তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও...

শাশ্বতী সান্যাল



সে এক অদ্ভুত ছেলেবেলা ছিল আমার। ভোর পাঁচটা, চারিদিকে কুয়াশা কুয়াশা সাদা দুধের সর... ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ। মা দুএকবার ঠেলা দিয়ে যেত, "কি রে! উঠবিনা? পড়াশোনা নেই? " একটা চোখ কোনোরকমে খুলে হুঁ হাঁ করে তারপরই আবার পাশ ফিরে চোখ বন্ধ।বাকি ইন্দ্রিয়ও অসাড়। কিন্তু কান সজাগ হয়ে গেছে ততক্ষণে। কান শুনছে এক জলদগম্ভীর কন্ঠস্বর...
ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্। ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহষ্মি দিবাকরম্॥

সূর্যপ্রণাম চলছে। কন্ঠস্বর খাদ থেকে উঠে ক্রমশই উদারা মুদারা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভোরের আলোর মতো। উচ্চারিত হচ্ছে একের পর এক শ্লোক। উচ্চারিত হচ্ছে

" মধুকৈটভাদিদৈত্যদলনী যা মাহিষোন্মূলিনী
যা ধূম্রেক্ষণচন্ডমুন্ডম থনী যা রক্তবীজাশনী |
শক্তিশুম্ভনিশুম্ভদৈত ্যদলনী যা সিদ্ধিদাত্রী পরা

প্রতিটি স্তোত্রের পর কোষে কোষে ধাক্কা মারছে শব্দ
"গতিস্তং গতিস্তং তমেকা ভবানী "

হ্যাঁ, চন্ডীপাঠ হচ্ছে। খুব কাছেই কোথাও। চোখ বন্ধ করেও যেন দেখতে পাচ্ছি বাড়ির পুবমুখো বেলগাছতলায় একটা টকটকে লাল আসন পেতে বসে আছেন এক সত্তোরোর্ধ দীর্ঘকায় মানুষ। সটান ঋজু চেহারা । চামড়ায় বলিরেখা আছে অবশ্য, ওটুকুই বয়সের প্রমাণ। কিন্তু কন্ঠস্বরে বা উচ্চারণে কোথাও তিলমাত্র জড়তা নেই। সেই পূর্বমুখী মানুষটার সুর করে টেনে টেনে স্পষ্ট সংস্কৃত উচ্চারণের মধ্যেই আমার সকাল হত। এই মিতবাক, উপবীতধারী প্রাচীন ঋজু মানুষটিই আমার ঠাকুরদা। একসময় সত্যিই বিশ্বাস করতাম দাদান(ঠাকুরদা) মন্ত্র উচ্চারণ না করলে বোধহয় সকালে সূর্যটাই উঠবে না। সেটা মন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস, না কন্ঠের প্রতি, জানিনা। চোখ বন্ধ করেও দেখতে পেতাম শব্দ কীভাবে ডানা মেলছে ভোরের আকাশে। সেই স্পষ্ট শুদ্ধ অক্ষরমালা কখনো ধৈবত থেকে কড়ি মধ্যম ছুঁয়ে নেমে আসতো গান্ধারের শরীরে। কখনো উড়ে যেত পঞ্চমের স্বর্গাভিমুখে। এই অপার্থিব উড়ানের সাক্ষী হয়েই একটু একটু করে আমার অপরিণত, অশিক্ষিত কান বড় হয়ে উঠছিল। ধরতে পারছিলো সুরের ওঠাপড়া, মন্ত্রের আরোহণ অবরোহন। অথচ এর সবটাই হয়ে যাচ্ছিল কত অক্লেশে, কত অজান্তে! আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় দাদানের কাছ থেকে শুধু জীবন নয়, সম্ভবত সঙ্গীতেরও প্রাথমিক পাঠ পেয়ে গেছিলাম সেইদিনগুলোতে।

দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে

ছোটবেলায় রোববারগুলো ছিলো দাগ দেওয়া গানের দিন। সকাল সাতটা থেকে হৈমন্তী'র দরজা খুলে যেত। প্রথমে খুদেরা, তারপর বেলা বাড়ার সাথে সাথে দলে দলে বড়রা ভিড় করতো সেখানে। অক্লান্ত ব্যাচের পর ব্যাচ গান শিখিয়ে যেতেন কমল মাস্টার। পাশে খিলি করে রাখা পান, অল্প ভেজা চুন আর জাঁতিতে কাটা শুকনো সুপারি। প্রথম প্রথম অবশ্য গানের থেকে এই চুন সুপারির প্রতিই আমার মোহ ছিল বেশী। মুখ থেকে বেরোনো মিষ্টি পান আর জরদার গন্ধের লোভে সোজা মাস্টারমশাইয়ের কোলে চড়ে বসতাম। ছাত্রছাত্রীদেরও। জ্যেঠুর আদরের ভাইঝি, তাই কেউ কিচ্ছুটি বলতো না। না, কেউ কিচ্ছু বলেনি, তবুও ধীরে ধীরে সুর কথা বলতে শুরু করেছিলো ছোট্ট শরীরটায়। হাত আর পা আপনা আপনি শিখে যাচ্ছিল ছন্দে ছন্দে তাল দেওয়া। আর একটু বড় হওয়ার পর দায়িত্বও বাড়লো। হারমোনিয়ামে সা পা টিপে বেলো করার দায়িত্ব। জ্যাঠা তখন নিজের কোলের উপর বসিয়ে নিয়েছেন সুদীর্ঘ তানপুরা। গাইছেন :
"মোরে ঘর বাআজত সঅরস সুউন্দর/
সঅরস সুউন্দর বীঈণা মৃইদঙ্গ"

এভাবেই একটু একটু করে কাছে আসতে শুরু করেছে ভূপালি রাগ। এসেছে জৌনপুরী, রাগেশ্রী, বাগেশ্রী। এসেছে ভৈরবী। এবং এই রাগরাগিণীর হাত ধরেই কখন যেন আমার ভিতরঘরে ঢুকে পড়েছেন নজরুল।
"সন্ধ্যামালতি যবে ফুলবনে ঝুরে
কে আসি বাজালে বাঁশি ভৈরবী সুরে"

হ্যাঁ, নজরুল। নজরুলই প্রথম এলেন। রবিঠাকুর তখন বহুদূরবর্তী একটা নাম। প্রায় অপরিচিত। রবিঠাকুর মানে তখন খুব বড়জোর "আকাশভরা সূর্য তারা"... খুব বড়জোর " আছে দু:খ, আছে মৃত্যু"। কিন্তু কট্টর বাঙাল মধ্যবিত্ত পরিবারে তখনও রবিঠাকুরের গানকে ন্যাকান্যাকা মেয়েলি আখ্যা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চলছে। বরং স্বাগত জানানো হচ্ছে তার কবিতাকে। মনে পড়েনা, ঠিক কত ছোটবেলায়, কোন বয়সে তিনি এলেন... শুধু মনে আছে গরমের ছুটি, ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে নিয়মমাফিক। আর সেই ন্যাড়ামাথায় লাল ফিতের ফুল তুলে পাড়ার ম্যারাপ বাঁধা মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুলে দুলে মুখস্ত বলতে হচ্ছে "মাগো আমায় ছুটি দিতে বল
সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা"
দর্শকাসনে উপবিষ্ট বন্ধুদের ফিচফিচ হাসি দেখতে গিয়ে মাঝখানের তিনচারটে লাইন বেমালুম ভুলেও গেছি। কোনো ভাবে গড়গড় করে শেষ করেই 'নমস্কার'... তারপর সেই দাড়িওয়ালা জোব্বাপরা ছবিটার দিকে আড়চোখে এক ঝলক তাকিয়েই দে দৌড়।
তখন পঁচিশে বৈশাখ সত্যিই বিভীষিকা ছিল। নেড়া হওয়া আর সর্বসমক্ষে কবিতা পড়া -- এই যুগল মুষলের আঘাতে প্রায়ই গরমের ছুটিতে শয্যা নিতে হত আমায়। অথচ কী আশ্চর্য, এই গরমের ছুটির হাত ধরেই একদিন বন্ধুত্ব হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথ নামক সেই আশ্চর্য প্রাণীটির সাথে। ছোটোমাসী বেড়াতে এলেন এমনই এক গরমের দিনে, ইস্কুলছুটির সময়। সঙ্গে এল কাঁচামিঠে আম আর কিছু আশ্চর্য রেকর্ড। আমি আর ভাই গোল হয়ে বসলাম রেকর্ড প্লেয়ারের সামনে, আর ধুয়ে যেতে থাকলাম এক অনাস্বাদিত অমৃতময় ভাষার লাবণ্যে :
"শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা
নিশীথ যামিনী রেএএএ
কুঞ্জপথে সখী কৈসে যাওব
অবলা কামিনী রেএএএএ"...

