সেতুবন্ধন

তমাল রায়




আলোর দিকে চোখ নিয়ে গেলে,চোখ পুড়ে যায়। তাই আমি আলো দেখিনা! আলো কমে গেলে পড়ে থাকে যা তা আদতে এক আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া,অন্ধকার টানেল হাতড়ে হাতড়ে… স্পষ্টতই একটা সেতুর এপারে আমার বাস। তার ওপারে রাশি রাশি আলোর জগৎ। অনেক খুশী। এপারে গোমড়া মুখ অন্ধকারে আমিই । একা নই সে আছে বলে আমিও আছি। ন্যাশপাতির গন্ধ কিংবা কাগজি লেবুর মত ছেঁড়া এক বিষন্নতা...

তিনি কথা বলছেন না অনেকক্ষণ...তখনও সন্ধ্যে নামেনি। আলো কম,আবার আঁধারও না। অবশ্য আলো বা আঁধার বোঝার বাস্তব সক্ষমতা আমার কই! তিনি হেঁটে আসছেন,কিছুটা ছায়া আর কিছু বাস্তবতায়। আশপাশ এসময় শূন্যতা ভরা থাকার কথা। আর তেমনই। কেবল আমার দুচোখ বেয়ে নেমে আসছে জল। কেন জল,তা কি আর সবসময় বোঝা যায়। আমার দৃষ্টি ক্রমশ অস্পষ্ট। শেষ পাখিটাও কি তবে উড়ে গেল। এবার দীর্ঘক্ষণ নীরবতা ঘনাবে আমার আশপাশে। আমি আচ্ছন্ন থাকবো,কোথা দিয়ে ভেসে আসবে নদীর শব্দ,খুব ধীর,কিন্তু বইছে...ডানা ঝাপটাচ্ছে পাখি। কোনো এক অঙ্গ অকেজো হলে,অন্য অঙ্গ না’কি তীব্র হয়ে ওঠে। অক্ষমতাকে কাভার আপ করতেই। এ সময়ে,বা বলা ভালো অসময়ে কে যেন বলে উঠলো,হাউ ইজ দ্যাট। একটা আঙুল উঠে গেল সোজা। আউট। না’কি আউস্টেড? জানা নেই। কেবল এক অসহ্য যন্ত্রণা মূর্ছনার মত ভাসতে ভাসতে কিছু পর সঙ্গীত হয়ে উঠবে। সে সময়ে না’কি আলোকিত হয় আকাশ,মৃদূ সুগন্ধী বাতাসে ভরে যায় পরিমন্ডল। আর...হয় এসব। আমি কেবল প্রতীক্ষায় থাকি। কিন্তু আসে কই,তিনি ... অথবা আছেন,শ্বাস পড়ছে বুঝিবা এখনও...

একটা অস্পষ্ট পাহাড়। তাকে আমি দেখেছি ছোট বেলায়। লম্বা দোহারা চেহারা। কথা বলেন কম। হাঁটেন দৃপ্ত ভঙ্গীতে। মার্জিত কন্ঠ। এনার নিজের একটা জগৎ আছে। তার বাইরে খুব একটা বেরোন না। নিজেকে নিয়েই মগ্ন থাকেন। রাত আরও ঘনালে হিস হিসে কন্ঠে শুনতে পাই,কেঁদে কি লাভ। তখনই বলেছিলাম। দিয়ে আসি কোনো অনাথ আশ্রমে। কান্নার দমকটা আর একটু বেড়ে আরও কমে যায়। আমি জেগে আছি বুঝে, থেমে যায় সব। বাইরে তখন এঁটো বাসনে মুখ দিচ্ছে বেড়াল,ঝন ঝন ঝনাৎ। উনিই না’কি… তা তিনি জানিয়েছিলেন উনিই না’কি বাবা। তেমনটাই চিনেছি, দূরত্বে, আবছায়ায়…

