দর্শক

ভাস্বতী বন্দোপাধ্যায়

- স্যার! জাস্টিস, লিবার্টি, ইকুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি – এই কথাগুলোর কি সত্যিই কোনও অর্থ আছে আজকের দিনে? মানে আমাদের দেশে গনতন্ত্র যে পথে চলছে ...
পলিটিকাল সায়েন্সের ক্লাস নিয়ে সবে বেরচ্ছেন প্রিয়ব্রত, এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে সেকেন্ড ইয়ারের অনিন্দ্য।
প্রিয়ব্রত থমকে গেলেন একটু। এককথায় এর উত্তর হয় না। কলেজ ছুটির পরে এ নিয়ে কথা বলবেন বলে স্টাফরুমে ঢুকে গেলেন প্রিয়ব্রত।
এখন তাঁর ক্লাস নেই। লাইব্রেরীতে গিয়ে বসলেন প্রিয়ব্রত। প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো মনে। এমন প্রশ্ন আগে কখনও শুনতে হয় নি। এর উত্তর কি সত্যিই জানা আছে তাঁর?
হঠাৎ স্টাফ রুমের দিক থেকে একটা গোলমাল শোনা গেল। বেশ কিছু উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। ব্যাপার কি দেখতে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন প্রিয়ব্রত। কলেজ গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট বিধান সামন্ত রে রে করে তেড়ে যাচ্ছে ইংরাজির অধ্যাপিকা অদিতি হালদারের দিকে। বিধান তাঁর প্রাক্তন ছাত্র, শাসক দলের স্থানীয় নেতা, কেউকেটা লোক। দুজনের মতবিরোধ ঠিক কি নিয়ে তা বুঝতে পারলেন না প্রিয়ব্রত। দেখলেন, কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকেও বেশ কিছু ছেলে এসে যোগ দিয়েছে বিধানের সঙ্গে। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল কোনও অঘটন ঘটে যেতে পারে। ঠেলাঠেলি করে ভিতরে ঢুকলেন প্রিয়ব্রত।
- বিধান! কি হয়েছে, আমাকে বল।!
তাঁকে গ্রাহ্যই করে না বিধান।
- দুদিন চাকরি করতে এসে বড় নেতা হয়ে গেছে! সব শালা আগের গরমেনটের আমলে পার্টির পা চেটে পাওয়া চাকরি। ওর চাকরি থাকে কি করে আমি দেখব!
অদিতিও কিছু বলার চেষ্টা করে কিন্তু হই-হট্টগোলে তার গলা শোনা যায় না।
- না, না, বিধান! খুব ভালো মেয়ে অদিতি! খুব ভালো টিচার!
- কি মুশকিল! আপনি এর মধ্যে আসছেন কেন? এই সরা তো মালটাকে! বের করে দে!
বিকৃত মুখে নির্দেশ দেয় বিধান।
সঙ্গে সঙ্গে কারা যেন ঘাড় ধরে ঠেলে বের করে দেয় তাঁকে স্টাফরুমের বাইরে। হুমড়ি খেয়ে বারান্দায় পড়ে যান প্রিয়ব্রত। মাথাটা ঠুকে যায় দেওয়ালে। যন্ত্রণা ছাপিয়ে এক অপার বিস্ময়বোধ – .....আজ তিরিশ বছর ধরে তিনি এই কলেজে পড়াচ্ছেন, তাঁকে এভাবে...
ততক্ষণে অদিতির চুলের মুঠি ধরে গালে সপাটে এক চড় কষিয়েছে বিধান। অন্য অধ্যাপকেরা এসে অদিতিকে ঘিরে ধরায় আর বেশিদূর গড়াতে পারে না ব্যাপারটা। খানিক পরে বিধান স্লোগান দিতে দিতে ছেলেদের নিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রিয়ব্রত অবাক হয়ে ভাবেন, এরা কারা? এরা তো এই কলেজের ছাত্র নয়!