হ্যাঁ ভানুসিংহ। তিনিই এলেন সবার আগে। তারপর এলো, আসতেই থাকলো চিত্রাঙ্গদা, চন্ডালিকা, শ্যামা, শাপমোচন এবং অবশ্যই তাসের দেশ। বলাই বাহুল্য, সেসময় ভাইবোনের মধ্যে এই 'তাসের দেশ' এর আকর্ষণই ছিল সর্বাধিক। গান আর গল্প, সুর আর ছন্দের সেই যুগলবন্দী কিশোর মনকে যতটা টেনেছিল, ততটা পারেনি আর কিছুতে। প্রায় কন্ঠস্থ করে ফেলেছিলাম :

"- কী জাতি তোমরা
-আমরা নাসক, নাসা থেকে উৎপন্ন
-উচ্চবংশীয় কোনো জাতির এমনতরো নাম তো শুনিনি
-হাইয়ের বাস্পে তোমরা উঠে গেছ উচ্চে, ওই পরলোকের পারে। আর হাঁচির চোটে আমরা পরেছি নীচে, এই ইহলোকের ধারে"

কিংবা সেই গান
"হ্যাঁচ্চো! ভয় কী দেখাচ্ছ"
অমলিন হাসির মধ্যে দিয়ে আসলে সংক্রমিত হচ্ছিল আমার কিশোর মন। সেই সংক্রমণের নাম রবীন্দ্রনাথ। তখন তো জানতামনা , বড় হয়ে লিখব "মুগ্ধতা অসুখের নাম", কিন্তু ভিতরে ভিতরে অসুখ বাড়ছিল আমাদের। অসুখের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি

বাবাকে চিরকাল আক্ষেপ করতে শুনেছি। দাদানের কী এক একচোখা নীতির কারণে বাবা সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। এটা সেই সময়কার কথা যখন 'পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম' ছিল। তাই গান ভালোবাসলেও বাড়ির ছোটছেলেটি বাবার অমতে গান শেখার সাহস দেখাতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে সরস্বতীর প্রসাদ থেকে তিনি যে একেবারে বঞ্চিত ছিলেন, তেমন নয়। রীতিমতো ভালো সুর জ্ঞান ছিল, আর ছিল সুন্দর উচ্চারণ । দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংএর রাত্রিগুলো আমাদের ছাদের জলসা জমে উঠতো বাবার উদাত্ত গলার গানে গানে। কে না থাকতেন সেই গানের লিস্টিতে! অতুলপ্রসাদ, কান্তকবি থেকে শুরু করে হেমন্ত, মান্না, শ্যামল মিত্র মায় সতীনাথ পর্যন্ত।
বলাই বাহুল্য, শ্রোতা হিসাবে আমার বিচরণের পরিধি বাড়ছিল এইসময়। আওতায় চলে আসছিল রামকুমার-শ্রীকুমারের পুরাতনী মজলিশি গান, টপ্পা... নির্মলেন্দু- উৎপলেন্দু -রুণা লায়লার লোকগীতি - ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি সারী, টুসু... ধনঞ্জয়-পান্নালালের শ্যামাসঙ্গীত- ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কীর্তন... ময়মনসিংহ গীতিকা'র নাট্যরূপ মায় কবির লড়াই অব্দি। বড় গোল চাকতি রেকর্ড প্লেয়ারের জমানা শেষ হয়ে গেছে ততদিনে। ঘরে ঘরে এসে গেছে ক্যাসেটপ্লেয়ার। আর এই ক্যাসেটেরই এক বিপুল সম্ভার ছিল বাবার। আমি ছিলাম তার খুদে সেক্রেটারি। ছুটির দিনে বাগানে ফুলের চারা বুনতে বুনতে বাবা হুকুম দিতেন এবার অখিলবন্ধু'টা চালিয়ে দাও... এবার নির্মলা মিশ্র... সন্তোষ সেনগুপ্ত তারপর... পূর্ণদাস বাউল হাতের কাছে রাখো... ইত্যাদি... প্রভৃতি। পড়াশোনায় যথেচ্ছ ফাঁকি দিলেও সেদিন গানের প্রভাবে দিলদরিয়া বাবার কাছে সাতখুন মাফ ছিল। এবং শুধু গান নয়, কবিতাও। বাবার দাক্ষিণ্যে সেসময় পর পর শুনে ফেলছি কাজি সব্যসাচী, শম্ভু মিত্র, পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ, সৌমিত্র চাটুজ্জে মায় ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়. .. চিনে ফেলছি 'শেষের কবিতা', "বল বীর, বল চির উন্নত মম শির" থেকে শক্তির "বৃষ্টি যখন নামলো আমি উঠোনপানে একা" থেকে শঙখ ঘোষের "হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়" অব্দি। ভেসে যাচ্ছি কখনো সতীনাথ-উৎপলার সুরে, কখনো মানবেন্দ্রের গমকে, কখনো অনুপ ঘোষালের মাধূর্য্যে।
আহা! সেসব ছিল সত্যিই সোনালি ডানার দিন। ভোরে পান্নালাল গাইছেন "জেনেছি জেনেছি তারা, তুমি জানো ভোজের বাজি", সন্ধ্যেয় তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় ডাক পাঠাচ্ছেন "কাজলনদীর জলে ভরা ঢেউ ছলছলে প্রদীপ ভাসাও কারে স্মরিয়া"... এ বেলা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় আকুতি জানাচ্ছেন "একটা গান লিখো আমার জন্য", তো ওবেলা ব্রততী শোনাচ্ছে "বেণীমাধব, বেণীমাধব তোমার বাড়ি যাব"। আর এই সবকিছুর মধ্যে ফুটে উঠছি আমি। ফুটে উঠছি জীবনের প্রতিটি রঙ রূপ ও রসের সেরাটুকু নিংড়ে নিতে নিতে...