ওই যে হাত কয়েক দূরে যে,সে না’কি ভাই। চেনা তো এভাবেই হয়। হাত দিয়ে দেখেছি। ভারি মিষ্টি। এক মাথা কোঁকড়া চুল। ওর কাছে আলো আসে। ও তাই টপাটপ সেঁড়ি ভাঙে। আর কি হাসি। বিজয়ীর বস্তুত হাসি রাশি রাশি। কিন্তু পরাজিতর,শুধুই কান্না? অভিমান,ক্রোধ,হুংকার… আর প্রতিবেশী? সে’কি সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়? না সাহচর্যে?
পায়ে কখন থেকে হাত দিয়ে ঘষছি কিচ্ছু হয় না কেন?
তিনি সেতার বাজাতে ভালোবাসেন । স্ট্রিং ইনস্ট্রুমেন্ট বড় মিষ্টি। বাজলে আমার বন্ধ চোখের ওপর ঝরে পড়ত টুপ টাপ লাল,নীল শিমুল জারুল। এমনিতে নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়িতে যেমন হয়। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকতে গেলে বেরিয়ে পড়ে পেছন। সেভাবেই তো আমাদের সংসার, নুন, হলুদ, সাদা-কালো, কেবল ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে রান্না ঘর। ধোঁয়া গুলো কখন যেন তারই আকৃতি নিয়েছে। নুন আনতে পান্তা ফুরনো সকাল জুড়ে মাছের ঝোল আর ডাল,আর আলুসেদ্ধ... খাওয়া দাওয়া নৈমিত্তিকতায় এক। কেবল সে আছে তাই গাছে গাছে দু একটা ফুল ফোটে,বিকেল হলে ছড়িয়ে পড়ে ট্যালকম পাউডারের গন্ধ। আঁট করে বাঁধা খোঁপা, পাট ভাঙা শাড়ি, আর ইয়া বড় টিপ...এরপরই কি করে যেন দৃশ্য কাঁপতে কাঁপতে ব্লার হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে সন্ধ্যে নামে, রাত। আর আঁধার.... আমি আঙুল দিয়ে অনুভব করি একটা লালের বাঁকা টানে ঘোমটা, দুটি আয়ত চক্ষু, নীচে ভেসে রয়েছে অপার মায়া…
সেই মায়াবী গন্ধটা এখন কেমন ফিকে, অথচ তিনি থাকলে কি সুগন্ধ... দুবার ঝাঁকালাম, অল্প নড়লো মাত্র।

অস্পষ্টতায় কখনো ধূসর রংগুলো ফিকে হতে হতে নিকষ কালো। তাঁর কপালের টিপের নীচে যখন ঘাম তখন দিন। আর যখন ঘাম নেই রাত। চাঁদ বা সূর্য বুঝে ওঠার সহজ উপায় বাতলে দেয়নি কেউ। সেই কোন কালে যখন সকাল হত,উঠোনে পড়ে থাকতো শিউলি। শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে ওঠার আগে,কিছুক্ষণ হেঁটে গেল,আমাদের বারান্দায়। আলো আর ছায়া,রেলিং ঝিকিয়ে পড়ে আছে লাল বারান্দায়। একটা লাল বল একবার এদিক আর একবার ওদিক। রেডিওতে বিবিধভারতী। কেটে গেলে আছে বোরোলিন। ত্বক যদি ফেটে যায়...হাসিগুলো সকাল হয়ে বাবুমোড়া হয়ে বসলো পাশেই। এঁটোপাতে আঙ্গুল চলছে,ছবির নির্মাণ হচ্ছে। এবার নীচ থেকে ভেসে আসছে হুংকার,নেমে এলাম সুড় সুড় করে,আর সিঁড়ি গুলো চলতে লেগেছে,নামার পথে যেখানে চাতাল মেলে দেওয়া আছে শাড়ি। ভিজে আর জলজর মাঝে। ছোঁওয়া লাগতেই কেমন শান্তি,আর আরাম....আমি হারিয়ে যাচ্ছি। কতই বা বয়স,তবু আরাম লাগলে চোখ বুজেই আসে। এ সময়ে এল পিতে বেজে উঠবে সায়গল আর কাননবালা...নাঁকি সুরের সেই গান সারা বাড়ি ঘুরে রওয়ানা দেবে মেঠোপথ,আলপথ ধরে সোজা সাদা কালোর রঙীন জগতে। কেবল ঘুম আসবে চোখ জুড়ে। আর পাশের গলিতে কারা যেন হেঁকে যাচ্ছে পুরনো ভাঙা বাসন কোসন,আলমারিইইইই।

জল এনে মুখে ঝাপটা দিলাম...একটু নড়ে আবার স্থির...
একটা আলমারিই জানেন,তার দুটো দরজা,আর ফ্রেম তিন। যেমন হয়। এক দরজা খুললে,আর একটা বন্ধ হয়। আর,ডাক নামে কেউ ডাকে...জর্দার সুগন্ধি বাতাসে,নাক রাখি,কড়া থেকে উঠে আসছে বেগুন ভাজার শব্দ,তাঁর মুখ লাল উনুনের গনগনে আঁচে। হাসি কিন্তু অমলিন,এবার সকাল এসে তার পাশে বসলেই সুখবর জন্ম নেবে। খোকা,হাসি মাসির ছেলে হয়েছে,ও যেন তোর মত হয়!

