ঘুমগুলো সরগম। ঘুমগুলো মূর্ছা যাচ্ছে

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়



হর ঘরকে কোণে মে এক পোস্টবক্স হোতা হ্যায়
লহু য্যায়সা লাল রং-কা পোস্টবক্স হোতা হ্যায়
--মেমোরিজ ইন মার্চ, ঋতুপর্ণ ঘোষ

তখন তার বয়স বছর পাঁচেক। প্রতিদিন বিকেলে একজন শিক্ষক আসতেন। গৃহশিক্ষক। পাঠ শেষে যখন সে বাড়ির পাশে খেলার মাঠে গিয়ে দাঁড়াতো, মৃত বিকেল রক্তাক্ত দেহ নিয়ে সন্ধের পেটে। বন্ধুহীন একা মাঠ। কেউ নেই, কিছু নেই। শুধু পাশের বাড়ি থেকে মহিলা কন্ঠে সন্ধ্যার রেওয়াজ ভেসে আসত, ভেতর থেকে দলাপাকানো কান্না দুমড়ে মুচড়ে বুকে ধাক্কা দিত। এক অসহায় শিশু তার প্রিয় সময় থেকে, সাথীদের থেকে প্রতিদিন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
এমনই এক মরা বিকেলে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পেল, নির্জন মাঠে এক কাকশাবক। দুর্বল অসহায় পথহারা উড়তে পারছে না। লাফিয়ে লাফিয়ে কচি চিৎকারে মাকে খুঁজছে। খুঁজছে আশ্রয়। আর পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে সেই রেওয়াজ। শিশুটির কী হল কে জানে, একটা পাথর তুলে সোজা পাখির ঠোঁটে। মুহূর্তে পাখির ঠোঁট বেয়ে রক্তস্রোত। মাঠময় রক্ত ছড়িয়ে ছড়িয়ে সেই কাকশিশু খুঁজে চলেছে পথ, আশ্রয় অথবা মা। তখনও পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে সাতটি সরগম। আর সেই মানবশিশু, অসাড় শরীর নিয়ে সোজা বিছানায়— টানা সাতদিনের জন্য গভীর জ্বর মাথাব্যথা ভুলবকা। এক অসহায় কাকশাবক রক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে, না-উড়তে-পারা নিয়ে, কচি চিৎকার নিয়ে, সাতটি স্বরসহ ঘুরে বেড়াতে থাকে জ্বরের ভেতর।

ক্লাস থ্রি কিংবা ফোর। ছেলেটি ক্রিকেট খেলে। ফুটবলও। তার থেকে বছর পাঁচেকের বড় পিস্তুতো দাদা। দীপদা। ইন্ধনদাতা।
জানিস শ্রীকান্ত কীভাবে ব্যাট ধরে?
কীভাবে!
দু-পায়ের ফাঁক আড়াইফুট
বাপ্‌রে!
এই দ্যাখ, এভাবে, ব্যাট কাঁধে নিয়ে বাঘের চলন। বলে বলে চার-ছয়।

সে বিস্মৃত। আমাকে শ্রীকান্ত করে দাও ভগবান। সন্ধেবেলা ঠাকুর ঘরে ধূপ দিতে দিতে গভীর আকুতি।
সে গোলকিপার আর দীপদা স্ট্রাইকার, পেনাল্টিশুটার। দীপদার দুরন্ত শট সেভ করে সে নিতাই-গোউর।
উঁহু, হবে না। তুই বড় আনস্মার্ট।
মানে!
মানে, রিপ্লে হবে, রিপ্লে। আমি যেভাবে শট মারলাম আবার মারব। তুইও ঠিক আগের মতো সেভ করবি। তারপর আবার ওইরকম দুহাত তুলে ঢেড়সের মতো নাচবি। টিভিতে এসব দেখায়। বুঝেছিস।
এই দাদাই একদিন বলল, তুই জীবনানন্দের নাম জানিস?
জীবনানন্দ! ক্রিকেটার?
দূর গাধা, কবি।
কবি! সে তো স্কুলের বইয়ে আছে। কবিতা বলার আগে বলতে হয়।
দাদা হাসে। এ হল অন্য জাতের কবি। শোন, একবার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়(বলাই বাহুল্য, এই নামটিও তার কাছে অজানা) রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন; দেখলেন জীবনানন্দ দাশ একমনে হেঁটে আসছেন। কাছে আসতেই সুভাষ মুখোপাধ্যায় নত হয়ে জীবনানন্দকে প্রণাম করলেন। অথচ জীবনানন্দের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। প্রণাম করার সময় দিলেন, তারপর আবার সামনের দিকে হাঁটা দিলেন।
ছেলেটি অবাক। এ আবার কেমন লোক! স্কুলের স্যারদের প্রণাম করলে কত খুশি হন। বিষয়টা মনোমত না হলেও দৃশ্যটি মাথায় গেঁথে গেল। একজন মানুষ একা একা হেঁটে যায়, আরেকজন তাঁকে নত হয়ে প্রণাম করে। তাঁর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি থামেন, প্রণাম নেন, চোখ সামনে রেখে আবার হাঁটতে থাকেন।