আমার পরাণ যাহা চায়


শুরুতেই বলেছিলাম না, জীবনের একেবারে প্রথম দিকে সুরের হাত ধরে যে মানুষটার সাথে আলাপ হয়ে গেছিল, তিনি নজরুল ইসলাম। তার বেশ কিছু বছর পর পথ চলতে চলতে আবার যে মানুষটার সাথে আচমকা ধাক্কা লাগলো, মুখ তুলে দেখলাম তিনিও নজরুল ইসলাম। সবে বোর্ডের পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। বাবা নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে এসেছেন বিজ্ঞানবিভাগে। এবং তার সাথে সেই প্রথম ভর্তি হয়েছি একাধিক টিউটোরিয়ালে। একে মুখচোরা, তায় সারাজীবন গার্লস স্কুলে পড়ার সুবাদে এতকাল ছেলেদের সাথে স্বাভাবিক মেলামেশার সুযোগ অব্দি হয়না। এমনকি চোখাচোখি হলেও অস্বস্তি হত। তবু দুর্ঘটনা তো ঘটে এ পৃথিবীতে! কোনো এক বসন্তসন্ধ্যায় মফস্বলের কোনো এক টিউটোরিয়াল হোমে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে জোরকদমে চলছিলো গান গাওয়ার উৎসব। ক্লাসের একমাত্র নারীসদস্যটি জবুথবু হয়ে বসেছিলো যথারীতি দূরত্ব রেখেই। কিন্তু হঠাৎ ভূতে পাওয়ার মতো চমকে সোজা তাকাতে হল সামনে। মোটেও সুদর্শন নয়, আগে দেখেও পাত্তা দেবার প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ হয়নি, অথচ আজ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সেই ছোটোখাটো চেহারার কালো ছেলেটির দিকেই। সে তখন গেয়েই চলেছে :
"রাসবিলাসিনী আমি আহিরিণী/ শ্যামল কিশোর রূপ শুধু চিনি/ অম্বরে হেরি আজ এ কী জ্যোতিঃপুঞ্জ / হে গিরিজাপতি, কোথা গিরিধারী! "
একেবারে এক গায়কী, এক গমক, একইধরণের উচ্চারণ, যেন খুদে মানবেন্দ্রই বসে আছেন সামনে। সেই শুরু... এরপর কত মুখ এসেছে, কত নাম, কত কথা, শব্দেরা ভিড় করে এসেছে বারেবারে, তবু সব ছাপিয়ে বারবার একটা গলাই ভেসে বেরিয়েছে শ্রুতিপথে। না, একটাই গান নয় অবশ্য। ততদিনে তার মুখে শুনে ফেলা হয়েছে রবিঠাকুর থেকে কিশোরকুমার, জগজিৎ হয়ে অরিজিৎ সিংহ অব্দি। শুনে ফেলা হয়েছে : "যে শাখায় ফুল ফোটেনা ফল ধরেনা একেবারে"... শোনা হয়েছে : "খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি, আমার মনের ভিতরে" কিংবা " সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে"। পাশাপাশি কত বিকেল অনুরোধের পর অনুরোধে সে হাসিমুখে গেয়ে গেছে "তুম ইতনা জো মুসকুরা রহে হো", " মুসকুরানে কি ওয়াজা তুম হো", " সজনা বরষে হ্যায় কিঁউ আঁখিয়া"...
নয় নয় করে পনেরো বছর-- কত ঝগড়া, কত অভিমান, গোপন অশ্রু, কত চলে যাওয়া আর ফিরে আসার সাক্ষী থেকেছে মফস্বল বিকেলের ছাদ, তবু গান সঙ্গ ছাড়েনি। সুরের ভিতর দিয়েই বকুল ঝরে পড়েছে বারবার আমাদের ভিতরউঠোনে... এমনকি সে যেদিন সত্যিই চলে গেছে, সেদিনও দিয়ে গেছে এক অমূল্য গানের উপহার:
" তুমি সুখ যদি নাহি পাও/ যাও সুখের সন্ধানে যাও/ আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে/ আর কিছু নাহি চাই গো"... না, আর কিছু চাইনি, চাইনা। সময় অল্প অল্প করে বুঝিয়ে দিয়েছে, গান শেষ হয়, কিন্তু সুরটুকু থেকে যায়। তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয় নিজের ভিতরে। এই বয়ে নিয়ে চলারই অন্য নাম জীবন।