মানে কি?

খুশি বেড়ালেরও তিনটে বাচ্চা। দুটো মরে গেছে। মা বেড়াল বুকে আগলে মৃত শিশুদের। চোখের কোণে জল। হাসিও। তুই বড় হবি তো?

-বড় কেমন করে হতে হয়?

ঝিলিকরা আজ চলে গেল,পাড়াটা এবার নিঝুম হয়ে আসছে। তুই যাবি না'তো ছেড়ে এই বাড়িটা।

-বাড়ি কি করে ছাড়ে?

কাল হুতুমের জন্মদিন। ওদের তো তেমন পয়সা নেই। আমি লুচি আর পায়েস করে দিয়ে আসবো। তুই একটা কিছু কিনে দিস ওকে।

-জন্মদিন মানেই কি উৎসব?

স্বপন মামার খুব অসুখ রে। একবার দেখে আসবো যাবি?
-স্বপন মামাদের কেন অসুখ হয়?

আমার আঙুল ছেড়ে হাতটা পড়ে গেল,কি হল? কি হল....
ভাষার শরীরে যত ক্ষতচিহ্নই থাকুক,তা মুছে যায় যখন সমস্বরে ডাকা হয়...

জলে হাত রেখে বুঝি জল। গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠলে বুঝি,গন্ধ নাকে লাগে। বুঝি এখনও নিরন্ন নই। কানের পাশে গুন গুন শব্দে বুঝি মশা। মারতে যাইনা। কারণ তিনি বলেছেন নিরীহ অবলাকে মারতে নেই। আর তুচ্ছতার জীবনে হাত হারালে আমিও মাছি,মশা বা আরশোলাই…হাতই তো খুঁজি…কানে আসে সাইকেলের ঘন্টি,লরীর হর্ণ। অথবা রিক্সার প্যাঁকর প্যাঁকর। দৃশ্যগুলো শব্দ হয়ে মাথার একটা জায়গায় জমে,সেখান থেকে ফিল্টার করে একে একে চিনে নিই ছবিদের। যদিও ছবিরা আমার বন্ধু হয়ে ওঠে না কখনোই।
হাত নামিয়ে এনে দেখলাম শ্বাস পড়ছে এখনও...

তুলসী মঞ্চের কাছে বুঝি প্রদীপ জ্বলছে। যা যতটুকু আলো,তা কখন আপন হয়ে আঁধার কমিয়ে দুর্বার হলে,ঘরে ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। দুলে দুলে পড়া,সাথে মুড়ি ও ছোলা সেদ্ধ। আমাদের রেস্তর জোর নেই। মনের আবেগ আছে। আছে হার না মানা মনোভাব। হাজার 'না'এর সাথে লড়েই তো হ্যাঁ হতে হয়। কিছু পর পলাশ শিমুল ছুঁয়ে বাতাস আসবে বারান্দায়। আর আমরা গুন গুন করে গেয়ে উঠবো,আমার যে সব দিতে হবে সেতো আমি জানি,আমার যত বিত্ত প্রভু আমার যত গ্লানি। কেবল পরাক্রমে আমি হয়ে ওঠার আগেই,নি:স্ব হও,আপন দেবতার কাছে। দেখ তুমিও জ্বলে আছো। যিনি শিখিয়ে ছিলেন,তার মুখে বেদনার হাসি। একটু আগে মারা গেছে তার বড় বোন। অথচ কি স্তিমিত
শোক যেন প্রস্তাবনা না হয়ে ওঠে। গভীরে আলো জ্বলুক। ভালোবাসায় বাজছে সকরুণ বেণু। কেবল স্মৃতি গুলো সাজানো থাকলো টেবিলে। কেউ এসেছিলো। আলো লিখে গেছে।
কতক্ষণ ধরে ডাকছি কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না। কেন?
এসব শুনি আর ভাবি - একটা কিশোরী না’কি আলো হয়ে এসেছিলো কখনো এই বাড়িতে। তিন তলা বাড়ি। সেকি খুব লম্বা হয়? তার গায়ে শ্যাওলা জমে? শ্যাওলা কি মাছেরা খায়? মাছেরা কি এঁকে বেঁকে চলে? কুকুর কি খুব দৌড়তে পারে? এসব জেনে যাচ্ছিলাম,ভাগ্যে সে ছিলো। ইঁদুর কি কামড়ায়? সে বলেছিলো, না। গায়ে পা পড়লে কামড়াবে। এমনি কেন কামড়াবে। আর ওরা? যারা আমায় দেখে হাসে? তাদের কি হাসার সময় ক্যানাইন টিথগুলো বেরিয়ে আসে? কেন! তিনি বলেছিলেন যে বড় হয়,সে ছোট ছোট ঘটনাগুলো কে ইগনোর করে। আর আমাকে যদি ইগনোর করা হয়? ?? কিশোরী কেমন বড় হয়ে গেছেন প্রতিপালন করতে করতে। মানুষ বানানো তো যে সে কথা নয়!