কলেজ কতৄপক্ষর এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই। বিধান সামন্তের বিরুদ্ধে গিয়ে এখানে কলেজ চালানো সম্ভব নয়। প্রিয়ব্রত দেখলেন, একটা সূক্ষ্ম অন্যায় ঘটে যাচ্ছে সবার অলক্ষ্যে। চড়টা কি শুধু অদিতির গালেই পড়েছে? এই অপরাধটার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ দানা বাঁধা উচিত ছিল তা তো হল না!
অদিতি থানায় যাচ্ছিল। প্রিয়ব্রত বললেন,
- চল আমিও যাই।
থানার ওসি জানাল, এফ আই আর নেওয়া যাবে না। সেরকমই ইন্সট্রাকশন আছে।
আরও বলল,
- স্যার! আপনি কেন মিছিমিছি ঝামেলায় জড়াচ্ছেন? বাড়িতে অল্প বয়সী ছেলেমেয়ে রয়েছে, ধরুন যদি কোনও বিপদই ঘটে যায়, তাহলে?
থানা থেকে উদভ্রান্তের মত বেরিয়ে এলেন প্রিয়ব্রত।
- আমরা তাহলে এখন কোথায় যাব অদিতি? কার কাছে?
- আপনি বাড়ি যান স্যার! আমার সঙ্গে থানায় এসে আপনিও মার্কড হয়ে গেলেন। ঠিকই তো! আপনাকে তো এখানে বাস করতে হবে!
- কি বলছ তুমি অদিতি! এতবড় একটা অন্যায় হল তোমার সঙ্গে! পুলিশের উর্দি পরে থ্রেট করছে! বলছে এফ আই আর নেব না!
- এরও ওষুধ আছে স্যার! শুধু খুঁজে বের করতে হবে। আপনি ভাববেন না! আমি সহজে ছাড়বো না।
অদিতিকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরলেন প্রিয়ব্রত। বিধ্বস্ত অবস্থা। তাঁর স্নায়ু বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এত চাপ তারা আর নিতে পারছে না। আজ এত বছর ধরে সম্মানের সঙ্গে অধ্যাপনা করার পর নিজের কলেজে তাঁকে ঘাড়ধাক্কা খেতে হল! একটা নির্দোষ মেয়েকে...... আহা, কতদূর থেকে এখানে পড়াতে আসে মেয়েটা! ওর যদি কোনও বিপদ হয়!
শরীরের অস্বস্তিটা বাড়তে লাগলো। কিছু খেতে পারলেন না। ছেলে একমনে দেখে চলেছে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল ম্যাচ। অন্য দিনের মত তিনিও পাশে এসে বসলেন। কিন্তু আজ আর কিছু মাথায় ঢুকছে না তাঁর। তিনি শুধু দেখছেন একটা ফুটবল অগুন্তি বুটের লাথি খেতে খেতে গড়িয়ে চলেছে এদিক থেকে ওদিক। ওঃ!! যদি পারতেন বিধানের হাতখানা মুচড়ে ভেঙ্গে দিতে! অফিসারটির গালে একটা থাপ্পর কষাতে! নাহ, ফুটবল ম্যাচের এই উল্লাস উদ্দীপনা সহ্য হচ্ছে না তাঁর। পাশের ঘরে গেলেন। মেয়ে পরীক্ষার পড়া তৈরি করছে, ‘’উই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া, হ্যাভিং সলেমলি রিজলভড....’’ কারা এই পিপল? তিনি? অদিতি? বিধান? ওসি? ওঃ অসহ্য! অসহ্য!
রাতে জ্বর এল প্রিয়ব্রতর। সঙ্গে অসহ্য মাথাব্যাথা আর বমি-ভাব। বার বার দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল। ডাক্তার বললেন, ট্রমা। সেডেটিভ দিচ্ছি। কয়েকদিন রেস্ট নিতে হবে।
সেডেটিভ খেয়ে ঘুমোতে গেলেন প্রিয়ব্রত। কিন্তু আবার তো জেগে উঠতে হবে। অনিন্দ্যর প্রশ্নের উত্তরটা তো দেওয়া হয় নি। ছাত্র-শিক্ষক একত্রেই খুঁজবেন ওই প্রশ্নের উত্তর। জাগতে তো হবেই। কারণ জেগে থাকাও একটা ধর্ম।