পরদিন দাদার কাছে অনুরোধ, দাদা ওই যে কী নাম বলেছিলে, যে প্রণাম নেন অথচ খুশি হন না ওঁর একটা কবিতা শোনাবে?
সৌম্যদর্শন, মেধাবী, স্নেহশীল দাদা মৃদু হাসে—

আমাকে
তুমি দেখিয়েছিলে একদিনঃ
মস্তোবড়ো ময়দান— দেবদারু পামের নিবিড় মাথা— মাইলের পর মাইল;
দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস
দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হ’য়ে হারিয়ে যায়;
জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার,
জানালায় জানালায় অনেক্ষণ ধরে কথা বলেঃ
পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়।
তারপর
দূরে
অনেক দূরে
খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রুপসীর মতো ধান ভানে—গান গায়—গান গায়
এই দুপুরের বাতাস।

দাদা, এর মানে কী?
দাদাকে এই প্রথম একটু পরাজিত মনে হয়। একটু অপ্রস্তুত। হঠাৎ রেগে যায়।
এত মানে জানার দরকার কী, শুনে একটু দুঃখ-দুঃখ লাগছে কিনা বল। ওই গানের জায়গাটা?
হ্যাঁ, তা লাগছে। তবে ঠিক দুঃখ দুঃখ কিনা বোঝা যাচ্ছে না। কোনও গান নেই অথচ গানের একটা রেশ, যেন কোনোদিনই শেষ হবার নয়। একটা অস্বস্তি। ছেলেটি চুপ করে থাকে, কিছু বলে না।

রাত্রে পড়ায় মন বসে না। কেমন যেন অস্বস্তি। খাবার খাওয়া হয় না। সেই অবশ্যম্ভাবী জ্বর। সেই ভুলবকা। জ্বরের ভেতর এক বৃদ্ধা পা ছড়িয়ে কতদিন ধরে যে গান গেয়ে চলেছে একা একা; ঠোঁট নড়ছে, কী গাইছে সে বুঝতে পারে না, কোনোদিনই যেন শেষ হবার নয়।

ক্লাস সিক্স অথবা সেভেন। চা আর বিড়ি ছাড়া ঠাকুরদার সমস্ত খাবার চার ভাগে ভাগ হয়। একভাগ তাঁর নিজের, বাকি তিনভাগ যথাক্রমে পোষা টিয়াপাখি, পোষা কুকুর আর আদরের নাতি। নতুন কোনও লেখা হলেই পাঠক ঠাকুরদা। হ্যাঁ, সেই সিক্স বা সেভেন-এ।
বাঃ, বেশ হয়েছে। এটা তো একদম সত্যেন দত্ত মনে হচ্ছে রে। বাঃ বাঃ, এই লেখাটায় কিন্তু অমিত্রাক্ষর আছে, এই দ্যাক্‌ এই জায়গাটায়।
বারো-তেরো বছরের একজন বালকের কাছে যিনি মধুসূদন তিনিই সত্যেন; আর অশীতিপর পিতামহের একটাই উদ্দেশ্য, নাতিকে লেখায় উৎসাহিত করা। তার জন্য অতিকথন কিংবা মিথ্যাও শ্রেয়। উৎসাহিত নাতি আরও আরও লিখতে থাকে। ঠাকুরদা সেইসব লেখা শুকতারায় পাঠান। যে শুকতারার সাথে সে জন্মাবধি পরিচিত।
সময় গড়িয়ে যায়। লেখা ছাপা হয় না। ঠাকুরদা সান্ত্বনা দেন— ভাবিস না ঠিক ছাপা হবে। কখনও বলেন, বোধ হয় ঠিক অ্যাড্রেসে যাচ্ছে না, রেজিস্ট্রি করে পাঠাতে হবে। ইন্ডিয়ান পোস্টাল সার্ভিসের যা দশা, বিশ্বাস নেই।