নাকে কর্পুর শোঁকালাম,জুতোও... না,কিছু হচ্ছে না...
মার্বেল গুলি গুলো কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়। পা ফেলছি যেখানে গড়িয়ে যাওয়া। এ সমস্ত সময়ে এগিয়ে আসতো কোনো হাত,কিন্তু হাত হারিয়ে যায় বলেই তো হেঁটে চলতে হয় অবিরাম। ছোটো কাকটা পড়ে গেছিলো উঠোনে কি করে যেন,আর রাজ্যের কাক ভীড় করে এসেছে। চীৎকার মাথার ওপর কাক ঘুরছে অনেক। তিনি ঠোক্কর উপেক্ষা করেই পরিচর্যায়। বলতেনও তাই- শুশ্রুষা করবে অথচ ঠোক্কর খাবে না,এ আবার বাঙালির স্বভাব না’কি। আমি কিছুই বলতাম না। গুলির পাশে গুলি বসলে হয় চোখ,আর একটু নীচে আর একটা গুলি নাক,আর একটা মুখ । ব্যস হয়ে গেল মানুষ। মানুষ তাহলে কি এমন মুভেবল এলিমেন্টেরই কি যোগফল! আর যিনি এই এত্ত সমস্ত করেন,করেই যান,তিনি আছেন বলে অনুভব করে করে হাঁটতে হয় না আর। অনুমানে পেরিয়ে যাই অপার…
চোখ বন্ধ। তাহলে কি এভাবেই সুগন্ধ দেহ ছেড়ে যায়,আর কোনো বাতাস নেই কেন,সুগন্ধ?

উত্তর নাকি একটা দিক। দক্ষিন,পুব,পশ্চিম। নৈঋতে বসে থাকতেন তিনি। যেভাবে কোথাও আলো জ্বলে থাকে খুব অন্ধকারেও। একটু আগে তিনি চলে গেলেন। হয়ত’বা। তিনি হয়ত একটা আলমারিই। ভেতরে সাজানো সব অতীতের র‍্যাক। জর্দার গন্ধ। সেতারের শব্দ। অথবা এক অচিরাচরিত আলোই…কেউ নেই এ তিন তলা বাড়িটায়। কেবল মৃতদেহ ছুঁয়ে আমি…একটু দূরে ঘাস,পাতা পড়ে আছে কিছু অনিবার্যতায়। এগুলো আমার দৃশ্যতে আসে না,কিন্তু অনুভবে আমি দৃশ্য নির্মাণে সক্ষম কেবল তিনি ছিলেন বলেই। আর আমি জামা ছাড়বো না,স্নান করবো না…তাঁকে স্পর্শ করে থাকবো,কারণ অস্পষ্টতায় একটু দূরে তাঁকে ছুঁয়েই যে একটা সেতু… তাঁর হাত ধরে জন্মান্ধ আমি ওই সেতু ধরে দৃশ্য আর অদৃশ্যের মাঝে প্থ খুঁজে বেড়াবো অ আ ই ঈ …আমার বর্ণমালা...দূরে তখন হয়ত পাখি এক চলেছে উড়ে…যেভাবে…মা পাখি হয়ে যান কোনো এক অস্পষ্ট ভোরে…