নো হয়্যার ম্যান আর আমার গাছেরা

অলোকপর্ণা




নো হয়্যার ম্যান

ঠাকুমা বলতেন মানুষ মরে গেলে গান হয়ে যায়। নিজের চেষ্টায় তিনি বেঁচে থাকতেই হয়ে উঠেছিলেন এক নিপুন শ্যামাসংগীত। তাতে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। চোখ জুড়িয়ে আসার মত সেই গান কখনও অশান্ত করেনি কাউকে। কাউকে সারারাত জাগিয়ে রাখেনি, প্রশ্ন করায়নি, বরং গল্প শুনিয়েছে, সেইসব গল্পে ছিল অকাতর ঘুম। আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি।
আমাদের অশান্তি দিতে তারপর একদিন জন্মালেন নচিকেতা।
নচিকেতা ভোর, নচিকেতা সকাল, নচিকেতা দুপুর, নচিকেতা সন্ধ্যে থেকে নচিকেতা রাত জাগতে আরম্ভ করলাম যখন, ঠাকুমা কেমন ফ্যালফ্যাল করে আমাদের উথালপাথাল দেখতেন। ওনার মনের why did you আর why didn’t you-এর ফাঁক থেকে বেড়ে উঠত একটা গাছ, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেটের পাছাটা পা দিয়ে মাড়িয়ে দিতে দিতে নচিকেতা গাইতেন, “শুনবো না গান, গান শুনবোনা।” গান না শোনার সেই গান শোনার দিনে একদিন কিভাবে যেন নচিকেতার গানকেই প্রশ্ন করে বসলাম। সারা বাড়িটা দুম করে আবার শ্যামাসংগীত হয়ে গেল। এভাবে বোধ হয় ঠাকুমা নচিকেতার উপর এক রকম প্রতিশোধ নিয়ে চলে গেলেন। তের দিনের দিন টের পেলাম আমি আর প্রশ্ন করছি না, আমি বুঝতে শিখেছি লড়াই থেকে জন্ম নেয় আরো লড়াই। আমি নচিকেতা থেকে সেদিন পুরোপুরি মানুষ হয়ে গেলাম। প্রসূতির মৃত্যু আমায় এরপরে আর কখনো ভাবাতে পারেনি। আর আজ আমাদের চোখের আড়ালে নচিকেতাও কবে যেন পুরোপুরি মানুষ হয়ে গেছেন, ঠাকুমার জিত হয়ে গেছে। আমরা আরো জীবনমুখী হয়েছি।

নস্ত্রাদামুস বলে গিয়েছিলেন একদিন বৃষ্টির মত বিটলস এসে পড়বে আমার বড়বেলায়। একেবারে ঝমঝমিয়ে। করোগেটেড টিনকে বৃষ্টির দুর্বলতা আর আমার ভিতরের দানবগুলোকে দুপুরবেলার খাবার দিয়ে যেতে এসে গেল নো হয়্যার ম্যান। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে থাকতাম ছাতাহীণ মানুষ দেখার লোভে। কেউ নয় এমন কোনো ছাতাহীণ মানুষের সাথে আমার আজ অবধি দেখা হয়নি কোনো বৃষ্টির দিনে, যে আমাকে ছাতা হারানোর গুহ্য বিদ্যা শিখিয়ে দিতে পারে। যে সুরে গীটারের কান্না পায়, সেই সুরে মনে মনে আমি নো হয়্যার ম্যানকে স্মরণ করি। নো হয়্যার ম্যান আসেনা। বিটলস্‌ ভেঙে যায় স্বপ্নের নিয়মে। নো হয়্যার ম্যানের ডিম থেকে গাদা গাদা নটবর বেরিয়ে আসে। যে জানে, একা একা স্ট্রবেরী মাঠে এখন সেও যাবে না, আর আমিও যাবো না।

ঘরে ফেরার গান বুলাদার বাঁশিতে এখন কেমন শোনাবে আন্দাজ করার চেষ্টা করি আজকাল। মনে পড়ে যায়, আমাদের ঘুমন্ত মুখের কাছে, খুব কাছে এসে ঠাকুমা বলে দিয়ে যেতেন, কখনও নিপুন শ্যামাসংগীত যেন না হই। তাই ঠিক করেছি মরে গিয়ে রহাত ফতে আলি খানের গান হয়ে যাবো। তারই প্রস্তুতিপর্বে হেলায় সব প্রেমিক প্রেমিকাদের অভিমান পুষে দূরে সরিয়ে দিই। স্টেশানে নামার আগে ইচ্ছে করে ইছাপুর লোকালের ফাঁকা কামরায় ছেড়ে আসি বৃষ্টিছাতা। নির্দ্বিধায় মেট্রোর কথোপকথনের মাঝে হেডফোন গুঁজে দিই। অপেক্ষা করি সকাল হলে কখন পা ভাঁজ করে বসবেন রহাত, আর আমি একেকটা বেঁচে থাকাকে “তেরে রঙ্গ ওয়রগা” হয়ে যেতে দেবো।
... কি বুঝলে নটবর?
“ফুল সা হ্যাঁয় খিলা আজ দিন”