ছোটপিসির বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, বিবাহের। প্রায়ই সম্বন্ধ আসে। পাত্রপক্ষের লোকেরা ইন্টারভিউ নেয়। হাঁটা বসা দাঁড়ানো চুল রঙ পড়াশুনো রান্না হাতেরকাজ এবং অবশেষে গান। ফলে প্রতিদিনই পিসিকে হারমোনিয়ামের সামনে বসতে হয়, একজন বয়স্ক ‘মাস্টার’ আসেন, ঠাকুমা লেগে থাকেন
আরেকটু ভালো করে অভ্যেস কর মা...
ঠাকুর্দা চুপ করে বসে থাকেন তাঁর নিজের ঘরে, মেয়ের গলা ভেসে আসে, নাতিকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন
আজ কি লিখলে বাবু
আজ তো কিছু লিখিনি
ও, তাহলে এসো, রবিঠাকুর পড়ি
তিনি ‘নৈবেদ্য’ টেনে নেন, ছেলেটি কিছুই বোঝে না, যেমন আগেও বোঝেনি। কার উদ্দেশ্যে এই নিবেদন, কেনই-বা। ঠাকুর্দা নিজেও কি বুঝে পড়ছেন, নাকি তাঁর ছোট মেয়ের এই অনিচ্ছাকৃত জোর করে গেয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে কিছু একটা করতে চাইছেন, ছেলেটি তাও বোঝে না। শুধু এই সন্ধের উপর চেপে বসছে আরও এক সন্ধে, একটা ছোট্ট কাক, রক্তাল্পুত। আর সেই বিগত রেওয়াজ চেপে বসছে এই সন্ধের রেওয়াজের ওপর।

ক্লাস এইট। একদিন ঠাকুরদা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা। সামান্য জ্বর সর্দি কিম্বা শারীরিক দুর্বলতা ছাড়া, এর আগে কিশোরটি তার ঠাকুরদাকে সেভাবে কখনও অসুস্থ দেখেনি। তার প্রবল বিশ্বাস ঠাকুরদা একশ বছ বাঁচবে কিংবা তারও বেশি। এই অসুস্থতাতেও ঠাকুরদা নাতিকে ডেকে পাঠায়, বলে, ‘কোথায় সোনার তরী’? ছেলেটি রবিঠাকুর পড়ে। কয়েকটা কবিতার পর ঠাকুরদা বলেন, ‘গান’। তাঁর প্রিয় গীতিকারও ওই রবিঠাকুর, তিনি বলেন রবিবাবুর গান। দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় ‘পথের শেষ কোথায়’ আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’। ঠাকুরদার জর্জ বিশ্বাস আর হেমন্তবাবু।
অসুস্থতার তিন-চারদিন পর বিকেলবেলা অবস্থার অবনতি হয়। ডাক্তার বলেন কোথাও নিয়ে যাবার দরকার নেই। ঠাকুরদার বিছানা ঘিরে ঠাকুমা, বাবা-কাকা, মা-কাকিমা, পিসিরা। ছেলেটি সবাইকে ঠেলে বিছানায় ওঠে। ঠাকুরদার ক্ষীণ বুকে হাত বোলায়। বুকের হাড় পাতলা চামড়ার ওপর জেগে আছে। যেন কয়েকটি স্পিডব্রেকার উঠছে নামছে। কথা বন্ধ। চোখ বাঙ্‌ময়। কী বলছেন বোঝা যায় না। নাতিকে দেখে একটু কি হাসলেন! ছেলেটির তাই মনে হল। তার এখনও বিশ্বাস ঠাকুরদা ভালো হয়ে যাবে। সে খেলতে চলে যায়।

তখন সন্ধে। খেলা শেষ। মাঠ থেকে ফিরে দেখে ঠাকুরদার মাথার পাশে স্তব্ধ হয়ে ঠাকুমা, যেন আরেকটা মৃত বিকেল। পাশে মা কাকিমা পিসিরা। বাইরে বাবা কাকারা নীচুস্বরে কী নিয়ে আলোচনা করছেন। সে খাটে উঠে ঠাকুরদার দিকে তাকায়। দু-গাল ভেতরে ঢুকে গেছে। চোখ বন্ধ। বুকে হাত বুলিয়ে দেখে স্পিডব্রেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে, তবে ওঠানামা করছে না, স্থির। ঠাকুমাকে মনে হয় সেই বর্ষীয়সী মহিলা। চোখ দূরে স্থির।পা ছড়িয়ে বসে, ঠোঁট মৃদু কাঁপছে। কিছু কি গাইছেন? শব্দহীন। কেউ শুনতে পাচ্ছে না।

কয়েকদিন পর, টিউশনে এক বন্ধু জানাল কবিতা ছাপা হয়েছে, শুকতারায়।
তোর কবিতা খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু ঠিকানায় জেলা স্কুল লিখেছিস কেন? জিলা স্কুল হবে।
এই প্রথম কিশোরটি বাইরের কোনও পাঠক পেল, সমালোচকও।
এ যেন তেমন কোনও খবরই না। কোনও উৎসাহই দেখাল না সে। তার একান্ত পাঠক, উৎসাহদাতা, পেট্রন কিছুদিন আগে বিদায় নিয়েছেন। চির বিদায়। সে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে শুকতারার পাতাটি খুলে একটা পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রেখে দেয় টেবিলে, ঠাকুরদার ছবির সামনে। তারপর নিজের রুমে এসে টেপরেকর্ডারে চালিয়ে দেয়— দিনের শেষে ঘুমের দেশে। ততদিনে যে ‘হেমন্তবাবু’-র গলায় এইগানটি তারও খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে।