শব্দে সুরে ইচ্ছে করে বাঁচতে শেখা

তমাল রায়



বস্তুত একটি পেরেকেরও আছে শ্রবণ প্রণালী, ভোর ভাঙা শ্রাবণী উচ্ছাস
সে কুয়াশা সকালে কি জীবনানন্দ শিশির মাড়িয়ে যাওয়া মেটাল সুর শুনতেই কান পাততে চেয়েছিলেন ট্রাম লাইনে? কুয়াশা মেলানোরও শব্দ আছে। ঘুমেরও। মৃত্যু থেকে জীবনের মাঝে যে পাতাল নিহিত স্পেস তাকে, শব্দ দিয়েও আঁকা যায়, জানো?

তেমন তীব্র অহংকারী অন্ধকার ছুঁয়ে আছে যে, সে আমার কেউ। অথবা কেউ না। এ তীব্র অন্ধকার ভেদ করে পৌঁছতে হবেই সেখানে। দ্রিম দ্রিম দিদ্রিম একটা শব্দ, অথবা বৃষ্টির ঝরে পড়ার শব্দ... স্থায়ী না অন্তরা? পাখি ডাকছে। দৃষ্টির থেকেও তীব্র শব্দ, শব্দের গায়ে সুরের কুয়াশা চাদর... দেখ শীত নয়, অসময়ে কোকিল ডাকছে, শাল, পিয়াল, শিমুল পলাশে খুনখারাবি, যেভাবে বসন্ত আসে।

বাপ পাখিটা ততক্ষণ অবধি দ্বিতীয় সারিতে। যতক্ষণ সেই মুখ্য। আকাশে উড়তেও তো ঘর্ষণ জনিত ক্লান্তি, হাওয়াদের দিক বদল, আরও কত কি। প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠারও কি কম ক্লান্তি। সময় যত গড়িয়েছে, মেঘেদের বদল হয়েছে, বাপ পাখি কখন অজান্তেই সামনে। পেছনে অতন্দ্র প্রহরায় এবার পাখি-মা। বাপকে যে অ-সুখে ধরেছে। ক্লান্তিও। বাতাসের গায়ে পাখির ডানার ঘর্ষণে শব্দের জন্ম হচ্ছে, আর  সামনে থাকা শব্দ দেখ হাত ধরেছে প্রিয় নিঃসঙ্গ শব্দকে, সাথে আরও কিছু আনুষঙ্গিক শব্দদের নিয়ে কেবল ভেসে চলা, ক্লান্তির শব্দ  মুছে ভোর আসছে...

রেলিঙের গায়ে রোদ পড়লে মৃদু টুং টাং শব্দ ভেসে ওঠে। মা সেতার হয়ে উঠলে, আমাদের আমাদের পুরনো বাড়ি জুড়ে টুং টাং গুলো মিলে মিশে কখন জলতরঙ্গ... পূবালী সূর্য না'কি তখন সশব্দে হাঁটা দিয়েছে পশ্চিম দেশে। যেমন সন্ধ্যে  নামলে, আকাশে অস্পষ্ট শব্দের আভাস। এবার ফুটে উঠছে সে চেনা বা অচেনা আকাশ জুড়ে, যেভাবে চন্দ্রমা।

মল্লিক বাড়ির মূল ফাটকের রক্ষীগুলো কবে থেকে উদাস চোখে দাঁড়িয়ে। মাথায় কাক চড়ুই এর গু। রাত বাড়লে, পেঁয়াজ খোসার মত জলসা ছড়ালে, শব্দগুলো পুরনো ঝাড়লন্ঠন, কি করে যেন আলাউদ্দিন খাঁ হয়ে ওঠে সমস্ত জমিদার বাড়িটাই।এখানে আকাশ ছিলো। আকাশী শব্দ ছিলো সাত রঙা। এখনও আছে। এখানে দুপুর ছিলো, দুপুরের শব্দ ছিল খস খস। এখন নেই। না'কি আছে? বলে রাখি, দুপুরের তাকে রাখা ছিল মৃদু বাঁশির উচ্চারণ! তুমি শুনতে পেতে? একে একে থালা, বাটি, গ্লাস, বাথরুমের কল, ঝরা পাতা একে একে সবাই কি করে যেন হয়ে উঠছে এক একটা বাদ্যযন্ত্র। শব্দ বেরিয়ে আসছে অবিরাম। নিকষিত হেম।

'চে' এক শব্দের নাম। যেমন স্বপ্নেরও  শব্দ আছে। বিপ্লব অনেক শব্দের এক সমষ্টি। শব্দের একটা ধর্ম আছে। কয়েকবার পুনরাবৃত্তিমূলক গুন গুন কর। দেখবে পাশের লোক ও আক্রান্ত। অনেকটা ইনফ্লুয়েঞ্জার মত। কনজানটিভাইটিসের মত। ওর চোখ লাল। তোমারও। তুমি না'কি ওর দিকে চেয়েছিলে? এবার শব্দ  রওয়ানা দিয়েছে প্রধান সড়কে। এবার বিগবেন অথবা শহরের সব চেয়ে উঁচু টাওয়ারে সময়ের আর্তনাদে শব্দ উচ্চারিত হবে। ভাসতে ভাসতে, আকাশ ছাইবে। বৃষ্টি হয়েই নামবে আবারও।

এখানে এখনও ভোর 'রাই জাগো' মন্দ্র  চলনে, সকালের প্রাতরাশে বিছিয়ে রইল 'তুমি নির্মল কর...' দুপুর কেমন ঝিম ঘোরে 'রাণার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম', বিকেল উদাসী হলে-'আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি' চিঠি আসেনা, চিঠির শব্দ আছেই, তবু অপেক্ষা, সেও তো আদতে অনুচ্চার শব্দই,...'ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে নিশুতি রাত' তখন গুমরে কাঁদছে হয়ত বা,আচমকা পাশে শ্মশান থাকায়...'হরি বোল হরি বোল' কেউ চলে যাচ্ছে,'তবুও শান্তি তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে' কোথাও হয়ত কেউ জন্মাচ্ছে, এই এখনই হয়ত,'রাত্রি এসে যেথায় মেশে, দিনের পারাবারে'...ভোর।

একটা লাল শব্দ আসছে, একটা পতাকা শব্দ করতে করতে দৌড়চ্ছে আলপথ ধরে, অনেক পতাকা শব্দ করতে এবার মিশে যাচ্ছে,একটা স্বপ্নের প্যালেটে শব্দগুলো জল রঙে আঁকা হচ্ছে,স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক যুবতী অবয়ব,যেমন স্বপ্ন,আমাদের বেঁচে থাকা অথবা সুর .... নববর্ষে ঐহিক আনলো বাঁচা ও বাঁচানোর মাঝে সাড়ে তিন হাতি সুরেলা জীবন..গান ভালোবেসে গান।