একলা হওয়ার কোলাজ

অপরাহ্ণ সুসমিতো



প্রথম যখন পলাশ ফুল দেখি,আমাদের বাড়িতে তখন ছাদ ছিল না । একটা ছোট নদীর পাড়ে দেখেছিলাম ..বুনো বাতাসে সেই প্রিয় শিমুল গাছটা কোথায় যে হারাল ।
সেই ছিল প্রথম শোক ।

প্রথমবার যখন হাসপাতালে ভর্তি হলাম । লিফট বেয়ে একা দশতলায় হাজির । নার্স এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন,
: আপনার সাথে কেউ নেই ? অবাক কান্ড । অনেক কিছু কিনতে হবে তো ।
হেসে বললাম;
: অসুস্থতার খবর আমি রাষ্ট্র করি না । দিন সিস্টার তালিকা দিন ,কি কি লাগবে কিনে আনি ।

দশতলা থেকে নেমে শাহবাগের সিনোরিটায় ডিম-পরোটা খেয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে মনে হলো বেঁচে থাকাটা টেকনাফ বা তেতুলিয়ার মতো জরুরী ।

অরুণিমা নামে আমার এক বন্ধু ছিল,অন্ধ । রবিনাথের গান করত । কী আশ্চর্য সন্ধ্যা হলেই টের পেত সন্ধ্যা নামছে অলিম্পিয়াডের ভেনাস সুন্দরের মতো । বলতাম,গান করো ণিমা ।
অরুণিমা গাইতো দরদে : পাতার ভেলা ভাসাই নীরে...

আমি যখন ধুলো মাখা স্যান্ডেল পরে নাটক করে বেড়াই তখন পকেটে আমার যাযাবর তৃতীয় শ্রেনী ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরী,বাসার সামনের দোকানের বাকী বিল,উল্টোপিঠে লেখা;

কী সুন্দর অন্ধ !

কিশোর বেলায় কর্ণফুলী কাগজ কলের পাশে কর্ণফুলী নদীটা অসভ্য করে শুয়ে ছিল,আমি উবু হয়ে জলের ছায়ায় নিজের সবুজ মুখ দেখে থমকে যেতাম । কে যেন বলছে : এই বাউল তুই অন্ধ ! আয় পাতার ভেলা ভাসাই...
অরুণিমা গান করেছিল সেই শেষবার,তুমি কোন ভাঙ্গনের পথে এলে ।

তারপর দিন অরুণিমা আত্মহত্যা করলো।
আমাদের পাড়ার কণক’দা রাতের বেলা একাকী গান ধরতো গিটার বাজিয়ে ;

মাই টুমরোজ উইল অল কাম ট্রু/বিকজ আই এ্যাম স্পেন্ডিং মাই টুডেজ উইথ ইউ ।

আমার নামটা রেখেছিল ছোটপিসি (ছোটপি) । ছোটপিসিকে সবসময় বলতাম, ছোটপি আমি বড় হলে তোমাকে আমার সমস্ত রক্ত দিয়ে দেব এই সুন্দর নামটির বিনিময়ে । ছোটপি হাসতেন ।

তো,নার্সকে ফরমায়েস মোতাবেক সব বুঝিয়ে দিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি,নার্স স্যালাইন শুরু করলেন । আমি শুয়ে শুয়ে আরজ আলী মাতুব্বর পড়া শুরু করলাম । নার্স বিরক্ত হয়ে বললনে;
: সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন । কী সব নাস্তিকদের বই পড়েন হাসপাতালে এসে ।

তীব্র ব্যাথায় ঘেমে যাচ্ছি । মরফিন ঢুকে গেল স্যালাইনে । ছাদের দিকে তাকিয়ে কাউন্ট ডাউন করছি ...

নাইন্টি নাইন,নাইন্টি এইট,নাইন্টি সেভেন...

ঘুমে তলাবার আগে দেখতে পাই,অরুণিমা দেখতে পাচ্ছে । কী সুন্দর চোখ ওর । মেয়েটা আর কাঁদছে না । সারি সারি পাখি পাতার ভেলায় বসে আছে উন্মুখ..তির তির করছে জলের আড়ত।

রাজনীতি করতেন আমার যে ভাইটা ..তার লাশ দেখতে পাচ্ছি ছায়া ছায়া..

বেঁচে গেলাম সে যাত্রা । সাতদিন আমার কোন খবর ছিল না । মা পাগল দশা । মাকে বলেছিলাম,বরিশাল গিয়েছিলাম নাটকের দলের সাথে,নাটক করতে । হাসপাতালের গল্প বলিনি..

প্রথম যেদিন এজলাশে উঠি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে,আমার ঠোঁট শুকিয়ে যায়..এ আমি কাকে বিচার করি..কী বিবর্ণ এক গর্ভবতী মেয়ে এজলাসে দাঁড়িয়ে..তার গর্ভের কারণ তার লম্পট কবিরাজ দুলাভাই ।
কাকে আমি লম্পট বলি,কাকে দেই সাজা! লাল সালু ঘেরা আদালতে মনে হতে থাকে সেই সিনেমার দৃশ্য । খুশবন্ত সিং এর এ ট্রেন টু পাকিস্তান উপন্যাস...
দেশ ভাগ হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। শরণার্থীর দল ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে...

ছোট পিসিকে আমার রক্তের ঋণ আর শোধ হলো না । অরুণিমাকে বলা হলো না আর যে ওর চক্ষু অন্টারিও লেকের মতো জলে জলে সুন্দর ।

আমার প্রথম জন্ডিস হয়েছিল ক্লাস টেনে । এক কবিরাজ এসে কিসের যেন শিকড় দিয়ে মাথায় মালা বানিয়ে পরিয়ে দিলেন । বসে আছি ঘন্টার পর ঘন্টা,মালা আর বড় হয়ে গা বেয়ে নামছে না । মা বলল;

: ধৈর্য ধর । আরেকটু...

অপেক্ষার ভারে নুয়ে আমি অপেক্ষা করতে শিখেছি সেই প্রথম,সেই প্রথম সঙ্গীতের নীরে।

কতো সুবর্ণ বসন্ত চলে যায় ঢালু ব্রিজ বেয়ে,সেই কবে থেকে..