সাড়েতিন হাত নৌকার গান

রিমি দে



সবে স্কুল থেকে ফিরেছি।চিকচিক করছিল মাধুরী। মনে আসন্ন গাজনের আনন্দ। ফেরার পথেই মিঠু মিতুর সংগে চোখে চোখে কথা বলা সারা! খেয়েই বাইরে বেরোনোর প্ল্যান। কারণ সামনেই চরকপূজা।
তার প্রোগ্রাম ছকটা করতে হবে। মায়ের তখন বালিশের পাশে শংকর। চোখে দিবানিদ্রা।
হাত মুখ ধুয়ে মনে গুনগুন নিয়ে ঘরেই এদিক সেদিক। সদলবলে। দল ভালোবেসে দল। চল চল।
এমন মুডে। দুপুর তখন পড়ন্ত। বিকেলের সাথে হামি খাবার সময়। সে সময়ে আমরা।
আমরা মনুষের গন্ধ বহন করতাম। পাড়ার বন্ধুরা হুল্লোড় আর হুল্লোড়। অনর্গল কাকলি ,ভিতরে ভিতরে গানের
উচ্ছাস হাতে হাতে ধরি ধরি ! হাতে হাতে সবুজ পাতা ছিল যেন! পাতামহল। আমাদের পাতাবাহার।
তখন মেরুন ততটা প্রচলিত ছিলনা, যতটা ছিল লালখয়রী । তখন দখিন দুয়ার খোলা। হালকা বিকেল
আরো ঘনর দিকে, সে তখন আসবার জন্য মন কালো করে আকাশের বুকে মেঘ ছড়াচ্ছে। প্রবল
হাওয়া বিলিয়ে একটি বর্ষার প্রাক আবহ তৈরি হল। মুহূর্তেই দুনিয়া এলোমেলো করে বৃষ্টি এল।
ভেতরে জন্ম নিল যেন এক নতুন গুনগুন! ময়ূর হল মন।হালকা উথাল কিংবা ভিজে পাখির ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরার গান। চোখের সামনে ভেসে ওঠে টুপটাপ টুপটাপ । চিলেকোঠার নিঝুম। মৌনমুখর।
এক অপরূপ সৃষ্টির সাথে মিশে যাবার পালা। মুখোমুখি আমি ও সে। বসন্তদিনেও যেন ভেসে আসে
গন্ধরাজ। ভ্রম করি । নিঃসংশয় থাকতে পারি না।। তবু ভাঁটফুল তাড়িত করে। আরো ভেসে যাই।
অজানা কোন এক ভাষা অজানা কোন এক সুর বেশ কয়েকটা স্পেস এনে দেয়। সেখানেই
সেই অন্তরমহল!
উথলে ওঠা কিংবা থমকে যাওয়া গানের মুখরা । ঈহা অনিহার হর্ষ ও হাহাকার। একটি নিভৃত
জলসাঘর । বিস্তর বিস্তারার মাঝে মাদুরে মেদুর । অবিরাম অবিরাম! ছড়িয়ে থাকা রক্ত আঁচলে
জমিয়ে জমিয়ে জীবনের ঝোপঝাড় মরুভূমির মুখে মাখিয়ে দেওয়া । হোঁচট খাওয়া গর্তের পায়ে
রাঙা চুমিয়ে রাখা আরো কত কিছুই রামধনু হয়ে সা-রে-গা-মা র আরোহণ অবোরোহন এ মাতিয়ে রাখে।
আমার মনকানন ।
জানলার শার্সিতে পা গলিয়ে গাজনের মাঠ পেরিয়ে চড়কের কাঠ পেরিয়ে গ্রাম ছুঁয়েছি ।আমার
সেই গ্রামের নামটি নতুনগ্রাম । না শ্যামনগর নয় । ডুয়ারসের কোন চেচাখাতা নয় , কোন নোনাই য়ের
ধারঘেঁষা কচুবন নয় !! এযেন ভাঁটফুলের ঘ্রাণের দিকে নিয়ে যায় । কোন এক অনির্দিষ্ট গানের দিকে ছুটে চলেছি!! কথা সুর ছুঁয়েও ছুঁতে পারছি না। টের পাচ্ছি ভীষণ যে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাচ্ছি সুরের মোহে !
মনে হয় যেন সে –রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচাসোনা - - -! তবে মানুষই সেই গান আমার প্রাণের !
আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/ তাই হেরি তাই সকলখানে
আমি থাকি আপনগানেই । যে গান জানিনা আবার যে গান ছাড়া বাঁচিনা। মধুর অথচ নিষ্ঠুর এই দোলাচল। কখনো তা আঁধার দেখায় ,কখনো জোনাকী। নিজেই নিজের ভিতরে মুখ লুকাই। আবার অঙ্গে যখন বর্ষা জাগে তখন খুলে দেই নিংড়ে নেওয়া আগুন। এ যেন ঋতুবৈচিত্র নিজ অংগে !
মাংসপিন্ড যেন লন্ডভন্ড হতে থাকে - - -

চলমান বহমান এক গানের ফাঁদে পড়ে গেছি ! আমি যেন সেই বগা , হর্ষর আড়ালে বিষাদ গোপন করি। ভুলে থাকি পূজার ছলে !
কোথা যে সেই নিকুঞ্জবন/ বলবে স্বরূপ কোথায় আমার সাধের পেয়ারী
প্রাণের বান্ধবের অধরা গান আমাকে বাউল করে। গানেই খুঁজি গান ।প্রাণেই খুঁজতে থাকি তারে!
বাঞ্ছাকল্পতরু নাম দেই কখনো । মেতে থাকি বাউলগানে । জানি এ খোঁজ ফুরোবে না আর আমার !
যেন স্কুল থেকে আর ফেরা হবে না কোনদিন !