন লালনের গান শুনি কোনো যন্ত্রে, মনটা অচেনা আবেশে ভরে উঠে। শুয়ে শুয়ে গানের ভেতর আমি ঢুকি, আমার ভেতর গান ঢুকে। আমাকে তরল করে দেয় লালনের গান। সারা বিছানা জুড়ে আমি তরল হয়ে ছড়িয়ে পড়ি। এ অনুভুতি বলে বোঝানোর নয়। লালন।

সিরাজ সাঁইর আদেশে লালন/ বলছে বাণী শোনরে মলম/ ঘুরতে হবে নাগর দোলন/ না জেনে মূল বাণী :
লালন। তিনি মহামানব। তিনি তাঁর সমগ্র দর্শন, সমগ্র প্রাণ প্রকাশ করেছেন গান দিয়ে। গান যেকোনো কলার মধ্যে সেরা। কারণ একটি গান তার সুরের ফিতে দিয়ে বেঁধে একই সাথে ধারণ করতে পারে একটি কবিতা, একটি গল্প, একটি ইতিহাস এবং দর্শন। সুর দিয়ে যেভাবে ব্যথা বা আনন্দ প্রকাশ হয় অন্যকোনো ভাবে সম্ভব না। সুর নিজেই একটা ভাষা যা পৃথিবীর প্রতিটি কোণের লোকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কোনো মানুষের বুঝতে অসুবিধা হয় না। বাংলা গানের কোনো ব্যথাতুর সুর ইংরেজেরও হৃদয়ে করুণ রসের ধারা সঞ্চারিত করতে পারে। লালনের সুর হলে তো কথায় নেই। লালনের গানের সুর আমার আত্মার উপর হাত বুলিয়ে ভালবাসা দেয়, মার্জনা করে। এমনভাবে মার্জনা করে, হৃদয় হয়ে উঠে ঝকঝকে আয়নার মত। লালন।

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে :
লালন। তিনি পৃথিবীর সেরা মানুষ। শুধুমাত্র কবি শব্দটির দ্বারা লালনকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে তিনি একজন কবিও এ ব্যাপারে কোনো গোল নাই। যদিও এটা তাঁর খুব সামান্য অংশকে প্রকাশ করে। তার প্রতিটি গান বহণ করে একটি করে অসাধারণ কবিতা। লালন আমার কাছে মহামানব এবং প্রিয় কবিও। অবশ্য কবি শব্দটির একটি বৃহৎ অর্থও রয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে ‘কবিম্’ শব্দটি ঈশ্বরের জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সংস্কৃত ‘কবিম্’ শব্দের অর্থ কবি। ঈশ্বরকে যদি শুধুমাত্র একটি ইতিবাচক বা সদার্থক ধারণা হিসেবে দেখি তবে লালন তাই। লালন।

আমি সত্য না হইলে/ হয়, গুরু সত্য কোন কালে/ আমি যেরূপ দেখ না সেরূপ দীন দয়াময় :
লালন। যখন লালন বর্তমান ছিলেন শরীরের ভেতর, পৃথিবীর ভেতর তখন আমি আমার শরীরের ভেতর এবং পৃথিবীতে বর্তমান ছিলাম না। আবার লালন যখন শরীরে নান, তখন আমি আছি পৃথিবীতে শরীর নিয়ে। আমি পৃথিবীতে দেহের সাথে বাস করছি যখন লালন শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেছেন এবং পুরোপুরি তিনি তাঁর সঙ্গীতশরীরের ভেতর রয়েছেন। তিনি সঙ্গীত হয়ে আছেন। প্রেম বিলুচ্ছেন মানুষে মানুষে। আমার সন্দেহ যে আমিই পূর্বজন্মে লালন ছিলাম। এখানে সন্দেহ শব্দটিকে মার্ক করতে চাই। এই সন্দেহ একই সাথে দুটি অর্থ বহণ করে। প্রথমত সন্দেহ এজন্য যে - আমি যদি লালন না-ই থাকব তবে তাঁর সব বাণীকে কেন আমার নিজের বাণী মনে হয়! কেন এসব বাণী আমার পুরো মনকে দুমড়ে মুচড়ে পাগলপারা করে দেয়! আর দ্বিতীয়ত সন্দেহ এজন্য যে - আমি পূর্বজন্মে লালন ছিলাম না। যদি লালনই থাকব তবে কেন এমন সব মহান বাণী থাকতে কুরসে কুরঙ্গে মেতে উঠার ইচ্ছা পোষণ করি! কেন আমার শরীর মন সুদ্ধ হয়ে ওঠে না! লালন।

বিষ জুদা করিয়ে সুধা রসিক জনা পান করে/ সামন্য জ্ঞানে মন তুই পারবিরে :
লালন। আমার শরীর আর মন নিয়ে আমার ‘আমি’। শরীরের দিকে তাকালে মন দেখতে পাই না, মনের দিকে তাকালে শরীর দেখতে পাই না। দুটোকে একসঙ্গে দেখতে চাই। দুটোকে একসঙ্গে দেখতে হলে এর বাইরে তৃতীয় একটা বিন্দুতে দাঁড়াতে হয়। এই তৃতীয় বিন্দুতে দাঁড়াতে পারলেই তৃতীয় একটা মানে দাঁড়ায়, তৃতীয় একটা অর্থের উপর দাঁড়ানো যাই। শরীর আর মনকে একসাথে দেখার আনন্দ পাওয়া যায়। লালনের গানের সাধারণত দুটা অর্থ থাকে। একটা খুব সহজ, বুঝতে তেমন সমস্যা হয় না। এসব সহজবোধের মধ্যে আছে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, জাতাভেদ, মানুষের করণীয় বিভিন্ন বিষয়। অন্যটি খুবই জটিল এবং সাধনা না করলে এর পুরো অর্থ মনাঙ্গম করা কঠিন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমি তাঁকে পুরো বুঝি এমন বলাতো বহু দূরের কথা - বুঝি খুব সামান্য - ব্যাখ্যা করতে পারি না - অন্যের কাছে তো নয়ই, নিজের কাছেও না। আমি তাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করি, করতে চেষ্টা করি। আমি লালন থেকে সবচেয়ে বেশি যেটা অনুভব করি তা হলো উর্দ্ধরতির ধারণা। বড়ই কঠিন সাধনা। তৃতীয় বিন্দুর উপর দাঁড়ায় আমি। লালনের বাণীর ভেতর যা আছে, বাইরে যা আছে তা নিজের মত করে তৃতীয় বিন্দু থেকে দেখি, তিনি বলছেন - জন্মরহিত করার কথা। অথচ তাঁর কালামের কোনো এক স্থানেও ঠিক এই কথাটি তিনি উচ্চারণ করেননি। অথচ আমার মনে হয় তিনি ঠিক একথাই বলতে চেয়েছেন। এ জগতের দুঃখ বেদনা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো জন্ম না দেয়া। জগত একটা দুঃখসাগর। এখানে অজস্র দুঃখ ঠেলে ঠেলে তবে একটু অদুঃখ পায় মানুষ আর এই অদুঃখ পাওয়াকে ভেবে নেয় সুখ পেল সে। যে শিশুটা জন্মিবে দুবছর পর সে এখন কী অবস্থায় আছে? আমরা জানি না। তবে ধরে নিই ভাল আছে। আর সে ভাল জায়গা থেকে তাকে তার বিনা অনুমতিতে টেনে আনা বড়ই অন্যায় কাজ। আর মানুষ দিনের পর দিন করে চলেছে ব্যাপারটা না বুঝেই। অযথাই অন্য একটা মানুষকে সে জন্ম দিচ্ছে আর ফেলে দিচ্ছে অসীম দুঃখ সাগরের মাঝে। এমন অন্যায় করার অধিকার কোনো মানুষের নেই। অথচ তাই করছে। একটা মানুষ আর একটা মানুষকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসছে আর বলছে, এ আমার সন্তান। একজন মানুষকে রক্তাত্ব করে কষ্ট দেওয়া আর পৃথিবীয় যন্ত্রণার ভেতর ফেলে দিয়ে যন্ত্রণা দেওয়ার মধ্যে খুব বেশি প্রভেদ নেই। লালনের এ বিষয়টা বুঝতে আমার কোনো ভুল হয়নি। অথচ তিনি তা কোনোভাবেই সরাসরি বলেননি। তাঁর প্রতি আমার সমস্ত প্রেম এই ব্যাপারটির জন্যই সবচেয়ে বেশি। লালন।

জগৎ মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই/ ভক্তি দাওহে যাতে চরণ পাই :
লালন। জানি মুক্তি পাব না। ভক্তিতো দূরের কথা। তবু প্রাণের ভেতর থেকে কখনো কখনোতো ঠিকই গেয়ে উঠি -
কবে সাধুর চরণ ধুলি লাগবে মোর গায়
আমি বসে আছি আশা সিন্ধুর কূলে সদায়॥

চাতক যেমন মেঘের জল বিনে
অহর্নিশি চেয়ে থাকে মেঘ ধিয়ানে
তেষ্টায় মৃতগতি জীবনে
হইলো সে দশা আমায়॥

ভজন সাধন আমাতে নাই
কেবল মহত নামের দেই গো দোহাই
নামের মহিমা জানাওগো সাঁই
পাপীর হও সদয়॥

শুনেছি সাধুর করুণা
সাধুর চরণ পরশিলে হয়গো সোনা
বুঝি আমার ভাগ্যে তাও হলো না
ফকির লালন কেঁদে কয়॥

লালন তাঁর সঙ্গীত এমনভাবে সাজিয়েছেন, এমনভাবে গানের মধ্যে প্রাণ বসিয়েছেন একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলেই দেখে চমৎকৃত হতে হয়। পৃথিবীর অনেক কবি এবং গীতিকারই গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর বেশিরভাগ সঙ্গীতই করুণ রসের বা যেগুলো মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়, তার বেশিরভাগই করুণ রসের। এবং এসব গানের বেশিরভাগটা শ্রবনের পর, শ্রোতার মনে হতে পারে তার দুঃখের জন্য অন্য একজন দায়ী। কিন্তু লালনের গানের ভেতর আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি, সেখানে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের দুঃখের জন্য নিজেই যে দায়ী, শ্রোতা সেটা অনুধাবন করতে পারে। লালন।