গানে জাতিস্মর

শিমন শারমিন



কিছু গান থাকে না?
প্রশ্নটা ভুল হল সম্ভবত। থাকে তো কত গানই। শত ভাষায় কোটি কোটি গান। নতুন, পুরানো। প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে আরো কত গান। আরো কত সুর। কথা আর সুরের মায়ায় বেঁধে ফেলে আমাদের ভাসিয়ে নিতে তৈরি হচ্ছে তারা। এক জীবনে সব বই পড়ে ফেলা সম্ভব নয় ভেবে মাঝে মাঝে বিষাদে ভারাক্রান্ত হতে থাকে মন। তেমনি আরেক আফসোস তৈরি হয় গানের জন্য। কত গান শোনা হয় নি। আরো কত গান হয়তো শুনতে পাব না। সবচেয়ে আশ্চর্য সুন্দর সুরটা হয়তো আমার এখনো শোনাই হয় নি। সবচেয়ে অদ্ভুত গানের কথাগুলো এখনো হয়তো লেখাই হয় নি কোথাও। আমাদের একেকজনের মৃত্যুর একটু পরেই কিংবা অনেক বছর পরে হয়তোবা জন্ম নেবে নতুন রকম কোনো তালে, লয়ে বাঁধা সুর। তবে সেই সুর কানে বাজিয়ে হারিয়ে যাবার মতো অবস্থায় আমরা তখন আর থাকব না। কখনো মনে হয় আসলে ঠিক মৃত্যুর কথা ভেবে আমার ভয় হয় না। আমার মৃত্যুভয়টা এমন সব ছোট আর তুচ্ছ কারণগুলো নিয়ে। আকাশটা আর দেখতে পাব না। বৃষ্টির আওয়াজ পাব না। কখনো আর গান শুনতে পারব না! এমন আরো কত সামান্য সব বিষয়। ভয়-টয়ের ভয়াবহ কথা বাদ দিয়ে সেই কিছু গানের প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যাই।
এই কিছু গান থাকে খুব অন্যরকম। নির্দিষ্ট কারো গাওয়া নয়। লেখা নয়। নির্দিষ্ট কোনো ধরণ বা সুরের নয়। যে কারো জন্য যে কোনো গানই ওই “কিছু গানের” একটা হতে পারে। অথবা যে কোনো সময়ে যে কোনো গান যে কারো জন্যই হয়ে যেতে পারে সেই গানটা।
কিছু গান আছে যা শুনলেই তৎক্ষণাত অন্য কোনো সময়ে চলে যায় মন। অন্য কোনো স্থানে। কিছু গান। গানের কিছু কথা। গানের কোনো সুর। সেই গানের পেছনের কোনো গল্প। মনে পড়ে। কত কিছুই মনে পড়ে। মনে কী পড়ে আর কেন পড়ে সেসব কোনো কিছুই আমাদের হাতে থাকে না। কোনো সুর হঠাৎ বৃষ্টির মতো স্মৃতির পশলা ঝরিয়ে দেবে এক নিমেষে। কোন কথা নিয়ে যাবে কোন মুহূর্তের কাছে? কে বলতে পারে? গান না শুধু। এমন হয়তো অনেক কিছুই আছে। একটা কবিতা। চলচ্চিত্র? সাধারণ একটা ছবি। আর গন্ধেও। সবকিছুতেই স্মৃতি মেশানো থাকতে পারে কোনো না কোনো। তবে, সবকিছুরই ক্ষমতা নেই সঙ্গে সঙ্গে স্থানান্তর করে দেবার। কিংবা সময়ান্তর। সম্ভবতঃ স্মৃতির টানটা বা ওই সময়ের অনুভূতির তীব্রতাটা অনেকখানি বেশি হতে হয়। হয়তো। তবে বাকি যে কোনো কিছুর চেয়ে আমার ওপরে সম্ভবত গানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আমাকে এক মুহূর্তে সময়ান্তর করে দেবার যে ক্ষমতা একেকটা গানের আছে, তা তেমন আর কিছুতে নেই। আমার প্রতিটা দিনের সচেতন প্রতিটা ক্ষণের সাথে মিশে থাকে গান। গান ছাড়া মস্তিষ্ককে অচল মনে হয়। তাই হয়তো আর সব কিছুর চেয়ে একেকটা গানের মাঝেই আমার সবচেয়ে বেশি স্মৃতির ঘ্রাণ মিশে আছে।
সেই ছোট্টবেলা থেকে কতো লক্ষ গান শুনতে শুনতেই আমরা বড় হতে থাকি। আমাদের মনের ক্যানভাস দীর্ঘ হতে থাকে। সব গান কি আর দাগ কেটে রেখে যেতে পারে তবু? খুব প্রিয় কোনো গানেরও হয়তো সেই ক্ষমতা থাকে না। যে গানটা আমি প্রতিদিন শুনছি তার সাথে হয়তো কোনোই স্মৃতি নেই। তবে প্রতিদিন সেই গানটি শোনার সময় তার সাথে স্মৃতি তৈরি হয়ে যাবার একেকটা ক্ষেত্রও অবশ্য তৈরি হয়ে যায়। গানেদের কেউ এভাবে স্মৃতির ঝুলিতে আরো কিছু যোগ করে চিরতরে মিশে যায় আমাদের সাথে। কেউ পারে না। সে শুধু প্রিয় একটা গান হয়েই রয়ে যায়। আর তা-ই বা কম কীসে?
উল্টো দিকও আছে। প্রিয় স্মৃতি যেখানে মিশে থাকে হয়তো সেই গানটা আমার মোটেই পছন্দ না। তবু, ওই স্মৃতিটুকুর জন্য ওই গানটার প্রতি একটা আলাদা পক্ষপাতিত্ব রয়ে যায় মনের কোনো কোণে। অপ্রিয় একটা গান শুনে নিজের অজান্তেই তাই ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলে থাকে। নিমেষে দূর হয়ে যায় কতো শ্রান্তি।
ছোটবেলায় বাসার একমাত্র ক্যাসেট প্লেয়ারটি ছিল আমার বড় ভাইয়ের দখলে। তার মনমতো আর পছন্দমতো গান শুনতে হত প্রতিদিন। গান শুনেই বোঝা যেত সেদিন তার মনের অবস্থা কী। তার মনের সেই সব চড়াই উৎরাইয়ের বিভিন্ন গান পার হয়ে সবচেয়ে বেশি একটা গানের কথা মনে পড়ে। ওর সাথে আমার ঝগড়া লাগলে দেখা যেত টানা বেশ কিছু দিন আমরা কেউ কারো সাথে কথা বলছি না। দু’জনেরই খুব রাগ। খুব টানও। কথা বলতে চাইছি কিন্তু রাগটার কারণে কেউ বলছি না। আর এমন কোনো একটা দিনে সেই কথা বন্ধ পর্বের মধ্যে ভাইয়া মান্না দে চালিয়ে দিত। আকুল হয়ে তিনি গাইতে থাকতেন,
“সে আমার ছোট বোন,
বড় আদরের ছোট বোন!”
এরপর ঠিকই কোনো একটা ছুতোয় আবার কথা শুরু হয়ে যেত।
তারপর সেই যে আরেকটা গান, তৎকালীন সুমন চাটুজ্জের-“হাল ছেড়ো না বন্ধু আমার, কণ্ঠ ছাড়ো জোরে!” এক বন্ধুর সাথে তখন নতুন পরিচয়। আমারই কল্যাণে এই গানের সাথেও তার তখন নতুন পরিচয়। তারপর প্রবল আগ্রহ নিয়ে সুমনের আরো কিছু গান সে শুনে ফেলল। কিন্তু নির্দিষ্ট এই গানটার দিকেই তার কেন যেন প্রচণ্ড টান ছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করত,
“আচ্ছা, তোর মনে আছে, ওই গানটা যেন কী?”
আমি তো আগে থেকেই জানি যে তার “ওই গানটা” সবসময়েই এই গানটাই। বলে দেবার পর প্রায় প্রতিবারই তার চেষ্টা থাকত গম্ভীর মুখে গানের কথা থেকে দু’চারটা বাক্য বলে দার্শনিক ভাব নেবার। এখনো যতবার “হাল ছেড়ো না” বেজে ওঠে কোথাও, সেই মেয়ের মুখটাই ভেসে ওঠে মানসপটে। ওর সেই আনন্দিত চেহারার প্রতিটা ভাঁজ এখনো এত স্পষ্ট। আমি এখনো ভুলতে পারি না সেই বন্ধুটিকে। হাল ছাড়তে পারি না।
এমন আরো কত গানের সাথে অদ্ভুত কত স্মৃতি। রিকি মার্টিনের “লিভিং লা ভিডা লোকা” যখন প্রথম বের হল তখন স্কুলের ফাঁকে একটা বইয়ের দোকানে কাজ করি সপ্তাহে তিন দিন। সেখানে সারাদিন মুর্ছনা উঠত মোজার্ট, বিথোভেন, চোপিন, ইয়ানি আর এমন আরো কতো ক্লাসিক্যাল সুরে। নিয়মের বেড়াজালে ঘেরা সেই শান্তশিষ্ট বইয়ের দোকানেই একদিন“লিভিং লা ভিডা লোকা” বাজিয়ে দিল এক কমবয়সী কর্মী দোকানের সব ক’টা কাচের দেয়াল কাঁপিয়ে। দোকানের দুই বয়স্কা কর্মী আমাদের বকতে গিয়েও নিজেরাই হেসে উঠলেন। গুন গুন করতে করতে বই গুছিয়ে রাখতে লাগলেন নিজেদের মতো। এবং আমরা সবাই মিলেই ঠিক করলাম দোকানের ম্যানেজারকে আমরা কেউ কিচ্ছুটি বলবো না এই বিষয়ে। বইয়ের গাম্ভীর্যের ফাঁকে আমাদের একদিনের লা ভিডা লোকা বেঁচে ওঠা!
কার্পেন্টারসের “রেইনি ডেজ এ্যান্ড মানডেজ” গানটা শুনবার সাথে কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু খুব কাছের এক বন্ধুর সাথে পরিচিত হবার কারণের সাথে কী করে যেন এই গানটা মিশে গেছে। আরো একজনের সাথে পরিচয় হয়েছিল ডেমিয়েন রাইসের “ব্লোয়ারস ডটার” শুনতে গিয়ে। জিম ক্রোচের “টাইম ইন আ বটল” গানটার সাথে আমি এখনো স্মৃতি কুড়িয়েই যাচ্ছি। সেই অসীম ধারণক্ষম বোতলে সময় আর স্মৃতি ফেলেই যাচ্ছি শুধু। পবন দাস বাউলের “দিল কি দয়া” গান চললে চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই বিমান বাংলাদেশের একটা সিটে আব্বা বসে গান শুনছেন। একমনে। কানে সিডিম্যান। তিনি তন্ময় হয়ে শুনে যাচ্ছেন। শিলাজিতের “বসুন্ধরা” শুনে এখনো ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠার কারণ হয়ে স্মৃতিতে মিশে থাকে আরেক বন্ধু। বি-জিসের “এ্যালোন” গানটা শুনতে গেলেই মি. উইলিয়ামস কাঁধের পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে ওঠেন,
“তোমাদের বাংলাদেশিদের সমস্যা কী? যে কোনো একটা প্রজেক্ট করতে দিলেই তোমরা শুধু বাংলাদেশকে নিয়েই কাজ করো কেন? ভারি আজব তো!”
সব গানের সাথে যে আনন্দের ঘ্রাণ মিশে থাকে তাও নয়। কিছু গান আছে খুব প্রিয়। কিন্তু তাতে রয়ে যাওয়া কোনো মুহূর্তের রেশের কারণে সেই গানটাও কেমন যেন প্রাণহীন মনে হয়।
যেমন, সেই যে একটা গান। শুনলেই মনে হতে থাকে আমি হাঁটছি। চারপাশে অদ্ভুত সুন্দর একটা বিকেল। ব্যস্ত একটা রাস্তা ধরে হাঁটছি। দুই কানে সেই একটাই গান বেজে চলেছে। কোনো দিকে তাকাচ্ছি না। নিচে তাকিয়ে হন হন করে হাঁটছি। প্রচন্ড ক্ষিপ্ত, অপমানিত, অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি সবখানে। এই অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করতেই হয়তো আরো জোরে হাঁটছি। অস্বস্তিবোধটাকে পেছনে ফেলে হেঁটে যেতে চাইছি। যতো জোরে সম্ভব। কিন্তু সেই বোধ আমাকে ছাড়ছে না। পিছু ছাড়ছে না। গানটার সাথে আমার ওই সময়ের মানসিক অবস্থার কোনো মিল নেই। গানের কথা, সুর কিছুই মিলছে না। তবু ওই গানটাই বেজে যাচ্ছে। অস্বস্তিটা কেন লাগছে, রাগটা কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি আমার খুব রাগ লাগছে। খুব অপমানিত লাগছে। মাথাটা কেমন এক অস্থিরতায় আউলানো মনে হচ্ছে। আর আমি যতো দ্রুতগতিতে পারি হাঁটছি। হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তাটা আমি চিনি না। একটা স্রেফ ধারণা আছে। সেই ধারণা থেকে কোনো এক গন্তব্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। গন্তব্য আছে। তবু কেমন উদ্দেশ্যহীন। আশেপাশের কিছু মানুষ অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে। হাঁটার গতি দেখছে। নিরুদ্দেশ চলা দেখছে। আমি আমার মতো হন হন করে চলছি। দুই কানে মিল-ছাড়া একটা গান বেজে যাচ্ছে। বার বার! রিপিট!
অতঃপর অবশ্যম্ভাবী - রাস্তা হারিয়ে ফেললাম। কোনো একটা রাস্তার শেষ মাথায় হঠাৎ থেমে যেতে হলো। প্রথমবারের মতো চারপাশে তাকালাম। উল্টো দিকে ফিরে খেয়াল করলাম আশেপাশে কোথাও কিছু চিনি না। কোন দিকে যাবো? কোথাও কি আদৌ যাবার আছে? যেতে চাই কি কোথাও? এবার সত্যিই উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছি। রাস্তা হারিয়েছি বুঝেও আমি ঠিক রাস্তা খুঁজছি না। একটা দিকে হেঁটে যাচ্ছি। গান চলছে।
মাঝে মাঝে হারিয়েছি জেনেও খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে না কিছু। রাস্তা চিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। কোথাও। মাঝে মাঝে হারিয়ে যেতেই ভালো লাগে। যখন হারানোর কোনো পথই খোলা থাকে না তখনো গান থাকে। গান চলতে থাকে।
চোখ বুজে সেই সুরে ভেসে যাওয়া যায় দূর থেকে দূরে ...।