কান্ট্রি রোডস, টেইক মি হোম

হাসান আহমদ


কতদিন হলো বাড়ি যাই না! কতদিন?
গত পনেরো বছরের মধ্যে কয়বার বাড়ি গিয়েছিলাম? কয়বার?
তিন বার? চার বার? মনে করতে পারছি না? নাকি মনে করতে চাইছি না?

আমার যে একটা বাড়ি আছে, বড়ি মানে জন্ম ঠিকানা, পিত্রালয়- প্রায়ই মনে হয় যে সেটা আমার স্মৃতিতে এখন আর খুব একটা জোরালো ভাবে নিরঙ্কুশ ভাবাবেগের জায়গাতে নেই।

তবুও মাঝে মাঝে যখন মনে হয়, নিজের দেশে থেকেও যেন একটা অচিন ভিনদেশী হয়ে আছি, তখন কোথা থেকে যে সেই ভাবাবেগটা এসে ভর করে! কেমন একটা ভাবালুতা আমাকে গ্রাস করে। নিজেকে খুব শেকড়হীন উদ্বাস্তু ও নিঃসঙ্গ মনে হয়। যেন আমি স্বীয় জীবনের অর্ধেকটা হারিয়ে ফেলেছি নিজেরই কর্মদোষ আর কিছুটা নিয়তির তাচ্ছিল্যে, যা আমাকে কোনদিন কোনো ঠিকানাতেই পৌছে দেবে না। তখন খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কিভাবে আমি বাড়ি যাব? আমি যে বাড়ি ফেরার সকল রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি!
তখন চিৎকার করে গাইতে ইচ্ছে করে-
Country roads
Take me home
To the place
I belong!

কিন্তু সত্যিই কি আমার বাড়িটি আর আমার আছে?

বাড়ি আর কোনদিন সেই আমাকে গ্রহণ করবে না, যে আমি আমার বাড়ির উপযোগী এক বালক ছিলাম। যে আমি তার যথাযথ অনুগত এক সন্তান ছিলাম। আমাকে গ্রহণ করার জন্য যে নিশিদিন উন্মুখ হয়ে থাকতো। আমার অনুপস্থিতি ছিল যার সমূহ বেদনার কারণ। কখনও এমনও হতো যে, একটা সংক্ষিপ্ত অনুপস্থিতির পর বাড়ি ফিরে এলে শোনা যেত, আমার প্রস্থানে নাকি গাছের পাতাদের স্পন্দন থেমে গিয়েছিল! পাখিরা হারিয়ে ফেলেছিল তাদের সঙ্গীত প্রতিভা! ফুলেদের প্রস্ফুটিত ও ফুটনোন্মুখ প্রকাশ ভঙ্গি হয়ে যেত অস্ফুট, ম্লান ও সকাতর! প্রিয় পোষা কুকুরটি হারিয়ে ফেলতো তার সকল চঞ্চলতা।

আমার প্রত্যাবর্তনে গাছে গাছে শুরু হয়ে যেত পাতাদের নৃত্যমর্মর। পাখিদের কন্ঠে ফিরে আসতো গান। ফুলেরা মেলে ধরতো তাদের ঢালি। আর আমার কুকুরটি, সে আর কী বলবো? তার বাঁকা পুচ্ছটি অবিরাম এমনভাবে দুলতে থাকতো যে, তাতে করে তার প্রভুহীন সময়ের অবসান পর্যায়ের মানসিক উত্তেজনাটুকু খুব সহজেই টের পাওয়া যেত।

আর নক্ষত্রের আগুন জ্বলা সেইসব রাতে, কী ভীষণ প্রেম আর মমতায়, আমাকে তাঁর বুকের উষ্ণ ওমে চেপে, একদম নির্ভার, শুনশান ঘুমিয়ে পড়তো আমার গ্রাম।

এখন আমি আর আমার বাড়ির উপযোগী সেই বালকটি নই। নিজেকে হারিয়ে অন্য একটা অচেনা মানুষকে নিজের নামে বয়ে বেড়াচ্ছি। বাড়ির কাছে এখন আমি একজন অচেনা আগন্তুক ছাড়া আর কি হতে পারি?

All my memories gather round her, miner's lady, stranger to blue water.

একটা ক্লান্তিকর ও অর্থহীন জীবন বয়ে বেড়াতে বেড়াতে এখন ভাবি, জীবন সেখানেই ভালো ছিল, আর সেখানে আমরা কতইনা সুখী ছিলাম! নারকেল পাতার ফাঁকে ঝিরিঝিরি বাতাসের শনশন শব্দের মতোই জীবন ছিল তরঙ্গময়। কোন ক্লান্তি ছিল না। বিষন্নতা ছিল না। জীবন নিয়ে অহেতুক অনুযোগ করবার মতো যথেষ্ট অবকাশ ছিল না। আমাদের ঠোঁটে ছিল তালপাতার বাঁশি। হাতে ছিল বল্লম আর হার্পুন। শরীরে ছিল সদ্য কেটে আনা ঘাসের গন্ধ। শতাব্দী প্রাচীন সহস্র জীবনের মৌতাত- আমার গ্রাম, আমাকে মগ্ন করে রাখতো তার চিতায়।

Life is old there
Older then the trees
Younger then the mountains
Blowing like a breeze......

বাড়ির সঙ্গে একবার দুরত্ব তৈরি হয়ে গেলে বাড়ি কি আর কখনোই তার সন্তানকে ফিরে পায়, আগের মতো? স্মৃতির পোশাক খুলে- আশৈশব ধুলো আর কাদার মধ্যে চিৎকৃত ও গড়াগড়ি খাওয়া বালক যখন এক নিদারুন মরীচিকার পিছু ছুটে চলে, ভুলে যায় মাটির আঘ্রাণ আর বাড়িয়ে চলে দূরত্ব, আর বাড়তেই থাকে স্মৃতিহীনতা, আর কেবল বাড়তেই থাকে দেনা- তখন কেনই বা বাড়ি তাকে গ্রহন করবে? সে কি ততদিনে ভুলে যায়নি তাকে? সে কি ভুলে যায়নি তার সন্তানের শরীরের ঘাসের গন্ধ? সে কি তার হারিয়ে ফেলা পুত্রের বেদনায় কেঁদেছিল কয়েকরাত? সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ম্লান গোধুলির আলোয় বিষণ্ণ মিনারের দিকে তাকিয়ে নীরবে করেছিল অশ্রুপাত? মেঠোপথ ধরে দূরের চারণভূমি থেকে ক্লান্ত মেষপালকের দল ফিরে এলে, সে কি তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেনি- কোথায় রেখে এসেছো আমার পুত্রকে? বলো? আমার শতবছরের প্রাচীন দীঘির শীতল জল দিয়ে স্নান করিয়ে দেব তাকে। দূর করে দেব তার ক্লান্তি। চুপ করে থেকোনা। এনে দাও আমার পুত্রকে!

সে কি বলেনি? সে কি মনে রাখেনি তার কুহেলিকাপ্রবন, উজ্জ্বল নীরবতায় আচ্ছন্ন পুত্রের চির অভিমান?

Dark and dusty
Painted on the sky
Misty taste of moonshine
Teardrop in my eye!