কালিকাদা আর যশোর রোডের গাছদের জন্য

যখন কলেজ ছিল, বিটি রোড ধরে সাই সাই ছুটে চলা অটোর হাওয়া দিয়ে দেখতাম
রাস্তার পাশে মৃতদেহ পড়ে আছে,
সারি সারি।
হোক বিবর্ণ, তা বলে কি আমি দেখতে পেতাম না...
সারাটা বিটি রোড ভেসে গেছে গাছেদের রক্তে।

এমন একটা বন্ধু ছিল আমার,
দুহাজার সালের বন্যার আগে বাবা তাকে বনগাঁ থেকে এনেছিল,
উপরের ছাদের বারান্দায় গাছটা নিজের চোখের জল রাখত। কেউ আসে না এমন সে ছাদে শুধু আমিই যেতাম। আমার পাতা ঝরানোর দিনে, আমি সেই পিছনদিকের বারান্দার ছাদে এসে দাঁড়াতাম। দেখতাম আমার পায়ের কাছে শাট শাট পড়ে আছে বড় বড় পাতা। পা দিয়ে সেসব সরাতে চাইলে খর খর আওয়াজ ওঠে ছাদের মেঝেতে। সারাটা ছাদ জুড়ে তখন গাছটার গায়ের গন্ধ। লম্বু গাছটার গায়ের এই গন্ধ আমার ভীষণ ভালো লাগত, আমার- আমার লাগত। ছাদের থেকে একটু উপরে গাছটা মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। তার আজীবনের সন্তাপ। অল্প অল্প এগিয়ে এসে আমি লম্বু গাছটার গায়ে হাত রাখতাম। যেমন বরাবর আমার মনে হয়েছে, তখনও মনে হত, বোধ হয় গাছেরা আমাকে বোঝে।
বেশি বাড় বেড়ে যাওয়ায় মা তাকে গত বছর কেটে দিয়েছে, হাতে পেয়েছে বারোশো টাকা। মা’র ভয় ছিল, যদি ঝর ওঠে,
যদি, গাছটা হঠাৎ নেমে আসে আমাদের মাথার উপর...
আমি এখন আর উপরের বারান্দার ছাদে যাই না। ছাদময় পাতার গন্ধটা যেন শ্রডিঙ্গারের বিড়াল। আমি ছাদে চলে গেলে তার না থাকাটুকু পাকা হয়ে যাবে।
এখন যখন এদিক ওদিক যাই, গাছ দেখি যখন, মাঝে মাঝে টের পাই ওরা কেউ কেউ চাইছে আমি তাদের কাছে এগিয়ে যাই। মনে হয়, এগিয়ে গিয়ে গায়ে হাত না রাখলে তাদের শ্বাসকষ্ট হবে। মনে হয়, শ্বাসকষ্ট লাঘব করে যে ছোঁয়াচ, তা বুঝি আমি দিতে শিখে গেছি। উটির কাছে এক নাম না জেনে হারিয়ে যাওয়া চা বাগানে এমন এক গাছের সাথে দেখা হয়েছিল। তখন সদ্য বৃষ্টি থেমেছে, আমরা কুন্নুরের সেমেট্রি থেকে ফিরছি। দুদিকে খাদের সবুজ ঢাল, তার মাঝে কয়েক ফুটের রাস্তা ধরে গড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। যে জিনিসগুলো আমরা আমাদের উথলানো দুধের মত জীবনে হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাই তার একটা হল রামধনু। খাদের মধ্যে রামধনু দেখে আমাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল। খাদের ধারে ছিল সেই গাছটা, যে চেয়েছিল আমি তার গায়ে হাত রাখি। রামধনু দেখে চলে আসার আগে গাছটাকে ছুঁয়ে দিয়ে এসেছিলাম।

আমি বাড়ি ফিরে এসেছি ছমাস হল। এখানে আমার কোনো গাছ আর নেই। ঋতুদার পর কালিকা দা চলে গিয়ে বরং আমাকেই আরো একটু গাছ করে দিয়ে গেছে। ২০১৩ সালের ৩০শে মে টিউশনি শেষে বাড়ি এসে ভেবেছিলাম বুঝি অপর্ণা সেন... ঋতুদা ছিল সেবার। ৭ই মার্চ ভুল বোঝার সুযোগ দেয়নি কোনো। আরো স্থবির করে দিয়ে গেছে, স্থানু করে দিয়ে গেছে। কেটে ফেলে রাখা গাছের মত রাস্তার পাশে পড়ে থেকেছি সারাটা দিন। খোলা বুকে প্রাচীন বর্ষবলয় নিয়ে। জানতে পেরেছি ভালো মানুষেরা এমন চলে গেলে দাঁড়িয়ে থাকব সারাদিন, হাত ছেড়ে গ্যাস বেলুন উপরে উঠে গেলে যেভাবে নিচে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ,- ছোট হয়ে।

সেই ভাবে
চলে গেলে, সারাটা দিন
বৃক্ষবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
সারাটাদিন
বৃক্ষবৎ
দাঁড়িয়ে থাকি।