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

কলেজে ভর্তির পর প্রথম সরস্বতী পুজো। বাসন্তী শাড়ি, গোলাপি লাজুক মুখ, অনেক পাঞ্জাবির ভিড়ে প্রথম পুরুষ পুরুষ গন্ধ। সেই গন্ধ চুরি করে ঘাস মাড়িয়ে, ট্রেনলাইন পেরিয়ে, পদ্মফোটা বিল পেরিয়ে বাড়ি ফিরে আসা। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরই সব কেমন তছনছ হয়ে গেল। একটা ফোন, মাত্র একটা ফোনের সেই ধ্বংসাত্মক রূপ আগে দেখিনি। ফোন করেছিলো এক বন্ধু। কান্নায় গলা বুজে এসেছে, তবু কোনোভাবে উচ্চারণ করলো কথাগুলো। সে আর নেই। কে? আমার সবথেকে কাছের বন্ধুটি। সবথেকে বেশী হাসিকান্নার- আনন্দব্যথার সঙ্গীটি... সেদিনই দুপুরে নিজের পড়ার ঘরে একটা বাসন্তী ওড়নায়.........
সেই প্রথম ডিপ্রেশন এলো। সঙ্গে এলো মাইগ্রেন। সেই প্রথম অন্ধকার ঘর শেখালো একাএকা বসে থাকা। অন্ধকার বারান্দায় একা পায়চারি। ঘন্টার পর ঘন্টা... দিনের পর দিন। সেসময় দেখলাম বাবা এক অদ্ভুত পন্থা আবিষ্কার করেছেন। সে পন্থার নামও আশ্চর্যজনকভাবে 'গান'... ক্রমাগত গান বাজতো। বিরামহীন যতিহীন গান আর গান। একটাইগান। কখনো বা দুটো। "জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে"... শুনতে শুনতে বন্ধুর মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠতো, ফর্সা গালে টোলটা অব্দি। কীরকম যেন ঝিমিয়ে পড়তাম। কিছুক্ষণ পাতলা পাতলা ঘুমের পর দুঃস্বপ্ন দেখে আবার জেগে উঠে শুনতাম দেবব্রত তখনও গেয়ে চলেছেন
" আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া/ তোমার বীণা হতে আসিলো নাবিয়া"
হয়তো গোটাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি। পা টলছে। তবু উঠে দাঁড়াতাম। বা বলা ভালো গানটাই টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতো বাস্তবের সামনে। কিন্তু সে বাস্তব আর রূঢ় নেই, রবিঠাকুর চোখের জলে ভিজিয়ে নরম করে দিয়েছেন তাকে... অনুভব করলাম ভিতরে ভিতরে কেউ অক্লান্ত গেয়ে চলেছে :
'তবু প্রাণ নিত্যধারা/ হাসে সূর্য চন্দ্র তারা/ বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে"




আজও যখন বারবার পড়ে যাই, ছড়ে যায়, রক্তপাত হয়, কালশিটে পড়ে, যন্ত্রণায় কঁকিঁয়ে উঠি, তখনও বারবার মায়ের আঁচলের মতো নরম যা আমায় জড়িয়ে নেয়, তারই নাম গান। আমিও জড়িয়ে নিই তাকে, হারিয়ে যেতে চেয়েও যেতে না পারা বন্ধুটির মতো, মাঝরাতের অসম্পূর্ণ কবিতার মতো, আমার না-জন্মানো শিশুটির মতো। বারবার...